• Home
  • টপ-পোস্ট
  • আরব সাগরের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা কমিউনিটি সেন্টার
Image

আরব সাগরের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা কমিউনিটি সেন্টার

প্রকৃতিকে অক্ষত রেখে তার মধ্যেই স্থাপত্য গড়ে তোলা, এটাই আধুনিক নকশাচর্চার একটি বড় ধারা। মহারাষ্ট্রের আনজারলের সমুদ্রতীরবর্তী পাহাড়ে তৈরি ক্রেস্ট নাইন কমিউনিটি সেন্টার (CREST NINE Community Center) এই ধারারই একটি চমৎকার উদাহরণ। 

সঞ্জয় পুরি আর্কিটেক্টস এই ভবনটি এমনভাবে বানিয়েছে, যেন এটি মাটি থেকেই ধীরে ধীরে উঠে এসেছে। একটি গেটেড ভিলা কমপ্লেক্সের বিনোদন ও সামাজিক মেলামেশার কেন্দ্র হিসেবেই এটি পরিকল্পিত।

সবুজ ঘেরা র‌্যাম্প বেয়ে নেমে যাওয়ার পথ। ছবি: আর্কডেইলি
পাহাড়ি জমির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া নকশা

জমিটি খাড়া ঢালু, আর সেখান থেকে দেখা যায় আরব সাগরের বিশাল দৃশ্য। রাস্তা থেকে জমি হঠাৎ নিচের দিকে নেমে গেছে—আর এই বৈশিষ্ট্যই নকশাকে মূল ভিত্তি দিয়েছে। ভবনের প্রবেশপথ রাস্তার লেভেল থেকে প্রায় ছয় মিটার নিচে। দর্শনার্থীরা একটি চওড়া সিঁড়ি আর সবুজে ঘেরা বাঁকানো র‌্যাম্প দিয়ে নেমে ভবনের মূল চলাচলপথে পৌঁছান, যা পুরো ভবন জুড়ে বিস্তৃত।

ভবনের বাইরের রূপ শুরু হয়েছে একটি সাধারণ বাঁকানো সম্মুখভাগ দিয়ে। ছবি: আর্কডেইলি
বাঁকানো রেখায় গড়া রূপ

ভবনের বাইরের রূপ শুরু হয়েছে একটি সাধারণ বাঁকানো সম্মুখভাগ দিয়ে, তারপর তা ধীরে ধীরে ভিন্ন উচ্চতার একাধিক প্যারাবলিক আকারে ভাগ হয়ে গেছে। এই আকারগুলোর মাঝে আঙিনা আর সবুজ পকেট-স্পেস বসানো হয়েছে, যাতে নির্মিত অংশ আর খোলা জায়গার মধ্যে একটা ছন্দ তৈরি হয়। ফলে ভবনের প্রতিটি অংশ আলাদা কাজ করলেও পুরোটা মিলে একটাই সুসংহত অভিজ্ঞতা দেয়।

জমিটি খাড়া ঢালু, আর সেখান থেকে দেখা যায় আরব সাগরের বিশাল দৃশ্য। ছবি: আর্কডেইলি
একই ছাদের নিচে অনেক কিছু

প্যারাবলিক আকারগুলোর ভেতরে আছে ইনডোর স্পোর্টস রুম, জিম, রেস্তোরাঁ, বার আর চারটি গেস্ট রুম। প্রতিটি জায়গাই পশ্চিমমুখী চওড়া বাঁকানো ডেকের সঙ্গে যুক্ত, যেখান থেকে সমুদ্র দেখা যায়। ছাদটা ঢেউখেলানো—প্রধান অংশগুলোর ওপর উঁচু, মাঝখানে নিচু হয়ে ছোট ছোট অন্তরঙ্গ আঙিনা তৈরি করেছে। গভীর কার্নিশ ডেকগুলোকে রোদ আর বর্ষার বৃষ্টি থেকে বাঁচায়।

নিচের তলায় অবকাশ

ভবনের মাঝখানে একটি খোলা সিঁড়ি একটা গোল আঙিনা ঘিরে নিচের তলায় নেমে গেছে। এই নিচের তলায় আছে তিনটি সুইমিং পুল, একটি হেলথ ক্লাব আর একটি খোলা ক্যাফেটেরিয়া, সব মিলিত হয়েছে একটি বড় খোলামেলা মাল্টি-পারপাস ডেকের সঙ্গে। এভাবে ভবনের সব কার্যক্রম সহজেই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত, আর তৈরি হয়েছে প্রাণবন্ত সামাজিক পরিবেশ।

দেয়ালে ব্যবহার হয়েছে স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা ল্যাটেরাইট পাথর। ছবি: আর্কডেইলি
স্থানীয় উপকরণ, টেকসই নির্মাণ

দেয়ালে ব্যবহার হয়েছে স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা ল্যাটেরাইট পাথর—এতে একদিকে ভবনটি উপকূলীয় প্রকৃতির সঙ্গে দৃশ্যগতভাবে মিশে গেছে, অন্যদিকে স্থানীয় নির্মাণ-ঐতিহ্যও রক্ষা পেয়েছে। প্রতিটি ঘরে প্রাকৃতিক আলো পৌঁছায়, আর প্রায় ৭০ শতাংশ জায়গা প্রাকৃতিক বাতাসেই ঠান্ডা থাকে—তাই এসব জায়গায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের দরকারই হয় না। ছাদের কাঠামোয় ধাতব ফ্রেমের ওপর শিঙ্গলস বসানো হয়েছে।

পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা

স্থানীয় উপকরণ আর স্থানীয় শ্রমিক ব্যবহারের ফলে প্রকল্পের কার্বন নিঃসরণ অনেকটাই কমেছে। প্রাকৃতিক বাতাস চলাচল, দিনের আলোর ব্যবহার আর প্যাসিভ কুলিং এসব মিলিয়ে ভবনের পুরো জীবনচক্রে কার্বন নিঃসরণ কমাতে বড় ভূমিকা রাখে। পাহাড়ি ভূমির সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে ভবনটি যে একে মনে হয় বিভিন্ন আকারের পরস্পর-সংযুক্ত অংশের সমষ্টি, যা সবুজ খোলা জায়গা দিয়ে জোড়া লেগে মানুষের মেলামেশা আর নানা ব্যবহারকে উৎসাহ দেয়।

স্থানীয় উপকরণ আর স্থানীয় শ্রমিক ব্যবহারের ফলে প্রকল্পের কার্বন নিঃসরণ অনেকটাই কমেছে। ছবি: আর্কডেইলি

একটি কমিউনিটি ভবন শুধু অবকাশযাপনের জায়গা নয়। এটি ভূপ্রকৃতি, পরিবেশ আর মানুষের সামাজিক জীবনের মধ্যে একটা অর্থবহ সেতুও হতে পারে। পাহাড়ি জমির স্বাভাবিক রূপকে সম্মান জানিয়ে, বাঁকানো স্থাপত্যভাষা, খোলা সামাজিক পরিসর আর টেকসই নির্মাণকৌশলের মিশেলে সঞ্জয় পুরি আর্কিটেক্টস এমন একটি প্রকল্প তৈরি করেছে, যা প্রকৃতি আর মানুষের অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে মেলানোর একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত।

তথ্যসূত্র: আর্কডেইলি

Related Posts

আধুনিক সভ্যতার বুকে মেঘ ছোঁয়ার প্রত্যাশায় কাঠের এক ভবন

স্থাপত্যে কাঠ একটি আদিম নির্মাণ উপকরণ। সেই অন্ধকার যুগ থেকে আজ পর্যন্ত নির্মাণশিল্পে কাঠের চাহিদার একটুকুও কমতি নেই।…

সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে সগৌরবে দাঁড়ানো এক কমিউনিটি সেন্টার

চার দেয়ালের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে সমসাময়িক কমিউনিটি সেন্টারগুলো যেন এখন একেকটি জীবন্ত ক্যানভাস। এগুলো আজ শুধু নাগরিক জনসেবামূলক…

‘আনস্কুলিং’-এর জন্য এক ব্যতিক্রমী শিক্ষাকেন্দ্র

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্থাপত্যের উদ্দেশ্য হলো পাঠদানের পাশাপাশি এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা যেখানে শিশুদের কৌতূহল, সৃজনশীলতা এবং পারস্পরিক যোগাযোগ…

পরিবেশ, মানুষ আর নান্দনিকতার অপূর্ব মহাকাব্যের এক শিল্পকারখানা

ধোঁয়া ওঠা চিমনী আর চার দেয়ালের একঘেয়ে কংক্রিটের বন্দিদশা—শিল্পকারখানা বললেই তো এমন এক প্রাণহীন ছবি চোখে ভাসে। কিন্তু…