বৈচিত্র্যময় সাম্প্রতিক স্থাপত্যের এক ঝলক

স্থাপত্য জগতের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ডিজেইন প্রতি মাসে পাঠকপ্রিয় বাড়িগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করে। এখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অভিনব ও বৈচিত্র্যময় আবাসিক নকশা তুলে ধরা হয়। জুলাই ২০২৬-এর সংস্করণে জায়গা পেয়েছে ৫টি বাড়ি। এই পাঁচটি স্থাপনাই বিভিন্ন প্রেক্ষাপট, উপকরণ ও ডিজাইন-দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করে।

পুনর্ব্যবহারের নমুনা ‘‘ডুলনেইন’’, স্কটল্যান্ড
জুলাই মাসে ডিজেইনের সবচেয়ে জনপ্রিয় বাড়ি ছিল স্কটিশ হাইল্যান্ডসের তিন-শয়নকক্ষবিশিষ্ট পারিবারিক বাড়ি “ডুলনেইন”। স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান লোডার মন্টেইথ একটি পরিত্যক্ত খামারবাড়ি পুনর্নির্মাণ করে তার সঙ্গে কালচে রঙের লার্চ কাঠের একটি সম্প্রসারিত অংশ যুক্ত করেছে, যা বাড়িটিকে দুটি অংশে ভাগ করেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নির্মাণে ব্যবহৃত মূল গ্রানাইট পাথরের প্রায় ৯০ শতাংশই পুনর্ব্যবহার করা হয়েছে।

জুলাইয়ে সবচেয়ে আলোচিত বাড়িটা ছিল স্কটিশ হাইল্যান্ডসের তিন-বেডরুমের “ডুলনেইন”। ছবি: ডিজেইন

বনভূমির ন্যায় ‘‘ফরেস্ট ভিলা এমবি’’, নেদারল্যান্ডস
স্থপতি টম নিপকেনস তার নকশা করা “ফরেস্ট ভিলা এমবি” বাড়িটিকে নেদারল্যান্ডসের একটি বনভূমির সঙ্গে সম্পৃক্ত মনে হওয়ার মতো করে গড়ে তুলেছেন। বাড়িটির জালির মতো কাঠের ছাদ এমনভাবে তৈরি, যাতে তার মধ্য দিয়ে গাছ বেড়ে উঠতে পারে, আর বড় বড় কাচের দেয়াল থেকে প্রকৃতির দৃশ্য উপভোগ করা যায়। স্থপতি নিপকেনস জানিয়েছেন, প্রকৃতির ওপর স্থাপত্যকে চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তিনি চেয়েছেন নির্মিত কাঠামো ও চারপাশের গাছপালা যেন একসঙ্গে সহাবস্থান করে।

স্থপতি টম নিপকেনসের “ফরেস্ট ভিলা এমবি” বাড়িটি যেন নেদারল্যান্ডসের বনেরই অংশ। ছবি: ডিজেইন

র‍্যামড আর্থে গড়া ‘‘ডাবল কোর্টইয়ার্ড হাউস’’, নিউজিল্যান্ড
অকল্যান্ডের কাছে একটি বালিয়াড়ির ওপর নির্মিত “ডাবল কোর্টইয়ার্ড হাউস” তৈরি করেছে রবার্টস গ্রে আর্কিটেক্টস, যেখানে ব্যবহৃত হয়েছে র‍্যামড আর্থ বা চাপা মাটির পুরু দেয়াল। এই ভারী দেয়ালের ভেতরে রয়েছে দুটি ভিন্ন ধরনের প্রাঙ্গণ, একটি ছায়াময়, অন্যটি রোদে খোলা যাকে ঘিরেই সাজানো হয়েছে বসবাসের জায়গাগুলো। এই দুই প্রাঙ্গণ থেকেই বাড়িটির নামকরণ করা হয়েছে।

র্যামড আর্থের ভেতরে দুটি প্রাঙ্গণ- এক ছায়াময়, এক রোদেলা। ছবি: ডিজেইন

কংক্রিটের স্তম্ভের উপর ‘‘কাসা দিয়েজ পিয়েস’’, মেক্সিকো
মেক্সিকোর মাজুন্তে উপকূলীয় পাহাড়ের গা বেয়ে ধাপে ধাপে নেমে যাওয়া একগুচ্ছ টেরেস নিয়ে গড়া “কাসা দিয়েজ পিয়েস” বাড়িটির ভার বহন করছে দশটি মোটা কংক্রিটের স্তম্ভ। এই দশটি স্তম্ভ থেকেই বাড়িটির নাম রাখা হয়েছে, কাসা দিয়েজ পিয়েস, অর্থাৎ “দশ ফুট বাড়ি”। এই স্তম্ভগুলো এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে জায়গাটির প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর প্রভাব কম পড়ে, আর একইসঙ্গে সিঁড়ি, বাথরুম ও সংরক্ষণাগারের মতো জায়গাও তৈরি করা যায়।

এই দশটি স্তম্ভ থেকেই বাড়িটির নাম রাখা হয়েছে, “দশ ফুট বাড়ি”।ছবি: ডিজেইন

ইস্পাতের জালিঘেরা ‘‘স্প্লিটস্কেপ রেসিডেন্স’’, ভারত
ভারতের এই বহু-প্রজন্মভিত্তিক বাড়িটি সাজানো হয়েছে বিভক্ত-স্তরের মেঝে এবং একটি কমলা রঙের সিঁড়ি ঘিরে, আর পুরো বাড়িটি ঢাকা রয়েছে ছিদ্রযুক্ত ইস্পাতের পর্দায়। জালির মতো এই পর্দাগুলো আলো ফিল্টার করে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করায়, যার মধ্যে রয়েছে বাড়ির কেন্দ্রে একটি তিন-তলা উঁচু বসার জায়গাও। একইসঙ্গে এই পর্দা প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল নিশ্চিত করে এবং একধরনের উন্মুক্ততার অনুভূতি তৈরি করে। স্টুডিওটি ডিজেইনকে জানিয়েছে, অন্দরসজ্জা ইচ্ছাকৃতভাবেই সাদামাটা রাখা হয়েছে, যাতে স্থানের অনুভূতি, আলো এবং উপকরণই মূল আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।

পুরো বাড়িটি ঢাকা রয়েছে ছিদ্রযুক্ত ইস্পাতের পর্দায়। ছবি: ডিজেইন

জুলাই ২০২৬-এর এই পাঁচটি বাড়ি প্রমাণ করে, সমকালীন আবাসিক স্থাপত্যে স্থানীয় উপকরণ, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পারিবারিক প্রয়োজনের মেলবন্ধন কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। স্কটল্যান্ডের পুনর্ব্যবহৃত গ্রানাইট থেকে নিউজিল্যান্ডের চাপা মাটির দেয়াল, নেদারল্যান্ডসের গাছ-বান্ধব ছাদ থেকে মেক্সিকোর কংক্রিট স্তম্ভ কিংবা ভারতের ছিদ্রযুক্ত ইস্পাতের পর্দা, প্রতিটি বাড়িই তার নিজস্ব ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সাড়া দিয়ে তৈরি হয়েছে। এই বৈচিত্র্যই বিশ্বজুড়ে সমসাময়িক আবাসিক নকশার একটি প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে।

তথ্যসূত্র:
ডিজেইন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *