Image

সড়ক নির্মাণ এবং মান নিয়ন্ত্রণ (দশম পর্ব)

সড়ক নির্মাণকাজে সার্বিক মান নিয়ন্ত্রণ

বিভিন্ন প্রকার সড়ক নির্মাণ কল্পে সড়কসমূহের প্রকারভেদ, প্রয়োজনীয় মালামাল, যন্ত্রপাতি এবং কাজের পদ্ধতিসংক্রান্ত বিষয়াবলি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে সুদীর্ঘ আলোচনার প্রতিটি পর্বেই মালামাল ও কাজের গুণগত মান সম্পর্কে ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে সব বিষয়ের ওপরই আলোকপাত করা হয়েছে। তদুপরি, একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নার্থে ব্যবহৃতব্য মালামাল এবং কাজের সার্বিক মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আর একবার সবিস্তারে আলোচনা করছি। কারণ, একটি দেশের সড়কব্যবস্থাই সে দেশের সার্বিক উন্নয়নের চাবিকাঠি কিংবা প্রধান সোপান হিসেবে পরিগণিত। ফলে, যেকোনো দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নতি ত্বরান্বিত করতে এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে দেশের সুনাম তুলে ধরতে টেকসই ও মজবুত সড়ক নির্মাণ করা অপরিহার্য। আর এই টেকসই ও মজবুত সড়ক নির্মাণ নিশ্চিত করণার্থে মালামাল ও কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং অভিজ্ঞ ও দক্ষ লোকবল নিয়োগ দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। 

তাই, যেকোনো সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের প্রাথমিক স্তর হিসেবে স্থানীয় সুবিধা-অসুবিধা (সুফল-কুফল) বিচার-বিশ্লেষণ করে সাইট সিলেকশন করা এবং আর্থিক সংগতি বিবেচনায় নিয়ে বিস্তারিত একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা অত্যাবশ্যক। একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নকল্পে ভৌত কাজ শুরু করার প্রথম ধাপ ‘আর্থ অ্যাবেঙ্কমেন্ট’ নির্মাণ করা। অত্র কাজিটি শুরু করার পূর্বে রাস্তা ভরাট করার জন্য মাটি পরীক্ষা এবং মাটি নির্বাচন করা অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়।

রাস্তা ভরাট করার জন্য মাটির গুণাগুণ এমন হওয়া বাঞ্ছনীয়, যা ভরাট করার পর সূষ্ঠু ও সঠিকভাবে কম্প্যাকশন করা সহজতর হয়। আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা অনুসারে-মাটি যদি সঠিকভাবে নির্বাচন করা যায়, তাহলে তা যথাযথ নিয়ম অনুযায়ী কম্প্যাকশন করা হলে এত কঠিনভাবে কম্প্যাকশন করা সম্ভব যেখানে লোহার পেরেক বসাতে একটি গর্জন কাঠের চেয়ে বেশিসংখ্যক হাতুড়ির আঘাত প্রয়োজন পড়ে এবং এটা আমার নিজের হাতে পরীক্ষিত।

এ ছাড়া, মাটি সুষ্ঠু ও সঠিকভাবে কম্প্যাকশন করার জন্য প্রতিটি লেয়ারের বেইজটি শক্ত এবং মজবুত হওয়া দরকার। এ উপলক্ষে রাস্তার প্রথম লেয়ারে মাটি ভরাটের জন্য নির্ধারিত এলাকা থেকে কাদা-পানি কিংবা অন্যান্য ময়লা-আবর্জনা সম্পূর্ণরূপে সরিয়ে ফেলে শক্ত বেইজ তৈরি করে নিতে হবে। কোনো নরম কিংবা স্পঞ্জি মাটি বেইজের ওপর থাকতে পারবে না। তবেই এর ওপর ভরাটকৃত মাটি যথাযথ নিয়ম মেনে কম্প্যাকশন করলে আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যাবে।

আমি সৌভাগ্যক্রমে আশির দশকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশের আন্তর্জাতিক একটি ‘এক্সপ্রেস ওয়ে’ নির্মাণকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। যেখানে ‘আর্থ অ্যামবেঙ্কমেন্ট’ থেকে শুরু করে সাব-গ্রেড, সাব-বেইজ এবং অ্যাজফাল্ট কার্পেটিং করাসহ একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের প্রতিটি কাজ সরেজমিনে দেখেছি। আমার সেই অভিজ্ঞতায়, আমাদের দেশের সড়ক নির্মাণ প্রকল্পসমূহে কাজের মান নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি করার সুযোগ আছে। 

মনে রাখা দরকার, যেকোনো কাজের ভিত বা বুনিয়াদ শক্ত ও মজবুত করা মুখ্য একটি বিষয়। এই বুনিয়াদ তৈরির কাজে যদি কোনো দুর্বলতা থেকে যায়, তাহলে পুরো কাজটিই ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যেতে পারে। তাই একটি রাস্তার বুনিয়াদ (আর্থ অ্যামবেঙ্কমেন্ট) নির্মাণ করণার্থে সংশ্লিষ্ট সবার সর্বোচ্চ সজাগ ও সচেষ্ট থাকা জরুরি।

(চলবে)

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১১০তম সংখ্যা, জুন ২০১৯ 

Related Posts

দেয়ালের স্যাঁতসেঁতে দাগ: কারণ কী, সমাধান কী

বৃষ্টির মৌসুম শেষ হতে না হতেই বেডরুমের দেয়ালে হালকা একটা কালচে ছোপ চোখে পড়ে। প্রথমে ভাবি, “থাক, শুকিয়ে…

শতবর্ষী গুদাম যেভাবে কার্পেট শোরুম হলো

মুম্বাইয়ের ভিক্টোরিয়ান টেক্সটাইলের শতবর্ষী গুদামের নাম হয়েছে জয়পুর কার্পেট। তবে আজ তার জরাজীর্ণতা ঘুচে রূপ নিয়েছে নতুন ঠিকানায়।…

বাংলাদেশে টেকসই সড়ক নির্মাণ বাধ্যবাধকতা

বর্তমান বিশ্বে অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হলো সড়ক নির্মাণ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান…

রেলিং: নিরাপত্তা, সৌন্দর্য ও স্থায়িত্বের সমন্বয়

রেলিং একটি ভবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না, বরং ভবনের নান্দনিক সৌন্দর্যও বৃদ্ধি করে। বাড়ি,…