যে ঘরে নিত্য বসবাস, সে ঘরটি একটু আকর্ষণীয় না হলে কি চলে? নিজের জন্যই হোক বা অতিথিদের কাছে আপনার রুচি প্রমাণে অন্দরের সাজসজ্জার নান্দনিকতা খুুবই প্রয়োজন। শুধু বসবাসের ক্ষেত্রই নয়, বরং কর্মক্ষেত্রও এটি সমান দাবি রাখে। অন্দরের সৌন্দর্য বাড়াতে আলোর আবেদন অশেষ। বসবাসের স্থান বা কর্মক্ষেত্রে নতুনত্ব আনতে আনুষঙ্গিক আসবাবের সঙ্গে মানাসই আলো যুক্ত হলে সৌন্দর্য অনেকটাই বেড়ে যায়। আলো নিয়ে কত আয়োজনই-না করে থাকেন শৌখিন ব্যক্তিরা। আলো দিয়ে ঘর সাজানোর অন্যতম অনুষঙ্গ ঝাড়বাতি। ঘরের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে অন্যান্য সাজসজ্জার সঙ্গে ঝাড়বাতির ব্যবহার ঘরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে বহুগুণ। ঐতিহ্যের ও আভিজাত্যের স্বাদ পেতে ঝাড়বাতি হতে পারে চমৎকার এক অনুষঙ্গ।
ঝাড়বাতির রকমফের
ঝাড়বাতি দিয়ে আলোক বিচ্ছুরণের সাহায্যে ঘরের সৌন্দর্যবর্ধন ঘটে। বিভিন্ন ধরনের রংবেরঙের বাতি স্বচ্ছ কাচ অথবা অন্য উপাদান দিয়ে তৈরি করে স্তরে স্তরে সাজিয়ে লাগানো হয়। এতে আলোক বিচ্ছুরণের মাধ্যমে বাড়িয়ে তোলে ঘরের সৌন্দর্য। আমাদের দেশে সাধারণত ছোট বা মাঝারি আকারের ক্রিস্টাল, কাঠ, ধাতব ছাড়াও সিলিং, ইউনিক গ্লাস, বাটারফ্লাই মোটিফ গ্লাস, ড্রাম, ফুলেল কিংবা আলোর রং বদলানো ঝাড়বাতি বেশি ব্যবহৃত হয়। হালে বাজারে বাহারি ধরন ও ডিজাইনের ঝাড়বাতি পাওয়া যায়। কোনটা কেমন তা নির্ভর করে ধরনের ওপর। বাজারে পাওয়া ঝাড়বাতির মধ্যে রয়েছেÑ
রাস্টিক শ্যান্ডেলিয়ার
প্রকৃতির ছোঁয়া নিয়ে তৈরি করা রাস্টিক শ্যান্ডেলিয়ার রাস্টিক লুকপ্রেমীদের জন্য পারফেক্ট। এই ধরনের ঝাড়বাতিগুলোতে কাঠ, লোহা ও এডিসন স্টাইলের বাল্ব ব্যবহার করা হয়।
কনটেম্পোরারি শ্যান্ডেলিয়ার
আপনার বাড়ি যদি ইনোভেটিভ ও মিনিমাল থিমে তৈরি করা হয়, তাহলে এই কনটেম্পোরারি শ্যান্ডেলিয়ার আপনার জন্য একদম পারফেক্ট। ঘরের নকশা ইনোভেটিভ হলে এটা ব্যবহার করাটাই হবে গতানুগতিক।
মডার্ন শ্যান্ডেলিয়ার
মডার্ন শ্যান্ডেলিয়ার নকশায় ফুটে ওঠে কাঠের কারুকাজ ও শিল্পের নৈপুণ্য। বাজারে দেখে পছন্দ করে নিতে পারেন এ শ্যান্ডেলিয়ার।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্যান্ডেলিয়ার
ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্যান্ডেলিয়ারের নকশাগুলো অনেকটা শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত বস্তুর আদলে তৈরি। কাঠ ও মেটালের মাধ্যমে তৈরি এই ঝাড়বাতিগুলো শিল্পকারখানার জন্য একেবারে পারফেক্ট।
কোথায় লাগাবেন ঝাড়বাতি
আপনার পছন্দমতো ঘরের যেকোনো জায়গায় লাগাতে পারেন ঝাড়বাতি। তবে ঘরের মাঝখানে রাখলেই বেশি ভালো দেখাবে। সাধারণত বসার ঘরেই ঝাড়বাতি লাগানোর চল বেশি। তবে বসার ঘর হলেই হবে না, ঝাড়বাতির জন্য চাই বড় আয়তনের বসার ঘর। ছোট ঘরে বড় ঝাড়বাতি বেমানান লাগে। মাঝারি ধরনের বসার ঘরের জন্য বেছে নিতে পারেন সিলিং লাগোয়া ছোট আকারের ঝাড়বাতি।
বিভিন্ন ফুলের নকশা বা চারকোনা আকৃতির ঝাড়বাতি পাওয়া যায়, যা মাঝারি ধরনের বসার ঘরে খুব মানিয়ে যায়। চাইলে শোবার ঘরেও রাখতে পারেন ঝাড়বাতি। শোবার ঘরে ক্রিস্টাল ঝাড়বাতি বা ফুলেল ঝাড়বাতি ও ক্যান্ডেলার ঝাড়বাতির সেট করতে পারেন। শোবার ঘরের সজ্জারীতির ওপর নির্ভর করে ঝাড়বাতি লাগানো।
বর্তমানে ঘর সাজাতে ঝাড়বাতির ব্যবহার বহুগুণে বেড়ে গেছে। শোবার ঘর ছাড়াও বড় ঘরে, মিলনায়তনে, খাওয়ার ঘরে ঝাড়বাতি লাগানো হয়। এমনকি গোসলখানায়ও অনেকে লাগান ঝাড়বাতি। পাশাপাশি রেস্টুরেন্ট, বাণিজ্যিক ভবন, হাসপাতাল, অফিস, বিমানবন্দরসহ অনেক জায়গায় সৌন্দর্যবর্ধণে ঝাড়বাতির ব্যবহার দেখা যায়।
ঝাড়বাতিতে যে রঙের লাইট ব্যবহার করবেন
দেয়ালের রং যা-ই থাকুক ঝাড়বাতিতে হলুদ রঙের বাতিই ভালো মানায়। দেয়াল সাদা বা অফ হোয়াইট থাকলে সাদা লাইটও ব্যবহার করতে পারেন। এ ছাড়া সব পরিবেশে মানিয়ে নিতে কাচের ঝাড়বাতির জুড়ি মেলা ভার। পাশাপাশি যাঁর যাঁর পছন্দসই সোনালি, নীলাভ, সবুজ, সাদা বা লাল রঙের লাইট ব্যবহার করতে পারেন। এ ছাড়া বাসাবাড়ির ঘর বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা অফিসকক্ষের জন্য পছন্দমতো লাইটিনিং ফ্যাংশনও দেখে নিতে পারেন। আজকাল বাজারে একাধিক লাইটিনিং ফ্যাংশন পাওয়া যায়। যেমন-
- আপলাইট: এই ঝাড়বাতিগুলো ওপরের দিকে আলো ছড়িয়ে থাকে। এটি সরাসরি ডাউনলাইটিং না হয়ে হালকা ওপরের দিকে চারপাশে আলো ছড়িয়ে থাকে।
- ডাউনলাইট: এই ঝাড়বাতিগুলো নিচের দিকে আলো ছড়িয়ে থাকে। কোনো নির্দিষ্ট এক দিকে বা কোনো একটি নির্দিষ্ট বস্তুতে ফোকাস করতে না চাইলে ডাউনলাইট মডেলের ঝাড়বাতি নিতে পারেন।
- অ্যাম্বিয়েন্ট লাইটিং: এই ঝাড়বাতিগুলো চতুর্দিকে আলো ছড়িয়ে থাকে। ডাউনলাইট ঝাড়বাতি ছাড়া বাকি সব ঝাড়বাতিই অ্যাম্বিয়েন্ট তৈরির জন্য পারফেক্ট। চারদিকে আলো ছড়িয়ে দিতে এই ঝাড়বাতির মডেলটি বেছে নিতে পারেন সহজেই।
দরদাম
আকার ও গুণগত মানভেদে ঝাড়বাতির দামে রয়েছে ভিন্নতা। গুণগত মান ও ব্র্যান্ডভেদে ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম হয়ে থাকে। ক্রিস্টালের বিভিন্ন সাইজের ঝাড়বাতির দাম ৩০ হাজার থেকে শুরু করে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত রয়েছে। একটু বড় সাইজের নিলে দাম পড়বে ১ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। সিলিং ঝাড়বাতি ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। কাচের সঙ্গে কাঠ ও মেটালের সংযোজনে বিভিন্ন সাইজের ঝাড়বাতি ৮ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকায় বিকিকিনি হয়। এ ছাড়া বর্তমানে কাঠ দিয়ে তৈরি করা কিছু ঝাড়বাতিও বাজারে পাওয়া যায়।
যত্নআত্তি
যেকোনো ব্যবহার্য জিনিসই যত্ন করে রাখলে অনেক দিন টেকসই হওয়ার পাশাপাশি থাকে নতুনের মতো। ঝাড়বাতিও ঘরে লাগিয়েই কাজ শেষ বলে বসে থাকা চলবে না। এটি নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। নতুবা এর আলোর বিচ্ছুরণ দিনে দিনে কমে আলো কম দেখা যাবে। বিশেষ করে ক্রিস্টাল বা কাচের ঝাড়বাতি দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করলে ময়লা জমে যায়। অধিকাংশ ঝাড়বাতিই খুলে খুলে পরিষ্কার করতে হয়। পরিষ্কার করার আগে ছবি তুলে রাখুন। কারণ প্রতিটি অংশ খুলে যখন পরিষ্কার করবেন এবং পরে যখন সেগুলো ঠিক জায়গামতো লাগাবেন তখন ওই ছবিগুলো খুব কাজে দেবে।
ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি পরিষ্কার করার সময় গ্লাভস পরে নিন, তা না হলে এতে আঙুলের ছাপ পড়বে না। গ্লাভস ব্যবহার ঝাড়বাতিকে আঙুলের ছাপ থেকে সুরক্ষিত রাখে। ঝাড়বাতি পরিষ্কার করার জন্য পানি ও ভিনেগার মিশিয়ে একটি স্প্রে করার বোতলে ভরে তৈরি করে নিন। এরপর একটি পরিষ্কার নরম কাপড়ে সলিউশন স্প্রে করে ঝাড়বাতি পরিষ্কার করে শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে নিন।
ঝাড়বাতি কেনার আগে যা জানতে হবে
ঝাড়বাতি বেছে নেওয়ার আগে আপনাকে জানতে হবে ঝাড়বাতি কত রকমের আর কোনটা আপনার জন্য একদম মানানসই! ঝাড়বাতি ডিজাইন স্টাইল, শেপ, মেটারিয়াল এবং লাইটিং স্টাইলভেদে নানা রকম হতে পারে। ঘরের ডেকোর অনুযায়ী এগুলো বেছে নিন। কেনার আগে আপনার নিজের ঘর সম্বন্ধে যা জানতে হবে তা হচ্ছে, পজিশন, ঝাড়বাতি ঝোলানোর উচ্চতাসহ আলোর সক্ষমতাও।
ইতিহাসে ঝাড়বাতি
মধ্য যুগের ধনীরা মোমের ঝাড়বাতি ব্যবহার করতেন। এসব সহজেই বিভিন্ন ঘরে সরানো যেত। ১৫ শতক থেকে মুকুট বা চাকতির মতো ঝাড়বাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখন অভিজাত ব্যক্তি, যাজক এবং বণিকদের বাড়ি বা প্রাসাদে এগুলো ব্যবহৃত হতো। উচ্চমূল্যের হওয়ায় ঝাড়বাতি ছিল বিলাস ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক।
১৮ শতকে কাচের ঝাড়বাতি বানানোয় প্রসিদ্ধ ছিলেন বোহেমিয়ান ও ভেনিসীয় কাচ নির্মাতারা। বোহেমিয়ান প্রকরণের মূল আকর্ষণ ছিল পলকাটা কাচ থেকে প্রিজমের মতো সাতরঙা আলোর বিচ্ছুরণ। ইউরোপে এটি বিপুলভাবে ব্যবসাসফল হয়। নতুন এই শৈলীর প্রতিক্রিয়ায় ইতালির মুরানোতে কাচ-কারখানাগুলো উদ্ভাবন করে অলংকৃৃত ঝাড়বাতি। এর সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল জটিল অ্যারাবেস্কু-ফুল-লতা-পাতার নকশা, যা সাজানো হতো বিশেষ কাচ দিয়ে। ১৯ এবং ২০ শতকে আগের চেয়ে জটিল ও বিশদ ঝাড়বাতি তৈরি হতে থাকে। কিন্তু নিয়ন বাতি ও বৈদ্যুতিক বাতির বহুল বিস্তার, সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে ঝাড়বাতির আবেদন কমিয়ে দেয়। ২০ শতকের শেষভাগে ঝাড়বাতির ব্যবহার হয় প্রধানত ঘরের অলংকরণ ও সাজসজ্জায়, যা মূলত আলো দেয় না।
দেশে দেশে ঝাড়বাতি
মধ্য যুগ থেকেই ব্যবহার শুরু হওয়া ঝাড়বাতি বর্তমানে নান্দনিক রূপ পেয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কাচের ঝাড়বাতি তুরস্কের ইস্তাম্বুলের দলমাবাস প্রাসাদে স্থাপিত। এর নির্মাতা হ্যানকক রিক্সন অ্যান্ড ডান্ট এবং এফ অ্যান্ড সি ওসলার। এতে ৭৫০টি ছোট ছোট প্রদ্বীপ আছে এবং এর ওজন ৪ দশমিক ৫ টন। জার্মানির ব্যামবার্গ শহরের ক্যাথেড্রালেও পৃথিবী বিখ্যাত ঝাড়বাতি রয়েছে। এর বাইরে নেদারল্যান্ডসের ক্রোমেনিতে মধ্য যুগের ও আমস্টার্ডামের পর্তুগিজ সিনাগগে একটি মোমবাতিযুক্ত প্রাচীন ঝাড়বাতি রয়েছে।
প্রাপ্তিস্থান
রাজধানীর পল্টন, গুলশান ১ ও ২ নম্বর সার্কেল, বসুন্ধরা সিটি, পুরান ঢাকার নবাবপুর, চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট, হাতিরপুলে ঝাড়বাতির অসংখ্য দোকান রয়েছে। দেখে-শুনে নিতে পারেন আপনার পছন্দের ঝাড়বাতি। এ ছাড়া বিভাগীয়, বড় বড় জেলা শহরেও ঝাড়বাতির দোকান ও শো রুম রয়েছে, সেখান থেকে যাঁর যাঁর পছন্দসই ঝাড়বাতি সংগ্রহ করতে পারেন। চাইলে এখন করোনা মহামারির সময়ে অনলাইনেও যাচাই-বাছাই করে নিতে পারেন পছন্দসই ঝাড়বাতি।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩১তম সংখ্যা, জুলাই ২০২১।