চীনের জলাভূমির নীরবতায় দাঁড়িয়ে থাকা ইস্পাতের এক কবিতা

প্রকৃতি দেখার জন্য মানুষ চিরকালই উঁচু জায়গা খুঁজেছে। কিন্তু স্থাপত্য কীভাবে সেই দেখাকে একটা যাত্রায় রূপ দিতে পারে তারই এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে সাংহাই-ভিত্তিক স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান শিয়াং আর্কিটেক্টস। 

চীনের উহান শহরের কাছে চেনহু ওয়েটল্যান্ড পাখি অভয়ারণ্যে তারা তৈরি করেছে একটি বহু-সিঁড়িবিশিষ্ট পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, যার নাম চেনহু মাইগ্রেটরি বার্ড অবজারভেশন টাওয়ার। প্রতি শীতে এই জলাভূমিতে আশ্রয় নেয় এক লক্ষেরও বেশি পরিযায়ী পাখি, আর এই টাওয়ারটি সেই দৃশ্য দেখার জন্য চারপাশের জলাভূমি থেকে ১৯.৮ মিটার উচ্চতায় উঠে গেছে।

শিয়াং আর্কিটেক্টস নকশা করেছে এমন একটি ওয়াচটাওয়ার, যেখান থেকে চেনহু ওয়েটল্যান্ড পাখি অভয়ারণ্য দেখা যায়। ছবি: ডিজেইন
সিঁড়িই যেখানে স্থাপত্য

এই ওয়াচটাওয়ারের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, এটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে সিঁড়ি দিয়ে গঠিত। দুটি সিঁড়ি ডাবল হেলিক্স আকারে সাজানো, যা টাওয়ারের ওপরে ওঠা এবং নিচে নামার জন্য একটানা একটি পথ তৈরি করে। প্রতিটি সিঁড়ি শেষ হয়েছে ছোট একটি বারান্দার মতো জায়গায়, যেখানে কাচের অংশ রয়েছে, এভাবে মোট ২৪টি ধাপে ধাপে সাজানো ভিউয়িং প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে।

এই ভিউপয়েন্টটি সম্পূর্ণভাবে সিঁড়ি দিয়ে গঠিত। ছবি: ডিজেইন
অভিজ্ঞতার তিনটি ধাপ

শিয়াং আর্কিটেক্টসের ভাষায়, এই টাওয়ারে ওঠার পুরো অভিজ্ঞতাকে তিনটি ধারণাগত পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে—ওঠা, ঘোরা এবং দেখা। সিঁড়িগুলো একটি স্থির শারীরিক ছন্দ তৈরি করে, আর প্ল্যাটফর্মগুলো থামা ও চিন্তার জন্য মুহূর্ত এনে দেয়। 

দর্শনার্থীরা যখন চূড়ায় পৌঁছান, তখন শেষের প্যানোরামিক দৃশ্যটি একটি বিচ্ছিন্ন দৃশ্য না হয়ে পুরো যাত্রার চূড়ান্ত পরিণতি বলে মনে হয়। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এখানে ভূদৃশ্য শুধু একটি গন্তব্য নয়, বরং চলাচলের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি ধারাবাহিক গল্প।

এটি তৈরি হয়েছে ২৪টি প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড উপাদান দিয়ে। ছবি: ডিজেইন
গঠন পদ্ধতি: কেন্দ্রীয় কোরের বদলে সিঁড়িই কাঠামো

সাধারণত টাওয়ার-জাতীয় স্থাপনায় একটি কেন্দ্রীয় কোর কাঠামোর মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু এখানে সেই প্রচলিত ধারণা থেকে সরে এসে সিঁড়িগুলোকেই টাওয়ারের প্রধান কাঠামো হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। 

২৪টি প্রমিত মাপের প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড উপাদান দিয়ে তৈরি এই সিঁড়িগুলো তিন মিটার চওড়া একটি কেন্দ্রীয় ফাঁকা জায়গাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। কাঠামোটিকে শক্তি জোগাতে ব্যবহার করা হয়েছে পরস্পরবিরোধী দিকে ঘোরানো (কাউন্টার-রোটেটেড) ইস্পাতের ব্রেস।

ইস্পাতের ব্রেস কাঠামোটিকে মজবুত করেছে। ছবি: ডিজেইন
বহিরাবরণ: আলো ও আবহাওয়ার সাথে সংলাপ

পুরো টাওয়ারটি ইস্পাত দিয়ে মোড়ানো, যা একে চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে আলাদা এক স্বতন্ত্র রূপ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, এই ধাতব আবরণ আবহাওয়া অনুযায়ী রূপ বদলায়। মেঘলা দিনে জলাভূমির কুয়াশায় মিলিয়ে যায়, পরিষ্কার আকাশে নীল রঙ প্রতিফলিত করে, আবার সূর্যাস্তের সময় উষ্ণ অ্যাম্বার রঙে জ্বলে ওঠে। 

প্রকৃতিকে লুকিয়ে বা নকল করার চেষ্টা না করে, টাওয়ারটি নিজের স্বতন্ত্র স্থাপত্যিক উপস্থিতি বজায় রেখে আলো ও বস্তুগত গুণের ক্রমাগত মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে চারপাশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টতা

প্রকল্পটির স্থাপত্য নকশা করেছে শিয়াং আর্কিটেক্টস, যার প্রধান স্থপতি শিয়াং নান এবং প্রকল্প স্থপতি ছিন চুয়ান। কাঠামোগত নকশার দায়িত্বে ছিল এএনডি অফিস, আর ইস্পাত কাঠামো ও কার্টেন ওয়ালের বিস্তারিত নকশা ও নির্মাণ করেছে রোবোটিকপ্লাস.এআই। প্রকল্পের ক্লায়েন্ট উহান আরবান কনস্ট্রাকশন ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপ কোং।

ভিউপয়েন্টটির বহিরাবরণে রয়েছে ধাতব ফিনিশ। ছবি: ডিজেইন

চেনহু মাইগ্রেটরি বার্ড অবজারভেশন টাওয়ার দেখিয়ে দেয়, কীভাবে একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ কাঠামোও নিছক উচ্চতায় ওঠার মাধ্যম না থেকে একটি সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতায় রূপ নিতে পারে। সিঁড়িকে কাঠামোর কেন্দ্রে স্থাপন করে এবং আলো-আবহাওয়ার সাথে ধাতব বহিরাবরণের সংলাপ তৈরি করে শিয়াং আর্কিটেক্টস প্রমাণ করেছে, প্রকৃতির সাথে সহাবস্থানের জন্য নকল করার দরকার নেই। বরং স্বতন্ত্র স্থাপত্যিক ভাষাও প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারে।

তথ্যসূত্র 

ডিজেইন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *