একসময় তেজগাঁও ছিল ঢাকা শহরের বাইরে। নদী-খাল ও বন-জঙ্গলে ঘেরা এলাকা। মুঘল আমলেও এই এলাকায় তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। তবে তাদের শাসনামলের শেষ দিকে ঢাকায় আসা ডাচ্্-পর্তুগিজ ব্যবসায়ীরা এই এলাকাটির উন্নয়ন করে বসবাস শুরু করেন। যার কারণে এখনো এই এলাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে তাদের প্রতিষ্ঠিত গির্জা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে কীভাবে ‘তেজগাঁও’ নাম হলো তা কিন্তু এখনো অজানা! বর্তমানে তেজগাঁও ঢাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত, যেখানে জাতীয় সংসদ ভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার অবস্থান।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান-ভারত বিভক্তির পর প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকায় শিল্পাঞ্চল এলাকা হিসেবে তেজগাঁও এলাকাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৬ সালে ডিআইটি প্রতিষ্ঠার আগে ১৯৫০ সালে তখনকার ঈ্ই বিভাগের অধীনে পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট এই এলাকাটির পরিকল্পনা প্রণয়ন ও উন্নয়ন করে। পরে এখানে পর্যায়ক্রমে শিল্পপতিদের জায়গা বরাদ্দ দিতে থাকে। অনেক পশ্চিম পাকিস্তানি লোকজনও সে সময় এখানে প্লট বরাদ্দ পেয়েছিল, যা স্বাধীনতার পর ‘পরিত্যক্ত প্লট’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। প্রায় ৫০০ একর জমির ওপর এই শিল্পাঞ্চল এলাকাটির পরিকল্পনা করা হয়, যেখানে বর্তমানে প্লট ও উপ-প্লটের সংখ্যা প্রায় ৪৩০টি। ১৯৫৯ সালে প্রণীত ঢাকার প্রথম মহাপরিকল্পনায় তেজগাঁওকে শিল্প এলাকার স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং সে অনুসারে শুরুতে এখানে কিছু ভারী শিল্পও প্রতিষ্ঠিত হয়।
কিন্তু স্বাধীনতার পর নগরের অন্যান্য এলাকার মতো তেজগাঁও শিল্প এলাকায়ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন শুরু হয়। সে সঙ্গে চলে পরিত্যক্ত প্লট দখল! এভাবে সমগ্র এলাকাটি তখন বস্তিতে পরিণত হয়। পাশাপাশি তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে ভারী শিল্পগুলো টঙ্গী ও অন্যান্য দিকে স্থানান্তরিত হতে শুরু করে। আশির দশকে তেজগাঁও শিল্প এলাকায় মিশ্র উন্নয়ন, ব্যবহার এবং বাণিজি্যকীকরণও শুরু হয়। তবে এলাকাটিতে এখনো কিছু হালকা শিল্প রয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে এই এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন, সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাস ডিপো, মিডিয়া হাউস ইত্যাদি গড়ে উঠতে থাকে। বর্তমানে তেজগাঁও ঢাকার বিকল্প সিবিডি (ঈবহঃৎধষ ইঁংরহবংং উরংঃৎরপঃ) এলাকায় রূপান্তরিত হওয়ার পথে!
প্রথমে ঢাকার সিবিডি ছিল মতিঝিল-দিলকুশা, তারপর কারওয়ান বাজার। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নব্বইয়ের দশক থেকে গণপূর্ত ও স্থাপত্য অধিদপ্তর এই এলাকার সংশোধিত ভ‚মি ব্যবহার পরিকল্পনা তৈরি করা শুরু করে, যা সম্প্রতি সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অনুমোদন লাভ করে। ১৯৯৫ সালে প্রণীত উগউচ স্ট্রাকচার প্ল্যানে এই জায়গায় মিশ্র ভ‚মি ব্যবহার দেখানো হয়েছে। সম্প্রতি প্রণীত নতুন ড্যাপেও এই এলাকাটিকে মিশ্র ও বাণিজি্যক ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব প্রদান করেছে। সাম্প্রতিককালের এক সমীক্ষা মতে, বর্তমানে এখানকার ৪৩০ প্লটের মধে্য ১৪৭টি বাণিজি্যক, ১৪১টিতে হালকা শিল্প, ৬১টি প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপনা, ৬১টিতে আবাসিক ও অবশিষ্ট প্লটগুলোতে বিভিন্ন ধরনের সেবামূলক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আগে যেখানে তেজগাঁওয়ে ইমারতের উচ্চতা ছিল দু-তিনতলা, সেখানে বর্তমানে সুউচ্চ তলা কয়েকটি ভবন নির্মিত হয়েছে। এমনকি দেশের সর্বোচ্চ ভবনটিও (৪০ তলা) নির্মিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, তেজগাঁও এলাকার প্লটগুলোর সাইজ অনেকটা বড় আকারের, যেখানে ৫০/৬০/৯০ কাঠা আয়তনের প্লটও রয়েছে। এখানকার সড়কগুলো গ্রিড প্যাটার্নের এবং অনেক চওড়ায় নির্মিত। প্রায় প্রতিটা সড়ক মোড়ই চারদিক থেকে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য বিশেষভাবে পরিকল্পিত। কিন্তু অব্যবস্থাপনার কারণে বর্তমানে এর প্রায় সড়ক ও ফুটপাতগুলো বেদখলে! সর্বত্রই রিকশার গ্যারেজ, ভাঙারি, বস্তি ও অন্যদের দখলে। বাস্তবে স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় ‘পরিত্যক্ত’ তেজগাঁও এলাকায় এই অবস্থার বিরাজ করছে! তেজগাঁও এলাকার প্রতিটা সড়ক মোড় ট্রাফিক ফ্রেন্ডলি করে তৈরি করা, তাই এখানে গাড়ি চালানো অনেকটা সহজ। কাজেই সরকার চাইলে এখানকার সড়ক ও ফুটপাতগুলোকে পূর্ণাঙ্গ চওড়ায় নির্মাণ করতে পারে।
উল্লেখ্য, এখনো তেজগাঁওয়ের প্রায় প্লটে এক-দুইতলার ফ্যাক্টরি বিল্ডিং বা ঘরবাড়ি বিদ্যমান। তাই এসব ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণে কোনো অসুবিধা হবে না। কারণ এখানে তেজগাঁও বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে কোনো উচ্চতা বিধিনিষেধও নেই। বিভিন্ন সময়ে আবার এই এলাকার অনেক প্লটের হাতবদল ও মিশ্র ব্যবহারে রূপান্তরিত হয়ে এই মুহূর্তে সেখানে দেশের সবচেয়ে উঁচু ইমারতটিও নির্মিত হচ্ছে। ইতিমধে্য এখানে কিছু ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা আঞ্চলিক কার্যালয় হয়েছে। এ ছাড়া অনেক করপোরেট ও বহুজাতিক কোম্পানি এবং শীর্ষস্থানীয় দেশীয় ব্যবসায়িক শিল্পগোষ্ঠীর সদর দপ্তরও নির্মিত হয়েছে। তা ছাড়া সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়সহ ইতিমধে্য এখানে রাষ্ট্রীয় আরও কিছু প্রতিষ্ঠানও স্থানান্তরিত হয়েছে।
গুলশান-বনানী ও নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকা এবং দক্ষিণে ও পশ্চিমে ধানমন্ডির সঙ্গে ও তেজগাঁওয়ের সরাসরি সংযোগ রয়েছে। তন্মধ্যে গুলশান-বনানী মূলত আবাসিক এলাকা এবং গুলশান অ্যাভিনিউর প্রায় প্লটগুলোতে ইতিমধ্যে ১০-১৫ তলার বহুতল ভবনেও পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। তাই সংগত কারণে এখন গুলশান আবাসিক এলাকাকে আর সিবিডিতে পরিণত করার সুযোগ নেই। তবে ইতিমধ্যে গুলশান-তেজগাঁও সংযোগ সড়কটি (যেটি তুলনামুলকভাবে ছোট হলেও) এবং পশ্চিমের সড়কটিকে (সাত রাস্তার মোড় থেকে মহাখালী পর্যন্ত) বাণিজি্যক সড়ক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং এই সুবিধায় এই এলাকায় (বিশেষ করে উত্তর দিকে) ইতিমধ্যে অনেক বহুতল ভবন ও বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। ২০১৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক তেজগাঁও শিল্প এলাকার চরিত্র পরিবর্তন করে একে মিশ্র এলাকা হিসেবে ব্যবহারের ঘোষণা দেওয়া হয়।
আগে তেজগাঁওকে শিল্প এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হলেও সেখানে শিল্প প্লটের পাশাপাশি বেশ কিছু প্রাতিষ্ঠানিক প্লটও বরাদ্দ করা হয়। যেমন ২৭ একর জমিতে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, ১১ একর জমিতে গøাস ও সিরামিক ইনস্টিটিউট, ১৬ একর জমিতে কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদাম (সিএসডি), ৮ একর জমিতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি), বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন (বিএসইসি) ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করা হয়। তা ছাড়া এখানে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর, বাংলাদেশ স্টান্ডার্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), কোহিনুর কেমিকেল, নাবিস্কো বিস্কুট অ্যান্ড ব্রেড ফ্যাক্টরি, ঢাকা ব্রেড ফ্যাক্টরি, ////শার্প ব্রেড////, অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রিজ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের জন্যও জমির সংস্থান রাখা হয়। একইভাবে এই এলাকার আশপাশে (কারওয়ান বাজারে) রেলওয়ের অনেক জায়গাও রয়েছে, যার অনেক জমিই এখন পরিত্যক্ত বা বেদখল অবস্থায় অথবা খুবই স্বল্প ব্যবহারে রয়েছে। ইতিমধ্যে তেজগাঁও এলাকায় সিটি করপোরেশনের অফিসও স্থাপিত হয়েছে।
তেজগাঁওজুড়ে রয়েছে উত্তরবঙ্গের বাস স্টপেজ ও বাস ডিপো, যেটি সরকার ঢাকা নগরীর বাইরে নেওয়ার জন্য পরিকল্পনা করছে! এই অবস্থায় সরকার যদি তেজগাঁও শিল্প এলাকাকে ঢাকার সিবিডি এলাকায় পরিণত করতে চায়, তাহলে এসব অনেক পরিত্যক্ত বা অব্যবহৃত প্রতিষ্ঠানের জমি ও শিল্প প্লটগুলোকে পুনর্মূল্যায়ন ও নকশা সংশোধন করে যথোপযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বরাবরে জমি বরাদ্দ করতে পারেন। সম্প্রতি এক সংবাদে জানা গেছে, রেলওয়ে বিভাগ তাদের এসব অব্যবহৃত ও স্বল্প ব্যবহৃত জায়গায় কিছু (প্রায় ৪০ একর) বাণিজি্যক প্রকল্পও গ্রহণ করতে চায়! তারা এখানে বিশ্বব্যাংকের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় একটি মাল্টিমডেল ট্রান্সপোর্টেশন অ্যান্ড বিজনেস হাব নির্মাণেরও উদে্যাগ নিতে যাচ্ছে!!
অপর দিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শিল্প-ব্যবসায়ী গ্রæপও বসে নেই! তারা মিশ্র ব্যবহারের সুযোগ ও স্ব-উদে্যাগে তেজগাঁও শিল্প এলাকায় প্লট ট্রান্সফার বা ক্রয় করে সেখানে ইতিমধ্যে পাঁচ তারকা হোটেল, সদর দপ্তর, বিক্রয়কেন্দ্র ইত্যাদি গড়ে তুলতে শুরু করেছে। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান ‘শান্তা হোল্ডিংস’ তো ইতিমধ্যে তেজগাঁওয়ে দেশের সর্বোচ্চ উঁচু বিল্ডিং নির্মাণের কাজও শুরু করেছে। এর মধ্যে আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও তেজগাঁওয়ে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ক্যাম্পাস নির্মাণ করেছে এবং সরকারি উদে্যাগে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের জায়গায় বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিস্থাপিত হয়েছে। ইতিমধ্যে এখানে কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সাম্প্রতিককালে তেজগাঁওয়ের দক্ষিণে হাতিরঝিল প্রকল্পের সমন্বিত উন্নয়নের মাধ্যমে সার্বিকভাবে তেজগাঁওয়ের পরিবেশ ইতিমধ্যে অনেকটা উন্নীত হয়েছে। তাই এই অবস্থায় নগরীর কেন্দ্রে অবস্থিত তথা হাতিরঝিল লেকসংলগ্ন তেজগাঁও এলাকার সংশোধিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সেখানকার উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে গণপূর্ত অধিদপ্তর, রাজউক, স্থাপত্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি বিশেষ অথরিটি গঠন করা যেতে পারে। সে সঙ্গে সরকারেরও উচিত রাষ্ট্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে তেজগাঁও এলাকাকে সিবিডিতে রূপান্তর করা।
প্রকৌশলী এমদাদুল ইসলাম
প্রকাশকা:ল বন্ধন ১৫৪ তম সংখ্যা, জুন ২০২৩