construction

ক্রমবর্ধমান পাকা বাড়ি ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

মানুষ বাড়ছে। বাড়ছে বসতি। কাচা বাড়ি নয় বাড়ছে পাকা বাড়ি। বর্তমান বাংলাদেশে পাকা বাড়ির সংখ্যা লাগামহীন বৃদ্ধি পাচ্ছে। একসময় যেখানে গ্রামীণ এলাকায় অধিকাংশ মানুষ টিন, বাঁশ, কাঠ কিংবা মাটির ঘরে বসবাস করতেন, আজ সেখানে এখন ইট, সিমেন্ট, রড ও কংক্রিট দিয়ে নির্মিত হচ্ছে পাকা বাড়ি।

কেউ কেউ বাড়ি নির্মাণ বিনাশ করছে আবাদী জমি। নগরায়ণ, মানুষের আয় বৃদ্ধি, প্রবাসী আয়, সরকারি আবাসন কর্মসূচি এবং উন্নত নির্মাণপ্রযুক্তির কারণে এই পরিবর্তন আরও দ্রুত হচ্ছে।

পাকা বাড়ির প্রসার নিঃসন্দেহে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে এর পাশাপাশি পরিবেশ, কৃষি, সামাজিক সম্পর্ক, জলবায়ু এবং নগর ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাবও পড়ছে। তাই পাকা বাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি শুধু জীবনমান উন্নয়ন নয়। এই ‍উন্নয়ন একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরেরও প্রতিচ্ছবি।

যে কারণে বাড়ছে পাকা বাড়ি

নানা কারেণেই বাংলাদেশে পাকা বাড়ি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পেছনে অনেক কারণের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণও রয়েছে।

roadside house
যত্রতত্র গড়ে উঠছে পাকা বাড়ি। ছবি: সংগৃহীত

১. মানুষের আয় বৃদ্ধি: গত দুই দশকে দেশের মাথাপিছু আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ব্যবসা, চাকরি, কৃষি এবং প্রবাসী আয়ের কারণে অনেক পরিবার এখন পাকা বাড়ি নির্মাণে সক্ষম হচ্ছে।

২. নগরায়ণ: শহরের পাশাপাশি উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলেও আধুনিক আবাসনের চাহিদা বেড়েছে। ফলে গ্রামেও পাকা বাড়ির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

৩. ব্যাংক ঋণ ও আবাসন সুবিধা: বর্তমানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সহজ শর্তে গৃহঋণ প্রদান করছে, যা অনেক মানুষের জন্য পাকা বাড়ি নির্মাণকে সহজ করেছে।

৪. আধুনিক নির্মাণসামগ্রীর সহজলভ্যতা: ইট, সিমেন্ট, রড, কংক্রিট ব্লক, টাইলস ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী এখন দেশের প্রায় সব এলাকায় সহজে পাওয়া যায়।

জনজীবনে ইতিবাচক প্রভাব

পাকা বাড়ির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো নিরাপত্তা। এ ধরণের বাড়িতে ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কমায়। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়প্রবণ ও বন্যাকবলিত এলাকায় পাকা বাড়ি মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পাকা বাড়ি
ফসলি জমি নষ্ট করে গড়ে তোলা হচ্ছে ইট পাথরের বাড়ি। ছবি: সংগৃহীত

পাকা বাড়িতে উন্নত স্যানিটেশন, নিরাপদ পানি ব্যবস্থা থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকাংশেই কমে। এছাড়া  পর্যাপ্ত আলো-বাতাস আমাদেরকে মানসিকভাবেও প্রশান্তি দেয়। সব মিলে আধুনিক, স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করায় পাকা নি:সন্দেহে আমাদের জীবনমান উন্নত করে।

অপরদিকে বেশিরভাগ কাচা বাড়িতে অব্যবস্থাপনা থাকায় নানারকম সমস্যা যেনো পিছুই ছাড়ে না। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, ধুলাবালি এবং পোকামাকড়ের সমস্যাও বেশি থাকে। স্যাঁতস্যাতে পরিবেশে দিনকে দিন এডিস মশার উপদ্রব বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু সংক্রমণও।

বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী বাড়িতে অনলাইন ক্লাস করে এবং অনেকেই বাসা থেকেই কাজ করেন। পাকা বাড়ির নিরিবিলি পরিবেশ নিরিবিলি পরিবেশ থাকায় ক্লাসে অংশগ্রহণ করা সহজতর হয়।

একটি পাকা বাড়ি শুধু বসবাসের জায়গা নয়, মূল্যবান সম্পদও। ভবিষ্যতে কাচা বাড়ির তুলনায় বেশি দামে বিক্রি করা যায়। ভাড়া দিয়ে নিয়মিত আয়ও করা সম্ভব।

পাকা বাড়ি মানুষের সামাজিক অবস্থানের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়। গ্রামে অনেক পরিবার প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে আধুনিক বাড়ি নির্মাণ করছে, যা তাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করছে।

এছাড়া পাকা বাড়ি শিল্প বিকাশেও ভূমিকা পালন করছে। পাকা বাড়ির চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সিমেন্ট শিল্প, রড শিল্প, টাইলস, সিরামিক, কাচ ও অ্যালুমিনিয়ামের মতো শিল্পখাতগুলোও সম্প্রসারিত হচ্ছে।

পাকা বাড়ির নেতিবাচক প্রভাব

যদিও পাকা বাড়ি মানুষের জীবনমান উন্নত করে, তবে কিছু নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে বাড়ি নির্মাণের ফলে উর্বর কৃষিজমি দ্রুত কমে যাচ্ছে। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য। গ্রামীণ পরিবেশেও ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ইট, কংক্রিট ও অ্যাসফল্ট প্রচুর তাপ শোষণ করে তাই দিনে শেষ রাত আসলেও তাপমাত্র কমতে কমতে রাত যেনো শেষ হয়ে যায়। শহরগুলো পরিণত হয়  হিট আইল্যান্ডে। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বেড়ে যায় মাত্রাতিরিক্ত হারে। অতিরিক্ত কংক্রিটের কারণে বৃষ্টির পানি শোষণ করতে পারে না মাটি।

paved house
ফসলি জমিতে পাকা বাড়ি, খাদ্য সঙ্কটের আশঙ্কাও বাড়ছে। ছবি: সংগৃহীত

জমিতে পাকার পাকার পরিমাণ (Hard Surface) বেড়ে যাওয়ায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকলেও তার উপর বাড়তি চাপ পড়ে। দেখা দেয় জলাবদ্ধতা।

পাকা বাড়ি নির্মাণে যেসব উপকরণ ব্যবহার করা হয় সেসব উপকরণ উৎপাদনে প্রচুর কার্বন নি:সরণ হয়। এতে ধ্বংস হচ্ছে বায়ুমন্ডল। পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়ছে দিনকে দিন।

সামাজিক চ্যালেঞ্জ

দিন দিন পাকা বাড়ি বৃদ্ধির ফলে কমে যাচ্ছে ফসলী জমি। উৎপাদন কমে যাওয়ায় খাদ্য সঙ্কট বাড়ছে লাগামহীন। বাড়ছে কৃষি পণ্যের দাম। নিত্যপণ্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতির কারণও দিন দিন পাকা বাড়ি বৃদ্ধি। আমাদের নিত্যপণ্যের বেশিরভাগই কৃষিপণ্য। দিন দিন কৃষি জমি কমে যাওয়ায় প্রভাব পড়ছে নিত্যপণ্যের দামেও।

খেলাধুলা শিশু কিশোরেদের বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। দিন দিন পাকা বৃদ্ধির ফলে কমে আসছে খেলার মাঠ। উন্মুক্ত স্থান সংকুচিত হচ্ছে। প্রতিবেশীদের সাথে পারস্পারিক সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে। শিশুদের প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ এখন প্রায় নেই বললেই চলে।

টেকসই সমাধান

পাকা বাড়ির সংখ্যা বাড়লেও পরিবেশ ও জনজীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। সবুজ ভবন নির্মাণের মাধ্যমে পরিবেশ বিপর্যয় কমাতে পাকা বাড়িতে ছাদবাগান করা যেতে পারে। বিদ্যুতের উপর বাড়তি চাপ কমাতে সৌরবিদ্যুৎ হতে পারে সেরা বিকল্প।

বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহার করলে ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমবে। ঘরের পরিবেশ স্বাভাবিক ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ রাখতে ঘরে প্রচুর প্রাকৃতিক আলো-বাতাস নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়ণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী কয়েক দশকে শহর ও গ্রাম উভয় এলাকায় পাকা বাড়ির সংখ্যা আরও বাড়বে। তাই এখন থেকেই পরিবেশবান্ধব নির্মাণনীতি, সবুজ স্থাপত্য এবং টেকসই নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা জরুরি।

জলাবদ্ধতা
অপরিকল্পিত পাকা বাড়ির ফলে বাড়ছে জলাবদ্ধতা। ছবি: সংগৃহীত

রাজউক, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED), গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু-সহনশীল আবাসন গড়ে তোলা সম্ভব।

পাকা বাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি বাংলাদেশের উন্নয়নের একটি ইতিবাচক সূচক। এটি মানুষের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে নির্মাণশিল্প, সিমেন্ট, ইস্পাত, সিরামিক ও অন্যান্য খাতের প্রবৃদ্ধিতেও অবদান রাখছে।

তবে অপরিকল্পিত নির্মাণ, কৃষিজমি হ্রাস, জলাবদ্ধতা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ দূষণের মতো চ্যালেঞ্জও উপেক্ষা করা যায় না। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে শুধু বেশি পাকা বাড়ি নির্মাণ করাই যথেষ্ট নয়। টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি-দক্ষ আবাসন নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে।

পরিকল্পিত নগরায়ণ, সবুজ ভবন প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং কৃষিজমি সংরক্ষণের সমন্বিত উদ্যোগই পারে উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে একটি নিরাপদ, আধুনিক ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।

Related Posts

বিয়ের প্রতিশ্রুতি রাখতে আকাশের নিচে নির্মিত হলো এক উন্মুক্ত মন্দির

বিয়ের প্রতিশ্রুতি রাখতে গিয়ে কেউ যদি একটি পুরো স্থাপনা ডিজাইন করে ফেলেন, তবে সেই গল্প সহজে ভোলার নয়।…

বিশ্বের প্রাচীনতম স্থাপনা: হাজার বছর টিকে থাকা স্থাপত্যের বিস্ময়

মানুষের স্থাপত্যচর্চার ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরোনো। আধুনিক শহর, সুউচ্চ ভবন কিংবা অত্যাধুনিক নির্মাণ প্রযুক্তির অনেক আগে মানুষ…

রঙের ভাষায় ছয়টি ভবনের গল্প

অনেকের ধারণা, ভবনে বেশি রং ব্যবহার করলে ডিজাইনের গাম্ভীর্য আর বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়। রং যেন কেবল সাজসজ্জা, স্থাপত্যের…

অস্ট্রিয়ার আল্পসে জলের আয়না: স্নোহেটার “লেখ মাউন্টেন মিরর”

পাহাড়ের চূড়ায় উঠে চারপাশের দৃশ্য দেখতে আমরা সবাই পছন্দ করি। কিন্তু সেই দৃশ্যকে যদি পায়ের নিচে জলের ওপর…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

বাওয়ার দৃষ্টিতে স্বভূমি শ্রীলঙ্কার স্থাপত্য
বিয়ের প্রতিশ্রুতি রাখতে আকাশের নিচে নির্মিত হলো এক উন্মুক্ত মন্দির
Knap-of-Howar
রঙের ভাষায় ছয়টি ভবনের গল্প
অস্ট্রিয়ার আল্পসে জলের আয়না: স্নোহেটার “লেখ মাউন্টেন মিরর”
highrise
হাওর জীবন
ফর্ম, অর্ডার ও জীবন: বিংশ শতকের স্থাপত্যভাবনা
শ্রমিক