barbican

বারবিক্যানের স্থাপত্য যখন ঘরের আসবাবে

লন্ডনের বিখ্যাত বারবিক্যান এস্টেটের স্থাপত্য এবার প্রবেশ করছে অন্দরমহলে। মেড (made.com) ও বারবিক্যান যৌথভাবে এমন একটি হোমওয়্যার সংগ্রহশালা তৈরি করেছে। এখানে ব্রিটিশ  স্থাপত্যের অন্যতম পরিচিত এই কমপ্লেক্সের জ্যামিতি, উপকরণ, রং এবং অভ্যন্তরীণ নকশার ভাষা নতুনভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

২৩টি পণ্যের এই সংগ্রহে রয়েছে আসবাব, আলো, কার্পেট, কুশন, স্টোরেজ ও বাহারী রকমের গৃহসজ্জার সামগ্রী। প্রতিটি পণ্যের নকশায় বারবিক্যানের স্থাপত্যকে সরাসরি অনুকরণ করার বদলে তার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে সমকালীন গৃহস্থালি পণ্যের আকারে রূপান্তর করা হয়েছে।

ব্রুটালিস্ট স্থাপত্য থেকে গৃহসজ্জার উপকরণ

লন্ডনের বারবিক্যান এস্টেট শুধু একটি আবাসিক কমপ্লেক্স নয়। এটি যুদ্ধ-পরবর্তী ব্রিটিশ স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিলও। চেম্বারলিন, পাওয়েল এবং বন-এর নকশায় গড়ে ওঠা এই বিশাল কমপ্লেক্সে কংক্রিটের শক্তিশালী উপস্থিতি, পুনরাবৃত্ত জ্যামিতি, এলিবেটেড ওয়াকওয়ে, টেরেস, জলাধার এবং গভীর স্থাপত্যিক স্তরবিন্যাস একে স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে।

নতুন মেড এবং সেই স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্যগুলোকেই ঘরের ভেতরের দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রীতে নিয়ে এসেছে।

এখানে বারবিক্যানের কংক্রিটের স্তম্ভ, কফার্ড সিলিং, বাঁকানো দেয়াল, নিচু আসন এবং অভ্যন্তরীণ রঙের মতো উপাদানগুলো সরাসরি নকশার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

ফলে সংগ্রহটির পণ্যগুলোকে শুধু আসবাব বা গৃহস্থালির জিনিস হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এগুলো মূলত একটি স্থাপত্যিক ভাষাকে ছোট আকারে পুনর্নির্মাণের প্রচেষ্টা।

med
বার্বিকান এবং মেড.কম একটি গৃহসজ্জার সামগ্রীর সংগ্রহ। ছবি: ডিজেইন

মিরিয়াম হাউইটের নকশার প্রভাব

এই সংগ্রহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা বার্বিকানের প্রাথমিক ইন্টেরিয়র ডিজাইনের সঙ্গে যুক্ত মিরিয়াম হাউইটের কাজ।

১৯৬০-এর দশকে হাউইট বারবিক্যানের শোইটের ভেতর সাজানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর নকশায় তখনকার আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে রং, প্যাটার্ন, আসবাব এবং স্থাপত্যের একটি সমন্বিত সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।

নতুন সংগ্রহ সেই ঐতিহাসিক ইন্টেরিয়র ডিজাইনকে পুনরায় পাঠ করেছে। বিশেষ করে হাউইটের ব্যবহৃত রঙ, প্যাটার্ন এবং কার্পেট ডিজাইনের প্রভাব নতুন পণ্যগুলোর মধ্যে দেখা যায়।

এভাবে সংগ্রহটি শুধু বার্বিকানের  বহিরাঙ্গনের ব্রুটালিস্ট চরিত্রকে তুলে ধরে না বরং ভবনটির ভেতরের জীবন ও ডিজাইন সংস্কৃতির ধারাকেও পুনরুজ্জীবিত করে।

বাকানো প্রদীপ: স্থাপত্যের শব্দ থেকে আলোর নকশা

সংগ্রহটির উল্লেখযোগ্য পণ্যগুলোর একটি হলো বাকানো প্রদীপ। এর আকৃতিতে বারবিক্যান কংক্রিটের হলের নলাকার অ্যাকোস্টিক প্যানেলের প্রভাব রয়েছে।

কংক্রিট হলের অ্যাকোস্টিক ট্রিটমেন্ট মূলত শব্দ নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি হলেও তার পুনরাবৃত্ত বাঁকানো আকৃতি নিজেই একটি শক্তিশালী দৃশ্যমান উপকরণ। সেই স্থাপত্যিক জ্যামিতিকে ছোট করে একটি আলোকসজ্জার পণ্যে রূপ দেওয়া হয়েছে।

এখানে কার্যকারিতা ও নান্দনিকতার সম্পর্কটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যে উপাদানটি একটি ভবনে অ্যাকোস্টিক পারফরম্যান্সের জন্য প্রয়োজনীয়, সেটিই আবার একটি ঘরের আলো তৈরির নকশাগত ভাষায় পরিণত হয়েছে।

কফার লাইট এবং বারবিক্যানের সিলিং জ্যামিতি

বারবিক্যানের অন্যতম পরিচিত স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য হলো এর গভীর জ্যামিতিক সিলিং প্যাটার্ন বা কফার্ড কাঠামো।

Chair
আকর্ষণীয় কাঠের সাইড প্যানেলযুক্ত চেয়ার। ছবি: ডিজেইন

এই জ্যামিতিকি সিলিংই কফার লাইটের মূল অনুপ্রেরণা। আলোকে শুধু আলোর উৎস হিসেবে না দেখে সিলিংয়ের স্থাপত্যিক প্যাটার্নের সঙ্গে যুক্ত একটি বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

এখানে ব্রুটালিস্ট স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো পুনরাবৃত্তিকে নতুনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। একই ধরনের জ্যামিতিক নকশা পুনরাবৃত্ত হয়ে একটি বৃহত্তর দৃশ্যমান ছন্দ তৈরি করে। কফার লাইট এবং সেই রিদমকে ঘরের ভেতরে নিয়ে আসা হয়েছে।

প্লিন্থ কফি টেবিল

আরেকটি উল্লেখযোগ্য পণ্য হলো প্লিন্থ কফি টেবিল। এর নকশায় বারবিক্যানের লেকের পাশে থাকা নিচু আসনের অর্ধবৃত্তাকার জ্যামিতিক নকশার প্রভাব রয়েছে।

টেবিলটির আকৃতি তাই প্রচলিত প্রচলিত চার কোণাকার কফি টেবিলের তুলনায় বেশি ভাস্কর্যমন্ডিত। এর পৃথক অংশগুলো আলাদাভাবেও ব্যবহার করা সম্ভব, আবার একত্রে রেখে একটি বৃহত্তর কম্পোজিশনও তৈরি করা যায়।

এই মডুলারিটি বারবিক্যানের স্থাপত্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। পুরো এস্টেটজুড়ে বিভিন্ন স্থাপত্যিক উপাদান একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে একটি বৃহৎ কম্পোজিশন তৈরি করেছে। প্লিন্থ টেবিল সেই ধারণাটিকে আসবাবপত্রের ডিজাইনে নিয়ে এসেছে।

কংক্রিট থেকে কাঠের ডিজাইনে ডুয়াল চেয়ার

ডুয়াল চেয়ার বা দ্বৈত চেয়ারে বারবিক্যানের পিলারের দৃঢ়তা নতুনভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

ব্রুটালিস্ট স্থাপত্যে কাঠামোগত উপকরণগুলো অনেক সময়ই নান্দনিকতার প্রধান অংশ হয়ে ওঠে। বারবিক্যানের কংক্রিটের স্তম্ভগুলোও শুধু ভবনকে ধরে রাখে না। সেগুলো ভবনের দৃশ্যমান পরিচয়ও সৃষ্টি করে।

ডুয়াল চেয়ারের কাঠের সাইড প্যানেলে সেই শক্তিশালী কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের একটি বিমূর্ত রূপ দেখা যায়। ফলে চেয়ারটি একই সঙ্গে ব্যবহারযোগ্য আসবাব এবং স্থাপত্যিক রেফারেন্স হিসেবেও কাজ করে।

ব্রুট রাগ: ইতিহাসের প্যাটার্নের পুনর্জন্ম

সংগ্রহটির ব্রুট রাগ সরাসরি বারবিক্যানের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। এর নকশায় মিরিয়াম হাউইটের ১৯৬৭ সালের শো ফ্ল্যাটের কার্পেটের প্যাটার্ন থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে।

এখানে অতীতের একটি ইন্টেরিয়রর উপকরণ সমকালীন ব্যবহারের জন্য নতুনভাবে তৈরি হয়েছে।

এ ধরনের পুনর্ব্যবহার বারবিক্যানের ঐতিহ্যগত নকশা সংরক্ষণের একটি আকর্ষণীয় পদ্ধতি। পুরোনো কোনো স্থাপত্যের ছবি বা নকশা শুধু আর্কাইভে সংরক্ষিত না থেকে যখন নতুন কোনো বস্তুতে রূপ নেয় তখন সেটি মানুষের নিত্যকার জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।

Lamp
এই সংগ্রহটি লন্ডনের সেই বিখ্যাত এস্টেটের স্থাপত্যশৈলীর খুঁটিনাটি তুলে ধরে। ছবি: ডিজেইন

আসবাবের রংয়েও ফিরে আসে বারবিক্যান

বারবিক্যানকে অনেক সময় শুধু ধূসর কংক্রিটের স্থাপত্য হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এর অভ্যন্তরীণ সাজ সজ্জার ইতিহাস অনেক বেশি রঙিন।

নতুন সংগ্রহে  শ্যাওলা সবুজ, মেরুন, মরিচা কমলা, নীল এবং বাদামীর মতো মধ্য শতাব্দীর রঙ ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলোর সঙ্গে দাগযুক্ত ছাই কাঠ এবং ক্রোম এর মতো উপকরণও যুক্ত হয়েছে।

ফলে সংগ্রহের দৃশ্যমান চরিত্র একদিকে ব্রুটালিস্ট, অপরদিকে উষ্ণ ও গৃহস্থালির পর্যায়ে রূপ নেয়।

এই বৈপরীত্যটি গুরুত্বপূর্ণ। ব্রুটালিজমের কঠিন কংক্রিটের ছবির বিপরীতে উষ্ণ কাঠ, রঙিন টেক্সটাইল এবং নরম আসবাব একটি মানবিক ইন্টেরিয়র তৈরি করে।

এভাবেই একটি স্থাপত্য তার নিজস্ব ভবনসীমা অতিক্রম করে মানুষের ঘরেও প্রবেশ করতে পারে। তখন সেটি শুধু আর স্থাপত্যই  থাকে না—পরিণত হয় একটি জীবন্ত ডিজাইন কালচারে।

সূত্র: ডিজেইন

Related Posts

বালি’র জঙ্গলে এক চার পাতার ভিলা

ইন্দোনেশিয়ার বালির পূর্বাঞ্চলের সিদেমেন—সবুজ পাহাড়, ধানক্ষেত, ঘন উদ্ভিদ এবং আগ্নেয় পাহাড়ের প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য পরিচিত একটি অঞ্চল। এই…

মার্বেলের বর্জ্যে বানানো আর্বান মাইক্রো স্থাপত্য ফার্নিচার

ইতালির টাস্কানি অঞ্চলের ক্যারারা শহর হাজার বছর ধরে পরিচিত তার বিখ্যাত সাদা মার্বেলের জন্য। সেই মার্বেল খনন করে…

কংক্রিটের আড়ালে সাও পাওলোর স্থাপত্য ও নগরজীবন

ব্রাজিলের বৃহত্তম শহর সাও পাওলোকে অনেকে শুধু একটি কংক্রিটের জঙ্গল হিসেবে চেনেন। রিও দে জেনেইরোর সৈকত বা ব্রাজিলের…

শতবর্ষী গুদাম যেভাবে কার্পেট শোরুম হলো

মুম্বাইয়ের ভিক্টোরিয়ান টেক্সটাইলের শতবর্ষী গুদামের নাম হয়েছে জয়পুর কার্পেট। তবে আজ তার জরাজীর্ণতা ঘুচে রূপ নিয়েছে নতুন ঠিকানায়।…