শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্থাপত্যের উদ্দেশ্য হলো পাঠদানের পাশাপাশি এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা যেখানে শিশুদের কৌতূহল, সৃজনশীলতা এবং পারস্পরিক যোগাযোগ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকশিত হতে পারে। ভারতের চেন্নাইয়ের বেসান্ট নগরে অবস্থিত লার্নিং সেন্টার এট কোয়েস্ট (Learning Center at Quest), KSM Architecture-এর নকশায় নির্মিত এমনই একটি প্রকল্প।
৮ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য নির্মিত এই কেন্দ্রটি বিশেষভাবে হোম-স্কুলিং এবং ‘আনস্কুলিং’ শিক্ষাপদ্ধতির শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে পরিকল্পিত হয়েছে। এখানে নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রমের পরিবর্তে শিক্ষার্থীর আগ্রহই শেখার মূল চালিকাশক্তি।

শিক্ষা দর্শনের সঙ্গে স্থাপত্যের সংলাপ
প্রকল্পটি চেন্নাইয়ের সমুদ্রতীর থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে ৫৪০ বর্গমিটার জমিতে অবস্থিত। ভবনের মোট নির্মিত আয়তন ৭৬০ বর্গমিটার এবং এটি ২০২১ সালে সম্পন্ন হয়। স্থপতিরা এমন একটি পরিবেশ নির্মাণ করতে চেয়েছেন, যেখানে শেখা কেবল শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

মুক্ত প্রবাহের স্থানবিন্যাস
ভবনটিকে একাধিক মুক্ত প্রবাহমান (Free-flowing) ভলিউমের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয়েছে। যা ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রশস্ততার অনুভূতি এবং দৃশ্যগত সংযোগ সৃষ্টি করে। প্রবেশপথে রয়েছে গাছঘেরা একটি সামনের প্রাঙ্গণ, যেখানে সিঁড়ির পাশাপাশি র্যাম্পও রাখা হয়েছে।
ভবনের কেন্দ্রে প্রবেশ করলে একটি পূর্ণ-উচ্চতার অ্যাট্রিয়াম দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায়। অ্যাট্রিয়ামের এক পাশে অ্যাম্ফিথিয়েটার এবং অন্য পাশে গ্যালারি স্পেস ভবনের অভ্যন্তরকে প্রাণবন্ত ও বহুমাত্রিক করে তুলেছে।

ঊর্ধ্বমুখী সংযোগ ও বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা
ভবনের কেন্দ্রীয় অ্যাট্রিয়ামের দুই পাশে পাঁচটি শ্রেণিকক্ষ বিন্যস্ত রয়েছে। এই স্তরগুলোকে সংযুক্ত করেছে একটি ধাতব সিঁড়ি। এই সিঁড়ি ঘুরে ঘুরে সব তলাকে একত্রিত করেছে। আগমনস্থল থেকে অ্যাম্ফিথিয়েটার সরাসরি উপরের লাইব্রেরির সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। ফলে বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে একটি ধারাবাহিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
লাইব্রেরি থেকে একটি স্লাইড সরাসরি দক্ষিণ পাশের উঁচু বাগানে পৌঁছে যায়, যা শিশুদের জন্য শেখার অভিজ্ঞতাকে আরও আনন্দময় করে তোলে। সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে সিঁড়িটি ভবনের বাইরে বেরিয়ে একটি স্পাইরাল সিঁড়ির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, যা ছাদের ক্যাফেটেরিয়া এবং দক্ষিণমুখী ল্যান্ডস্কেপড টেরেসে নিয়ে যায়।

জলবায়ু-সংবেদনশীল নকশা
চেন্নাইয়ের প্রাকৃতিক দক্ষিণমুখী বাতাসকে কাজে লাগানোর জন্য ভবনটির পরিকল্পনা বিশেষভাবে জলবায়ু-সংবেদনশীলভাবে করা হয়েছে। ভবনের দক্ষিণ পাশে উঁচু বাগান তৈরি করা হয়েছে, যা দক্ষিণ দিকের বাতাস ধারণ করার পাশাপাশি সড়কপথ থেকে সৃষ্ট বায়ুপ্রবাহকেও কার্যকরভাবে ব্যবহার করে।
পূর্ব ও পশ্চিম দেয়ালে তাপ প্রবেশ কমানোর জন্য ন্যূনতম খোলা অংশসহ ইনসুলেটেড ক্যাভিটি ওয়াল ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে পূর্ণ-উচ্চতার খোলা যায় এমন জানালা রয়েছে, যেগুলো প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল নিশ্চিত করে এবং ঊর্ধ্বমুখী অ্যালুমিনিয়াম অ্যারোফয়েল-আকৃতির লুভর দ্বারা সূর্যালোক নিয়ন্ত্রিত হয়।
আলো, বাতাস ও শেখার পরিবেশ
ভবনের অভ্যন্তরে কোনো কঠোর স্থানবিভাজন নেই। প্রতিটি অংশ স্বাভাবিকভাবে একে অপরের সঙ্গে এবং বাইরের বাগানের সঙ্গে সংযুক্ত। পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো, ঝলকানিবিহীন আলোকপরিবেশ, বিভিন্ন স্তরে প্রবাহিত প্রাকৃতিক বাতাস এবং রঙের প্রাণবন্ত ব্যবহার মিলিয়ে একটি আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

উন্মুক্ত স্থানবিন্যাস, জলবায়ু-সংবেদনশীল নকশা, প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের দক্ষ ব্যবহার এবং খেলাধুলামুখী উপাদানের সমন্বয়ে KSM Architecture এমন একটি শিক্ষাকেন্দ্র নির্মাণ করেছে, যেখানে শেখা, অনুসন্ধান এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়া একই ধারায় প্রবাহিত হয়। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তিত চাহিদার প্রেক্ষাপটে এটি সমসাময়িক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নকশার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
তথ্যসূত্র
আর্কডেইলি। প্রকাশকাল: ১৮ নভেম্বর, ২০২৩






















