Image

সিলেটের বালুর যত কথা

সকাল ১০টা! নদীপাড়ের কুয়াশা তখনো কাটেনি। হাঁটছি সারি সারি নৌকায় সাজানো নদীর তীর ঘেঁষে। চোখে পড়ল অসংখ্যা ছোট ছোট ভাসমান নৌকা। নদীপাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে রাখা রাশি রাশি বালু; যেন তা বিশাল বালুর হাট। কেনাবেচার উদ্দেশ্যেই নৌকাবোঝাই বালু এ স্থানটিতেই স্তূপ করে রাখা। নদীর পাড়ের ওপর থেকে নিচে না নামলে হয়তো বুঝতেই পারতাম না বালুকে ঘিরে চলে এমন বিশাল কর্মযজ্ঞ। বলছিলাম, সিলেটের অন্যতম বালুকাময় নদী সারিপারের নিত্যদিনের দৃশ্যপটের কথা। দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ সিলেট। তবে সিলেটের এ পরিচয়ের বাইরেও উল্লেখ করার মতো রয়েছে আরও অনেক ঐশ^র্য ভান্ডার। প্রকৃতি এ জনপদকে সাজিয়েছে উদারহস্তে। বরাকের দুই শাখা সুরমা-কুশিয়ারাকে কেন্দ্র করে এখানে অসংখ্যা নদী বহমান। এসব নদীতে পাওয়া যায় নির্মাণকাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ বালু। বিখ্যাাত ‘সিলেট স্যান্ড’ নামে পরিচিত লালরঙা এ বালুর কদর দেশব্যাপী। নির্মাণকাজের জন্য সিলেট থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার বালু সরবরাহ করা হয় সারা দেশে। বালুর আদ্যোপান্ত জানতে ঘুরে বেড়িয়েছি সিলেটের বিভিন্ন প্রান্তে। কথা হয়েছে বালুশ্রমিক, মহাজন, ঠিকাদার ও ইজারাদারদের সঙ্গে। ঘুরে পাওয়া তথ্য নিয়েই জানাব সিলেট বালুর যত কথা।

বালুর উৎস যেথায় 

সিলেট জেলা ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের খুব কাছে হওয়ায় খুব সহজেই পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে নেমে আসে বালু ও পাথর। পাথুরে নদীর কারণে সিলেটে বালু খুব সহজেই পাওয়া যায়। তা ছাড়া ভূমির খুব কাছে থাকায় সহজেই বালু উত্তোলন করা যায়। নদী খননের মাধ্যমে কিংবা ছোট ছোট টুকরি/বিশেষ বালতির মাধ্যমে এই বালু উত্তোলন করা হয়। সিলেট বালুর অন্যতম উৎস সারি, পিয়াইন, ধলাই, যাদুকাটা, কুশিয়ারা, সুরমা, মনু, খোয়াই নদী, চেঙ্গের খালসহ জালের মতো বিস্তৃত সব নদী ও খাল। তবে বর্তমানে সিলেট স্যান্ড বেশি পাওয়া যায় সুনামগঞ্জ জেলার যাদুকাটা নদীতে, যা গুণগত মানে অত্যন্ত ভালো হওয়ায় নির্মাণকাজের জন্য বেশ উপযোগী।

বালু সংগ্রহ প্রক্রিয়া

সিলেট অঞ্চলের পাহাড়ি নদীগুলো থেকে সাধারণত দুটি উপায়ে বালু সংগ্রহ করা হয়। এক ড্রেজারের মাধ্যমে, দ্বিতীয়ত, শ্রমিকেরা পানিতে ডুব দিয়ে একধরনের বালতির মাধ্যমে বালু তুলে নৌকায় সংগ্রহ করেন। তবে সাধারণত নদীর গভীরতা খুব বেশি না হওয়ায় ড্রেজারের বদলে শ্রমিকদের মাধ্যমেই বালু উত্তোলনের কাজ হয় বেশি। বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত হয় অসংখ্যা ছোট নৌকা। নদীর তলদেশ থেকে টুকরি যা বিশেষ ধরনের বালতি; এর মাধ্যমে এই বালু উত্তোলন করে নৌকাযোগে বিক্রয়কেন্দ্রে আনা হয়। প্রতিদিন শুধু সারিঘাট থেকেই ৫০-৬০ হাজার ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হয়। সে হিসাবে বছরে প্রায় সোয়া ২ কোটি ঘনফুটেরও বেশি বালু উত্তোলিত হয়। 

ফেসবুক

বালু শ্রমিকদের জীবন

সিলেটের বালুকাময় প্রায় সব নদীতেই বালু উত্তোলনের কাজ করে হাজারো শ্রমিক। এদের সবাই হতদরিদ্র; কেউ কেউ নিম্ন মধ্যবিত্ত। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নদী থেকে বালু তোলাই ওদের কাজ। সাধারণত একটি নৌকায় দুই থেকে পাঁচজন একত্রে কাজ করে। এদের কেউ আবার পিতা-পুত্র। প্রতিদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে একেকজনের আয় মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। প্রতিদিনের আয়ের টাকা সংসারের ব্যয় মেটাতেই খরচ হয়ে যায়। তা ছাড়া বর্ষা মৌসুমে প্রচন্ড পাহাড়ি ঢলে যখন নদীর পানি বেশি থাকে, তখন বালু তোলা সম্ভব হয় না। বেশ কিছুদিন শ্রমিকদের তাই কর্মহীন থাকতে হয়। অথচ তাদের যা আয় হয় তা প্রতিদিনই খরচ হয়ে যায়।

একটি নৌকায় ব্যস্ততার সঙ্গে গভীর মনোযোগ দিয়ে বালু তুলছিলেন বালু শ্রমিক মুজাম্মেল হোসেন। দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন এই কাজে। স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে কষ্টেই চলে তাঁর সংসার। বয়স ৪৫ এর কোটায়। প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। নদীর পানি প্রচন্ড ঠান্ডা হওয়ায় দীর্ঘ সময় ভেজা শরীরে থাকার ফলে ফুসফুসের সমস্যা দেখা দিয়েছে। ডাক্তার বলেছে, এই কাজ ছেড়ে দিতে। ডাক্তারের এমন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কাজটি ছাড়তে পারেননি। কারণ, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। বাল্যকাল থেকেই এই কাজটি করে আসছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। একধরনের মায়া জন্মেছে কাজটির প্রতি। তা ছাড়া হঠাৎ করে অন্য কাজ পাওয়াও সহজ  নয়! 

নদীতে কাজ করা প্রায় সব শ্রমিকেরই এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়। অত্যন্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা বালুর যে দাম পায় তা মোটেও যুক্তিসংগত নয়। অথচ ঘাটে বসে মহাজনেরা লাখ লাখ টাকার বালু বিক্রি করে অনেক কম টাকায় কিনে নিয়ে। নৌকা থেকে মহাজনের ডেরায় বালু নামানোর সঙ্গে সঙ্গেই তার দাম হয়ে যায় প্রায় দ্বিগুণ। আবার সেই বালুই সিলেট বা অন্যান্য শহরে কিনতে গেলে হয়ে যায় তিনগুণ বা তারও বেশি। তবে মহাজন, ঘাট ইজারাদার ও ব্যবসায়ীদের দাবি, ঘাটের ইজারা খরচসহ নানা কারণে বালুর দাম বাড়াতে বাধ্য হন তাঁরা।  

সিলেট বালুর বহুল ব্যবহার ও জনপ্রিয়তার কারণ

সিলেট বালুর বহুল ব্যবহার ও জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো এই বালুতে ‘সিল্ট’ এবং ‘ক্লে’ সয়েলসহ অন্যান্য অপদ্রব্যের উপস্থিতি কম। অন্যান্য বালুর তুলনায় সিলেট বালুর এফ এম (ফাইননেস মডিউল) ২.৩ থেকে ২.৯ এর মধ্যে থাকে, যা অত্যন্ত গুণমানসম্পন্ন। এই বালু সব ধরনের ঢালাইয়ের কাজে অত্যন্ত কার্যকরী ও বহুল ব্যবহৃত। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রাকৃতিক কারণে সিলেট বালুতে সিলিকার পরিমাণ বেশি থাকায় এই বালু দেশের নির্মাণ চাহিদায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছে। 

বালু-বিষয়ক সাধারণ তথ্য

প্রকৌশলের ভাষায় বালুর সাইজ খুঁজে বের করার নামই হলো ‘ফাইননেস’। বিভিন্ন এলাকার বালু বিভিন্ন আকারের হয়ে থাকে। নির্মাণকাজের জন্য সাধারণত ছোট, বড় ও মাঝারি এ তিন ধরনের বালু ব্যবহার করা হয়। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় মাঝারি আকারের বালু। তবে উৎপত্তি অনুসারে বালুকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে-

  • নদীর বালু/রিভার স্যান্ড
  • পিট বালু
  • সাগরের বালু/সি স্যান্ড। 

বাংলাদেশের নির্মাণকাজের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় নদীর বালু বা রিভার স্যান্ড। এ দেশের অসংখ্যা নদীতে এই বালু পাওয়া যায়। স্থাপনা নির্মাণের জন্য বাজারে সাধারণত চার ধরনের বালু পাওয়া যায়। এগুলো হচ্ছে-

  • ভিটি বালু (ফিলিংয়ের জন্য)
  • লোকাল বালু (কংক্রিট ঢালাইয়ের জন্য)
  • সিলেট বালু বা লাল বালু (কংক্রিট ঢালাইয়ের জন্য)
  • চিকন বালু বা প্লাস্টার বালু (দেয়ালে প্লাস্টারের জন্য)।

বালু উত্তোলনে পরিবেশগত বিপর্যয়

বাংলাদেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশগত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল সিলেট বিভাগের বিভিন্ন নদী ও শাখা নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু ও পাথর উত্তোলনের ফলে প্রতিবেশব্যবস্থা আজ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর গভীরতা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ফলে প্রতিবছর নদীভাঙন বেড়েই চলেছে। বর্ষা মৌসুমে সারি, সুরমা, কুশিয়ারা, ধলাই নদীসহ অন্যান্য নদীর ভাঙন মারাত্মক আকার ধারণ করে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে স্থানীয়সহ সারা দেশের পরিবেশকর্মীরা আন্দোলন করছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), সিলেট শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সুরমা নদী ওয়াটারকিপার আবদুল করিম বলেন, ‘অপরিকল্পিতভাবে বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ করা না গেলে পরিবেশ যেমন পড়বে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সিলেটের পর্যটন খাত।’ আর তাই সমস্যা সমাধানে সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহŸান জানান তিনি।

সিলেট বালুর দাম

প্রতি ঘনফুট বড় দানার বালু সারিঘাটসহ অন্যান্য ঘাটের দাম ১৬ থেকে ১৭ টাকা। আর এই ১৬ টাকার বালু সিলেট শহরে এসে বিক্রি হচ্ছে ২৭ থেকে ২৮ টাকা দরে। মাঝারি দানার বালু প্রতি ঘনফুট ১৪ থেকে ১৫ টাকা। সিলেট শহরের এর দাম হচ্ছে ২৫ থেকে ২৬ টাকা। ছোট আকারের বালু ১১ থেকে ১২ টাকা। সিলেট শহর থেকে কিনতে প্রতি ঘনফুটে ব্যয় করতে হবে ২২ থেকে ২৩ টাকা। সঙ্গে অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত  স্থানে নিয়ে যেতে পরিবহন খরচ যোগ করতে হবে। তবে গুণগত মান, সময় ও স্থানভেদে সিলেট বালুর দামের তারতম্য হয়।

সিলেট বালু যেখানে পাবেন

সিলেটের বিভিন্ন নদী থেকে বালু উত্তোলিত হওয়ার পরে তা মহাজন, পাইকার ও মধ্যস্বত্বভোগীর হাত ধরে সিলেট নগরসহ আশপাশে জেলার বড় বড় ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছায়। এসব ব্যবসায়ী খুচরা ও পাইকারি বিক্রি করে থাকে। সিলেট শহরের মহাজনপট্টি, জিন্দাবাজার, দরগাগেট, কালীঘাট, সাগরদিঘির পাড়সহ বিভিন্ন জায়গায়। এ ছাড়া দেশব্যাপী বালু বিক্রেতারা সিলেট বালু সংগ্রহ করে তা বিক্রি করছে।

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৫তম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৯ 

মাথায় যত প্রশ্ন আসে

সয়েল ট্রিটমেন্ট বৃত্তান্ত 

প্রকৌশলী সুবীর কুমার সাহা

সয়েল ট্রিটমেন্ট কী? 

মাটিতে বেশ কিছু পোকা থাকে, যা দমন করা না হলে পরবর্তীকালে ভবনের কাঠে আক্রমণ করে। ভবনের নির্মাণকাজ চলাকালীন মাটিতে রাসায়নিক সলিউশন ব্যবহার করে কাঠ ধ্বংসকারী পোকার আক্রমণ থেকে ভবনকে রক্ষা করা হয়। এই প্রক্রিয়াকেই সয়েল ট্রিটমেন্ট বলে। উল্লেখ্যা, সয়েল ট্রিটমেন্টই পোকার আক্রমণরোধে সবচেয়ে ভালো ও একমাত্র গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। 

কীভাবে সয়েল ট্রিটমেন্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়? 

বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সয়েল ট্রিটমেন্ট সম্পন্ন করা হয়। বিশেষ করে নিচে উল্লেখিত যেকোনো একটি রাসায়নিক পদার্থ পানির সঙ্গে মিশিয়ে ইমালশন প্রস্তুত করা হয়। 

ইমালশন ছিটানো যন্ত্রের সাহায্যে ধাপে ধাপে এটি প্রয়োগ করা হয়-

  • ধাপ-১: ভিত্তির গর্তের তলদেশ এবং পাশে ৩০ সে.মি. উঁচু পর্যন্ত প্রয়োগ করা হয়। প্রতি বর্গমিটারে পাঁচ লিটার হারে ইমালশন ব্যবহার করা হয়।
  • ধাপ-২: ভিত্তির দেয়াল নির্মাণের পর এর উভয় পাশে মাটি দিয়ে পূর্ণ করার আগে খাঁড়া পৃষ্ঠে প্রতি বর্গমিটারে পাঁচ লিটার হারে ইমালশন প্রয়োগ করা হয়। আনুভূমিক যা হবে ৩০ সে.মি. চওড়া এবং ৪৫ সে.মি. গভীর।
  • ধাপ-৩: মেঝে তৈরি করার আগে সমগ্র সমতলপৃষ্ঠে প্রতি বর্গমিটারে পাঁচ লিটার করে ইমালশন প্রয়োগ করা হয়।
  • ধাপ-৪: দালানের চারদিকের মাটিকে টারমাইট প্রতিরোধী করার জন্য ১৫ সে.মি. পরপর ১২ সে.মি. ব্যাসের ৩০ সে.মি. গভীর ছিদ্র করতে হয়। প্রতি একক মিটারে ২.২৫ মিটার হারে দ্রবণ প্রয়োগ করে মাটি দিয়ে পূর্ণ করে দিতে হয়।

কাঠামোগতভাবে কীভাবে পোকা প্রতিরোধ করা যায়?

কাঠ ধ্বংসকারী পোকা যাতে মাটি থেকে ভবনের ওপরের অংশে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য প্লিন্থ লেভেলে ৫০-৭৫ মি.মি. পুরু সিমেন্ট কংক্রিটের ডি.পি.সি. (উধসঢ় চৎড়ড়ভ ঈড়ঁৎংব) লেয়ার প্রদান করা হয়। প্রয়োজন হলে ডি.পি.সি.-এর নিচে বিটুমিন অ্যাসফল্টের লেয়ার দিতে হবে। ডি.পি.সি. ভেতরের দিকে বা বাইরের দিকে ৫০-৭৫ মি.মি. বাড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। নতুন কাঠের যেকোনো দরজা, জানালা, চৌকাঠ প্রভৃতি ব্যবহারের আগে অবশ্যই কাঠকে ভালোভাবে ঘষে সিজনিং, বার্নিশ ও পেইন্টিং করতে হবে। কারণ, ভবনে ব্যবহৃত কাঠের সব কাঠামোই হতে হবে ড্যামপ্রæফ। যেটা কাঠকে কাজে লাগানোর আগে সঠিকভাবে করা সম্ভব। কাঠ ধ্বংসকারী পোকার আক্রমণ রোধে পেইন্টিং অনেক বেশি কার্যকর।

স্থাপনার নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে কীভাবে ট্রিটমেন্ট করা যায়?  

সাধারণত বর্ষার সময় মাটি ও অন্যান্য কাঠে জলীয় কণার উপস্থিতিতে সাবট্যারানিয়ান টারমাইট-জাতীয় পোকার আক্রমণ বেশি হওয়ার ভয় থাকে। যেসব বিল্ডিং আগে নির্মিত দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে কাঠের সব স্থানে পোস্ট কন্সট্রাশন ট্রিটমেন্ট একটি কার্যকরী ব্যবস্থা। কাঠ ধ্বংসকারী পোকার আক্রমণ এ ব্যবস্থার মাধ্যমে সহজেই প্রতিরোধ করা যায়। যেভাবে এটি করা হয়-

ভিত্তির মাটি ট্রিটমেন্ট 

ভবনে যদি সাবট্যারানিয়ান টারমাইটের উপস্থিতি বেশি বোঝা যায়। তবে এ পদ্ধতি অবলম্বন করা যায়। সে জন্য প্রথমে দালানের বাইরের চারদিকে ০.৫ মিটার গভীর করে গর্ত খনন করা হয়। ক্রো-বার (Crow-Bar)-এর সাহায্যে দেয়ালকে স্পর্শ করে ১৫০ মি.মি. পরপর ১৫ মি.মি. ব্যাসের ছিদ্র তৈরি করা হয়। ছিদ্রের গভীরতা ভিত্তির কংক্রিট পর্যন্ত হয়। এরপর ছিদ্রগুলো রাসায়নিক ইমালশন দিয়ে পূর্ণ করা হয়। ছিদ্র ও খননকৃত গর্ত মাটি দিয়ে ভরাট করে দিতে হয়। প্রতি বর্গমিটারে ৭.৫ লিটার হারে ইমালশন ভরাট মাটিতে ব্যবহার করা হয়।

ফেসবুক

মেঝের নিচের মাটি ট্রিটমেন্ট

প্রসারণ জোড়, নির্মাণ জোড় অথবা ফাটল দিয়ে টারমাইট ভেতরে উঠতে পারে। এ অবস্থায় জোড় ও ফাটলগুলোতে ৩০ মি.মি. পরপর ১২ মি.মি. ব্যাসের ছিদ্র থাকে। ট্রিলের সাহায্যে এর মধ্যে রাসায়নিক ইমালশন দিয়ে পূর্ণ করা হয়। মেঝের ছিদ্রগুলোকে বন্ধ করে দিতে হয়।

ম্যাসনারির শূন্যস্থান ট্রিটমেন্ট

যদি দেয়াল ভালোভাবে প্লাস্টার না করা থাকে অথবা ডি.পি.সি. (উধসঢ় চৎড়ড়ভ ঈড়ঁৎংব) সঠিকভাবে করা না হয়, তাহলে ম্যাসনারির ফাঁকা স্থানের মাধ্যমে টারমাইট প্রবেশ করে। সে জন্য প্রয়োজন ম্যাসনারির ফাঁকা বা শূন্য স্থানে ট্রিটমেন্ট দেওয়া। প্লিন্থ লেভেলে দেয়ালের ভেতর এবং বাইরে উভয় দিকে ৪৫০ কোণে ৩০ সে.মি. পরপর ১২ মি.মি. ব্যাসের ছিদ্র করে তার ভেতর রাসায়নিক ইমালশন প্রয়োগ করতে হয়। সম্পূর্ণ ছিদ্র বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ইমালশন প্রয়োগ চালিয়ে যেতে হয়।

কাঠের কাজের ট্রিটমেন্ট 

আক্রান্ত কাঠে ৪৫০ কোণে ১৫ সে.মি. পরপর ৬ মি.মি. ব্যাসের ছিদ্র করে রাসায়নিক ইমালশন প্রয়োগ করে কাঠ ধ্বংসকারী পোকা প্রতিরোধ সম্ভব হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা দৃষ্টিনন্দন হয় না। তা ছাড়া কাঠ সহজলভ্য হওয়ায় কাঠে পচন বা কাঠ ধ্বংসকারী পোকার আক্রমণ হলে কাঠ পরিবর্তন করে নতুন কাঠ ব্যবহার করাই উত্তম। নতুন কাঠ ব্যবহারের আগে অবশ্যই সেটা সিজনিং করে নিতে হবে, সেই সঙ্গে প্রয়োজনমতো বার্নিশ এবং পেইন্টিং করাতে হবে। তবেই সম্ভব হবে কাঠকে টারমাইটের হাত থেকে রক্ষা করা।

রুফ ট্রিটমেন্ট কীভাবে করা হয়, প্রয়োজনীয়তাই-বা কী?

রুফ বা ছাদের ওপরে পড়া বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন এবং রোদের তাপ নিরোধক হিসেবে বিভিন্নভাবে সারফেস ট্রিটমেন্ট করা হয়। এই প্রক্রিয়াটি স্থাপনার স্থায়িত্ব ও ব্যবহার উপযোগিতা বাড়ায়। সাধারণত স্ট্রাকচারাল ডিজাইন অনুযায়ী নির্মিত আরসিসি ছাদের ওপর ৩ ইঞ্চি (গড় মাপ) পুরু লাইম কংক্রিট (চুন, সুরকি ও ইটের খোয়ার মিশ্রণ) সংক্ষেপে এলসি ব্যবহার করা হতো। তবে বর্তমানে এলসির পরিবর্তে নতুন কিছু প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন- সর্বশেষ ছাদটি করার সময় তাপ নিরোধক ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য হলো বøক বসিয়ে আরসিসি ঢালাই করা এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য তার ওপর ১.৫ ইঞ্চি পুরু স্ক্রিডিং ঢালাই দিয়ে নিট-সিমেন্ট ফিনিশিং করা। এ ছাড়া এসব ফিনিশিংয়ের ওপরের পৃষ্ঠে রুফিং কম্পাউন্ড নামে তাপ নিরোধক এক প্রকার রং ব্যবহার করা হয়। ছাদের ওপর এ ধরনের ট্রিটমেন্ট সঠিকভাবে করা না হলে রোদের উত্তাপের কারণে টপ ফ্লোরে বসবাসকরীরা গরমের কষ্টে ভোগে। এ ছাড়া বৃষ্টির পানিতে ছাদ তথা ভবনের স্থায়িত্ব কমে যায়। 
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৫তম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৯

Related Posts

রেলিং: নিরাপত্তা, সৌন্দর্য ও স্থায়িত্বের সমন্বয়

রেলিং একটি ভবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না, বরং ভবনের নান্দনিক সৌন্দর্যও বৃদ্ধি করে। বাড়ি,…

টাইলসের রকমফের ও আধুনিক ভবন নির্মাণ

বর্তমান সময়ে একটি ভবনের নান্দনিকতা, স্থায়িত্ব এবং ব্যবহারিক সুবিধা নিশ্চিত করতে টাইলের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একসময় টাইল শুধুমাত্র…

আধুনিক নির্মাণ উপকরণ ও অগ্নিরোধী কাঠ

কাঠ নির্মাণের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। আমাদের জীবনের নানা ক্ষেত্রেই কাঠের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। সহজলভ্য এবং দামে…

টেকসই নির্মাণ উপকরণ কার্বন ফাইবার রিইনফোর্সড পলিমার

বর্তমান যুগে প্রযুক্তি ও প্রকৌশলের দ্রুত বিকাশের ফলে এমন সব উপকরণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, যা একই সঙ্গে হালকা,…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *