এমএডি আর্কিটেক্টস উত্তর চীনের হারবিন শহরে অবস্থিত তাদের সম্পূর্ণ হারবিন অপেরা হাউস উন্মোচন করেছে। ২০১০ সালে, এমএডি হারবিন কালচারাল আইল্যান্ডের জন্য আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করে। এটি ছিলো হারবিনের সংহুয়া নদীর তীরবর্তী একটি অপেরা হাউস। সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো এটি একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। তবে তার চারপাশের জলাভূমির জন্য একটি মহাপরিকল্পনাও।
এই আঁকাবাঁকা অপেরা হাউসটি কালচারাল আইল্যান্ডের কেন্দ্রবিন্দু। হারবিনের মোট ৪৪৪ একর এলাকার মধ্যে প্রায় ৮৫০,০০০ বর্গফুট জুড়ে বিস্তৃত অপেরা হাউসটি। এতে রয়েছে একটি বিশাল থিয়েটার যেখানে ১,৬০০ জনেরও বেশি দর্শক একসাথে বসতে পারে। এছাড়া ৪০০ জনের জন্য আরও একটি ছোট থিয়েটারও রয়েছে।
হারবিনের জলাভূমির মধ্যে অবস্থিত হারবিন অপেরা হাউসটি এই উত্তরের শহরের অদম্য বন্যতা এবং হিমশীতল জলবায়ুর শক্তি ও চেতনার একটি ধারক। এর নকশাও করা হয়েছে সেই প্রেক্ষাপটেই। ভবনটির ডিজাইনে স্থানীয় পরিবেশ ও ঐতিহ্যে স্পট ছাপ দেখা যায়।
ভবনটি প্রকৃতি এবং ভূ-প্রকৃতির সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। স্থানীয় পরিচয়, শিল্প এবং সংস্কৃতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই স্থাপনায়। এমএডি আর্কিটেক্টস-এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মা ইয়ানসং বলেন, “আমরা হারবিন অপেরা হাউসকে ভবিষ্যতের একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে কল্পনা করি – যা হবে একটি অসাধারণ পারফরম্যান্স ভেন্যু। একই সাথে একটি নাটকীয় গণপরিসর, যা মানুষ, শিল্প ও শহরের পরিচয়কে একীভূত করে প্রকাশ করবে।”

বাহ্যিক দিকে, স্থাপত্যটি পারিপার্শ্বিক এলাকার আঁকাবাঁকা ভূদৃশ্যকে নির্দেশ করে। এর বাইরে রয়েছে মসৃণ সাদা অ্যালুমিনিয়াম প্যানেল দিয়ে তৈরি বক্রাকার আবরণ। সে কারণেই ভবনটি দেখতে কোমলতা ও তীক্ষ্ণতার এক কাব্য হয়ে ফুটে উঠেছে। সেতু পার হয়ে হারবিন কালচারাল আইল্যান্ডে প্রবেশ করার পর থেকেই এই যাত্রা শুরু হয়। এখানে এই ঢেউখেলানো স্থাপত্য কাঠামোটি একটি বিশাল গণচত্বরকে ঘিরে রেখেছে। সাদা অ্যালুমিনিয়ামের আবরণ শীতকালে তুষারময় শীতের পরিবেশে বিলীন হয়ে যায়।
স্থাপত্যের এই শোভাযাত্রা একটি ধারণাগত আখ্যানের কোরিওগ্রাফি করে, যা দর্শকদের শিল্পীতে রূপান্তরিত করে। গ্র্যান্ড লবিতে প্রবেশ করার সাথে সাথেই দর্শনার্থীরা দেখবেন লবি জুড়ে বিস্তৃত বিশাল স্বচ্ছ কাঁচের দেয়াল। এ দেয়ালটি বক্রাকার ভেতরকে এর ঢালু সম্মুখভাগ এবং বাইরের চত্বরের সাথে দৃশ্যত সংযুক্ত করে।
এর উপরে, একটি হালকা ডায়াগ্রিড কাঠামোর অনুসরণে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ কাঁচের পর্দা-দেয়াল গ্র্যান্ড লবি জুড়ে বিস্তৃত। কাঁচের পিরামিড দিয়ে গঠিত এই দেয়ালের পৃষ্ঠতলটি মসৃণ এবং বহুভুজাকৃতির যা হিমশীতল আবহাওয়ার উড়ন্ত বরফ ও তুষারের কথা মনে করিয়ে দেয়। দর্শনার্থীরা নিজেদের আসনে বসার আগেই প্রাকৃতিক আলো এবং বস্তুগত অনুভূতির এক সাধারণ ঐশ্বর্য তাদের যেনো অভ্যর্থনা জানায়।
একটি উষ্ণ ও আমন্ত্রণমূলক আবহ তৈরি করতে গ্র্যান্ড থিয়েটারটি নির্মাণ করা হয়েছে মূল্যবান কাঠ দিয়ে। এই মূল্যবান কাঠকেও সাজানো হয়েছে ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত একটি কাঠের খণ্ডের অনুকরণে। মাঞ্চুরিয়ান অ্যাশ কাঠ থেকে নির্মিত এই কাঠের দেয়ালগুলো মূল মঞ্চ এবং থিয়েটারের আসনগুলোকে আলতোভাবে ঘিরে রেখেছে।
প্রোসেনিয়াম থেকে মেজানাইন ব্যালকনি পর্যন্ত গ্র্যান্ড থিয়েটারে ব্যবহৃত সাধারণ উপকরণ এবং স্থানিক বিন্যাস বিশ্বমানের ধ্বনিবিজ্ঞান নিশ্চিত করে। বিশাল থিয়েটারটি আংশিকভাবে একটি সূক্ষ্ম স্কাইলাইটের মাধ্যমে আলোকিত হয়, যা দর্শকদের ভেতরে বসেও বাইরের জগৎ এবং সময়ের প্রবাহের সাথে যুক্ত করে।

দ্বিতীয় ছোট থিয়েটারটির ভেতরে পারফরম্যান্স মঞ্চের পেছনের বিশাল প্যানোরামিক জানালার মাধ্যমে ভেতরের অংশটি বাইরের অংশের সাথে সংযুক্ত। শব্দরোধী কাঁচের এই দেয়ালটি পারফরম্যান্সের জন্য একটি প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশ তৈরি। মঞ্চটিকে বাইরের পরিবেশের একটি সম্প্রসারণ হিসেবে সক্রিয় মনে হবে কারো কারো কাছে।
হারবিন অপেরা হাউসটির সাধারণ দর্শনার্থী এবং টিকিটধারীদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া সৃষ্টি করে। টিকিটধারী এবং সাধারণ জনগণ উভয়েই সম্মুখভাগের খোদাই করা পথগুলো ঘুরে দেখতে পারেন এবং চারপাশের পরিবেশ দেখতে ভবনটির উপরে যেতে পারেন।
চূড়ায় পৌঁছে দর্শনার্থীরা একটি খোলা, বাইরের পারফরম্যান্স স্পেস খুঁজে পান যা একটি পর্যবেক্ষণ মঞ্চ হিসেবে কাজ করে। সেখান থেকে দর্শনার্থীরা হারবিনের মহানগরীর আকাশরেখা এবং নীচের চারপাশের জলাভূমির প্যানোরামিক দৃশ্য দেখতে পারেন। নীচে নেমে আসার পর, দর্শনার্থীরা প্রশস্ত পাবলিক প্লাজায় ফিরে আসেন এবং তাদের বিশাল লবি স্পেসটি ঘুরে দেখার জন্যও রাস্তা খোলা থাকে।
অপেরা হাউসের স্থাপত্যশৈলীতে এমএডি এমন এক স্থাপত্যকে ফুটিয়ে তোলে যা প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত এবং স্থানীয় পরিচয়, সংস্কৃতি ও শিল্পকলায় পরিপূর্ণ। হারবিন অপেরা হাউস পরিবেশের সাথে জনসাধারণের আবেগঘন সংযোগকে গভীর করে। একইসাথে এর স্থাপত্যও আখ্যানমূলক পরিবেশকে উপস্থাপনে এবং ভূদৃশ্যের প্রেক্ষাপটে নাকরীয় করে তোলে।
















