স্থাপত্য শিক্ষার প্রথম পাঠ শেষে

শুধু স্থাপনা নকশা প্রণয়ন বা বিনির্মাণ করেই একজন স্থপতির কাজ শেষ নয়। স্থাপত্যকর্ম একটি বহুমাত্রিক বিষয়। পার্থিব-অপার্থিব সবকিছুর সঙ্গেই স্থাপত্যের রয়েছে গভীর সংযোগ। আজ সভ্যতার এই ব্যাপক অগ্রগতি স্থপতিকে দিয়েছে অনন্য সম্মান। বিরল এই সম্মানের এমন স্বপ্ন থেকেই স্থাপত্যে পড়তে আসা। শুরু এক ঝাঁক শিক্ষার্থী নিয়ে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) স্থাপত্য বিভাগে ষষ্ঠ ব্যাচের যাত্রা। ভর্তিযুদ্ধের বন্ধুর পথ পেরিয়ে কখন যে কেটেছে প্রথম বর্ষ; অসামান্য সব অভিজ্ঞতা নিয়ে। যতটা প্রত্যাশা ছিল, তারচেয়ে অনেক বেশি সাফল্য এসেছে স্থাপত্যজীবনের প্রথম পাঠে, আর সম্ভাবনার দরজাগুলো ধীরে ধীরে খুলেছে নতুন অবয়বে।

ভর্তির পর প্রথম সেমিস্টার ছিল স্থাপত্যযাত্রার প্রারম্ভকাল। স্থাপত্যের প্রাথমিক সবকিছুর সঙ্গে পরিচিত হওয়া ছাড়াও কাজ করেছি ডিজাইনের প্রাথমিক সব ফর্মের দ্বিমাত্রিক কম্পোজিশন নিয়ে। শিখেছি স্থাপত্যের নন্দনতত্ত্ব, ব্যবহারিক ও ফলিত দিকগুলো। ডিজাইন ক্লাসে ছিলেন শায়লা শারমিন আর নুসরাত কেয়া ম্যাডাম, যাঁরা অসীম ধৈর্য ও ভালোবাসায় আমাদের দিয়েছেন স্থাপত্যের নানা পথনির্দেশনা। প্রাথমিক ফর্মগুলো, যেমন বিন্দু, সরল রেখা, বক্র রেখা, যৌগিক তলের কম্পোজিশন করেছি আমরা। পিক্সেল, টেক্সচারের মতো বিষয়গুলো নিয়েও কাজ করতে হয়েছে আমাদের।

দ্বিতীয় সেমিস্টার ছিল দ্বিমাত্রিক ফর্মে শেখা সমস্ত কিছু নিয়েই ত্রিমাত্রিক তলে কাজ করার সময়। এই সেমিস্টারটি উল্লেখযোগ্য আর স্মরণীয় ছিল নানা কারণে। এই সেমিস্টার থেকেই প্রথম আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে নানা রকম উপাদান নিয়ে কাজ করতে শুরু করি, সঙ্গে অভিনব ও সৃষ্টিশীল পরিকল্পনা। এই প্রথম বিভিন্ন ফর্মকে ত্রিমাত্রিক মাধ্যমে প্রকাশ করতে গিয়ে আমারা মুখোমুখি হয়েছি নানা চ্যালেঞ্জ, প্রতিকূলতা আর নতুন পরিস্থিতির। এসব সামাল দিতে আমরা শিখেছি অনেক কিছু। আর স্থাপত্যের সুশৃংখল নিয়মতান্ত্রিকতার সঙ্গে শিল্পের নান্দনিকতার স্বাধীনতার যে কী গভীর রকমের সম্পর্ক, তা প্রথম অনুধাবন করেছি এই সেমিস্টারেই। তাই এ সেমিস্টারের প্রতিটি প্রজেক্ট আমাদের সবার জন্য যেমন ছিল চ্যালেঞ্জিং, তেমনি উপভোগ্যও। এ সময়ে আমরা শিখেছি একজন স্থপতির শৈল্পিক, বৈজ্ঞানিক ও মানবিক মানসিকতা থাকাটা কতটা জরুরি।

এই সেমিস্টারে আমাদের ডিজাইনের শিক্ষক ছিলেন অমিত ইমতিয়াজ স্যার। বেশ কয়েক দিন আগেই ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন আয়োজিত বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক হান্টার ডগলাস পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে তাঁর জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাঁধের মধ্যে লোকজ আবাসন কেন্দ্র প্রকল্প। বিরলতম এই সম্মানের অধিকারীদের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে তিনিই প্রথম। প্রচণ্ড সৃষ্টিশীল ও ধীমান এই মানুষটির সঙ্গে আরও ছিলেন নুসরাত কেয়া ও সুমাইয়া মেহজাবীন মৌলি ম্যাডাম। উনাদের পথনির্দেশনায় শুরু হয় চুয়েট স্থাপত্য বিভাগে ২০১৫ ব্যাচের দ্বিতীয় সেমিস্টারের যাত্রা।

প্রথম প্রজেক্ট ছিল ডট কম্পোজিশন। প্রথম সেমিস্টারে আমরা কাজ করেছিলাম দ্বিমাত্রিক বিন্দুর কম্পোজিশন নিয়ে, আর এই প্রজেক্টের লক্ষ্য ছিল ত্রিমাত্রিক ক্ষেত্রে বিন্দুর কম্পোজিশন। আমাদের লক্ষ্য ছিল একটি গোলকের স্ট্রাকচারের ভেতর শোলার তৈরি ডটের কম্পোজিশন। গোলকের স্ট্রাকচারটি হবে পছন্দমতো কোণ তৈরি, আর সেই গোলকের স্ট্রাকচারেও একটা নির্দিষ্ট কম্পোজিশন থাকতে হবে। এ ধরনের প্রজেক্ট সম্পূর্ণ নতুন বিধায় আমাদের জন্য তা ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জিং। শুধু কম্পোজিশন শেখার ব্যাপারই নয়, এই প্রজেক্টে প্রথম একটি গোলকের স্ট্রাকচার তৈরির ব্যাপার ছিল, তাও নিজের নকশা অনুযায়ী। এ ছাড়া নির্দিষ্ট সময়ে সমস্ত উপাদান জড়ো করে পুরো প্রজেক্টটি গড়ে তোলার ব্যাপারও ছিল। এ কাজের জন্য আমাদের যেতে হয় বেতের কিংবা লোহা সারাইয়ের দোকানে, সেখানে লোহার তার কিনে নিজেদের মতো করে তারের কম্পোজিশন করে স্ট্রাকচারটি গড়তে হয়। আবার অনেকেই প্রজেক্টটি করেছিল বেতের কিংবা পারটেক্সের তৈরি গোলক দিয়ে।

আমাদের ছুটতে হয়েছে প্রচুর, শহর ঘুরে বের করতে হয়েছে লোহা ঝালাইয়ের দোকান কিংবা বেতের কারিগরদের চিনতে হয়েছে অনেক নতুন কর্মক্ষেত্র। বেতের কিংবা লোহা ঝালাইয়ের কারিগরদের ডিজাইন বোঝানো থেকে শুরু করে সঠিক মাপের তার নির্বাচন, উপাদানগুলোর মূল্য নির্ধারণ ও দরদাম করে কেনা পর্যন্ত অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে, সঙ্গে সামালও দিতে হয়েছে সবকিছু। রাত জেগে সবাই তৈরি করেছে শোলার বল। শোলা থেকে গোলক তৈরি বেশ কৌশলী হাতের কাজ, আর তার রয়েছে ভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়া। তবুও জীবনে প্রথমবার কাজ করেও সবাই তৈরি করেছে নিখুঁত শোলার বল। আর সবশেষে নির্দিষ্ট সময়ে সবাই জমা দিয়েছে প্রজেক্ট। দ্বিতীয় সেমিস্টারের এই প্রজেক্ট সবার প্রথম আমাদের জানান দিয়েছিল একজন স্থপতির কর্মক্ষেত্র কতটা বিস্তৃত, কতটা বিস্তীর্ণ হতে হয় তাঁর জানার পরিধি। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছিল, আমরা কাজ শেষে অনুযোগ করেছিলাম যে কারিগরদের বোঝাতে অনেক কষ্ট হয়েছে এই ডিজাইনগুলো। তখন স্যার বলেছিলেন, শুধু প্রজেক্ট নয়, এর তৈরির প্রক্রিয়াটিও তোমাদের কাজের একটি অংশ ছিল। কারণ, ভবিষ্যতেও একজন স্থপতিকে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হবে প্রকৌশলী থেকে শুরু করে সবার, আর তাদের নিজের ডিজাইনের ধারণা আর আইডিয়া বুঝিয়ে সফল করতে হবে স্থাপনা তৈরির প্রক্রিয়া।

এরপরে শুরু হয় লাইন কম্পোজিশন বা রেখা কম্পোজিশনের কাজ। এই প্রজেক্টের অভিনব দিক ছিল এই কম্পোজিশনে কনসেপ্ট হিসেবে বেছে নিতে বলা হয়েছিল একটি বিশেষ সংগীতের সুরকে, যার প্রকৃতি আর চলনের ওপর রেখার কম্পোজিশন করতে হবে। সঙ্গে এই প্রজেক্টের উপাদানগুলোও হতে হবে সেই সুরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রত্যেকেই নানা ধরনের সুর বেছে নেয়, আর তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নানা ধরনের উপাদানও খুঁজে বের করতে হয় সবাইকে। এই প্রজেক্টের একটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সংগীতের সুরের নান্দনিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে স্থাপত্যের কম্পোজিশনকে মেলানো, আর তার সঙ্গে নানা ধরনের উপাদান নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে হয়েছে, জানতে হয়েছে কোন পরিস্থিতির সঙ্গে কোন উপাদান যায়। যেমন খুব শান্ত সুরের জন্য একজন ব্যবহার করেছে কাচের নল আর কাচের বেস, রকসংগীতে ধাতব তারের জটিল কম্পোজিশন। একটি প্রজেক্টের কনসেপ্ট ছিল স্ক্যান্ডিনেভিয়ান লোকসংগীত। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার লোকজ জীবন আর ভৌগোিলক রূপরেখার কথা বিবেচনা করে এই প্রজেক্টে আসে রুক্ষ কাঠের বেস আর তা থেকে জন্ম নেয় রুক্ষ আনপলিশড কাঠের রেখা। বাঁশির সুরে মীড় কিংবা গমকের কাজ থেকে কিছু প্রজেক্ট হয় কার্ভ লাইনে কিংবা বক্র রেখায়। বেস ব্যবহারেও অভিনব কিছু কাজ হয়েছে এই প্রজেক্টে। বেসের ওপরেই দাঁড়িয়ে থাকবে কম্পোজিশনÑ এই ধারণা থেকে বেরিয়ে বেসের দুদিকেই স্ট্রেট লাইন দিয়ে কম্পোজিশন করা হয় একটি প্রজেক্টে।

বিন্দু থেকে রেখা, রেখা থেকে তল- এই ধারণা থেকেই আমাদের পরের প্রজেক্ট ছিল প্লেন কম্পোজিশন। একটি নির্দিষ্ট আয়তনের মধ্যে করতে হবে নানা ধরনের প্লেন নিয়ে কম্পোজিশন। আর এই কম্পোজিশনের কনসেপ্ট হতে হবে পৃথিবীখ্যাত স্থপতিদের বিখ্যাত স্থাপনা। সব স্থাপনার মধ্যেই প্রাথমিক কিছু ফর্ম নিয়ে কাজ থাকে। কখনো সেই ফর্ম থেকে জন্ম হয় নতুন ফর্মের, আবার চিরচালিত ফর্ম ভেঙেচুরে তৈরি হয় স্থাপনা। কিন্তু সব স্থাপনাতেই অবধারিতভাবে কিছু প্লেন খুঁজে পাওয়া যায়, আর তা থেকেই কম্পোজিশন। এই প্রজেক্টের জন্য প্রচুর পড়তে হয়েছে, নতুনভাবে বিখ্যাত সব স্থপতিদের নিয়ে জানতে হয়েছে, জানতে হয়েছে তাঁদের কাজ নিয়ে, কোন কোন ফর্ম নিয়ে তাঁরা কাজ করেছেন অথবা কীভাবে ফর্ম ভেঙে নতুন ফর্ম তৈরি হয়েছে, তাও খুঁজে বের করতে হয়েছে। সঙ্গে জানতে হয়েছে স্থপতিদের জীবনযাত্রা নিয়ে, ভাবনা নিয়ে। যেভাবে উঠে এসেছেন লুই কান, রিচার্ড মায়ার কিংবা ফ্রাংক লয়েড রাইটের মতো জগদ্বিখ্যাত স্থপতিরা, তেমনি এসেছেন কার্লোস স্কার্পা, ইতালির অসামান্য সৃষ্টিশীল স্থপতি, বহুকাল যিনি স্বদেশে উপেক্ষিত ছিলেন, আবার ছিলেন ফ্রাংক লয়েড রাইটের প্রশংসাধন্য। এসেছেন ভ ত্রং নিয়ার মতো আধুনিক স্থপতিরাও। বিখ্যাত সব স্থাপনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সব প্লেন কম্পোজিশন প্রস্তুত হয়, যেখানে উঠে আসে সেই স্থাপনাগুলোর বহুমাত্রিকতা। উঠে আসে কার্লোস স্কার্পার আনপলিশড পাথরের স্ল্যাব ব্যবহারের বাতিক থেকে রুক্ষ জং ধরা ধাতব পাতের কম্পোজিশন কিংবা ফ্রাংক লয়েড রাইটের অসামান্য ফলিং ওয়াটারের আদল।

খুব অভিনব একটি উপাদান নিয়ে পরের প্রজেক্টে কাজ করতে হয় আমাদের। প্লাস্টার অব প্যারিস দিয়ে করতে হবে মাস (mass) কম্পোজিশন। এই কম্পোজিশনে আমাদের ফর্ম ছিল ঘনক। এই ঘনকের কম্পোজিশনে সলিড আর ভয়েড হিসেবে একদিকে থাকবে ঘনক, আবার অন্য দিকে থাকবে সেই ঘনক থেকে বের হওয়া কিছু ফর্মের কম্পোজিশন। প্লাস্টার অব প্যারিস নিয়ে কাজ করতে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি প্রতিকূলতার অম্মুখীন হতে হয়েছে আমাদের, যেহেতু এর সঙ্গে পানির সংমিশ্রণে খুব সূক্ষ¥তায় হেরফের ঘটে যায় অনেক কিছুর। অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও শেষ হয় কঠিন এ প্রজেক্টটি।

এরপরে একটি মডিউল কম্পোজিশন করি আমরা। মডিউলের ফর্ম ছিল ত্রিভুজ, আর ত্রিভুজ থেকে নানাভাবে মডিউল বের করে তাদের কম্পোজিশন করাটা ছিল এই প্রজেক্টের মূল উদ্দেশ্য।

মডিউলের পরে আসে কালার প্রজেক্ট। রঙের ব্যবহার জানা স্থপতির প্রধানতম বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি, আর এই ধারণা থেকেই শুরু হয় আমাদের কালার  প্রজেক্ট। কিছু ফর্মের কম্পোজিশনে নির্দিষ্ট রঙের বিভিন্ন শেডকে প্রকাশ ছিল এই প্রজেক্টের উদ্দেশ্য। নিখুঁত কম্পোজিশন যেভাবে শিখতে হয়েছে এই প্রজেক্টে, সেভাবে রঙের শেডগুলোর পার্থক্য গভীরভাবে অনুধাবন করতে হয়েছে আমাদের।

ফাউন্ড ম্যাটেরিয়াল কম্পোজিশন প্রজেক্ট অবধারিতভাবেই আসে সব স্থাপত্য স্কুলে। এরপর আমাদের প্রজেক্ট ছিল ফাউন্ড ম্যাটেরিয়াল নিয়েই, দ্বিতীয় সেমিস্টারের সবচেয়ে অভিনব আর মজার প্রজেক্টগুলোর মধ্যে একটি। এই প্রজেক্ট ছিল ফাউন্ড ম্যাটেরিয়াল বা স্ক্র্যাপ ম্যাটেরিয়াল নিয়ে কোনো একটি কনসেপ্টে থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে একটি কম্পোজিশন তৈরি হবে। তবে উপাদানগুলো সবই হবে ধাতব যন্ত্রাংশ। এই যন্ত্রাংশের খোঁজে সবাই খুঁজে বেড়িয়েছে নানা জায়গা, সারা চট্টগ্রাম শহর, অথবা দল বেঁধে চলে গেছে ভাটিয়ারির জাহাজঘাটায়। শেষে বিভিন্ন ধরনের কনসেপ্টকে প্রতিচ্ছবি করে তৈরি হয় সবার নিজস্ব কম্পোজিশন। তবে কনসেপ্টের ধারণায় এসে এই প্রজেক্ট শুধু স্থাপত্যই নয়, পেরিয়েছে ভাস্কর্যের সীমানাও। এই প্রজেক্ট আমাদের জানিয়েছে শিল্পের সঙ্গে স্থাপত্যের যোগসূত্র কতটা গভীর।

সব প্রজেক্ট শেষ হয়ে আসে ফাইনাল প্রজেক্টের সময়। ফাইনাল প্রজেক্ট হিসেবে আমাদের প্রজেক্টটি ছিল একদম অন্য রকম আর অভূতপূর্ব। এই প্রজেক্টটি ছিল একটি পারফর্মিং প্রেজেন্টেশন। কোনো এক বিখ্যাত মণীষীর জীবনের ঘটনা ও কাজকে স্থাপত্যের বিভিন্ন ফর্মের সাহায্যে আলো আর শব্দের সমন্বয় ঘটিয়ে বিমূর্তভাবে উপস্থাপন করতে হবে মঞ্চে। অনেকটাই নাটকের মতো, আবার চিরাচরিত নাটক নয়। মঞ্চে উপস্থিত থাকবে না জীবন্ত অভিনেতারা, থাকবে ছদ্মবেশী ফর্ম, আলো আর শব্দ। আর সবকিছু মিলিয়ে সৃষ্টি করতে হবে সেই মহামানবের জীবনালেখ্য, যা গোপন থাকবে দর্শকের কাছে। উপস্থাপনা শেষে দর্শক বুঝতে পারবেন কে সেই মহামানব, আর এখানেই প্রজেক্টের সার্থকতা। মণীষীদের মধ্যে ছিলেন লালন সাঁই, আলফ্রেড হিচকক, লিডউইগ ভ্যন বিথোভেন, পাবলো পিকাসো আর প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। প্রজেক্টের শুরু থেকেই প্রতিটি গ্রুপ প্রচুর গবেষণা শুরু করে প্রত্যেক মণীষীকে নিয়ে, তাঁদের জীবনালেখ্য নিয়ে হয় প্রেজেন্টেশন। শুধু তাঁদের জীবনী কিংবা কাজ নয়, জানতে হয় তাঁদের কাজের ধরন, দর্শন আর সৃষ্টিশীলতা নিয়েও। বিটোভেনের অসামান্য সংগীত-ভাবনা, কিংবা হিচককের রহস্যপ্রিয়তা, পাবলো পিকাসোর শিল্পে আধুনিকতার বিবর্তন কিংবা লালন সাঁইয়ের অসামান্য জীবন দর্শনÑ সবকিছুর অলিগলি থেকে ধারণা নিতে হয়েছে প্রতিটি গ্রুপকেই। তার চেয়েও জটিল ব্যাপার ছিল তাঁদেরকে মঞ্চে বিমূর্ত আঙ্গিকে উপস্থাপন। এ জন্য দরকার হয় মঞ্চসজ্জার। এই প্রজেক্টে সবাই প্রচুর পরিশ্রম করেছে, নিজেদের মতো ভেবেছে মঞ্চ সজ্জা কিংবা আলোক সংপাত নিয়ে, নানা এক্সপেরিমেন্ট করেছে শব্দাংশ সংযোজনে। এই প্রজেক্টের সাবমিশন শুধু আমাদের নিজস্ব ছিল না, চুয়েট অডিটোরিয়ামে উপস্থাপিত হওয়া এই প্রজেক্ট ছিল পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি উৎসব। প্রজেক্টের আগের দিন সবাই দিন-রাত খেটেছে অডিটোরিয়ামে, নিজ হাতে তৈরি করেছে প্রতিটি মঞ্চাংশ, পরিচালনা করে গেছে আলোক কিংবা শব্দ সংপাত। সব শেষে পর্দা ওঠে মঞ্চে, প্রত্যেকে তাঁদের প্রজেক্ট অসামান্যভাবে উপস্থাপন করে মঞ্চে। সবচেয়ে বেশি প্রতিকূলতার মুখোমুখি এই প্রজেক্টের জন্যই হতে হয়েছে আমাদের, আর সবচেয়ে বেশি অভিনবত্বও ছিল এখানেই। প্রীতিলতার জীবনীতে বিমূর্ত দৃশ্যাবলি, হিচককে আলো-আঁধারিতে হাড় কাঁপানো শব্দের সঙ্গে জানালা খোলার দৃশায়ন, বিটোভেনের জীবনের চড়াই-উতরাইয়ে পিয়ানোর রিডের দৃশ্যাবলি শেষে পিয়ানোর রিড ছিঁড়ে পড়ে যাওয়া, পিকাসোর জীবনীতে আলো শব্দের অসামান্য সংযোজন আর লালনের মঞ্চায়নে চোখ ধাঁধানো বিমূর্ত ভিজুয়ালাইজেশনÑ সব মিলিয়ে তৈরি হয় অন্য রকম এক পরিবেশ।

স্থাপত্য বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টার আমাদের জানতে শিখিয়েছে স্থাপত্যের পরিধি কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত, শুধু নকশা আঁকা কিংবা স্থাপনার ডিজাইনেই আমাদের মোক্ষ নয়, বিজ্ঞান, শিল্প বিপণন থেকে শুরু করে পার্থিব সব জ্ঞানের সঙ্গে কীভাবে স্থাপত্যের সংযোগ রয়েছে কোনো না কোনোভাবে। অমিত ইমতিয়াজ স্যার, নুসরাত কেয়া আর সুমাইয়া মেহজাবীন মৌলি ম্যাডামের স্নেহ-ভালোবাসা-শাসন ও সঠিক পথনির্দেশনা আর শিক্ষায় এই যাত্রা ছিল স্থাপত্য শিক্ষাজীবনের অপরিবর্তনীয় সংযোজন। শুধু একজন ডিজাইনার হিসেবেই নন, পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে একজন স্থপতির মনন আর কাজ কীভাবে পরিচালিত হবে, তা শিখিয়েছে এই সেমিস্টার। থিওরিতে পেয়েছি সজল চৌধুরী স্যারের মতো স্থাপত্য অন্তঃপ্রাণ মেধাবী এক গবেষককে, পেয়েছি মুস্তাফিজ স্যারের মতো প্রতিভাবান স্থপতি কিংবা সারা ম্যাডাম আর তাজিয়া ম্যাডামের মতো অসাধারণ শিক্ষকদের। শিখতে হয়েছে ফটোগ্রাফি, বিশ্ববিখ্যাত আলোকচিত্রী শোয়াইব ফারুকি স্যার ছিলেন শিক্ষক, অথবা ড্রয়িং ক্লাসে যুবরাজ স্যারÑ সব মিলিয়ে স্থাপত্যের বহুমাত্রিকতা আমাদের মতো নবিশদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে স্থাপত্যের নতুন পৃথিবীর সঙ্গে। এ ছাড়া স্থাপত্য বিভাগের সবার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক সৃষ্টি আর ভাবনা নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে অমিত ইমতিয়াজ স্যারের নেতৃত্বে ২০১৫ ব্যাচের আয়োজনে শুরু হয় স্থাপত্যবিষয়ক মাসিক আড্ডা ‘শেষ রবিবার’। প্রথম আড্ডায় উপস্থিত হয় স্থাপত্য বিভাগের সবাই, খোলা আকাশের নিচে গোল হয়ে বসে, আড্ডায়-গানে-স্মৃতিচারণা আর স্থাপত্যবিষয়ক গল্পে কাটায় একটি অসাধারণ বিকেল।

যাত্রা সবে শুরু হয়েছে আমাদের, এখনো কিছুই শেখা হয়নি, অনেকটা পথ বাকি। তবুও স্থাপত্যজীবনের পাঁচ অধ্যায়ের প্রথম অধ্যায় শেষে আমাদের শিখিয়েছে অনেক কিছুই, স্থাপত্যের বহুমাত্রিক দিক নিয়ে। এই যাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য প্রথম অধ্যায় প্রস্তুত করে দিয়েছে আমাদের, আর এভাবেই সবার সহযোগিতা আর সৃষ্টিশীলতার মেলবন্ধন সামনের বন্ধুর পথ পেরোতে সাহায্য করবে ভীষণভাবে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৩তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৭।

অনুপম হোর
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top