Image

অন্দরের সৌন্দর্যে বেসিন

কর্মব্যস্ত নগরজীবন। সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিসে বা কাজে যাওয়ার তাড়া। দিনের শুরুটা হয় বেসিনে মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হওবার মধ্য দিয়ে। চনমনে ভাবটা তখনই ফিরে আসে, যখন মুখ-হাত ধোয়ার বেসিনটা হয় নান্দনিক। বাথরুমে ঢোকার মুখে সুদৃশ্য বেসিন দেখলেই মনটা ভালো হয়ে যায়। ঝকঝকে-তকতকে বেসিন যেমন চোখের প্রশান্তি তেমনি মনেও আনে আনন্দের খোরাক। তবে অধুনা বেসিন শুধু বাথরুমেই নয়, ব্যবহৃত হচ্ছে খাবারঘর, রান্নাঘর ও বারান্দায়। ঘরের আকার আর ইন্টেরিয়রের ওপর ভিত্তি করে ঘরে লাগানো হয় মানানসই বেসিন। অত্যাধুনিক ডিজাইনের সুদৃশ্য বেসিনগুলো প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি ঘরের সৌন্দর্যবর্ধনে যোগ করে নতুন মাত্রা।

বৈশ্বিক সভ্যতায় বেসিন ব্যবহারের প্রমাণ মেলে। তবে সেগুলো এখনকার মতো এত নিখুঁত ও কার্যকর না হলেও কাজ চালিয়ে নেওয়ার জন্য নেহাত মন্দ নয়। প্রাচীন গ্রিসে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০-৪২৫ বেসিন ব্যবহৃত হতো, যার প্রমাণ মেলে বিভিন্ন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ থেকে। এ ছাড়া ইতালির ভেনিসসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও এ অনুষঙ্গটি ব্যবহারের প্রমাণ মেলে। সেগুলোর বেশির ভাগই পাথরের। ১৮০০ শতাব্দীর শেষ দিকে আমেরিকায় হাত ধুতে এক ধরনের বেসিন ব্যবহৃত হতো। একটি গভীর বোল বা বাটি টেবিলের ওপর রাখা থাকত অনেকটা ইংলিশ ট্র্যাডিশনাল বেসিনের মতো করে। এই বোলের নিচে ছিদ্র থাকত পানি বেরিয়ে যাবার জন্য। ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে পানি ধরে রাখা ও মুখ-হাত ধোয়ার জন্য বেসিন আকৃতির কাঠের বড় চৌবাচ্চা ব্যবহৃত হতো। কালক্রমে বিভিন্ন আদলের এই মুখ-হাত ধোয়ার অনুষঙ্গসমূহ আজকের আধুনিক বেসিনের রূপ পায়।  

দেশে দেশে, যুগে যুগে ভিন্ন ভিন্ন উপকরণের বেসিন ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রাথমিক পর্যায়ের প্রচলিত কাঠ ও পাথরের বেসিনের ধারণা থেকে বেরিয়ে মানুষ তৈরি করেছে বিভিন্ন উপকরণের বেসিন। এসব বেসিনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- 

  • সিরামিক বেসিন
  • কংক্রিট বেসিন
  • গ্রানাইট বেসিন
  • মার্বেল বেসিন
  • কাচ বেসিন
  • স্টিল বেসিন
  • কপার বেসিন
  • কাস্ট আয়রন বেসিন
  • নিকেল বেসিন
  • পাথর বেসিন
  • পোড়ামাটি বেসিন
  • কাঠ বেসিন প্রভৃতি।

ডিজাইন, রং ও ধরন

বেসিনের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সিরামিকস বেসিনের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া স্টিল ও কাচ বেসিনও সম্প্রতি ব্যবহৃত হচ্ছে। কিছু কিছু অভিজাত বাসাবাড়ি ও হোটেলে কপারের বেসিন লক্ষ করা যায়। বাজারে বিভিন্ন ডিজাইন, রং ও আকারের বেসিন পাওয়া যায়। এসব বেসিন যেমন আধুনিক ডিজাইনের সম্পূর্ণ নতুন লুকে পাওয়া যায়, একই সঙ্গে পুরোনো ডিজাইনের সঙ্গে নতুনের মিশেলেও বিক্রি হয়। বাজারে আকার বৈচিত্র্যে যেসব বেসিন পাওয়া যায় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম-

  • চারকোনা বা স্কয়ার
  • গোলাকার বোল আকৃতির
  • ওভাল বা ডিম্বাকৃতির।

রঙের মধ্যে সাদা, অফহোয়াইট, পার্পেল, গাঢ় ও হালকা নীল বেশি জনপ্রিয়। সম্প্রতি প্রিন্টেড পেডিস্টাল বেসিনও পাওয়া যায়। এসব বেসিনের ডিজাইন ও আকারভেদে সাধারণত ওজন ৫ কেজি থেকে ৪০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। বাজারে প্রচলিত বেসিনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-

  • ইন্টিগ্রেটেড পেডিস্টাল বেসিন
  • হাফ পেডিস্টাল বেসিন
  • ওয়াল হ্যাং বেসিন
  • কর্নার বেসিন
  • কাউন্টার বেসিন
  • কেবিনেট বেসিন
  • আন্ডার কাউন্টার বেসিন
  • ওভার কাউন্টার বেসিন ইত্যাদি।

বেসিনের আনুষঙ্গিক অংশবিশেষ

বেসিন সেটসহ কিংবা আলাদা আলাদা অংশে কিনতে পাওয়া যায়। এসব সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে-

  • ফোসিট
  • ফোসিট হোল
  • ড্রেনেজ হোল
  • ওভার ফ্লো হোল
  • পেডিস্টাল
  • কেবিনেট
  • হোস পাইপ।

বেসিনের ডেকোরেশন

বেসিন স্থাপন ও এর ডেকোরেশন বেশ গুরুত্বপূর্ণ, যার অন্যতম অনুষঙ্গ আয়না। বেসিনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ডেকোরেটিভ বা সিম্পিল আয়না লাগানো যায়। তবে ডাইনিং বেসিনের আয়না একটু ডেকোরেটিভ হলেই ভালো। ছোট পরিসর অথবা কর্নার স্পেসের বাথরুম বা ডাইনিংয়ে কর্নার বেসিন বসানো হয়। বাথরুম ও রান্নাঘরের সৌন্দর্যে কাউন্টার বেসিন বেশ উপযোগী। কারণ, এতে কাউন্টারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সাজিয়ে রাখা যায়। এ ছাড়া বেসিনের সৌন্দর্যে ট্যাপ বা ফোসিটের রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। বেসিনের সঙ্গে নান্দনিক ফোসিট পুরো ফ্ল্যাটে আনে ভিন্ন সৌন্দর্য। এ ছাড়া বেসিন কাউন্টারের সৌন্দর্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বেসিন সারফেস মার্বেলপাথর, টাইলস ও সিজনস উডের হয়ে থাকে। কাউন্টার সারফেস ঘরের রং ও ইন্টেরিয়রের ওপর ভিত্তি করে মেট, গ্লোসি বা পলিশড হতে পারে। 

বাজারে প্রচলিত ব্র্যান্ডসমূহ

বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বেসিন পাওয়া যায়। এর মধ্যে রোসা, মারকুইস, আরএকে, টোটোসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বেসিন রয়েছে ক্রেতা চাহিদার শীর্ষে।

বেসিন কেনার আগে

বাজারে হরেক রকম বেসিনের মধ্যে সঠিক বেসিনটি বাছাই করা সত্যিই দুরূহ। তা সত্ত্বেও এই নিত্যপ্রয়োজনীয় অনুষঙ্গটি ভালোভাবে যাচাই করে ভালো ব্র্যান্ড ও কিছুটা দাম দিয়ে উন্নতমানের পণ্যটি কেনাই অধিক যুক্তিযুক্ত। গরম ও ঠান্ডা পানি প্রাপ্তির সুবিধাসংবলিত ডাবল ফোসিটযুক্ত বেসিনের দাম কিছুটা বেশি। উন্নতমানের বেসিনের যে সুবিধা পাওয়া যায়-

  • স্ক্রাচ পড়ে না
  • সহজে স্থাপন করা যায়
  • দীর্ঘস্থায়ী
  • সহজে পরিষ্কার করা যায়
  • হাইজেনিক বা স্বাস্থ্যসম্মত।

এ ছাড়া দাম দিয়ে বেসিন কিনলেও লক্ষ রাখতে হবে তা যেন ঘরের সঙ্গে খাপ খায়। যেমন, যেখানে স্পেস কম সেখানে কাউন্টার বেসিন মানাবে না বরং স্লিম ফিট বেশ চলনসই। আবার বেশি সংকীর্ণ জায়গা হলে কর্নার বেসিনও খাপ খায়। বেসিন কেনার আগে প্রয়োজনে একজন অভিজ্ঞ ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের পরামর্শ নিতে পারেন। 

যত্নআত্তি ও দরকারি টিপস

  • স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বেসিন সব সময় পরিষ্কার রাখা উচিত। কারণ, বেসিনে প্রচুর ব্যাকটেরিয়া জন্মে।
  • বেসিনে কোনো কিছু লাগলে দ্রুত তুলে ফেলতে হবে, তা না হলে তা ওঠাতে বেগ পেতে হতে পারে।
  • বেসিন ও ফিটিংস লাগানোতে অভিজ্ঞ ও দক্ষ স্যানিটারি মিস্ত্রির সাহায্য নেওয়া উচিত। এতে ফিটিংসগুলো মাপমতো বসানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

আকারভেদে দরদাম

চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশের বেসিন ছাড়াও দেশে তৈরি বেসিন বাজারে পাওয়া যায়। রোসা, মারকুইস, আরএকে, টোটোর আধুনিক বেসিনগুলো সহজেই নজর কাড়ে। সাধারণত ডিজাইন, মান ও সাইজ অনুযায়ী এর দাম নির্ধারিত হয়। ছোট আকারের বেসিন ১,০০০ থেকে ৯,০০০ টাকা, মাঝারি বেসিন ২,৫০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা, বড় বেসিনের দাম ৫,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকার মধ্যে। কাউন্টারসহ উন্নতমানের ও আমদানি করা বেসিনের দাম পড়বে ১০,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ টাকার মধ্যে। তবে ভালো মানের টেকসই বেসিন কেনাটাই বুদ্ধিমানের কাজ, কেননা তা বারবার বদলানো যায় না।

পাওয়া যাবে যেখানে

সাধারণত স্যানিটারি সামগ্রী বিক্রির শো-রুম ও দোকানে বেসিন পাওয়া যায়। ঢাকার হাতিরপুল, বাংলামোটর, মিরপুর, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, গুলশানের বেশির ভাগ স্যানিটারি সামগ্রীর দোকানে বেসিন পাওয়া যায়। আমদানি করা সিরামিকস বেসিনের একটি বড় বাজার রাজধানীর গ্রিন রোডের গ্রিন সুপার মার্কেট। এ ছাড়া বিভিন্ন সিরামিকস কোম্পানির আউটলেটে বেসিন পাওয়া যায়। অনলাইন শপগুলো থেকেও কিনতে পারেন আপনার পছন্দের বেসিন।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৬তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৮।

Related Posts

রেলিং: নিরাপত্তা, সৌন্দর্য ও স্থায়িত্বের সমন্বয়

রেলিং একটি ভবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না, বরং ভবনের নান্দনিক সৌন্দর্যও বৃদ্ধি করে। বাড়ি,…

টাইলসের রকমফের ও আধুনিক ভবন নির্মাণ

বর্তমান সময়ে একটি ভবনের নান্দনিকতা, স্থায়িত্ব এবং ব্যবহারিক সুবিধা নিশ্চিত করতে টাইলের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একসময় টাইল শুধুমাত্র…

আধুনিক নির্মাণ উপকরণ ও অগ্নিরোধী কাঠ

কাঠ নির্মাণের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। আমাদের জীবনের নানা ক্ষেত্রেই কাঠের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। সহজলভ্য এবং দামে…

টেকসই নির্মাণ উপকরণ কার্বন ফাইবার রিইনফোর্সড পলিমার

বর্তমান যুগে প্রযুক্তি ও প্রকৌশলের দ্রুত বিকাশের ফলে এমন সব উপকরণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, যা একই সঙ্গে হালকা,…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

Award
দক্ষিণ কোরিয়ায় সিউলের আবাসন স্থাপত্যে নতুন দিগন্ত
ভবিষ্যতের ৮টি স্টেডিয়াম যা প্রচলিত ধারণা বদলে দেবে
নুহাশ পল্লী: হুমায়ূন আহমেদের স্বপ্নের সবুজ রাজ্য
Cover
Ramna Park
রেলিং: নিরাপত্তা, সৌন্দর্য ও স্থায়িত্বের সমন্বয়
Qatar
Electric