• Home
  • টপ-পোস্ট
  • সাক্ষাৎকার | ওয়ার্ল্ড আর্বান ফোরাম ২০২৬-এ অনুষঙ্গ বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা
Image

সাক্ষাৎকার | ওয়ার্ল্ড আর্বান ফোরাম ২০২৬-এ অনুষঙ্গ বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা

অনুষঙ্গ বাংলাদেশ প্রচলিত ডিজাইন ফার্মের চেয়ে ভিন্নভাবে কাজ করে। তারা মাঠপর্যায়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে স্থানীয় পরিবেশ ও জলবায়ুর উপযোগী নকশা তৈরি করে। পাশাপাশি অংশগ্রহণমূলক কর্মশালার মাধ্যমে স্থপতি, প্রকৌশলী, রাজমিস্ত্রি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে একত্রিত করে দ্রুত, কম খরচে এবং প্রয়োজনভিত্তিক স্থাপত্য সেবা নিশ্চিত করে।

বর্তমানে তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন পৌরসভা, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) এবং এডু ফাউন্ডেশনের মতো দেশি-বিদেশি সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সাথে যৌথভাবে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বিভিন্ন সামাজিক আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

সম্প্রতি আজারবাইজানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড আর্বান ফোরাম (World Urban Forum)-এ ‘Practice Hub’ বিভাগে নির্বাচিত স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পেয়েছিল অনুষঙ্গ বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক এ স্বীকৃতি ও অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা নিয়ে বন্ধন ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে স্থপতি সুপ্রভা জুঁই কথা বলেছেন অনুষঙ্গ বাংলাদেশ-এর এ কে এম সালেহ আহমেদ অনিক এবং মোঃ ওমর ফারুক সানিম-এর সঙ্গে। 

এ ছাড়াও এই প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য সদস্যরা হলেন, মঈনুল আলম, শুভ দত্ত, সাদ ইউসুফ আন্দালিব, সৈয়দ সাইফ উদ্দিন আহমেদ, মেহরান হায়দার ও জান্নাতুল ফেরদৌস মালিহা।

অনুষঙ্গ বাংলাদেশ সম্পর্কে সংক্ষেপে আমাদের পাঠকদের জন্য কিছু বলবেন? এর লক্ষ্য, কার্যক্রম কাজের পরিধি সম্পর্কে জানতে চাই।

সালেহ আহমেদ: আমরা ছয়জন বুয়েট গ্র্যাজুয়েট, আমাদের উদ্যোগেই এর শুরু। বাণিজ্যিক চিন্তার বাইরে গিয়ে বাংলাদেশে সম্পূর্ণ মানবিক স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে কম আয়ের মানুষের জন্য কম খরচে ও নিরাপদ আবাসন নকশা তৈরিতে কাজ করছে ‘অনুষঙ্গ বাংলাদেশ’। ২০১৮ সালে ব্র্যাক (BRAC) আয়োজিত &quot আর্বান ইনোভেশন চ্যালেঞ্জে  বিজয়ী হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৮ সাল থেকে আমাদের পথচলা শুরু হয়।  

এখন অনুষঙ্গের কাজ আরও বর্ধিত হয়েছে। আমরা চাই, বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগণের জন্য সাশ্রয়ী ও স্বাস্থ্যকর আবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করতে। গত আট বছর ধরে আমরা এই মানুষগুলোর জন্যই কাজ করছি। সরাসরি তাদের সাথে যুক্ত হওয়া কঠিন তাই সরকারি বা বেসরকারি নানান স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে একসাথে আমরা কাজ করছি। এক্ষেত্রে আমাদের কাজগুলোতে যা যা প্রাধান্য পেয়েছে তা হলো- সাশ্রয়ী মূল্য নিশ্চিত কতা, বাসাটা যেন সহজে রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়, পরিবর্তনশীল জলবায়ু মোকাবেলার ক্ষমতা নিশ্চিত করা, সার্ভিস ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা। এ ছাড়া যে কমিউনিটির জন্য বানানো হচ্ছে তাদের সাথে  আলাপ করে তাদের সমস্যাগুলোকে বুঝে সেগুলো ডিজাইনের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা। 

ওয়ার্ল্ড আর্বান ফোরাম-এ (World Urban Forum) আপনারা মূলত কোন বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন, এবং কেমন প্রতিক্রিয়া পেলেন?

সালেহ আহমেদ: আমরা আসলে আমাদের এই দীর্ঘ সময়ের কাজগুলোকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে নিয়ে আসতে চাচ্ছিলাম। এগুলো নিয়ে কথা হলে আমাদের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার একটা সুযোগ যেমন তৈরি হবে, তেমনি সচেতনতাও বৃদ্ধি পাবে। এই খোঁজ করতে করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমরা দেখলাম ওয়ার্ল্ড আর্বান ফোরাম এই প্রথম ‘Practice Hub’ বলে একটি শাখা তৈরি করেছে। 

এখানে তারা বিশ্বজুড়ে এমন আবাসন প্রকল্পগুলো আহ্বান করে যেগুলো বানানো শেষ হয়ে মানুষজন উঠে গিয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা, ফিডব্যাক এসব নিয়েই একটা আলোচনা করে জ্ঞানের আদান-প্রদান ও নিজেদের অবস্থান বুঝতে পারাটা ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। তখন আমরা এপ্লাই করি এবং ওরা আমাদের নির্বাচন করলে আমরা ওয়ার্ল্ড আর্বান ফোরামে আমন্ত্রিত হই। কুষ্টিয়া, চাঁদপুর ও নোয়াখালী এই তিন জায়গায় UNDP এর সহযোগিতায় আমরা পরামর্শকের কাজ করি যেগুলো উপস্থাপনের জন্য আমরা নির্বাচিত হই। এভাবেই আমাদের যাত্রার শুরু।  

১৮ থেকে ২২ মে পর্যন্ত মোট ১১টা সেশন ছিল। মজার বিষয় হলো, কেউ এখানে আলাদাভাবে নিজেদের কাজগুলোকে উপস্থাপন করেছে এমন না, বরং তুলনামূলক আলাপই হয়েছে। আমাদের সাথে যেমন নামিবিয়া ও ব্রাজিল দুই দেশের কাজগুলো নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। ওদের অনুষ্ঠান বিন্যাসটাই এমন। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে কাজ করতে যেয়ে আমাদের সমস্যাগুলো কি ছিল, সেগুলো মোকাবেলার জন্য আমরা কি কি পদ্ধতি অবলম্বন করেছি এবং কোন কোন স্টেকহোল্ডারদের সাথে কাজ করেছি এটা ছিল তাদের প্রাথমিক জানতে চাওয়া।

এরপর প্রকল্প শেষ হলে যখন সেগুলোতে মানুষ বসবাস করতে লাগলো  তখন তাদের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল, এবং সেটা থেকে আমরা কি শিক্ষা গ্রহণ করছি এমন আলোচনা মূলত এখানে করা হয়েছে। আবাসনটাকে একটা চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে ওরা দেখতে চেয়েছে, এবং আমাদের কাজের ফলাফলগুলোকে তারা প্রামাণ্যিকরণ করতে চেয়েছে পরবর্তী পরিকল্পনার জন্য।

ওয়ার্ল্ড আর্বান ফোরামে উপস্থিত বাংলাদেশী স্থপতিবৃন্দ। ছবি: অনুষঙ্গ বাংলাদেশ

আপনার আবাসন প্রকল্পগুলোতে এখন যারা থাকছেন তাদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে একটু জানতে চাচ্ছিলাম। 

সালেহ আহমেদ: ভবনে বসবাসকারীদের কাছ থেকে আমরা যা শুনেছি তার বেশিরভাগই আসলে খুব উৎসাহব্যঞ্জক। যেমন চাঁদপুরের আবাসন প্রকল্পটা হলো সিটি কর্পরেশনে পৌরসভার কর্মীদের জন্য। তাদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত হয়েছে, নিজেদের রান্নাঘর, নিজেদের টয়লেট পেয়েছে এতে তারা বেশ আনন্দিত। 

কিন্তু আমরা জানি যে, তারা আসলে বহুতল ভবনে বসবাস করে অভ্যস্ত নয়। মাটির সাথে তাদের সম্পর্কটা খুব শক্ত। এই অনুভবটাকে আমরা কিভাবে বহুতল ভবনে নিয়ে আসতে পারি সেটা ছিল আমাদের চিন্তা। তখন আমরা আমাদের বহুচেনা উঠানকে নিয়ে আসি। বহুতল ভবনেও উঠানের ধারণাটা এই কমিউনিটির জন্য দম নেওয়ার জায়গায় পরিণত হয়েছে। এই সোশ্যাল ইন্ট্যারাকশনের জায়গাগুলোতে এখন তারা নিজেরাই বাগান করে নিচ্ছে, আলপনা করছে। ফলে তারা তাদের নিজেদের মত করে এখন বাসাটা গুছিয়ে নিচ্ছে। 

ওমর ফারুক: চাঁদপুরে আমরা কাজ করেছি হরিজনদের নিয়ে। পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কর্মী তারা। দীর্ঘদিন ধরে একটা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নাগরিক সুবিধার বাইরে তাদের থাকতে হয়েছে। যেমন নোয়াখালীতে আমরা দেখেছি কোনোমতে কেবল উপরে টিন ও পাশে বেড়া থেকে একটা ছাউনি বানিয়ে তারা বসবাস করছে। এইরকম মানুষদের জন্য যখন প্রজেক্ট ডেভলপ করতে হয় তখন অনেক ছোট ছোট বিষয় আসলে মাথায় রাখতে হয়। 

বহুতল ভবনে তারা থাকতে একেবারেই অভ্যস্থ না। দিনের অনেকটা সময় তারা বাড়ির বাইরে বসে থাকে, খেলা করে ও আড্ডা দেয়। মহিলারা তাদের কাজ সারেন বাইরে এমনকি বাচ্চারা দিনের বেলাতে বাইরেও পড়াশোনা করে। এদেরকে যখন বহুতল আবাসনে স্থানান্তরিত করতে চাওয়া হয় তখন তাদের মাঝে সন্দেহ তৈরি হয় যে তারা বহুতল ভবনে যেয়ে আসলে থাকতে পারবে কিনা। 

তখন তাদের সাথে আমরা কথা বলে ডিজাইন রচনা করি। যে নিচ তলায় আছে তার জন্য বাইরের পরিবেশের সাথে সংযুক্ত হওয়া সহজ। কিন্তু উপরের দিকে যারা আছেন তাদের জন্য উঠোনগুলো ভাবা হয়েছে। নিজেদের কাজ, আড্ডা, চাল শোকানো, আতিথেয়তা এসবই তারা এখানে করতে পারছে। এছাড়া খেলার মাঠ, মন্দির, পুকুর এগুলিও আমরা ডিজাইনে যুক্ত করেছি যাতে তাদের জীবনমান উন্নত হয়।

অনুষঙ্গ বাংলাদেশ-এর চাঁদপুরের সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প। ছবি: Prantography

ওয়ার্ল্ড আর্বান ফোরাম-এ যেয়ে অন্যান্য দেশের কাজগুলো দেখে বাংলাদেশের সাথে একটা তুলনামূলক পর্যালোচনা করতে হলে কি বলবেন?

ওমর ফারুক: আমাদের এখানে যেটা সবচেয়ে বড় দুর্বলতা দেখলাম তা হলো সরকারি উদ্যোগের অভাব। আমরা যে নামিবিয়ার সাথে একই সেশনে ছিলাম ওদের প্রজেক্টগুলো ছিল সরকারি। এবং প্রায় ৩৫,০০০ পরিবারের আবাসনের জন্য তারা কাজ করেছে। সে তুলনায় আমরা মাত্র ১২০০ পরিবার নিয়ে কাজ করেছি। 

কিন্তু হাতে গোণা কয়েকটা ছাড়া প্রান্তিক মানুষদের জন্য আসলে কোনো কাজ হচ্ছে না। Practice Hub-এর অন্য প্রকল্পগুলির বেশিরভাগই সরকারি ছিল এটা একটা লক্ষণীয় বিষয়। পুরোপুরি সরকারি প্রকল্পে থেকে প্রায় ১০, ০০০ বস্তিবাসীর জন্য আমর একটা আবাসন প্রকল্প ডেভলপ করবো এই জাতীয় কোনো চর্চা আমাদের হয়নি। কিন্তু ওয়ার্ল্ড আর্বান ফোরামে যেয়ে আমরা দেখলাম অন্যান্য দেশগুলো এ নিয়ে কাজ করছে। 

সরকারি, বসরকারি বা ব্যক্তি উদ্যোগে ফান্ড সংগ্রহের পাশাপাশি যেসব প্রকল্পে ফান্ডের পরিমাণ অনেক বেশি সেখানে তারা ধাপে ধাপে উন্নয়ন করছে, কিন্তু পুরো প্রকল্পের মাস্টারপ্ল্যান তাদের প্রস্তুত আছে। ২০ বছর পর তারা কোথায় পৌছাবে এগুলো তারা জানে, এবং সে অনুযায়ী আগাচ্ছে। কিন্তু আমাদের এখানে এমন কোনো পরিকল্পনাও নাই। দুঃখজনক হলেও সত্য একটা মাস্টারপ্ল্যান করে ধাপে ধাপে আমরা স্বাস্থ্য সমস্যা, ফায়ার সেফটি সমস্যা, ড্রেনেজ সমস্যা এমন নানান সমস্যা নিয়ে যে একটা সময়কে ধরে কাজ করবো বাংলাদেশে সেটা এখনো শুরুই করতে পারিনি। এটাই একটা বড় শিক্ষা ছিল এই ফোরামে।   

সালেহ আহমেদ: আরেকটা বিষয় হলো, ওদের কিছু অ্যাক্টিভিস্ট সংস্থা আছে যারা সরকারকে চাপ প্রয়োগ করতে পারে এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য। ফোরামে যেয়ে Favela Hub নামে একটা প্যাভিলিয়ন পেয়েছিলাম। ব্রাজিল থেকে শুরু হলেও বিভিন্ন দেশে যারা বস্তি নিয়ে কাজ করে এখন এটা তাদের সংস্থা হয়ে গিয়েছে। তারা একটা নেটওয়ার্ক বানিয়ে বিভিন্ন ফোরামে এই চাহিদাগুলো বাস্তবায়ন করতে চাপ প্রয়োগ করতে পারছে। পলিসি মেকাররাও এদের সাথে যুক্ত হয়ে সরকারকে তাগাদা দিচ্ছে।   

ওমর ফারুক: সাশ্রয়ী আবাসন তো আসলে সকল শ্রেণির নাগরিকের মৌলিক অধিকার। ফোরামে যেয়ে কিন্তু আমরা সেটাই দেখলাম। সবগুলো দেশ তাদের নিজেদের সাশ্রয়ী আবাসনের যে মূল পরিকল্পনা সেগুলোর চিন্তা ভাবনায় আসলে আমাদের সাথে শেয়ার করছে। প্রান্তিক থেকে নগর সকল স্তরের মানুষের জন্যই তারা কাজ করছে। সেদিক থেকে আমরা আমাদের দেশের এই বিশাল জায়গাটার একাংশও এখনো ধরতে পারিনি। কোনো পরিকল্পিত কাঠামোর ভিত্তিতে আমাদের কাজগুলো গুছিয়ে করা হচ্ছে না।

বাবুবাজার বস্তিতে কমিউনিটির সাথে আয়োজিত কর্মশালা। ছবি: অনুসঙ্গ বাংলাদেশ

বর্তমানে আবাসন শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রয়োগ কেমন গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে হয়েছে?

ওমর ফারুক: চায়না এবং কম্বোডিয়ার কিছু কাজ দেখি আমরা ফোরামে। মাস্টারপ্ল্যানটাকে ওরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ম্যাপিং(mapping) করেছে। এখন। এখন তো AI এর ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও বাংলাদেশের আবাসন শিল্পে এর ব্যবহার এখনো শুরু হয়নি। দেখা যাচ্ছে ম্যাপিং এর কারণে আগে যে প্রক্রিয়ায় প্রায় ৩মাস সময় লাগত এখন সেটা তারা মাত্র ৭২ঘন্টায় করে ফেলছে। মাঠপর্যায়েও ওরা দলভিত্তিক এই ডাটাগুলো চেক করার জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু এই চমৎকার ম্যাপিং এর ফলে কোথায় কোন ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করলে তার ফলাফল কি হবে সেটা এখনই ওরা জানে।      

আমাদের যেটা সবচেয়ে বড় সমস্যা, একটা শহরের টারশিয়ারি লেভেলে বা প্রাইমারি লেভেলে হোক, অথবা সেকেন্ড টায়ার সিটি বা থার্ড টায়ার সিটিতে হোক, কোনো সিটিরই মাস্টারপ্ল্যান নেই। এমনকি ঢাকা শহরেরও নাই। ঢাকার নতুন যে মাস্টারপ্ল্যান DAP সেখানে অনেক সুন্দর সুন্দর কথা আছে। কিন্তু এগুলো যে বাস্তবায়ন হবে, সেটার ধারাবাহিকতা সম্পর্কে আমরা অবহিত না। 

রাস্তাঘাট, ব্রিজ, MRT এসব আমরা বলছি ঠিকই কিন্তু আমাদের মানুষেরা যেখান দিয়ে হাঁটবে সেই পার্কগুলো কখন হবে তা স্পষ্ট না। লেখা আছে যে ২০৩০সালের মাঝে হতে হবে, নাহলে এটা ব্যর্থ প্রকল্প। আমাদের কাগজে কলমে যা করা আছে তা একটা নির্দিষ্ট সময়ের মাঝে বাস্তবায়িত না হলে প্রকল্পের পাশাপাশি শহরটাও যে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এনিয়ে আমি কারো মাথাব্যাথা দেখি না।

অনুষঙ্গ বাংলাদেশ-এর নোয়াখালীর সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প। ছবি: Prantography

সালেহ আহমেদ: সমাজের সবার অধিকার অটুট রেখে আমরা যে এগিয়ে যাব এমন রূপরেখা DAP এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতার কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। আমরা এতদিন ধরে কাজ করছি কিন্তু আমরাও নিশ্চিত না। আগামী ১০ বছরে আমি নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষের জন্য আবাসন নিশ্চিত করবো এ ধরনের কোনো মেগা পরিকল্পনা আমাদের নেই। আবাসন শিল্পে রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো একটা নির্দিষ্ট গ্রুপকে সার্ভিস দিচ্ছে। সরকারপক্ষ তাদের কর্মকর্তাদের জন্য আবাসন বানাচ্ছে। কিন্তু এ ছাড়াও যে বিশাল জনগোষ্ঠী থেকে যাচ্ছে তাদের আবাসন আমরা কীভাবে নিশ্চিত করছি এটা নিয়ে পরিষ্কার কোনো উদ্যোগ নেই।

কিন্তু এখানে কাজের অনেক সুযোগ আছে যেটা আমরা ওয়ার্ল্ড আর্বান ফোরমেও দেখেছি। বড় বড় সংস্থা, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ সবাই মিলে দেশের একটা সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে তারা কাজ করছে। আমরা যেমন নামিবিয়ার কাজ দেখলাম। ওদের আর আমাদের টাইমলাইন একই। আমরাও গত ৬-৭ বছরে মাত্র ১২০০ পরিবারের আবাসন নিয়ে কাজ করেছি সেখানে তারা ঐ একই সময়ে ৩৫হাজার পরিবার নিয়ে কাজ করেছে। আমাদেরও এমন মেগা প্ল্যানে আসা দরকার।      

ওমর ফারুক: আমি যখন একটা ফাঁকা জায়গায় ভবন নির্মাণ করছি তখন স্বাভাবিকভাবে সেখানের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে। উন্নয়নের সাথে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সম্পর্কটা আছেই। কিন্তু এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, সেখানে আমাদের আগ্রহটা আরও বাড়াতে হবে। এখন যেমন গ্রিন বিল্ডিং এর দিকে তাই সবাই ঝুঁকছে। এই মুহূর্তে গুগলে যে ডাটা আছে সেটাই আমাদের বলে দিতে পারবে আজ থেকে ২০ বছর পর আমার শহরটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। কত পরিমাণ জায়গা উন্নয়ন কাজে ব্যবহৃত হবে, ফুটপ্রিন্ট বেড়ে যাবে এমন তথ্যগুলো আমরা পেয়ে যাব। এই ডাটা নিয়ে বাইরে সবাই কাজ করছে। আমিতো শুধু গুগলের কথা বললাম কিন্তু ওদের এমন টিমই আছে যারা শুধু এগুলো নিয়েই কাজ করছে।

যেমন ফোরামের একটা টিমের প্রেজেন্টেশন দেখলাম, ওদের বিল্ডিং এবং অটোমেটেড সিস্টেম আছে যেটা দিয়ে ওরা কেপটাউন, আমেরিকা ও ফিলিপাইনের কাজগুলো দেখালো। ওরা জানে যে আগামীতে একটি অঞ্চলে কতগুলো বিল্ডিং নির্মিত হবে, কতগুলো বিল্ডিং ভেংগে নতুন করে কাজ করা যাবে এমন নানান তথ্য আছে। ওদের সবই আসলে ডাটা নির্ভর। ওদের সিস্টেমে ফিট করে এখন শুধু আউটপুট বের করছে যে এই কাজগুলো ওরা করবে। স্যাটেলাইট থেকে সঠিক ডেটা নিয়ে ওরা অনেক এগিয়ে গিয়েছে। আমরা সে তুলনায় এখনো সেখানেই পৌঁছাতে পারিনি যে আমাদের আসলে কি করা দরকার। 

সালেহ আহমেদ: কিছুদিন আগে কিছু সংস্থা যেমন বেঙ্গল ইন্সটিটিউটকে দেখলাম আর্বান হিট নিয়ে একটা ম্যাপিং করেছে। এই ডেটাগুলো যদি আমরা AI মডেলে ফিট করাতে পারতাম তাহলে বেশ হতো। কেননা এটা আসলে একটা প্রেডিকশন মডেল হিসেবে আমাদের বলে দিতে পারত যে আমরা যদি এই ধরনের পলিসি এডাপ্ট করি তাহলে পূর্বাচলে আগামী ২০ বছরে থার্মাল টেম্পারেচার কতটা বেড়ে যাবে। তাহলে কোন ধরনের পলিসি নিয়ে কাজ করলে এই তাপমাত্রা আরও কমতে পারে ইত্যাদি। কিন্তু সেরকম ডেটা না থাকায় আমাদের আন্দাজ করে কাজ করতে হচ্ছে। সরকারি বা বেসরকারি সংস্থাও এক্ষেত্রে নিশ্চিত করে বলতে পারবে না, এবং বিষয়টা সময় সাপেক্ষ। ডাটা সায়েন্সের সাপোর্ট না থাকায় আমাদের কোনো র‍্যাশনাল ভিত্তি নেই। কিন্তু ওয়ার্ল্ড আর্বান ফোরামে আমরা দেখি যে এই রিসোর্সগুলো ওরা করে ফেলেছে।  

অনুষঙ্গ বাংলাদেশ-এর কুষ্টিয়ার সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প। ছবি: স্থপতি মোঃ ওমর ফারুক সানিম

বর্তমানে পরিবর্তনশীল জলবায়ু-কে মাথায় রেখে আপনাদের ডিজাইন করা সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্পগুলোকে কীভাবে ডিজাইন করা হয়েছে?

ওমর ফারুক: আমাদের একেক প্রকল্পের ক্যারেক্টার আসলে একেকরকম হয়ে উঠেছে। কখনো সেটা কমিউনিটির চাহিদা থেকে হয়েছে, আর কখনো জলবায়ুর জন্য হয়েছে। নোয়াখালীর প্রজেক্টটা এক্ষেত্রে সবথেকে ভালো উদাহরণ। নোয়াখালী যেহেতু উপকূলীয় অঞ্চল এজন্য এর নিচের তলা আমরা পুরোটাই ফাঁকা রাখি যাতে দুর্যোগের সময় সমস্যা না হয়। আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবেও এই ভবনটা তখন কাজ করবে। 

এই প্রকল্পের ৫ তলা নির্মাণ কাজ চলাকালীন শেষ যে নোয়াখালী ফেনী অঞ্চলে ব্যাপক বন্যা হলো ঐ সময়টায় আমাদের এই ভবনের নিচতলার প্রায় ৬-৭ ফিট পানির নিচে গিয়েছিল। তখনই আশেপাশের অনেক মানুষ এখানে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছিল। প্রকল্পটি হ্যান্ডওভারের আগেই তখন টেস্টেড হয়ে যায় যে এটা কীভাবে কাজ করতে পারে। একইসাথে স্ট্রাকচারাল কম্পনেন্টের জন্য লবণাক্ততা, ভূমিকম্প সহনীয় উপকরণ নিয়ে ভাবা হয়েছে। 

তেমনি রংপুরের প্রকল্পটি ভূমিকম্প ঝুঁকির জোন-৩ এ পড়েছে তাই স্ট্রাকচারাল সিস্টেম পুরোই অন্যরকম। এর কলামের সাইজ, এবং অন্যান্য সিদ্ধান্তে ভূমিকম্প সহায়ক করে বানানো হয়েছে। আর সবগুলো প্রকল্পে যে পুকুর ছিল আমরা সেগুলো রেখে দিয়েছি। কিছুক্ষেত্রে সেগুলো ডেভলপও করেছি। যাতে আগুন লাগলে পানির একটা উৎস এটা হয়ে উঠতে পারে। ফায়ার এস্কেপও আমরা নিশ্চিত করেছি। খুব সরু জমি হলেও যেন ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসতে পারে সেটা নিশ্চিত করেছি। 

একটা আবাসন প্রকল্পে আসলে অনেকগুলো বিষয় মাথায় রাখতে হয়। বিশেষ করে স্ট্যান্ডার্ড মেইন্টেইন করতে পারাটা ছিল বড় লড়াই। এই বহুতল আবাসন যেন একটা বহুতল বস্তিতে পরিণত না হয়, যেন ৬০% উন্মুক্ত জায়গা থেকে সেটা নিয়ে আমাদের পক্ষ থেকে স্টেকহোল্ডারদের অনেক বোঝাতে হয়েছে এবং আমরা এক্ষেত্রে সফলও হয়েছি।     

সব স্টেকহোল্ডারদের অর্থাৎ কমিউনিটি লেভেল থেকে শুরু করে যারা ফান্ড দিচ্ছেন, যে অথরিটি এটা দেখাশোনা করছেন সবাইকে আসলে একসাথে কাজ করতে হবে এটাই আমার অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া একটা বড় শিক্ষা। আমরা যারা স্থপতি বা আর্বান ডিজাইনার তারা এই পুরো প্রক্রিয়ার শেষ দিকে থাকি। এখানে পলিসি মেকার যারা তাদের প্রভাব সবচাইতে বেশি। তাই আমাদের আসলে সবাই মিলে পলিসি মেকারদের বোঝাতে হবে। 

বিখ্যাত চাইনিজ ল্যান্ডস্কেপ স্থপতি কংজিয়ান ইউ প্রায় ৭০০-৮০০ শহরের ল্যান্ডস্কেপের মাস্টারপ্ল্যান করছেন। উনি দেখিয়েছিলেন, চায়নার যত মেয়র আছেন তাদেরকে ছয় মাস পরপর একজন স্থপতি প্রশিক্ষণ দেন যে শহরগুলোতে তাদের কি কি করণীয়। সেখানে আমরা যে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি তা বলায় বাহুল্য। 

ওয়ার্ল্ড আর্বান ফোরাম – ২০২৬ এ নিজেদের প্রকল্প সম্পর্কে বলছেন ‘অনুষঙ্গ বাংলাদেশ’ এর স্থপতিবৃন্দ। ছবি: অনুষঙ্গ বাংলাদেশ

আপনাদের কাজগুলো নিয়ে ওয়ার্ল্ড আর্বান ফোরামে কেমন সাড়া পাওয়া গেল?

সালেহ আহমেদ: আমাদের পদক্ষেপগুলোকে সবাই উৎসাহ জুগিয়েছে। কারণ প্রতিটা কাজের যে কনটেক্সট সেটার ভিত্তিতে সেই প্রজেক্টকে তারা বুঝতে চেয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের মত ঘনবসতিপূর্ণ একটা দেশে এভাবে আমরা কাজগুলো বের করে আনতে পারছি এটা তাদেরকে অবাক করেছে। কমিউনিটির সকলেও যে ডিজাইনে অংশগ্রহণ করেছিল এই ব্যাপারগুলো তাদের বেশ আকৃষ্ট করেছে।   

ওমর ফারুক: আমরা ঢাকা শহরে যেসকল লাক্সারি এপার্টমেন্ট দেখি তাদের চাইতেও আমাদের আবাসন প্রকল্পগুলোতে অভিজ্ঞতা আসলে আরও বর্ধিত হয়েছে। যেমন আমাদের চাঁদপুরের প্রকল্পে নানা ফ্লোরে উঠোন এসেছে, সামনে পুকুর আছে, ৬০ শতাংশ খোলা জায়গা আছে যা ঢাকায় গুলশান বনানীর প্রকল্পেও খুঁজে পাবেননা। ওয়ার্ল্ড আর্বান ফোরামে বাংলাদেশী আরও অনেকে ছিলেন তারা পর্যন্ত অবাক হয়েছেন। আর বাইরের অনেকেই ভবনটি নিয়ে উৎসাহ যুগিয়েছেন। পাশাপাশি কোন কোন জায়গায় আমরা আরও ভালো করতে পারতাম সেগুলো নিয়ে আরও আলোচনা হয়েছে। রাজউক, স্থাপত্য অধিদপ্তর, আইএবি থেকেও অনেকে গিয়েছিলেন তাদেরও নানান জিজ্ঞাসা ছিল। সবমিলিয়ে অসাধারণ একটা অভিজ্ঞতা ছিল।

আপনাদের আন্তরিকতার জন্য বন্ধন-এর পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভকামনা।

বন্ধনকে ও আপনাকেও ধন্যবাদ।  

Related Posts

তাজহাট জমিদার বাড়ি বাংলার ইতিহাসের সাক্ষী

তাজহাট জমিদার বাড়ি বাংলার ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের এক স্মারক। পুরান রংপুর যা বর্তমানে তাজহাট উপজেলা হিসেবে পরিচিত সেখানেই গড়ে…

“যত মানুষ ফুটবলের ভক্ত, তত মানুষ স্থাপত্য নিয়েও আগ্রহী হোক”

আর্কিটেক্টস জার্নাল (AJ) কথা বলেছে মেক্সিকোর স্থপতিযুগল Isabel Abascal (ইসাবেল আবাসকাল) এবং Alessandro Arienzo (আলেসান্দ্রো আরিয়েনজো)-এর সঙ্গে। স্বামী-স্ত্রী…

নিখিল: নৃত্যের ছন্দে গড়া স্মৃতির অনুরণন

নিখিল রেসিডেন্স (একজন নৃত্যশিল্পীর বাড়ি)অবস্থান: ৩৩৫, নর্থ বাগবাড়ি, সিলেট।প্রধান স্থপতি: স্থপতি রাজন দাসআলোকচিত্র: Prantography  নিখিল রেসিডেন্স এমন এক…

প্রথমবার AIA মেডেল পেলেন জাপানের স্থপতি শিগেরো ব্যান

আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেকটস (AIA)। তারা প্রতি বছরই একজন আমেরিকান স্থপতিকে সম্মাননা হিসেবে AIA গোল্ড মেডেল দিয়ে থাকে।…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

Ai
‘Solaris’: শিশুর স্কেচ থেকে শিল্পোৎপাদিত নকশা
ইরানের ঐতিহ্যকে ধারণ করা এক ঊর্ধ্বমুখী জনপদ শুপে
‘কাসা মেসেডোনিয়া’: মাদ্রিদের রূপান্তরিত এক ব্যতিক্রমী আবাসিক
Carbon fiber
চমকে দিল ফ্র্যাঙ্ক গেহরির নতুন ডিজাইন আবুধাবিতে
Brick Wall
জীবন্ত স্থাপত্যের ধারণা: IGArchitects-এর নকশাকর্মের আলোকে বিশ্লেষণ
সঙশান লেক: সমকালীন সাংস্কৃতিক স্থাপত্যের এক নতুন অধ্যায়