• Home
  • সর্বশেষ
  • বাঁশের পদ্ম: প্রকৃতি ও স্থাপত্যের অসাধারণ মেলবন্ধ
Lotus

বাঁশের পদ্ম: প্রকৃতি ও স্থাপত্যের অসাধারণ মেলবন্ধ

ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের স্থাপত্যে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক কখনোই কেবল দৃশ্যগত সৌন্দর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রকৃতি, জলবায়ু, স্থানীয় উপকরণ এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন—সবকিছুকে একত্র করে একটি স্থাপত্যিক অভিজ্ঞতা তৈরি করাই এখানকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সেই ধারাকে সমকালীন ভাষায় নতুনভাবে প্রকাশ করেছে লোটাস যোগশালা

উবুদের নদী ও ঘন সবুজ অরণ্যের পাশে নির্মিত এই ১২৫ বর্গমিটারের যোগব্যায়াম প্যাভিলিয়নটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য তার বিশাল বাঁশের ছাদ। ওপর থেকে দেখলে ছাদটি একটি প্রস্ফুটিত পদ্মফুলের মতো—যেন প্রকৃতির মধ্য থেকেই একটি পদ্ম উঠে এসে মানুষের ধ্যান ও শরীরচর্চার স্থান তৈরি করেছে।

পদ্মফুল থেকে স্থাপত্যের ধারণা

লোটাস যোগশালার নকশা নিয়ে পাবলো লুনা স্টুডিও কাজ শুরু করে ২০২১ সালে। প্রকল্পটি ছিল স্টুডিওটির প্রকৃতির গঠন ও নীতিকে স্থাপত্যে প্রয়োগের প্রাথমিক পরীক্ষাগুলোর একটি। স্থপতিরা পদ্মফুলের আকৃতিকে শুধু অলংকার হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং ফুলের পাপড়ির বিস্তারকে ছাদের কাঠামোগত যুক্তির মধ্যেই নিয়ে এসেছেন।

Lotus
ব্যায়াম ও যোগ সাধনার জায়গা: ছবি: ডিজাইনবুম

এখানেই প্রকল্পটির স্থাপত্যিক গুরুত্ব।

অনেক ভবনে প্রকৃতির কোনো আকৃতি কেবল নান্দনিকতার উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এই স্থাপনায় পদ্মের আকৃতি ভবনের যৌক্তিক গঠনের অংশ। ছাদের প্রতিটি পাপড়ি আকৃতি তৈরি হয়েছে বাঁশের আর্চের মাধ্যমে।

ফলে ভবনটি বাইরে থেকে দেখতে যেমন একটি পদ্মের বিমূর্ত রূপ, ভেতরে প্রবেশ করলে সেই একই জ্যামিতি কাঠামোর জটিল রেখাচিত্র হিসেবে দৃশ্যমান হয়।

বাঁশ যখন কাঠামো

এই প্রকল্পে ব্যবহৃত প্রধান উপাদান হলো পেটুং বাঁশ। বাঁশকে এখানে শুধু হালকা আবরণ বা ঐতিহ্যবাহী উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি; বরং মূল কাঠামোর সিস্টেম হিসেবেই ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রধান বাঁকা আর্চগুলো তিনটি করে পেটুং বাঁশকে একত্র করে তৈরি। এর ওপর কাটা বাঁশ দিয়ে তৈরি হয়েছে একটি আন্ত:বুনন গ্রিডশেল। এই গ্রিড কাঠামো ছাদের বাঁকা আকৃতিকে একটানা শেলের মতো দৃঢ়তা দেয়।

ছাদের প্রান্তে বিভিন্ন স্ট্রাকচারাল লোড কয়েকটি বাঁশের খুঁটির জংশনে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। সাধারণত তিন থেকে পাঁচটি বাঁশের খুঁটি একসঙ্গে একটি কাঠামোগত ক্লাস্টার তৈরি করে। এর ফলে অতিরিক্ত সংখ্যক কলামের প্রয়োজন হয়নি।

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যিক সিদ্ধান্ত। কারণ কম কলাম মানে শুধু কাঠামোগত দক্ষতা নয়—ভেতরের জায়গাটিও অনেক বেশি মুক্ত থাকে।

দেয়ালহীন যোগের স্থান

লোটাস যোগশালার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রায় দেয়ালহীন স্থানিক বিন্যাস।

এখানে প্রচলিত অর্থে শক্ত দেয়াল দিয়ে ইন্টেরিয়রকে ল্যান্ডস্কেপ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়নি। বরং ছাদই মূল স্থানিক সীমানা হিসেবে কাজ করে। মেঝের চারদিকে খোলা জায়গা থাকায় নদী, গাছপালা, আলো, বাতাস—সবকিছুই স্থাপত্যের অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে।

সিলিং
সিলিংয়ে বাশে চাটাইয়ে গ্রিডলাইন। ছবি: ডিজাইনবুম

যোগব্যায়াম ও মেডিটেশনের মতো কার্যক্রমের জন্য এটি বিশেষভাবে অর্থবহ। কারণ এমন একটি স্থানের মূল উদ্দেশ্য শুধু একটি নির্দিষ্ট আয়তনের ভেতরের জায়গা তৈরি করা নয়; বরং ব্যবহারকারীকে একটি শান্ত, প্রাকৃতিক এবং মনোযোগ-কেন্দ্রিক পরিবেশ দেওয়া।

এখানে স্থাপত্য যেন নিজেকে যতটা সম্ভব পেছনে সরিয়ে প্রকৃতিকে সামনে নিয়ে এসেছে।

পাহাড়ের ঢাল না কেটে স্থাপত্য

প্রকল্পটির অবস্থানও নকশার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্যাভিলিয়নটি একটি ঢালু, সবুজ জমিতে নদীর পাশে বসানো হয়েছে। স্থপতিরা ভূমিকে সমতল করে বিশাল মাটির কাজ করার পরিবর্তে বিদ্যমান ভূসংস্থান অনুসরণ করেছেন। ভবনের প্লাটফর্ম মাটির ওপর সামান্য উঁচু করে বসানো হয়েছে।

অর্থাৎ ভবন নির্মাণের জন্য ল্যান্ডস্কেপকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলার পরিবর্তে ল্যান্ডস্কেপের বিদ্যমান চরিত্রকে গ্রহণ করা হয়েছে।

ফলে ভবনটি যেন জমির ওপর বসানো কোনো বিচ্ছিন্ন বস্তু নয়; বরং ঢালের ধারাবাহিকতার অংশ।

আধুনিক স্থাপত্যে স্থানীয় উপকরণের নতুন ভাষা

বাঁশ বালির ঐতিহ্যবাহী নির্মাণ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু লোটাস যোগশালা বাঁশকে ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের পুনরাবৃত্তি হিসেবে ব্যবহার করেনি।

বরং ঐতিহ্যবাহী উপকরণকে সমসায়কি জ্যামিতিক নকশার সঙ্গে মিলিয়ে একটি নতুন স্থাপত্যিক ভাষা তৈরি করেছে।

এখানে বাঁশ একই সঙ্গে—

  • স্থানীয় উপকরণ,
  • কাঠামোগত উপকরণ
  • পরিবেশগত কৌশল
  • নান্দনিক নকশা এবং
  • স্থাপত্যিক পরিচয়
যোগশালা
পাহাড়ের কোলে লোটাস যোগশালা। ছবি: ডিজাইনবুম

এই বহুমাত্রিক ব্যবহারই প্রকল্পটিকে বিশেষ করে তুলেছে।

পাবলো লুনা স্টুডিওর যোগশালা দেখায়, আধুনিক স্থাপত্যকে ভবিষ্যতমুখী করতে সবসময় নতুন বা উচ্চপ্রযুক্তির উপকরণ প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো স্থানীয় ও প্রাকৃতিক একটি উপাদান—যেমন বাঁশ—কেই নতুন স্থাপত্যিক এবং স্থানিক যৌক্তিকতার মাধ্যমে ব্যবহার করাই যথেষ্ট।

পদ্মের পাপড়ির মতো ছড়িয়ে থাকা ছাদটি দূর থেকে একটি ভাস্কর্যের মতো মনে হলেও কাছে গেলে বোঝা যায়, এর সৌন্দর্য এসেছে অত্যন্ত বাস্তব কাঠামোগত যুক্তি থেকে।

সবচেয়ে বড় কথা, ভবনটি প্রকৃতিকে দেখার জন্য আলাদা কোনো জানালা তৈরি করেনি। প্রকৃতিকেই ভবনের অংশ করে নিয়েছে।

সূত্র: ডিজাইনবুম

Related Posts

সিউলের হাইওয়ে ভেঙে নদী ফিরিয়ে আনতেই কমল যানজট

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া একটি ছোট নদীর নাম চেওংগিয়েচন। এক সময় নগরায়নের কারণে এই…

হোমালি যেনো রেস্তোরাঁ নয় ধান গাছের জীবন গল্প

নিউইয়র্কের পশ্চিম গ্রামের থাই রেস্তোরাঁর ইন্টেরিয়র ডিজাইন যেনো শুধু খাবারের পরিবেশই নয়। এটি একটি সাংস্কৃতিক গল্প বলার মাধ্যমও…

স্থাপত্যে বাংলাদেশের ঝুলিতে এলো আরও দুটি অর্জন

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবারও উজ্জ্বল হলো বাংলাদেশের স্থাপত্যশৈলী। কমনওয়েলথ অ্যাসোসিয়েশন অব আর্কিটেক্টসের (সিএএ) ২০২৬ সালের পুরস্কার তালিকায় জায়গা করে…

আজকাল স্থপতিরা কেন ভবনের বাইরেও বেশি কিছু ডিজাইন করছেন?

স্থাপত্য বলতে এতদিন আমরা বুঝেছি ইট, কংক্রিট আর কাঁচের কাঠামো তৈরির শিল্প। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই ধারণা বদলে…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

অভিনেতার নিউ ইয়র্কের বাড়িতে এক অবাক করা পল্লীসুলভ ছোঁয়া
সিউলের হাইওয়ে ভেঙে নদী ফিরিয়ে আনতেই কমল যানজট
হোমরালি রেস্তোরাঁ
স্থাপত্যে বাংলাদেশের ঝুলিতে এলো আরও দুটি অর্জন
আজকাল স্থপতিরা কেন ভবনের বাইরেও বেশি কিছু ডিজাইন করছেন?
স্থাপত্যে প্রায়েমিয়াম ইম্পেরিয়াল পুরস্কার জিতলেন লিবেসকিন্দ
Arch De Trump
কেন স্বেচ্ছায় নিজের “স্থপতি” উপাধি মুছে ফেললেন RIBA সভাপতি?
construction