Image

বাঁশে বোনা সাতটি ভবনের গল্প

বাঁশ আমাদের দেশে বহু যুগ ধরেই ঘরবাড়ি, সাঁকো কিংবা বেড়া তৈরির অন্যতম প্রধান উপকরণ। দ্রুত বেড়ে ওঠে, সহজলভ্য আর পরিবেশের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ হওয়ায় বাঁশ এখন শুধু গ্রামীণ নির্মাণেই নয়, আধুনিক স্থাপত্যেও নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছে। 

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে স্থপতিরা এই একটামাত্র গাছকে দিয়েই বানিয়ে ফেলছেন ধ্যানকেন্দ্র, স্কুল, রিসোর্ট থেকে শুরু করে বসতবাড়ি পর্যন্ত নানা কিছু। 

সম্প্রতি স্থাপত্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন ডিজেইন এমনই সাতটি উল্লেখযোগ্য বাঁশের ভবন নিয়ে একটি ফিচার প্রকাশ করেছে। চলুন দেখে নেওয়া যাক প্রকল্পগুলো কী কী আর সেগুলোতে বাঁশ কীভাবে ব্যবহার হয়েছে।

বিশাল বাঁশের ট্রাস পুরো ভবনের মাথার ওপর মুকুটের মতো বসানো। ছবি: ডিজেইন
মহামুদ্রা মেডিটেশন সেন্টার, নেপাল

কাঠমান্ডুর কাছেই এক পাহাড়ের চূড়ায় গড়ে তোলা হয়েছে এই বৌদ্ধ ধ্যানকেন্দ্রটি। ডিজাইন করেছে স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ‘আবারি’। মণ্ডলের মতো দেখতে একটা বিশাল বাঁশের ট্রাস পুরো ভবনের মাথার ওপর মুকুটের মতো বসানো। তিন তলা এই স্থাপনার ভেতরে আছে ১৫ মিটার উঁচু একটা ধ্যানকক্ষ, সেই সঙ্গে একটা ডাইনিং হল আর গেস্ট হাউজও।

বাঁশ দিয়ে মোড়ানো একগুচ্ছ ছাতার মতো চাঁদোয়া। ছবি: ডিজেইন
তাপমি সেন্টার, ভারত

ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি বিজনেস স্কুলের জন্য স্থানীয় সংস্থা দ্য পার্পল ইঙ্ক স্টুডিও বানিয়েছে বাঁশ দিয়ে মোড়ানো একগুচ্ছ ছাতার মতো চাঁদোয়া। যা পুরো ক্যাম্পাসের প্রাণকেন্দ্রকে ছায়া দেয়। প্রচলিত স্কুল-কলেজের গতানুগতিক ডিজাইনকে একরকম চ্যালেঞ্জ করেই তৈরি এই জায়গাটার কেন্দ্রে আছে একটা নিচু খোলা মঞ্চ, যেখানে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী একসঙ্গে জড়ো হতে পারে।

৩০০-রও বেশি বাঁশের টুকরো তাপ দিয়ে বাঁকিয়ে বানানো এই কাঠামো আংশিক খোলা। ছবি: ডিজেইন
লিভিং ব্রিজ, ইন্দোনেশিয়া

স্থপতি জোনাথন মিজি একটা স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মিলেই তৈরি করেছেন এই লার্নিং সেন্টার, নাম লিভিং ব্রিজ। ৩০০-রও বেশি বাঁশের টুকরো তাপ দিয়ে বাঁকিয়ে বানানো এই কাঠামো আংশিক খোলা। ফলে এখানে অনুষ্ঠান আর আলোচনা সভা আয়োজনের জন্য বেশ নমনীয় একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

বাঁশের জালি আর বাঁশ-স্টিলের খুঁটি দিয়ে, মূলত কম খরচে মুরগি পালনের একটা নমুনা হিসেবে বানানো হয়েছে। ছবি: ডিজেইন
চিকেন হিরো প্যাভিলিয়ন, ইন্দোনেশিয়া

জাকার্তার একটা পার্কে সাময়িকভাবে বসানো হয়েছিল এই মজার নামের বাঁশের মুরগির খোঁয়াড়টা। যাকে ঢেকে রাখা হয়েছে একটা কৃত্রিম টিলার আড়ালে। বালিভিত্তিক স্থাপত্য সংস্থা RAD+ar এটা বানিয়েছে বাঁশের জালি আর বাঁশ-স্টিলের খুঁটি দিয়ে, মূলত কম খরচে মুরগি পালনের একটা নমুনা হিসেবে।

সমুদ্রের ঝিনুক, মাছ আর ম্যান্টা রে-র শরীরের বাঁক থেকে আইডিয়া নিয়ে বানানো হয়েছে এই ঢেউ খেলানো বাঁশের ছাদ। ছবি: ডিজেইন
ইন্তায়া রিট্রিট, ইন্দোনেশিয়া

বালির স্থাপত্য সংস্থা পাবলো লুনা স্টুডিও সমুদ্রের ঝিনুক, মাছ আর ম্যান্টা রে-র শরীরের বাঁক থেকে আইডিয়া নিয়ে বানিয়েছে এই ওয়েলনেস রিসোর্টের ঢেউ খেলানো বাঁশের ছাদ। নুসা পেনিদা দ্বীপের এক খাড়া পাহাড়ের কিনারে গড়ে ওঠা এই রিট্রিটে আছে ১২টা অতিথিকক্ষ, একটা যোগব্যায়াম স্টুডিও, স্পা, রেস্তোরাঁ আর চা-কক্ষ।

পুরো কাঠামো তৈরি হয়েছে খিলান আকৃতির বাঁশ দিয়ে। ছবি: ডিজেইন
দ্য জুলিয়েট সেন্টার, পাকিস্তান

পাকিস্তানের একটা কমিউনিটি ওয়ার্কশপ ও অনুষ্ঠানকেন্দ্রের পুরো কাঠামো তৈরি হয়েছে খিলান আকৃতির বাঁশ দিয়ে। এটা বানিয়েছেন উত্তর আয়ারল্যান্ডের স্থপতি জ্যাক র‍্যাঙ্কিন ও যুক্তরাজ্যের সংস্থা নিয়ামি স্টুডিও মিলে। 

পোনো গ্রামে, যেটা মূলত হেরিটেজ ফাউন্ডেশন অব পাকিস্তান ও এর প্রতিষ্ঠাতা ইয়াসমিন লারি গড়ে তুলেছিলেন এই কেন্দ্রটি এখন শূন্য-কার্বন ও বন্যা-সহনশীল ঘরবাড়ির একটা পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশের মতো বন্যাপ্রবণ এলাকার জন্যও এমন উদাহরণ বেশ প্রাসঙ্গিক।

বাঁশ আর সবুজ রঙের স্টিল দিয়ে বানানো একটা চাঁদোয়া। ছবি: ডিজেইন
আনজুং, মালয়েশিয়া

কুয়ালালামপুরের কাছে একটা বাড়ি আর স্টুডিওকে রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে মালয়েশীয় স্থপতি এলিনা জামিল ব্যবহার করেছেন বাঁশ আর সবুজ রঙের স্টিল দিয়ে বানানো একটা চাঁদোয়া। আনজুং নামের এই প্রকল্পে আছে দুটো এক তলা ভবন একটায় চার-বেডরুমের গেস্ট হাউজ, আরেকটায় ছোট্ট একটা কর্মক্ষেত্র।

এই সাতটা প্রকল্প দেখলে বোঝা যায়, বাঁশ শুধু গ্রামের ঘরবাড়ির উপকরণ হয়ে থাকেনি, আধুনিক স্থাপত্যেও এটা একইসঙ্গে সুন্দর, মজবুত আর পরিবেশবান্ধব সমাধান দিতে পারে। ধ্যানকেন্দ্রের বিশাল ছাদ থেকে শুরু করে বন্যা-সহনশীল কমিউনিটি সেন্টার পর্যন্ত, প্রতিটি জায়গাতেই স্থপতিরা বাঁশের নমনীয়তা আর শক্তিকে কাজে লাগিয়েছেন নিজ নিজ এলাকার আবহাওয়া আর প্রয়োজন বুঝে। বাংলাদেশেও বাঁশের যে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য আছে, তাকে যদি এভাবে আধুনিক নকশার সঙ্গে মিলিয়ে কাজে লাগানো যায়, তাহলে টেকসই আর কম খরচের নির্মাণে এটা হতে পারে বড় একটা সম্ভাবনা।

তথ্যসূত্র

ডিজেইন

Related Posts

আধুনিক বাড়ির নকশায় গৃহস্থালি কাজ ও করিডরের বিবর্তন

একটি বাড়ির নকশায় করিডর বা চলাচলের পথকে সাধারণত খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বসার ঘর, শোবার ঘর,…

আধুনিক বাড়ির স্বপ্ন: মানুষকে স্বাধীন করার প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার সংকট

আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ, আরামদায়ক ও স্বাধীন করে তোলা। বিংশ শতাব্দীতে স্থপতি…

পরিবেশগত নৈতিকতার আলোকে স্থাপত্যের ১০টি প্রধান চ্যালেঞ্জ

স্থাপত্য কেবল ভবন নির্মাণ কিংবা নান্দনিক নকশা তৈরির শিল্প নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রা, প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর…

হাসপাতালে রোগী-কক্ষে ঘরোয়া আবহ দিচ্ছে কোয়ালুর নতুন ফার্নিচার

হাসপাতালের রোগী-কক্ষ বলতে আমাদের চোখে সাধারণত ভেসে ওঠে সাদা দেয়াল, ঠান্ডা আলো আর যান্ত্রিক পরিবেশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

বায়তুর রউফ জামে মসজিদ স্থপতি মেরিনার অনন্য স্থাপত্যকর্ম
করিডোর
house
01
হাসপাতালে রোগী-কক্ষে ঘরোয়া আবহ দিচ্ছে কোয়ালুর নতুন ফার্নিচার
10
09
ফর্ম ফলোজ ফিকশন: ফাংশনের বাইরে ছয়টি ডিজাইনের অনুসন্ধান
প্রকৃতির দামও হিসাব করছে ভুটান: জিডিপির পাশে জিইপি