ভারতের ৪টি সুন্দর স্মৃতি থেকে নির্মিত বাড়ি

ভারতের সবচেয়ে সুন্দর বাড়িগুলো প্রায়শই স্মৃতি থেকে শুরু হয়। রান্নাঘর পুরোনো আম গাছের গন্ধে ভরপুর থাকে, করিডোরে হাসির প্রতিধ্বনি শোনা যায়, এবং বসার ঘরে সাজানো থাকে পারিবারিক ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্র।

স্মৃতি সত্যিই একটি শক্তিশালী নকশার উপাদান। অতীতের স্মৃতিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে এটি অতীত মানুষ, স্থান এবং সময়কে স্মরণ করিয়ে দেয়। স্থাপত্যশিল্পে স্মৃতিময় স্থাপনা ও পরিবেশকে ফুটিয়ে তুলতে পারলে এটি হতে পারে এক অনবদ্য নিদর্শন হয়ে উঠতে পারে।

এখানে ভারতের সবচেয়ে সুন্দর কিছু বাড়ির কথা বলা হলো যেগুলো স্মৃতি থেকে নির্মিত।

Jefri Jawar

জেফ্রি বাওয়ার বাড়ি

আলিবাগের একটি বাড়ির কেন্দ্রীয় উঠোনে অর্ধ-ঝর্ণার মতো একটি চম্পা গাছ দাঁড়িয়ে আছে। চাপা ফুলের সুগন্ধ অনিয়ন্ত্রিত আনন্দের মতো খাবার ঘর, বসার ঘর এবং সুইমিং পুলে ছড়িয়ে পড়ছে। ল্যান্ডস্কেপ স্থপতি কুনাল মানিয়ার জেফ্রি বাওয়ার স্মৃতিতে এই সুন্দর গাছটি রোপণ করেছিলেন।

তিনি মনে করেন একটি চম্পা গাছ দিয়ে ভুল হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। এটি যেনো একজন নারীর আলমারিতে থাকা সেই চিরায়ত বেনারসি শাড়ির মতো। দুই একরের এই সম্পত্তিতে নস্টালজিয়ার প্রতি দুর্বলতা একটি পুনরাবৃত্ত মোটিফ।

শৈশবের আরামের স্মৃতির সাথে বুদ্ধিদীপ্ত, বায়োফিলিক ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনের ধারণাকে একীভূত করার মাধ্যমে জোরালোভাবে ফুটে উঠেছে এই বাড়িতে।

বাড়ির মালিকদের পক্ষ থেকে বাগানটির জন্য যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বাড়িটিকে যেনো পাখি ও মৌমাছির সাথে সহাবস্থানের উপযোগী করে ডিজাইন করা হয়। তবে, মানিয়ার যে কারণে কৃতজ্ঞ, তা হলো তাঁর প্রকৃতি-প্রেমী দৃষ্টিভঙ্গিটি এই প্রকল্পের কিংবদন্তি স্থপতি রাহুল মেহরোত্রার দৃষ্টিভঙ্গিরই অনুরূপ। কুনালকে মেহরোত্রার নির্দেশনা ছিল যে, প্রাকৃতিক দৃশ্য যেন কোথাও শেষ না হয়ে যায়।

Bijoy Varma

অভিনেতা বিজয় ভার্মার বাড়ি

বিজয় ভার্মার নিজের কথায়, তিনি একজন ঘরোয়া মানুষ। সিনেমার অতি-উত্তেজিত সেটের বাইরে, তিনি সাধারণ, ঘরোয়া আনন্দের শান্ত আবহে তাঁর জীবন উপভোগ করেন। তিনি যখন কাজ করেন না, তখন বাড়িতেই থাকতে এবং জীবনের সাথে তাল মেলাতে চেষ্টা করেন। এটাই তার ভালো লাগে। এটাই আমার স্বাভাবিক বাসস্থান।

আমি খুব বেশি ছুটি কাটান না। তাই বাড়িটিতেই ছুটির আমেজ তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তার কোনো নির্দিষ্ট নকশার রুচি নেই, তবে তার বাড়ি হতে হবে কিছুটা মজার এবং রঙিন। সাথে তার স্মৃতি ও গল্পে ভরা ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের এক বিশাল সমাহারও উপভোগ কতে চান।

মাসব্যাপী নতুন বাসস্থানের জন্য অবিরাম অনুসন্ধানের পর, বিজয় একটি বহুতল ভবনের ১৩ তলায় একটি অ্যাপার্টমেন্ট পেয়ে যান। এটি কোনো সাধারণ অ্যাপার্টমেন্ট ছিলো না। এর একপাশে রয়েছে ব্যস্ত রাস্তা এবং কংক্রিটের আকাশরেখা। আর অপর পাশে সবুজের এক বিশাল, ঘন সমুদ্র।

এই দ্বৈততা স্থানটির মেজাজকে প্রভাবিত করেছে।  অন্তর্মুখী এবং শান্ত, তবুও এর শহুরে প্রান্ত সম্পর্কে সূক্ষ্মভাবে সচেতন। নকশাটিতে মাটির রঙের ব্যবহার করা হয়েছে যা প্রাকৃতিক পরিবেশকে দৃশ্যত ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়।

বাসার প্রবেশপথটি একটি বিরতির মতো। প্রবেশ করা মাত্রই আপনি এর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবেন। এই সংকীর্ণ, গুটি-আবদ্ধ পথটি একটি ভূমিকা হিসেবে কাজ করে। একই সাথে, এটি শিল্প ও উদ্ভিদের প্রতি বিজয়ের অনুরাগের সূচনা করে।

এছাড়াও, বিজয় অত্যন্ত যত্নে বাড়ির চারপাশে এমন সব বাস্তব স্মৃতি সাজিয়ে রেখেছেন যেগুলো নানা জায়গায় ঘুরে এসেছে। বিজয়ের কাছে বাড়ির ধারণা হলো এমন একটি স্থান, যেখানে তাঁর সবচেয়ে অসংযত সত্তাটি প্রকাশিত হয়।

Deradun House

দেরাদুনের এই ম্যাক্সিমালিস্ট বাংলো

দেরাদুনে মেহক মালহোত্রার রোদ ঝলমলে বাংলোতে ঢুকলে প্রথমেই চোখে পড়বে এর রঙ। এক কোণে রয়েছে লিপস্টিকের মতো লাল রঙের একটি পড়ার টেবিল। সরিষা-হলুদ রঙের ছাদ বসার ঘর জুড়ে উষ্ণতা ছড়িয়ে দেয়।

এমনকি পর্দাগুলোও যেন নিজেদের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলে। মুম্বাইয়ের সদা পরিবর্তনশীল ভাড়ার জগতে এক দশক কাটানোর পর, ডিজাইন স্টুডিও ‘গিগলিং মাঙ্কি’-র প্রতিষ্ঠাতা এবং ক্যানভা-র ইন্ডিয়া ক্রিয়েটিভ লিড মালহোত্রা সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি একটি ভিন্ন গতির জন্য প্রস্তুত।

এমন এক শান্ত জীবন যা স্থান, নিস্তব্ধতা এবং আত্মপ্রকাশের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। তিনি বলেন, “বোম্বে আমাকে গড়ে তুলেছে। এটি আমাকে মানুষ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং পেশা দিয়েছে। কিন্তু একটা সময় আমার নিজের চিন্তাভাবনা শোনার জন্য নীরবতার প্রয়োজন ছিল।” দেরাদুনে মালহোত্রা এমন একটি বাড়ি খুঁজে পান যা আপনাকে থেকে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়।

বাড়িটিতে রয়েছে গাছে ঘেরা এক বিশাল লন, সকালের আলোয় ভরা চওড়া জানালা, আর তার দুটি বিড়াল—গাগু ও চিক্কি। বাড়িটি হয়তো অস্থায়ী, কিন্তু এর ভেতরের সবকিছুই যেন পরিকল্পিত।

দেরাদুনে তার বাংলোর প্রতিটি ঘরই সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী পছন্দের ছাপ বহন করে। শোবার ঘরের ছাদটা গাঢ় সরিষা হলুদ রঙের যেনো মেঘলা দিনের সানরুফ। রত্ন-রঙা পর্দাগুলো যেন রঙের ছোপ ছোপ দাগের মতো মেঝে পর্যন্ত ঝুলে আছে। গাঢ় সবুজ রঙের একটি বইয়ের তাক, যেটাকে সঠিক রঙটা আনার জন্য দু’বার রং করা হয়েছে।

বাড়িটি এমন সব বস্তুতে পরিপূর্ণ যেগুলো হয়তো হুবহু একরকম নয়, কিন্তু প্রত্যেকটিরই নিজস্ব অর্থ রয়েছে। মুসৌরির রাস্তার ধারের একটি দোকান থেকে কেনা মাটির তৈরি একটি গরু। স্কুলে বানানো একটি রাখি, যা এখনও সগর্বে সাজিয়ে রাখা। দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে রাখা একটি আয়না, যা ইচ্ছাকৃতভাবেই ফ্রেমে বাঁধানো হয়নি।

Alibag House

আলিবাগের একটি বাড়ি

আলিবাগের আগারসুর গ্রামের একটি শান্ত গলির ধারে, বাতাস প্রায় অলক্ষ্যে বদলে যায়। নোনা বাতাস আরও ভারী হয়ে ওঠে। নারকেল গাছের ছায়ায় মৃদু হাওয়া বয়ে যায়। এখানে এমন পরিবেশে একটি লম্বা, নিচু বাড়ি দেখে মনে হয় যেন এটিকে মাটির উপর বসানো হয়নি বরং এটি মাটির সাথে মিশে গেছে।

বাড়িটি অবসরপ্রাপ্ত মার্চেন্ট নেভির এক দম্পতি এবং তাদের বর্ধিত পরিবারের জন্য ডিজাইন করা।  আলিবাগের ৫,৫০০ বর্গফুটের এই বাড়িটির পরিকল্পনা করেছে ‘দ্য আর্কিটেকচার কোম্পানি’। এর নকশাটি ছিল স্মৃতি আর আকাঙ্ক্ষায় পরিপূর্ণ।

এমন একটি বাড়ি যা ঘন ঘন যাতায়াতের জন্য মুম্বাইয়ের যথেষ্ট কাছে। তবে জীবনের ধীরগতির আমেজকে আলিঙ্গন করার জন্য যথেষ্ট দূরে। এই গল্পের শুরু কানপুরে যেখানে বাড়ির মালিক তাদের শৈশবের দিনগুলো পৈতৃক বাড়িতে পরিবারের সান্নিধ্যে কাটিয়েছিলেন।

কানপুরে পরিবারের জমকালো ভোজের স্মৃতি আছে তাদের। সেখানে পরিবারটির নারীরা রান্নাঘরে এবং বাইরে উভয় স্থানেই ঐতিহ্যবাহী আওয়াধি ও পাঞ্জাবি খাবার তৈরিতে মগ্ন থাকতো। তাদের জীবনে খাদ্য, ভোজন এবং উৎপাদিত পণ্যের গুরুত্বকে কেন্দ্র করে নকশাটি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

এই স্মৃতিই পরিকল্পনাটিকে রূপ দিয়েছে—বাড়ির কেন্দ্রস্থলে একটি প্রশস্ত রান্নাঘর, যা একটি সমৃদ্ধ বাগানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত, যেখানে একসাথে উপকরণ চাষ করা এবং খাবার তৈরি করা যেত।

০.৭৫ একরের এই জায়গাটির নিজস্ব একটি গল্প ছিলো। এর পূর্বার্ধ ছিলো অস্পর্শিত পাকা নারকেল, গুলমোহর এবং ফ্র্যাঞ্জিপানি গাছের একটি বাগান। নকশাটি দুটি দীর্ঘ অংশে বিভক্ত যা ছায়াযুক্ত বারান্দা এবং সিঁড়িসহ একটি তিনতলা উঁচু অ্যাট্রিয়াম দিয়ে সংযুক্ত। বাইরের খোলা জায়গাগুলো পারিবারিক জীবনের ধারণাকে মুক্ত বাতাসে প্রসারিত করে।

আসবাবপত্র পুরোনো স্মৃতির ভার বহন করে। পরিবারের কানপুরের বাড়ি থেকে আনা এক শতবর্ষী বেঞ্চ বসার ঘরে রাখা আছে। স্থানীয় কাঠমিস্ত্রিদের দিয়ে পুনরুদ্ধার করা একটি ঔপনিবেশিক ধাঁচের খাট মাস্টার স্যুটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

গাছপালার মাঝে বাড়িটি অপেক্ষা করছে। এটি স্মৃতির উষ্ণতা এবং এখনও না বলা নতুন গল্পের নীরব প্রতিশ্রুতি নিয়ে।

নিজের বাড়ি নিজের মতো না হলে মন খারাপই থাকতে পারে। তাই বাড়ি বানানোর আগে আমাদের চিন্তা করা উচিত আগে নিজের আরামের কথা। আরাম শুধু বিলাশবহুল আসবাবেই নয়। বাড়ির পরিবেশের সাথে মনের আরামের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। তাই বাড়িতে যেনো গোটা জীবনকে দেখা যায় এক পলকে, বাড়ি সেরকমই স্মৃতিময় হওয়া উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *