হারানো স্টোন হাউসের জায়গায় দাঁড়াল ৭০০ বছরের পুরনো “গ্লাস হাউস”

জার্মানির রয়টলিঙেন শহরের পুরনো এলাকায়, শতাব্দীপ্রাচীন কাঠের বাড়িগুলোর মাঝে একটি স্বচ্ছ কাচের ভবন জেগে উঠেছে। এটি স্টুটগার্টভিত্তিক প্রতিষ্ঠান উলফ আর্কিটেকটেনের নকশা করা “গ্লাস হাউস”, যা ২০২৫ সালে শেষ হয়েছে।

এটি একটি বড় প্রকল্পের অংশ, হিস্টোরিক্যাল ওবারআমটাইস্ট্রাসে জাদুঘর। এই প্রকল্পের আওতায় আশপাশের পুরনো বাড়িগুলোর সংস্কারকাজও চলছে, যা ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ হবে।

উলফ আর্কিটেকটেন এই প্রকল্পের নকশা প্রতিযোগিতায় জিতেছিল ২০১৭ সালে। ভবনটির বাইরের আবরণ কাচ দিয়ে তৈরি, যার স্বচ্ছতা ও রং দিনের সময় এবং আবহাওয়া অনুযায়ী বদলায়।

স্থপতি ইংমার বলেন, তারা হারানো স্টোন হাউসের স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। ছবি: আর্কপেপার
হারানো “স্টোন হাউস”-এর স্মৃতি

ওবারআমটাইস্ট্রাসে ২৮-৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়ির সারি। আর ৩৪ নম্বর প্লটে দাঁড়িয়ে থাকা “স্টোন হাউস”-এর অবশিষ্ট বেসমেন্ট, এই দুটি মিলে রয়টলিঙেনের প্রাচীনতম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর একটি গড়ে তুলেছিল। ত্রয়োদশ শতকে শহরটি প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই এসব কাঠামোর ইতিহাস শুরু।

দক্ষিণ জার্মানির প্রাচীনতম হাফ-টিম্বার বাড়ির সারির একটি হিসেবে এই এলাকা পরিচিত। ১৯৭২ সালে “স্টোন হাউস” বা “টাওয়ার হাউস” ভেঙে ফেলার পর সমস্যা শুরু হয়। কারণ এই ভারী বাড়িটিই আশপাশের বাড়িগুলোকে ঠেকা দিয়ে রাখত। এটি সরে যাওয়ার পর বাকি বাড়িগুলো হেলে পড়তে থাকে এবং ধসের ঝুঁকিতে পড়ে। তাই নতুন ভবনটির মূল কাজ হলো পুরনো বাড়িগুলোকে ধরে রাখা ও ভূমিকম্প থেকে রক্ষা করা।

স্থপতি ইংমার বলেন, তারা হারানো স্টোন হাউসের স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। তাই নতুন কাচের ভবনটি সেই পুরনো বাড়ির জায়গাতেই বানানো হয়েছে, যা অতীত ও বর্তমানকে একসঙ্গে জুড়ে দেয়।

বাইরের আবরণে ব্যবহৃত হয়েছে কাচের টালি, যা আবহাওয়া থেকে সুরক্ষা দেয়। ছবি: আর্কপেপার
নকশা: চালাঘরের আদল, কাচের অবয়ব

গ্লাস হাউসের নকশায় আশপাশের বাড়িগুলোতে ঢালু ছাদের আকার অনুসরণ করা হয়েছে। তবে তা বানানো হয়েছে স্বচ্ছ কাচ দিয়ে। বাইরের আবরণে ব্যবহৃত হয়েছে “বিভার-টেইল” কাচের টালি, যা আবহাওয়া থেকে সুরক্ষা দেয়। এই টালিগুলো ধরে রেখেছে কাঠের তৈরি তিন-স্তরের একটি কাঠামো। আলো ও প্রতিফলনের তারতম্যে এই কাঠামো কম-বেশি দেখা যায়, তাই ভবনটি সময়ে সময়ে ভিন্ন রূপ নেয়।

গ্লাস হাউসটি জাদুঘরের সমাবেশস্থল এবং পুরনো বেসমেন্টের সুরক্ষা-আবরণ দুই কাজই করে। এখানে তাপ-নিরোধক বা এসি নেই। বাইরের খোলা জোড়গুলো দিয়ে স্বাভাবিক বাতাস চলাচল ও ধোঁয়া বের হওয়ার ব্যবস্থা আছে।

এই ভবনের নকশা করা হয়েছে “ক্র্যাডল টু ক্র্যাডল” নীতি মেনে, যার লক্ষ্য চক্রাকার নির্মাণ-সংস্কৃতি।ছবি: আর্কপেপার
চক্রাকার নির্মাণনীতি: টেকসই স্থাপত্যের চর্চা

গ্লাস হাউসের নকশা করা হয়েছে “ক্র্যাডল টু ক্র্যাডল” নীতি মেনে, যার লক্ষ্য চক্রাকার নির্মাণ-সংস্কৃতি। তাই সব সংযোগ করা হয়েছে স্ক্রু দিয়ে, যাতে ভবিষ্যতে সহজে খুলে ফেলা যায়। বর্জ্য ও কার্বন কমাতে কংক্রিটের বদলে কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে।

স্থপতি ইংমার বলেন, পুরনো বাড়িগুলো দেখে তাঁরা বুঝেছেন, অতীতের মানুষ কিছুই ফেলত না, বরং সবকিছু পুনর্ব্যবহার ও মেরামত করত। এই ভাবনা থেকেই তাঁরা এমন নকশা করেছেন, যা অতীতকে ধরে রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতের প্রয়োজনেও বদলানো যায়।

পুরনো হাফ-টিম্বার বাড়িগুলো ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি নিজেরাও জাদুঘরের প্রদর্শনী-বস্তু হিসেবে কাজ করছে। ছবি: আর্কপেপার
জাদুঘর হিসেবে ঐতিহাসিক ভবনগুলোর ভূমিকা

পুরনো হাফ-টিম্বার বাড়িগুলো ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি নিজেরাও জাদুঘরের প্রদর্শনী-বস্তু হিসেবে কাজ করছে। সাতশ বছরেরও বেশি সময়ের নগর, সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্যিক ইতিহাস এসব বাড়ির গায়ে গায়ে লেখা রয়েছে। কাঠামোগত সংস্কারের কাজ ঐতিহাসিক সংরক্ষণ-নীতিমালা মেনেই করা হচ্ছে। আর সেই সঙ্গে ৩৪ নম্বর প্লটে নতুন কর্নার ভবনটি (গ্লাস হাউস) পুরনো সারিকে হেলে পড়া ও ধসে যাওয়া থেকে রক্ষা করার কাজও করছে।

ভবনের সেকশন ড্রয়িং। ছবি: আর্কপেপার

গ্লাস হাউস অতীত আর বর্তমানের মধ্যে এক ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা। পুরনো কাঠামোকে সম্মান জানিয়ে, আধুনিক ও টেকসই উপায়ে বানানো এই ভবন দেখায় যে ঐতিহ্য রক্ষা আর নতুন স্থাপত্য একসঙ্গে চলতে পারে। রয়টলিঙেনের পুরনো শহরে এই স্বচ্ছ কাচের ভবন হারিয়ে যাওয়া স্টোন হাউসের স্মৃতি বহন করবে, আর একইসঙ্গে অতীত ও ভবিষ্যৎ দুটোকেই ধরে রাখবে সেটাই চাওয়া।

তথ্যসূত্র: 

আর্কপেপার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *