অস্ট্রিয়ার আল্পসে জলের আয়না: স্নোহেটার “লেখ মাউন্টেন মিরর”

পাহাড়ের চূড়ায় উঠে চারপাশের দৃশ্য দেখতে আমরা সবাই পছন্দ করি। কিন্তু সেই দৃশ্যকে যদি পায়ের নিচে জলের ওপর ফুটে উঠতে দেখা যায়, তাহলে অভিজ্ঞতাটা কেমন হবে? অস্ট্রিয়ার আল্পস পর্বতের একটি গ্রামে ঠিক এমন একটি ডিজাইন সম্প্রতি সম্পন্ন হয়েছে। 

নরওয়েভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্কিটেকচার স্টুডিও স্নোহেটা (Snøhetta) এর নাম দিয়েছে “লেখ মাউন্টেন মিরর” (Lech Mountain Mirror)। এটি একটি ভিউপয়েন্ট বা দৃশ্য দেখার স্থান, যার মূল ভাবনা হলো দর্শনার্থীকে এক মুহূর্ত থেমে প্রকৃতির দিকে তাকাতে আমন্ত্রণ জানানো।

স্নোহেটা “লেখ মাউন্টেন মিরর” প্রকল্পটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছে। ছবি: ডিজেইন
অবস্থান ও মূল ধারণা

প্রকল্পটি অস্ট্রিয়ার ফোরারলবার্গ (Vorarlberg) অঞ্চলের লেখ (Lech) নামের একটি গ্রামে অবস্থিত। এটি আসলে একটি অগভীর জলের পুকুর, যা বসানো হয়েছে জুগারবার্গবান (Zugerbergbahn) কেবলকারের স্টেশনের ছাদে। কেবলকার হলো তারে ঝোলানো গাড়ি, যা পাহাড়ে মানুষ ও মালপত্র ওঠানামা করায়। দর্শনার্থীরা এই পুকুরের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারেন।

ডিজাইনটি করেছে স্নোহেটার ইন্সব্রুক (Innsbruck) অফিস। লক্ষ্য ছিল এমন একটি লুকআউট পয়েন্ট তৈরি করা, যা একই সঙ্গে আশপাশের নাটকীয় পাহাড় ও মেঘকে জলে প্রতিফলিত করবে এবং দর্শনার্থীর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে খেলবে। প্রবেশ বিনামূল্যে।

অবকাঠামো থেকে অনুভূতির স্থান

সাধারণত কেবলকার স্টেশন একটি কার্যকরী অবকাঠামো, যার কাজ যাত্রী ওঠানামা করানো। এখানে স্টেশনের ছাদটিকেই একটি অভিজ্ঞতার জায়গায় রূপ দেওয়া হয়েছে। স্নোহেটার পার্টনার প্যাট্রিক লুথ (Patrick Lüth) বলেছেন, প্রকল্পটি একটি অবকাঠামোগত স্থাপনাকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এক অনন্য অভিজ্ঞতার স্থানে রূপান্তর করে। তার ভাষায়, এটি পাহাড়ের জাদুকে দর্শনার্থীদের কাছে এক অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে তুলে ধরে এবং পাহাড়ি দুনিয়াকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ করে দেয়।

ভিউপয়েন্টটি “পাহাড়ের জাদুকে ধারণ করে। ছবি: ডিজেইন
জল, ধাপপাথর আর প্রতিফলন

পুকুরের ভেতরে সারি সারি ডোরাকাটা ধাপপাথর (stepping stones) বসানো আছে। সেগুলো ধরে এগোলে পানি থেকে মাথা তুলে থাকা একটি শিলা বা পাথরের কাছে পৌঁছানো যায়।

জলের মধ্যে দর্শনার্থী চারপাশের ভূদৃশ্যের উল্টো প্রতিবিম্ব দেখতে পান। এই প্রতিবিম্ব আবহাওয়া ও দিনের সময়ের সঙ্গে বদলায়। ফলে মানুষ থেমে পরিবর্তনশীল প্রকৃতিকে লক্ষ্য করার সুযোগ পায়। 

বাংলাদেশের পাঠকের জন্য একটি তুলনা দেওয়া যায়: বর্ষা বা শরতে হাওর বা বিলের স্থির জলে আকাশ আর মেঘের ছায়া পড়তে দেখলে যে অনুভূতি হয়, এখানে সেই অনুভূতিকেই ডিজাইনের কেন্দ্রে আনা হয়েছে।

ডোরাকাটা ধাপপাথরগুলো জলের ওপর দিয়ে এগিয়ে গেছে। ছবি: ডিজেইন
আবহাওয়াই যেখানে নকশার অংশ

স্নোহেটার মতে, আবহাওয়া এখানে অভিজ্ঞতারই অংশ। কারণ তা সারাক্ষণ চারপাশ সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধি বদলে দেয়। রোদেলা, পরিষ্কার দিনে প্রতিফলন হয় নিখুঁত। বাতাস বইলে প্রতিবিম্ব ঝাপসা হয়ে যায় এবং জলের ওপর ঢেউ তৈরি হয়। যা নতুন এক প্রাকৃতিক অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। স্টুডিওর ভাষায়, পাহাড় ও আকাশ, মেঘ ও মানুষের প্রতিবিম্ব মিলেমিশে এমন একটি ছবি তৈরি করে, যা প্রতিটি বাতাসের ছোঁয়া আর আলোর বদলের সঙ্গে বদলাতে থাকে।

চারপাশের সবুজ ও বসার জায়গা

ভিউপয়েন্টটিকে ঘিরে রয়েছে সবুজ জায়গা এবং বিভিন্ন বসার ব্যবস্থা। এগুলো তৈরি লার্চ (larch) কাঠ ও পাথরের বোল্ডার দিয়ে। লার্চ এক ধরনের শীতপ্রধান অঞ্চলের গাছ। ফলে দর্শনার্থীরা শুধু জলের ওপর হাঁটেন না, আশপাশে বসে দৃশ্যও উপভোগ করতে পারেন।

ভিউপয়েন্টের পাশে বসার জায়গা তৈরি করা হয়েছে। ছবি: ডিজেইন
পর্যটন ও শিল্পকর্মের বৃহত্তর পরিকল্পনা

প্রকল্পটির একটি অর্থনৈতিক লক্ষ্যও আছে। আশা করা হচ্ছে, এটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠবে এবং লেখকে শুধু শীতকালীন স্কিইংয়ের গন্তব্য না রেখে সারা বছরের গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করবে। স্নোহেটা জানিয়েছে, গ্রীষ্মকালীন পর্যটন বাড়ানোর জন্য এলাকায় আরও কয়েকটি শিল্প-উদ্যোগ তৈরির কাজ চলছে। এর মধ্যে আছে শিল্পী অ্যান্টনি গোর্মলি (Antony Gormley) ও জেমস টারেল (James Turrell)-এর প্রকল্প।

আশা করা হচ্ছে, এটি এলাকাটির গ্রীষ্মকালীন পর্যটন বাড়াতে সহায়ক হবে। ছবি: ডিজেইন

লেখ মাউন্টেন মিরর দেখায়, একটি কেবল কার স্টেশনের ছাদের মতো সাদামাটা জায়গাও ভাবনার জোরে অনুভূতির স্থান হয়ে উঠতে পারে। এখানে ডিজাইনের বড় অংশ জল, আলো, বাতাস ও মেঘের মতো প্রকৃতির উপাদানের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, আর স্থাপত্যের কাজ হলো সেগুলোকে দেখার একটি মঞ্চ তৈরি করা। পাশাপাশি এটি পর্যটনের মাধ্যমে একটি এলাকার অর্থনীতিকে সারা বছরের জন্য সক্রিয় রাখার চেষ্টাও।

তথ্যসূত্র

ডিজেইন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *