জেনটিং হাইল্যান্ড রিসোর্ট ‘ওয়ার্ল্ড জেনটিং’ নামেও খ্যাত। জেনটিং হাইল্যান্ডের নির্মাতা মালয়েশিয়ার জেনটিং গ্রুপ। অনেক মালয়েশিয়ানের কাছে জেনটিং রিসোর্ট অবকাশ যাপনে সবচেয়ে পছন্দের জায়গা। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের আগত যেসব পর্যটক তীব্র গরম ও আর্দ্র পরিবেশ থেকে খানিকটা সময়ের জন্য দূরে থাকতে চান, তাঁদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় জায়গা এটি। এখানকার তাপমাত্রা ১৬ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা অনেকটাই শীতল পরিবেশ কুয়ালালামপুরবাসীর কাছে। জেনটিং হাইল্যান্ডে রয়েছে বৃহৎ আকৃতির বেশ কিছু হোটেল, যেখানে ইচ্ছা করলেই খুব কম খরচে থাকা যায়। এখানকার হোটেলের ভাড়া সাশ্রয়ী হওয়ায় এ অঞ্চলের একমাত্র ক্যাসিনোর অবস্থান এখানে, যা লাসভেগাসের ক্যাসিনোর ক্ষুুদ্র সংস্করণ বললেও ভুল হবে না। এ ছাড়া রয়েছে বিশাল আকৃতির থিম পার্ক। ছোট বাচ্চাসহ পরিবারের অবসর বিনোদনের উপযুক্ত স্থান এটি। জেনটিং হাইল্যান্ড সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় এক হাজার ৭৬০ মিটার ওপরে অবস্থিত। এখান থেকে পুরো কুয়ালালামপুর শহরের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যায়।
জেনটিং রিসোর্টের গড় উচ্চতা প্রায় এক হাজার ৭৪০ মিটার বা পাঁচ ৭১০ ফুট। অবস্থান টিটিওয়াংশা পর্বতমালায়। রিসোর্ট ওয়ার্ল্ড জেনটিং পরিচালিত হয় জেনটিং মালয়েশিয়ার বাহাদ দ্বারা। আগে যা রিসোর্ট ওয়ার্ল্ড বাহাদ নামে পরিচিত ছিল। গাড়িতে চড়ে এক ঘণ্টায় কুয়ালালামপুর শহর থেকে এখানে সহজেই পৌঁছানো যায়। তা ছাড়া জেনটিং স্কাইওয়ে দিয়ে কেবল কারের মাধ্যমে ৩ দশমিক ৩৮ কিলোমিটার বা ২ দশমিক ১০ মাইল দূরত্ব স্বল্পসময়ে অতিক্রম করা যায়।
যা যা থাকছে
গেনটিং হাইল্যান্ডের পেছনের কথা
টান শি লিম গো টং-এর মাথায় আসে কুয়ালালামপুরের কাছে হিল রিসোর্ট নির্মাণের। ১৯৬৫ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি জেনটিং হাইল্যান্ড বাহাদ নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। টান শি লিম ১৯৬৫ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে ১২ একর বা চার হাজার ৯০০ হেক্টর জমি পাহাং এবং দুই হাজার ৮০০ একর বা এক হাজার ১০০ হেক্টর জমি সিলাঙ্গর রাজ্য সরকারের কাছ থেকে ব্যবহারের অনুমোদন নেন। ১৯৬৫ সালের ১৮ আগস্ট একদল দক্ষ নির্মাণ প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধানে গঠিত নির্মাণকারী দল জেনটিং হাইল্যান্ডের সংযোগকারী রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু করে। ১৯৬৯ সালের ৩১ মার্চ মালয়েশিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী টিংকু আবদুর রহমান পাইওনিয়ার হোটেলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। একই সঙ্গে জেনটিং হাইল্যান্ডের জন্য নির্মিত সংযোগ সড়কের উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী জেনটিং গ্রুপের একক প্রচেষ্টায় মালয়েশিয়াবাসীর জন্য পাহাড়ে রিসোর্ট নির্মাণে খুব খুশি হয়ে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
১৯৭১ সালে জেনটিং হাইল্যান্ডের প্রথম হোটেল হাইল্যান্ডের নির্মাণকাজ শেষ হয়। বর্তমানে যা থিম পার্ক হোটেল নামে পরিচিত। জেনটিং হাইল্যান্ড রিসোর্টে ১৯৭১ সালের প্রথম হোটেল নির্মাণের পর জায়গাটি ব্যাপক আকারে পর্যটকপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৯৭ সালে জেনটিং হাইল্যান্ড রিসোর্ট, জেনটিং স্কাইওয়ে, কেব্ল কার সংযোগের মাধ্যমে তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে। জেনটিং স্কাইওয়ে দিয়ে কেব্ল কারের মাধ্যমে ৩.৩৮ কিলোমিটার বা ২ দশমিক ১০ মাইল পথ অতিক্রম করে খুব সহজেই পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানো যায়। জেনটিং স্কাইওয়ে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতিসম্পন্ন মনোকেব্ল কার, যার গতি প্রতি ঘণ্টায় ২১ দশমিক ৬ কিলোমিটার বা ১৩ দশমিক ৪ মাইল।
জেনেটিং রিসোর্টে সর্বমোট হোটেল রয়েছে পাঁচটি। এর মধ্যে ফাস্ট ওয়ার্ল্ড হোটেল ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বড় হোটেল হিসেবে বিবেচিত হয়। হোটেলটিতে রয়েছে মোট ছয় হাজর ১১৮টি কক্ষ। এ ছাড়া রয়েছে-
আবাসস্থল
- জেনটিং গ্র্যান্ড (আগে জেনটিং হোটেল নামে পরিচিত ছিল)।
- মাক্সিম জেনটিং হোটেল (আগে হাইল্যান্ড হোটেল নামে পরিচিত ছিল)।
- রিসোর্ট হোটেল।
- থিম পার্ক হোটেল।
- ফাস্ট ওয়ার্ল্ড হোটেল (জেনেটিং সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বের চতুর্থ সর্ববৃহৎ হোটেল)।
জেনটিং স্কাইওয়ে
জেনেটিং স্কাইওয়ে কুয়ালা কুবু ভারু সিলাঙ্গরে অবস্থিত। একটি মনোকেব্ল কার যা ভ্রমণকারীদের জেনটিং হাইল্যান্ড রিসোর্টে পৌঁছে দেয়। এর সবচেয়ে নিচের স্টেশন ঘটং জায়া এবং সবচেয়ে উঁচু স্টেশন জেনটিং হাইল্যান্ড রিসোর্টের হাইল্যান্ড হোটেল।
- আকর্ষণ বা সুবিধাসমূহ
- জেনেটিং রিসোর্টে রয়েছে চারটি পারফরমেন্স ভেন্যু-
- এরিনা অব স্টারস।
- জেনটিং ইন্টারন্যাশনাল শোরুম।
- জেনটিং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টার।
- ফাস্ট ওয়ার্ল্ড প্লাজা।
ইনডোর থিম পার্ক রাইড
বাচ্চাদের রাইডসমূহ-
- ক্যারোসেল।
- জুনিয়র বাম্পার কার।
- রাইড দ্য প্যারিস।
- বিজি বাগস।
- সার্কাস রাইড।
- ফানল্যান্ড।
পারিবারিক রাইড
- মিনি ট্রেন।
- রেইনডিয়ার ক্রুইজ।
- মনোরেল।
- ভেনিস গানডোলা।
- রিও ফ্লয়েট।
থ্রিল রাইডস
- ইউরো এক্সপ্রেস।
- অ্যাডাল্ট বাম্পার কার।
- ৪উ মোশন মাস্টার।
ভিডিও গেমস পার্ক
- ফ্যান্টাসি ওয়ার্ল্ড।
- ভিশন সিটি।
অন্য আকর্ষণসমূহ-
- জেনটিং স্কাই ভেনচার।
- স্নো ওয়ার্ল্ড।
- রেইন ফরেস্ট স্প্যাশ পুল।
- স্নোকার সেন্টার।
বিশেষত্ব
জেনটিং হাইল্যান্ডের হোটেল, পার্ক, শপিংমলের অবস্থান সুন্দরভাবে সন্নিবেশিত। জেনটিং রিসোর্ট থেকে নিম্নমুখী সিঁড়ি দিয়ে খুব সহজেই ক্যাসিনো ও থিম পার্কে যাওয়া যায়। ফাস্ট ওয়ার্ল্ড প্লাজার ফুড কোর্ট ও রেস্টুরেন্টে খাবারের ভিন্নতার শেষ নেই। যে কেউ নিজের পছন্দ অনুযায়ী খাবার পছন্দ করে এখান থেকে কম খরচে খেতে পারবে। প্রতিটা হোটেলের আলাদা আলাদা পার্কিংব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে প্রচুর পরিমাণে গাড়ি পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা আছে।
ফাস্ট ওয়ার্ল্ড হোটেল
জেনটিং হাইল্যান্ডের ফাস্ট ওয়ার্ল্ড হোটেল বিশ্বের সর্ববৃহৎ হোটেলের অন্যতম। হোটেলটিতে সর্বমোট কক্ষ রয়েছে ছয় হাজার ১১৮টি, যা দুটি টাওয়ারে বিভক্ত। প্রতিটি টাওয়ারে রয়েছে ২৩টি করে ফ্লোর। হোটেলটিতে ছয়টি ভিন্ন ধরনের কক্ষের ব্যবস্থা রয়েছে। যথা- স্ট্যান্ডার্ড রুম, স্ট্যান্ডার্ড ভিউ, ডিলাক্স, ডিলাক্স ভিউ, সুপার ডিলাক্স রুম ও ওয়ার্ল্ড ক্লাব। সুপার ডিলাক্সের থেকে নিম্নমানের কক্ষগুলোতে মিনিবার, চুল শুকানো মেশিনসহ কোনো ধরনের রুম সার্ভিসের ব্যবস্থা নেই। ওয়ার্ল্ড ক্লাব মানের কক্ষগুলোতে বিশ্বের ভালো হোটেলের মতো সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার সুব্যবস্থা রয়েছে। হোটেলটিতে রুমের সংখ্যা বৃদ্ধি করার জন্য প্রকৌশলীদের রুমসমূহের আকার-আকৃতি অনেকাংশে ছোট করতে হয়েছে। এখানকার সবচেয়ে ছোট রুমের সাইজ ২০৭ বর্গফুট। হোটেলের রুমের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় অতিথিদের চেক-ইন করার জন্য প্রায় এক থেকে দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তাই এখানে আগত অতিথিদের রুম হারিয়ে ফেলা, রুম পাল্টে যাওয়া নিয়মিত ঘটনা।
বিনোদন পার্ক এবং অন্যান্য আকর্ষণ
জেনটিং হাইল্যান্ড মূলত স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশিত বিনোদনকেন্দ্র। আনন্দ, বিনোদনের জন্যই লোকেরা এখানে মূলত ভ্রমণ করতে আসে, তা ছাড়া অনেকে আবার কুয়ালালামপুর শহরের গরম থেকে কিছু সময়ের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে এখানে চলে আসে। সম্পূর্ণ জায়গাটি হোটেলে পরিপূর্ণ। হোটেলগুলো বিনোদন পার্ক ও ক্যাসিনো দ্বারা অতিথিদের যত দূর সম্ভব বিনোদিত করে থাকে। জেনটিং হাইল্যান্ডে মোট তিনটি বিনোদন পার্ক রয়েছে। একটি আউটডোর ও ইনডোর বিনোদন পার্ক আর অন্যটি ওয়াটার পার্ক, যা একত্রে মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় থিম পার্ক হিসেবে বিবেচিত। হাইল্যান্ডের মূল থিম পার্ক ছাড়াও অন্যান্য বিনোদনব্যবস্থা রয়েছে; যেমন- ভিডিও গেমস, তির নিক্ষেপ, দেয়াল বেয়ে ওঠা, স্নোকার, বোলিং, স্কাই ড্রাইভিং প্রভৃতি।
লাসভেগাস মালয়েশিয়াতে
জেনটিং হাইল্যান্ড জুয়াড়ু ও জুয়াখেলার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। সম্পূর্ণ ক্যাসিনো দে জেনটিং কমপ্লেক্সে রয়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ক্যাসিনো ও বার। কিছু ক্যাসিনোর পরিবেশ অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। আবার কিছু ক্যাসিনোর পরিবেশনা শুধু জুয়াড়িদের জন্য। ক্যাসিনোগুলোতে রয়েছে সর্বমোট তিন হাজার মেশিন এবং ৪২৬টি টেবিল, যা দিন রাত ২৪ ঘণ্টা সর্বসাধারণের জন্য খোলা থাকে। এখানে কেউ জুয়া খেলতে চাইলে প্রথমে তাকে ওয়ার্ল্ড কার্ড পেতে হবে। যখন কেউ মেশিন ব্যবহার করতে চায়, তখন তাদের এই ওয়ার্ল্ড কার্ড এখানে প্রবেশ করাতে হয়। এই ওয়ার্ল্ড কার্ড পেতে হলে অবশ্যই পাসপোর্ট সঙ্গে আনতে হবে।
বিশেষ অনুষ্ঠান প্রদর্শনী
জেনটিং হাইল্যান্ড এমন একটি জায়গা, যেখানে পৃথিবীর নামকরা বিশেষ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন তারকারা নিয়মিত অনুষ্ঠান পরিবেশন করে থাকে। বিশ্বখ্যাত অনেক ব্যান্ড মালয়েশিয়ার জেনটিং হাইল্যান্ডে বিভিন্ন সময়ে পারফর্ম করে গেছে। যাদের পপসংগীতের রয়েছে বিশেষ দখল। এ ছাড়া হলিউড ও বলিউডের নামকরা সব পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান এখানে নিয়মিত হয়ে থাকে। অদূর ভবিষ্যতে এর সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আয়োজকদের বিশ্বাস।
ফাস্ট ওয়ার্ল্ড প্লাজায় কেনাকাটা
বিশাল শপিং কমপ্লেক্সের প্রথম ফ্লোরে বিভিন্ন ধরনের পণ্য বিক্রির জন্য রয়েছে সারি সারি দোকান। এখানে প্রচলিত দোকানে অলংকার, কাপড়, জুতা-স্যান্ডেল বিক্রি করা হয়। এখানে বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট ছাড়াও বার্গার কিং, কেএফসি, পিৎজ্জা হার্ট, ম্যাকডোনাল্ডের মতো ফাস্টফুডের দোকান রয়েছে। এ ছাড়া এখানে রয়েছে নামকরা কফিশপ ও চায়ের দোকান। ফাস্ট ওয়ার্ল্ড প্লাজায় কেনাকাটা করা ছাড়াও রয়েছে বিশেষ বিনোদনের ব্যবস্থা।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
জেনটিং হাইল্যান্ড কোথায় অবস্থিত?
জেনটিং হাইল্যান্ড মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অবস্থিত।
জেনটিং হাইল্যান্ড কি একটি শহর?
না। জেনটিং হাইল্যান্ড কোন শহর নয়। এটি মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অবস্থিত একটি পাহাড়ী রিসোর্ট। এটি একটি শহরের মতো বিশাল আয়তনের একালাজুড়ে বিস্তৃত।
জেনটিং হাইল্যান্ডে কি কি আছে?
জেনটিং হাইল্যান্ডে আছে ইনডোর এবং আউটডোর থিম পার্ক। এছাড়াও ক্যাসিনো, কনসার্ট আয়োজনের ব্যবস্থাসহ মাল্টিমিডিয়া ভেন্যুও রয়ছে জেনটিং হাইল্যান্ডে।
কেন ঘুরতে যাবেন জেনটিং হাইল্যান্ডে?
১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়ার দূরদর্শী ব্যবসায়ী লিম গোহ টং প্রতিষ্ঠা করেন জেনটিং হাইল্যান্ড। অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই বিনোদন কেন্দ্রে রয়েছে অনেক অ্যাডভেঞ্চারাস স্পট। আপনি যদি অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী হোন তবে অবশ্যই ঘুরতে যাবেন জেনটিং হাইল্যান্ডে। এছাড়াও স্থানীয় অনেক সংস্কৃতির মেলবন্ধ জেনটিং হাইল্যান্ড।
sahn7022@gmail.com
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৫৫তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৪