২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জাপানের আইচি প্রদেশের নাগোয়া শহরে যা ঘটেছে, তাকে শুধু “রেকর্ড বৃষ্টিপাত” বলে সংজ্ঞায়িত করলে আসল প্রশ্নটাই এড়িয়ে যাওয়া হয়। প্রশ্নটা হলো, একটি প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর, সুশৃঙ্খল ও সুপরিকল্পিত শহরের ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো কেন এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই বিধ্বস্ত হয়ে গেল?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে নগর পরিকল্পনার এমন একটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতায়, যা কেবল জাপানের নয়, বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দ্রুত-নগরায়িত শহরের জন্য একটি সতর্কবার্তা। বিশেষ করে ঢাকার জন্য তো বটেই।
নাগোয়ায় মাত্র এক ঘণ্টায় ১০৪.৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয় যা ১৮৯০ সালের পর সর্বোচ্চ। শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা সাধারণত একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ বৃষ্টি ধরে রাখার মতো করে বানানো হয়। যেমন, “৫০ বছরে একবার হয় এমন বৃষ্টি”। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই “বিরল” বৃষ্টিই এখন বারবার হচ্ছে। আর পুরনো হিসাব দিয়ে বানানো অবকাঠামো তা সামলাতে পারছে না।
পাইপের মধ্যে পানি ধরে না পারলে সেই চাপ সবচেয়ে দুর্বল জায়গা দিয়ে বেরিয়ে আসে। আর সেটাই হলো ম্যানহোল কভার। পাশের ইয়োক্কাইচি শহরে পানির স্তম্ভ ট্রাফিক সিগন্যালের সমান উঁচু হয়ে উঠেছিল, যা বোঝায় সমস্যাটা কতটা গুরুতর ছিল।

নগর পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভূমি ব্যবহার। শহরের কতটুকু জমি “পারমিয়েবল” বা পানি শোষণক্ষম রাখা হচ্ছে, আর কতটুকু কংক্রিট-অ্যাসফল্টে ঢাকা পড়ছে। সাকায়ে স্টেশনের মতো ঘনবসতিপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় প্রায় পুরো ভূমিই অভেদ্য পৃষ্ঠ দিয়ে আবৃত/
ফলে বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হওয়ার সুযোগ না পেয়ে সরাসরি ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর সম্পূর্ণ বোঝা চাপিয়ে দেয়। এটি আধুনিক নগর পরিকল্পনার একটি স্বীকৃত দ্বন্দ্ব। ঘনত্ব ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনে ভূমি যত বেশি “সিল” করা হয়। এত বৃষ্টির পানি ধরে রাখার প্রাকৃতিক ক্ষমতা কমে যায়।

নাগোয়ার ঘটনা থেকে নগর পরিকল্পনার আঙ্গিকে ঢাকার জন্য তিনটি নির্দিষ্ট শিক্ষা পাওয়া যায়।
- প্রথমত, অবকাঠামোর বয়স ও রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা। জাপানের আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থাও যখন চাপ সামলাতে পারেনি, তখন ঢাকার পুরনো ও প্রায়ই পলি-বর্জ্যে বন্ধ নিষ্কাশন নালার জন্য পরিস্থিতি আরও গুরুতর হওয়ার আশঙ্কা স্বাভাবিক।
- দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ। ঢাকার চারপাশের খাল ও জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়া মানে হলো, শহরের প্রাকৃতিক “বাফার জোন” হারিয়ে যাওয়া যা অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি সাময়িকভাবে ধরে রাখতে পারত। নগর পরিকল্পনায় এই জলাধারগুলোকে আইনগতভাবে সুরক্ষিত রাখা এবং অবৈধ ভরাট বন্ধ করা তাই কেবল পরিবেশগত নয়, একটি সরাসরি বন্যা-প্রতিরোধ কৌশল।
- তৃতীয়ত, ভবিষ্যৎমুখী ডিজাইন মানদণ্ড। নাগোয়ার ঘটনা দেখায়, অতীতের বৃষ্টিপাতের উপাত্ত দিয়ে তৈরি ডিজাইন মানদণ্ড এখন আর যথেষ্ট নয়। ঢাকার ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনাগুলোতেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ভবিষ্যৎ চরম বৃষ্টিপাতের প্রক্ষেপণ অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। নাহলে আজকের “পর্যাপ্ত” অবকাঠামো আগামী দশকে অপ্রতুল প্রমাণিত হবে।

এই ম্যানহোল বিস্ফোরণ একটা উদাহরণ মাত্র। নগর পরিকল্পনা যখন পুরনো হিসাব দেখে ভবিষ্যতের অবকাঠামো বানায়, তখন জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা সেই হিসাবকেই ভুল প্রমাণ করে দেয়। তাই বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এখান থেকে শেখার আছে। নগর পরিকল্পনাকে একবার বানিয়ে ফেলে রাখা যাবে না। সময়ে সময়ে হালনাগাদ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতের চরম আবহাওয়া সামলানো যায়।
তথ্যসূত্র
জাপান টুডে, নিউজ অন জাপান, আলো জাপান