নির্মাণশিল্পে অত্যাধুনিক যত প্রযুক্তি

নির্মাণশিল্পের পরিসর দিন দিন বাড়ছে। পরিবর্তনের ধারায় এ শিল্পেও প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন আধুনিক প্রযুক্তি। নির্মাণসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রতিযোগিতায় নিজেদের পিছিয়ে পড়া থেকে বাঁচাতে নির্মাণযজ্ঞে প্রতিনিয়তই যোগ করছে নিত্যনতুন নানা প্রযুক্তি। সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিক জীবনযাত্রায় এসব আধুনিক প্রযুক্তি নির্মাণশিল্পের উন্নয়নেরই বহিঃপ্রকাশ।

এসব প্রযুক্তির মধ্যে অন্যতম- 

  • মডিউলার বিল্ডিং পদ্ধতি
  • থ্রিডি প্রিন্টার
  • স্বয়ংক্রিয় নির্মাণযন্ত্র
  • ওয়্যারলেস মনিটরিং সেন্সর
  • ক্লাউড অ্যান্ড ডাইরেক্ট অবর্জাভেশন।

মডিউলার বিল্ডিং পদ্ধতি

মডিউলার বিল্ডিং পদ্ধতি বলতে আসলে তেমন কিছু নেই। এটি একধরনের সংযোজন পদ্ধতি বলা যেতে পারে। ভবন নির্মাণে আমরা সাধারণত যে উপায় অবলম্বন করি, তার মধ্যে প্রথমেই নির্মিত হয় স্থাপনার ফাউন্ডেশন, তারপর কাক্সিক্ষত ডিজাইন অনুযায়ী ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। প্রথমে নিচতলা, পরে দ্বিতীয় তলা এভাবে যত খুশি তত। এটিই হলো ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি। এতে প্রয়োজন হয় অনেক সময়; প্রচুর লোকবল। আবহাওয়ার ওপরও নির্ভর করতে হয়। অথচ আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের এমন সব সুবিধা দিয়েছে, যেখানে স্থাপনা নির্মাণে এসব বিড়ম্বনা কমেছে অনেকটাই। তাই সময়, ব্যয় এবং বাড়তি নিরাপত্তার জন্য মডিউলার পদ্ধতি অত্যন্ত সুবিধাজনক, যা ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে দিনকে দিন। 

মডিউলার বিল্ডিং পদ্ধতি হলো বিল্ডিংয়ের ছোট ছোট পার্ট আলাদা আলাদা করে নির্মাণ করে পরে একসঙ্গে জুড়ে দেওয়া। ধরে নেওয়া যাক, একটি ফ্লোর বানানো হবে। সেক্ষেত্রে প্রতিটি ইউনিট এবং সিঁড়ি আলাদা আলাদা নির্মাণ করতে হবে। ততক্ষণে ফাউন্ডেশনও হয়ে যাবে। ফাউন্ডেশন সম্পন্ন হলে আলাদা বানানো সিঁড়ি ও ইউনিটগুলো ডিজাইন অনুযায়ী ফাউন্ডেশনের ওপর প্রতিস্থাপন করতে হবে। তাই এই পদ্ধতি অবলম্বনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কৌশলগত নকশা করা। ডিজাইনার যত কৌশলী হবে কনস্ট্রাকশন তত সহজ ও ব্যয়সাশ্রয়ী হবে। এ পদ্ধতির রয়েছে অনেক সুবিধা:

সময়সাশ্রয়ী। এই পদ্ধতি সনাতন নির্মাণপদ্ধতির চেয়ে কমপক্ষে ৩০-৪০ শতাংশ সময় বাঁচাবে। এই পদ্ধতি অফসাইট নির্মাণপদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। যেখানে বিল্ডিং নির্মাণ করা হবে, ছোট পার্টগুলো সেখানে নির্মাণ না করে অন্য স্থানে নির্মাণ করা হবে, তাই ঝামেলা হবে অনেক কম। 

কারখানা, ইনস্টিটিউট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রায় সব ক্ষেত্রেই কাজের কোনো ক্ষতি হয় না মডিউলার পদ্ধতিতে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে। এর জন্য ব্যবসা, কারখানা, স্কুল, কলেজ কিংবা যেকোনো নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয় না। গবেষণা অনুযায়ী প্রায় ৮০ শতাংশ কার্যক্রম চালু রেখেই এই পদ্ধতিতে নতুন নতুন ভবন নির্মাণ করা যায়। 

এই পদ্ধতিতে নির্মিত ভবনগুলোর প্রতিটি অংশ আলাদা আলাদা থাকে। তাই ভূমিকম্প কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই ধরনের ভবনের কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। 

প্রতিটি অংশ আলাদা আলাদা স্থানে নির্মাণ করায় এক অংশের বেঁচে যাওয়া উপকরণ অন্য অংশে ব্যবহার করা যায়, তাই অপচয় রোধ করে ব্যয় কমে।

থ্রিডি প্রিন্টার

ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। কেউ ভাবছে ভবিষ্যতে কী হবে আর কেউ ভাবছে ভবিষ্যতে কী করবে। দিন দিন বাড়ছে প্রযুক্তির উৎকর্ষ। রোবটের ব্যবহার শুরু হয়েছে অনেক আগে থেকেই। এই শতাব্দীতেও বাড়ছে রোবটের নানাবিধ ব্যবহার। নির্মাণকাজেও কম ব্যবহার হয় না। তবে এত দিন রাস্তাঘাট, ব্রিজ, ভাস্কর্য নির্মাণে সীমাবদ্ধ ছিল রোবটিক যন্ত্রপাতি। নির্মাণের সঙ্গে জড়িত সবচেয়ে আধুনিক যন্ত্রের নাম থ্রিডি প্রিন্টার। থ্রিডি প্রিন্টারে খুব কম সময় আর স্বল্প খরচেই নির্মাণ করা যায় উন্নতমানের রাস্তা, ব্রিজ। তবে এবার বিল্ডিং নির্মাণেও ব্যবহার হচ্ছে থ্রিডি প্রিন্টার। প্রযুক্তি দিন দিন অগ্রগামী। বিল্ডিং নির্মাণে থ্রিডির ব্যবহারে আরও প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। এখন পর্যন্ত গবেষক, নির্মাতা ও প্রকৌশলীদের অভিজ্ঞতায় থ্রিডি প্রিন্টেড বাড়ির রয়েছে অনেক সুবিধা। কিছু অসুবিধাও রয়েছে। প্রযুক্তির কল্যাণে বিশালাকৃতির এই প্রিন্টার সময়ের সঙ্গেই আরও উন্নত হবে। নির্মাণশিল্পে যুক্ত হবে নতুন নতুন মাত্রা।

থ্রিডি প্রিন্টেড নির্মাণের সুবিধা

থ্রিডি প্রিন্টেড বাড়ির অনেক সুবিধার মধ্যে একটি হলো ব্যয়সাশ্রয়ী। খরচ গতানুগতিক নির্মাণপদ্ধতির চেয়ে কম হওয়া থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তির চাহিদা বর্তমানে অনেক বেশি। এই প্রযুক্তি নানাভাবে ব্যয় হ্রাস করে থাকে। এই প্রযুক্তিতে একটি মেশিনই যেহেতু সবচেয়ে বেশি কাজ করে, তাই বিশেষ জনবলের প্রয়োজন হয় না। বাঁচে মজুরি ব্যয়।

সময়সাশ্রয়ী

একটি মেশিন দিনরাত কাজ করে কনস্ট্রাকশনের সব কাজ সম্পন্ন করে। শ্রমিকের কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট থাকায় প্রথাগত নিয়মে ভবন নির্মাণে অনেক সময় দরকার হয়। অত্যাধুনিক এই প্রযুক্তিতে যন্ত্রের মাধ্যমে কাজটি সম্পন্ন হওয়ায় যন্ত্রের বিরতিহীন কাজের ফলে ততটাই সময় সাশ্রয় হয়, যতটা কল্পনায় নেই। পাশাপাশি কনস্ট্রাকশন প্রসেস হয় অনেক দ্রুত ও নির্ভুল। থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি দিয়ে এক দিনের মধ্যেই একটি স্ট্রাকচার দাঁড় করানো যায়, যা প্রথাগত উপায়ে কমপক্ষে কয়েক মাস দরকার। আমেরিকার টেক্সাসে থাকা একটি কনস্ট্রাকশন স্টার্ট-আপ, আইকন, এমন প্রযুক্তি ডেভেলপ করেছে, যাতে ৬৫০ বর্গফুটের একতলা একটি থ্রিডি প্রিন্টেড বাড়ি প্রিন্ট করা যাবে মাত্র ২৪ ঘণ্টায়। রাশিয়া, চীনের মতো দেশেও শুরু হয়েছে থ্রিডি প্রিন্টেন্ড প্রযুক্তির ব্যবহার।

ডিজাইনে অমিত সম্ভাবনা

এই প্রযুক্তি শুধু যে সময় আর খরচ বাঁচাবে তা-ই না, থ্রিডি প্রিন্টিং আসছে আরেকটি বড় সম্ভাবনা নিয়ে। পুরোনো পদ্ধতিতে যখন সব নির্মাণকাজ করতে হতো, তখন ডিজাইনে কিছু সীমাবদ্ধতা থেকেই যেত। এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দূর করেছে সেই সীমাবদ্ধতাও। নিত্যনতুন, সৃষ্টিশীল যেসব নকশা এখন তৈরি করছেন স্থপতিরা, থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তিই সেগুলো করতে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করছে।  

থ্রিডি প্রিন্টেডের যত অসুবিধা

তবে থ্রিডি প্রিন্টেড বাড়ির রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতাও। অনেক সুবিধাজনক দিক থাকার পরও আবাসনশিল্পে থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি এখনো নতুন। থ্রিডি প্রিন্টেড বাড়ি তৈরি করতে গেলে এখনো মুখোমুখি হতে হয় নানা প্রতিবন্ধকতার। 

কাঁচামালের সহজলভ্যতা

থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি আবাসনশিল্পে আসার পরপরই যে সমস্যাটি দেখা দিয়েছে তা হলো উপযুক্ত নির্মাণসামগ্রীর অভাব। প্রথাগত বাড়ি তৈরির কাঁচামাল আর থ্রিডি প্রিন্টারের কাঁচামাল কখনোই এক নয়। বর্তমানে থ্রিডি প্রিন্টারে যেসব কাঁচামাল ব্যবহার করা যায়, তার সংখ্যা খুবই সীমিত। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় প্রতিটি প্রিন্টারের জন্য থাকে নির্দিষ্ট ম্যাটেরিয়াল। অর্থাৎ এক প্রিন্টারের কাঁচামাল অন্য প্রিন্টারে ব্যবহার করে থ্রিডি প্রিন্টেড বাড়ি নির্মাণ করা সম্ভব নয়।

বাড়াবে বেকারত্ব

ডিজিটাল যুগে মানুষের অনেক কাজই এখন স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের দখলে। থ্রিডি প্রিন্টারের ব্যবহার ভালোভাবে শুরু হলে তার প্রভাব পড়বে বর্তমানের জনশক্তি ও আবাসনশিল্পে সঙ্গে জড়িত মানুষের কর্মসংস্থানের ওপর। বর্তমানে প্রথাগত নির্মাণে যে দক্ষতা প্রয়োজন, তার দাম কমে যাবে, হুমকির মুখে পড়বে নির্মাণশ্রমিকেরা। যাঁরা কনস্ট্র্রাকশনের জন্য বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর বিপণনের সঙ্গে জড়িত তাঁরাও পড়বেন বিপদে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রেমিট্যান্সের এক বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যেখানে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করেন আমাদের দেশের নির্মাণশ্রমিককেরা। নির্মাণকাজ করতে তাঁদের তেমন স্পেশালাইজড কোনো দক্ষতার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু, থ্রিডি প্রিন্টেড বাড়ির জন্য দরকার পড়বে নির্দিষ্ট দক্ষতার, যা আমাদের সাধারণ শ্রমিকদের নেই। ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে রেমিট্যান্সের ওপরও।

সমস্যা যখন পরিবহনে

বিল্ডিং নির্মাণে ব্যবহৃত থ্রিডি প্রিন্টার অন্য সাধারণ প্রিন্টারের মতো ছোট আকৃতির না হওয়ায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া বিরাট চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। তা ছাড়া কনস্ট্র্রাকশন সাইটে নিরাপদে অপারেট করা আরও কঠিন। তাই আকৃতিগত কারণে এই প্রিন্টার ব্যবহারে রয়েছে কিছুটা ঝুঁকি।

ডিজাইন সংশোধন

থ্রিডি প্রিন্টারের সবচেয়ে সমস্যা হলো ভুল প্রিন্ট হলে সংশোধন করা যাবে না। স্থপতিদের করা ডিজাইন ভুল হলে তার জন্য পুরো বাড়িটিই আবার নতুন করে প্রিন্ট করতে হয়। তবে সম্ভাবনাময় ব্যাপার হলো, প্রিন্ট করার আগে মডেল তৈরি করলে ভুলের ঝুঁকি কিছু কম হতে পারে। অপর দিকে গতানুগতিক নিয়মে ইট, বালু, সিমেন্ট ব্যবহার করে যেকোনো ডিজাইনে বাড়ি বানালে তা যেকোনো সময় মূল ডিজাইন ঠিক রেখে পরিবর্তন করা যায় কিন্তু নির্মাণ উপকরণ ও প্রযুক্তি সীমিত ও ভিন্ন হওয়ায় থ্রিডি প্রিন্টেড বাড়ির ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়।

স্বয়ংক্রিয় নির্মাণযন্ত্র

স্বয়ংক্রিয় নির্মাণযন্ত্র বলতে এমন সব যন্ত্রকে বোঝায়, যা নিজে থেকে চলতে পারে। প্রথমেই প্রশ্ন জাগতে পারে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র কীভাবে ভবন নির্মাণ করবে। ভবন নির্মাণের অনেক ধাপ রয়েছে। কোনো কোনো ধাপে গাড়িও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডেজার, ক্রেন, ডাম্প ট্রাক এবং এক্সকেভেটরের মতো অনেক গাড়ি আছে, যা নির্মাণকৌশলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই গাড়িগুলো ভারী হওয়ায় পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন অনেক জনবল। সময়ের ব্যবধানে নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গাড়ি ও যন্ত্রপাতি রোবটের সাহায্যে চালানোর সুযোগ হয়েছে। তাই শিল্পে উৎকর্ষতা বাড়াতে, বাণিজ্য প্রসারে উন্নত প্রযুক্তির রোবটিক ইকুইপমেন্টের ব্যবহারও বাড়ছে নির্মাণশিল্পে। সম্ভাবনাময় এই প্রযুক্তির চাহিদা নির্মাণশিল্পে দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই প্রযুক্তির তিনটি বিশেষ সুবিধা নির্মাতাদের আকৃষ্ট করেছে। যেমন:

সুরক্ষিত নিরাপত্তা

কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা অনেক বড় একটি ব্যাপার। নির্মাণকাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। গতানুগতিক পদ্ধতিতে ভবন নির্মাণে প্রতিদিনই শ্রমিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায় পত্রিকার পাতায়। নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ভারী ভারী অ্যানালগ বিভিন্ন যন্ত্র ও গাড়ি ব্যবহারে শ্রমিকদের জন্য ঝুঁকি বহুগুণ বেশি। একজন শ্রমিকের মৃত্যু হলে কোম্পানি মালিককে গুনতে হয় অনেক টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বন্ধও হয়ে যায় নির্মাণ প্রকল্প। তাই স্বয়ংক্রিয় নির্মাণযন্ত্রের ব্যবহারে শ্রমিক বা অপারেটরের কোনো প্রয়োজন পড়ে না বলে নির্মাতা ও কন্ট্রাক্টরদের কাছে এ পদ্ধতির রয়েছে অনেক চাহিদা। 

নির্ভুল নির্মাণযজ্ঞ

এ পদ্ধতি যেহেতু কোনো অপারেটর থাকে না, তাই কোনো কিছু বলে দিলেও ভুল হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। রোবটিক যন্ত্রকে যেভাবে নির্দেশ দেওয়া থাকে, সে সেভাবেই কাজ করতে থাকে। পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত এই যন্ত্র একইভাবে কাজ করতে থাকে, তাই ভুলের আশঙ্কা শূন্যের কোঠায় পৌঁছায়।

ব্যয়সাশ্রয়ী

নির্মাণের সঙ্গে শ্রমিক ও শ্রমঘণ্টা অত্যন্ত সাধারণ একটি ব্যাপার। একটি কাজ পাঁচজন শ্রমিক যে সময়ে করতে পারবে, সেক্ষেত্রে একটি রোবটিক মেশিন সেই কাজটি বহুগুণ কম সময়ে করতে পারবে, তাই মালিকদের বাড়তি টাকা গুনতে হয় না। 

ওয়্যারলেস মনিটরিং সেন্সর

ওয়্যারলেস মনিটরিং সেন্সর বিল্ডিংয়ের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি যন্ত্র। এটি ব্যবহারের প্রচলন আমাদের দেশে খুব বেশি না হলেও উন্নত দেশে এর রয়েছে যথেষ্ট ব্যবহার। এই মনিটরিং সেন্সরের কাজ হলো বিল্ডিংয়ের স্থিতিস্থাপকতা সম্পর্কে বিল্ডিংয়ের মালিককে অবগত করানো। আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে বিল্ডিংয়ের ফিজিক্যাল স্ট্রেংথ দিন দিন কমছে। দিন দিন কমতে কমতে একপর্যায়ে বিল্ডিংটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেলেও আমরা সাধারণত বুঝতে পারি না। এ জন্য বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা করাতে হয়। সাভারের রানা প্লাজা ধসে পড়ার ঘটনা এ দেশের নির্মাণসংশ্লিষ্টদের অনেক ভাবিয়েছে। নগরকর্তারা শেষ পর্যন্ত রাজধানী শহরের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের স্থিতিস্থাপকতা পরীক্ষা করেছেন। বিল্ডিংসহ সব ধরনের স্থাপনা নির্মাণের সময় তাতে ওয়্যারলেস মনিটরিং সেন্সর ব্যবহার করলে স্থাপনাটির স্থিতিস্থাপকতা কমে এলে তা বোঝা যাবে সহজেই। এতে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার ওপর ভিত্তি করে সেন্সরগুলো ব্যবহার করা হয়। এই ধরনের সেন্সর বাজারে সহজলভ্য, তাই বাড়তি সতর্কতার এবং সুরক্ষার জন্য এই প্রযুক্তিটি এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। 

ক্লাউড অ্যান্ড ডাইরেক্ট অবজারভেশন

ক্লাউড অ্যান্ড ডাইরেক্ট অবজারভেশন (সরাসরি পর্যবেক্ষণ) মনিটরিংয়ের আরেকটি উন্নত প্রযুক্তি। আমাদের দেশেও এই প্রযুক্তির চাহিদা ও ব্যবহার বর্তমান সময়ে দারুণ জনপ্রিয়। এই প্রযুক্তি নির্মাতা, ডিজাইনার ও স্থপতিদের জন্য সবচেয়ে বেশি সহায়ক। সহজভাবে বলতে গেলে বিষয়টি হলো নির্মাণ প্রকল্প ও দাপ্তরিক কার্যক্রম নখদর্পণে রাখতে সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করা। ব্যবহার করা হয়ে থাকে ড্রোনও। এটিও একধরনের ওয়্যারলেস মনিটরিং সিস্টেম। তবে এ প্রযুক্তিতে শুধু নির্মাণাধীন প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভালো ফলদায়ক। প্রকল্পের কার্যক্রম নিয়মানুযায়ী হচ্ছে কি না, শ্রমিকেরা ফাঁকি দিচ্ছে কি না, কোথাও অপচয় হচ্ছে কি না তা মনিটরিংয়ে এই প্রযুক্তির জুড়ি নেই। তবে ছোট প্রকল্পের চেয়ে বড় বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। এর মাধ্যমে একই সময় বিভিন্ন প্রকল্প মনিটরিং করা সম্ভব। ফলে নির্মাতার পাশাপাশি কনট্রাক্টরদের ব্যয় অনেকাংশে হ্রাস পাবে। নিখুঁত ফলাফল পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে। কোনো কাজে ভুল হলে তাও খুঁজে বের করা যাবে সহজেই।

সর্বোপরি সময় এখন প্রযুক্তির দখলে। মানুষ সভ্য আর উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবির্ভাব ঘটছে নিত্যনতুন প্রযুক্তির। আমরা চাই আর না চাই, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার প্রায় সর্বত্রই। প্রযুক্তির কল্যাণে সহজতর হয়ে গেছে আমাদের যাপিত জীবন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই যখন প্রযুক্তির এত ছড়াছড়ি তখন নির্মাণশিল্পই-বা পিছিয়ে থাকবে কেন?
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৬তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০২১

রিগ্যান ভূইয়া
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top