নিউইয়র্কের মিডটাউন ম্যানহ্যাটনের ২৩৫ ইস্ট ৪২তম স্ট্রিটের ৩৩ তলা ভবনটি গত কয়েক দিনে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটিকে “হেলে পড়া” বা “ধসে পড়ার মুখে” বলে বর্ণনা করা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন।
ভবনটিতে গুরুতর কাঠামোগত সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্টিল কলামের বিকৃতি (buckling) এবং কিছু ফ্লোরের অস্বাভাবিক বসে যাওয়া (floor settlement) প্রকৌশলীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তবে নিউইয়র্ক সিটির কর্তৃপক্ষ ও জরুরি প্রকৌশল দল ভবনটিকে আপাতত স্থিতিশীল (stable) ঘোষণা করেছে।

কী ঘটেছিল?
ভবনটি মূলত ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফাইজারের (Pfizer) সাবেক কার্যালয় ভবন। সাম্প্রতিক সময়ে এটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টে রূপান্তরের কাজ চলছিল। গত ৬ জুলাই নির্মাণকাজ চলাকালে ২১তম তলায় দুটি প্রধান স্টিল কলাম বেঁকে যাওয়ার ঘটনা ধরা পড়ে। পরিদর্শনে দেখা যায়, কিছু ফ্লোর কয়েক ইঞ্চি নিচে নেমে গেছে এবং কাঠামোর ওপর অস্বাভাবিক চাপের সৃষ্টি হয়েছে।
এর পরপরই নিউইয়র্ক সিটি ডিপার্টমেন্ট অব বিল্ডিংস (DOB) আশপাশের ভবন খালি করার নির্দেশ দেয় এবং ভবনটির চারপাশে নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়। জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত স্টিল সাপোর্ট, শোরিং (shoring) এবং অস্থায়ী ব্রেসিং স্থাপন করা হয়।

প্রকৌশলগত দৃষ্টিকোণ: কলাম কেন বেঁকে যায়?
স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে কলামের প্রধান কাজ হলো ওপরের তলা থেকে আসা ঊর্ধ্বমুখী ভার (gravity load) নিরাপদে ভিত্তিতে স্থানান্তর করা। কোনো কলাম যদি তার ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়ে, অথবা তার পার্শ্বীয় সমর্থন (lateral restraint) দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে সেটি বেঁকে যেতে বা buckling-এর শিকার হতে পারে।
কলাম বকলিংয়ের কয়েকটি সাধারণ কারণ হলো-
- অনুমোদনহীন বা ভুলভাবে সম্পন্ন সংস্কারকাজ
- লোড পুনর্বণ্টনের সময় নকশাগত ত্রুটি
- অস্থায়ী সাপোর্ট অপসারণের ভুল সময় নির্বাচন
- আগের কাঠামোগত ক্ষয় বা স্টিলের দুর্বলতা
- নির্মাণকাজের সময় পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণের অভাব
এই ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো তদন্তাধীন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবনের ব্যবহার পরিবর্তন (office-to-residential conversion) প্রক্রিয়ায় কাঠামোর ওপর নতুন ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।
বিখ্যাত সুইস গণিতবিদ Leonhard Euler ১৮শ শতকে দেখিয়েছিলেন যে সরু কলামের ব্যর্থতা সবসময় উপাদানের শক্তির কারণে ঘটে না; অনেক সময় তা ঘটে স্থিতিশীলতা হারানোর কারণে। এ কারণেই আধুনিক উচ্চ ভবন নকশায় ‘বাকলিং’ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।

স্থাপত্যগত শিক্ষা: অভিযোজনমূলক পুনর্ব্যবহারের (Adaptive Reuse) চ্যালেঞ্জ
বিশ্বের বড় শহরগুলোতে পুরোনো অফিস ভবনকে আবাসিক ভবনে রূপান্তর করার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। নিউইয়র্ক, লন্ডন, টরন্টো এবং সিঙ্গাপুরে এই ধরনের প্রকল্পকে নগর পুনরুজ্জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কিন্তু স্থপতি ও প্রকৌশলীদের জন্য এটি সহজ কাজ নয়। একটি অফিস ভবনের ফ্লোর প্ল্যান, যান্ত্রিক ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা, ঊর্ধ্বমুখী লোডিং প্যাটার্ন এবং ব্যবহারকারীর ঘনত্ব আবাসিক ভবনের চাহিদা থেকে ভিন্ন। ফলে ভবনের মূল কাঠামো নতুন ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত কিনা, তা নির্ধারণে বিস্তৃত স্ট্রাকচারাল অডিট, লোড অ্যানালাইসিস এবং ধাপে ধাপে পুনঃনকশা প্রয়োজন। এটি যে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনারও বিষয় সেটাই ম্যানহ্যাটনের এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে।

ভবন কি ধসে পড়ার ঝুঁকিতে?
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, নিউইয়র্ক সিটির জরুরি প্রকৌশল দল ভবনটিকে তাৎক্ষণিক ধসের ঝুঁকিমুক্ত বলে জানিয়েছে। তবে ‘স্থিতিশীল’ (stable) শব্দটি ‘সম্পূর্ণ নিরাপদ’ (safe) শব্দের সমার্থক নয়। স্থিতিশীলতার অর্থ হলো, জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার পর কাঠামোটি আপাতত আরও অবনতি করছে না।
প্রকৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে পরবর্তী ধাপগুলো হবে-
১. বিস্তারিত ফরেনসিক স্ট্রাকচারাল তদন্ত
২. ক্ষতিগ্রস্ত কলাম ও সংযোগ ব্যবস্থার বিশ্লেষণ
৩. ভবনের লোড-পাথ (load path) পুনর্মূল্যায়ন
৪. প্রয়োজনে আংশিক বা পূর্ণ কাঠামোগত পুনর্বাসন (structural rehabilitation)

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য শহরে পুরোনো বাণিজ্যিক ভবনকে নতুন কাজে ব্যবহার করার প্রবণতা ধীরে ধীরে বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভবনের ব্যবহার পরিবর্তন করা হয় পর্যাপ্ত স্ট্রাকচারাল মূল্যায়ন ছাড়াই। ম্যানহ্যাটনের ঘটনা আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। ভবনের স্থাপত্য সৌন্দর্যের পাশাপাশি এর অদৃশ্য কাঠামোগত নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

যেকোনো ভবনের ব্যবহার পরিবর্তনের আগে বিস্তারিত স্ট্রাকচারাল অ্যাসেসমেন্ট, নন-ডেস্ট্রাকটিভ টেস্ট, লোড ক্যাপাসিটি যাচাই এবং যোগ্য প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় একটি ছোট কাঠামোগত ত্রুটিও বৃহৎ নগর বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে।
তথ্যসূত্র
রয়টার্স, এবিসি নিউজ



















