আজারবাইজানের বাকুতে ইউএন-হ্যাবিট্যাটের নির্বাহী পরিচালক আনাক্লাউডিয়া রসবাখের উদ্বোধনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রোববার ( ১৭ মে) বিশ্ব নগর ফোরামের (ডব্লিউইউএফ১৩) ১৩তম অধিবেশন শুরু হয়েছে। এরপর অনুষ্ঠিত হয় নিউ আরবান এজেন্ডা (এনইউএ) বিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক।
বিশ্ব নগর ফোরাম (WUF13) হলো জাতিসংঘের মানব বসতি কর্মসূচি (UN-Habitat) আয়োজিত একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম। এখানে দ্রুত নগরায়নের ফলে সৃষ্ট আবাসন সংকট, সামাজিক বৈষম্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
২২ মে পর্যন্ত চলা এ সন্মেলনে বাংলাদেশ থেকে অতিরিক্ত সচিব ফেরদৌসী বেগমের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল অংশ নিচ্ছে। প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা হিসেবে আছেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মো. আবদুল আওয়াল, প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম এবং স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি মো. আসিফুর রহমান ভূঁইয়া।
২০১৬ সালে বিশ্বনেতাদের দ্বারা গৃহীত ‘নিউ আরবান এজেন্ডা’ বিশ্বজুড়ে নগর রূপান্তরের ভবিষ্যৎকে পথনির্দেশকারী একটি বৈশ্বিক কাঠামো হিসেবে কাজ করে চলেছে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রতিনিধিদলটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পিত নগরায়ণ, সাশ্রয়ী আবাসন এবং জলবায়ু-সহনশীল উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশের চলমান প্রচেষ্টার ওপর আলোকপাত করেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার প্রতিনিধি, মেয়র ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা, নগর পরিকল্পনাবিদ, গবেষক, একাডেমিক, বেসরকারি সংস্থা ও সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, মিডিয়া কর্মী, শিক্ষার্থী এবং তরুণ কর্মীরা এই ফোরামে অংশগ্রহণ করছেন।
ফোরামের আলোচ্য বিষয়সমূহ
WUF13-এর আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো নিরাপদ ও পর্যাপ্ত আবাসনের অধিকার নিশ্চিত করা। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩ বিলিয়ন মানুষ কোনো না কোনোভাবে আবাসন সংকট বা অপ্রতুল বাসস্থানের সমস্যার মধ্যে রয়েছে।
এই বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে নগর পরিকল্পনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। তাই স্থাপত্যকে এখানে ভবন নির্মাণের পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে নগর নকশায় মানুষের প্রয়োজনকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হচ্ছে। শহরের প্রতিটি আবাসন ও অবকাঠামো এমনভাবে পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে তা নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং সকল শ্রেণির মানুষের জন্য সহজলভ্য হয়।
বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নারী এবং যুবকদের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে নগর উন্নয়ন আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন কণ্ঠস্বর প্রতিফলিত হয়।

WUF13-এ জলবায়ু সহনশীল নগর গঠনের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, তাপপ্রবাহ এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে, তাই ভবন ও নগর কাঠামোকে এসব পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার উপযোগী করে ডিজাইন করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এই ধরনের স্থাপনায় সবুজ অবকাঠামো, শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব উপকরণের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নগর গঠনে সহায়তা করে।
এছাড়া নগর উন্নয়নে সমন্বিত অবকাঠামো ব্যবস্থার ধারণাও গুরুত্ব পেয়েছে, যেখানে আবাসন, পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন এবং অন্যান্য মৌলিক সেবাকে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত একটি সিস্টেম হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে শহরের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায় এবং নাগরিকরা আরও সহজে ও কার্যকরভাবে সেবা পেতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নগর নকশা তৈরি করা। প্রতিটি শহরের সংস্কৃতি, জলবায়ু এবং সামাজিক বাস্তবতা ভিন্ন হওয়ায় একক কোনো নকশা সব জায়গায় কার্যকর হয় না। তাই স্থানীয় জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর WUF13-এ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে উন্নয়ন আরও বাস্তবসম্মত এবং টেকসই হয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, WUF13 আর্কিটেকচারের ধারণাকে একটি বিস্তৃত সামাজিক ও পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করেছে। এখানে ভবন নির্মাণের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মানুষের জীবনমান, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং জলবায়ু সহনশীলতা।
তথ্যসূত্র
ইউ.এন হ্যাবিট্যাট
















