শীতে অন্দরের উষ্ণতায়

শীতের বনে কোন সে কঠিন আসবে বলে,
শিউলিগুলি ভয়ে মলিন বনের কোলে

খুব সকালে এমন একটি রবীন্দ্রসংগীতে ঘুম ভাঙে অনেকেরই। স্বভাবতই যাঁদের প্রিয় ঋতু শীত। কিন্তু এ সময় প্রকৃতিতে যে পরিবর্তন আসে, তার ছোঁয়া পোশাকের পাশাপাশি ছুঁয়ে যায় ঘরের সাজসজ্জায়ও। বিভিন্ন রঙের, নানা ধাঁচের শীতের পোশাক পরে নিজেকে যেমন মানানসইভাবে উপস্থাপন করা যায়, তেমনি নানা রঙে রাঙিয়ে তোলা যায় ঘরের প্রতিটি গৃহকোণকে। একটা সময় ছিল যখন মানুষ নিজের ঘরের সাজসজ্জার দিকে এত সূক্ষ্মভাবে মনোযোগ দিত না। কিন্তু বর্তমানে ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের শৈল্পিক চিন্তাকে কাজে লাগিয়ে নিজ অন্দরমহলকে সাজাতে ব্যস্ত গৃহিণীরা। এখন ঋতু ও উৎসবভিত্তিক সাজসজ্জা শুধু যে পোশাকেই তা নয়, বিছানার চাদর থেকে শুরু করে ঘরের পর্দা, কুশন কভার, কার্পেটÑ সবকিছুতেই থাকে থিম-ভিত্তিক সজ্জাবিন্যাস।

এক্সটেরিয়র ইন্টেরিয়র প্রাইভেট লিমিটেডের কান্ট্রি ডিরেক্টর উম্মে কুলসুম বিনতে মোস্তফা যেমনটা বলছিলেন, ‘যাঁরা ঘর সাজাতে ভালোবাসেন এবং যাঁদের মধ্যে রয়েছে সৃজনশীল চিন্তাভাবনা, তাঁরা খুব সহজেই নিজস্ব অন্দরমহলকে বদলে ফেলতে পারেন হাতের নিপুণ ছোঁয়ায়। ঘরের চেহারা বদলে দিতে পর্দা, দেয়াল, আসবাবের সবকিছুতে পরিবর্তন আনুন। খুব কম খরচে আপনার হাতের কাছের বিভিন্ন জিনিস দিয়েও আপনি সহজেই আপনার ঘরের ভেতরটা বদলে দিতে পারেন। শীতকে সামনে রেখে বদল আনুন ঘরের অন্দরমহলে।’

পর্দায় ঝিলিক

ঘরের দৃশ্যপট দ্রুত পরিবর্তন করতে পর্দার জুড়ি নেই। যেহেতু শীতকাল, সেহেতু পর্দার ক্ষেত্রে উজ্জ¦ল রংকে প্রাধান্য দিন। বসার ঘরের জন্য লাল, কমলা, সোনালি, বেগুনি রং থাকবে প্রাধান্যের তালিকায়। বসার ঘর অতিথি আপ্যায়নের জায়গা, তাই বসের ঘরের পর্দায় একটু আভিজাত্যের ছোঁয়া থাকলে ভালো। যেহেতু শীতকাল, তাই চাইলে দুই লেয়ারের পর্দা ব্যবহার করে দিতে পারেন ভিন্নতার ছোঁয়া। খাবার ঘরের পর্দার ক্ষেত্রে উজ্জ্বল সবুজ, উজ্জ্বল কমলাÑ এ ধরনের রং বেছে নিন। শোবার ঘর যেহেতু আপনার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা, তাই এ স্থানের গুরুত্ব অনেক। বিশ্রাম নেওয়ার জায়গাটি যদি মনের মতো না হয়, তাহলেই ঘটে যত বিপত্তি। তাই শোবার ঘরের পর্দার ক্ষেত্রে আপনার পছন্দের রংকে গুরুত্ব দিন। কিন্তু মনে রাখবেন, শোবার ঘরের জন্য আদর্শ রং হলো নীল, আকাশি, অ্যাশ, উজ্জ¦ল বেগুনি। শীতের দিনে খুব সহজেই গাঢ় রং পছন্দের তালিকায় রাখতে পারেন। আপনার ছোট্ট সোনামণির ঘরটিকে রঙিন ভুবনে রাঙিয়ে তোলার এই তো সময়। যেকোনো উজ্জ¦ল রংই প্রাধান্য দিতে পারেন তাদের ঘরটিতে। চাইলে দুই-তিনটা রঙের সংমিশ্রণে রাঙিয়ে তুলতে পারেন সোনামণির ঘরটি। যেহেতু বাচ্চার ঘর সেহেতু অবশ্যই ভারী পর্দা ব্যবহার করুন। সম্ভব হলে দুই লেয়ার পর্দা ব্যবহার করুন। এতে ঠান্ডার হাত থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পাওয়া যাবে। যাঁরা দিনের বেলায় দীর্ঘ সময় ঘুমোতে পছন্দ করেন, তাঁরা ভারী ও দুই লেয়ারের পর্দা ব্যবহার করতে পারেন।

রঙিন দেয়াল

একেকটি রং একেকটি অভিব্যক্তির প্রকাশ। রং সৌন্দর্যের আরেক মাত্রা। তাই অন্দরমহল সজ্জায় রং নিয়ে হয় নানা খেলা। আপনার আবাস মনের রঙে সাজাতে আপনার পাশে রয়েছে নামকরা বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। যারা ইলুয়েশন আর পেইন্ট দিয়ে ঘরকে সাজিয়ে তুলছে মনের মতো রঙে। রিভার্টি ক্যাটাগরিজে রঙের সঙ্গে ব্যবহার করা হয় ভিন্ন ধরনের ম্যাটেরিয়াল। এ ছাড়া আরবান ক্যাটাগরিজের ডিজাইনগুলো হয় একটু শাইনি। আপনার বসার ঘর, লিভিং রুমের জন্য আপনি ভার্টিক্যাল ক্যাটাগরিজের ডিজাইন পছন্দ করতে পারেন। এসব ডিজাইনের উজ্জ¦ল রং ঘরকে প্রাঞ্জল করে তোলে। ডাইনিং প্লেসের জন্য কমলা রং স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করা যায়। বেডরুমের জন্য ভ্যালেন্টাইন ক্যাটাগরিজের মধ্যে হালকা নরম রং ব্যবহার করা যেতে পারে। যেহেতু এখন চারদিকে বিয়ের উৎসব। আপনার ঘরেও যদি থাকে এ ধরনের কোনো উৎসবের আয়োজন সে ক্ষেত্রে ব্রাইডাল ক্যাটাগরিজে লাল রংকে প্রাধান্য দিন। শিশুরা সব সময়ই কল্পনাপ্রবণ। কল্পনার রাজ্যেই তাদের বসবাস। যেহেতু ঘরেই কাটে তাদের বেশির ভাগ সময়, তাই তাদের ঘরকে কল্পনার রাজ্য বানাতে থিম-ভিত্তিক ইলুয়েশন বেছে নিন; যেমন- মেঘ, সূর্য, মাছ, পানির নিচের দৃশ্য, প্রাকৃতিক দৃশ্য অথবা কোনো রূপকথার চরিত্র। তবে গাঢ় রং দেয়ালে ব্যবহার করার আগে অবশ্যই কোনো দক্ষ ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের পরমার্শ নিন। কারণ, ভুল জায়গায় ভুল রঙের ব্যবহারে ঘটতে পারে বিপত্তি।

কুশন ভূষণ

বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের কুশনের ব্যবহার আজকাল পছন্দের তালিকায় রয়েছে অনেকেরই। বসার ঘর থেকে শোবার ঘর পর্যন্ত, সব জায়গাতেই কুশনের ছড়াছড়ি সহজেই চোখে পড়ে। যেহেতু শীত, তাই উজ্জ্বল রঙের কুশন কভার ঘরের সাজসজ্জা বদলে দেবে সহজেই। খাদি কাপড়, ক্রশকাঁটার কাজ, হাতের কাজের কুশন কভার তা যেটাই আপনি পছন্দ করেন না কেন। লক্ষ রাখবেন সেটা যেন ঘরের পর্দা, বেড কভার, সোফা কভারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে। আপনার পুরোনো শাল ফেলে না দিয়ে তা দিয়েও তৈরি করে নিতে পারেন নানা রঙের নানা ধরনের কুশন কভার। এ ছাড়া শাল দিয়ে আপনি বানিয়ে নিতে পারেন টেবিল রানার, টেবিল ম্যাট প্রভৃতি। যেহেতু শীত, তাই মেঝেতে বসার ব্যবস্থার জন্য ঘরের মেঝেতে বড় সাইজের কুশন ব্যবহার করুন। বাচ্চাদের ঘরে বিভিন্ন শেপের কুশন ব্যবহার করুন। এতে ঘরটি হয়ে উঠবে আরও বেশি আকর্ষণীয়। কুশনের পাশাপাশি এগুলো বাচ্চাদের খেলনা হিসেবেও ব্যবহার করতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে মরিচ, মাছ, টমেটো, গাজর, চাঁদ, তারা বিভিন্ন কিছুর আদলে কুশন নির্বাচন করুন বাচ্চাদের ঘরের জন্য। আজকাল বিভিন্ন বুটিক হাউসে পাওয়া যাচ্ছে নানা ধরনের কুশন ও কুশন কভার। ঋতু অনুযায়ী আপনার পছন্দের কুশনটি বেছে নিয়ে নান্দনিকতার ছোঁয়া দিন আপনার অন্দরমহলে।

মেঝের ব্যবহার

মনে রাখবেন, বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের কার্পেট, মাদুর ব্যবহার করা ভালো। যেহেতু শীত, তাই মেঝের ঠান্ডাভাব কমাতে এগুলোর জুড়ি নেই। বসার ঘরের জন্য সিনথেটিক কার্পেট ব্যবহার করুন। লক্ষ রাখবেন, বসার ঘরের কার্পেট যেন অন্যান্য ঘরের তুলনায় একটু বড় হয়। ঘরের আসবাবের সঙ্গে মিল রেখে কার্পেট নির্বাচন করুন। ঘরে যদি আধুনিক ফার্নিচার বা আসবাব থাকে, সে ক্ষেত্রে সিনথেটিক কার্পেটই বেশি মানানসই। আর ঘরের আসবাব যদি দেশীয় ধাঁচের হয়, সে ক্ষেত্রে শতরঞ্জি ব্যবহার করুন। শতরঞ্জির রং ঘরের পর্দার সঙ্গে মিলিয়ে রাখুন। শোবার ঘরের কার্পেট খাটের পাশেই রাখুন, যাতে সকালে ঘুম থেকে উঠেই মেঝেতে ঠান্ডাভাব অনুভূত না হয়। বাচ্চাদের ঘরে সম্ভব হলে পুরো ঘরে কার্পেট বিছিয়ে দিন। এতে মেঝের ঠান্ডাভাব থেকে মুক্তি মিলবে, সেই সঙ্গে বাচ্চাদের ঠান্ডা লাগবে না। প্রতিটি রুমের প্রবেশমুখে ম্যাট বিছিয়ে দিন। ঘরের কাপের্ট, ম্যাট কেনার সময় ঘরের আয়তন, ঘরের বৈশিষ্ট্যকে মাথায় রেখে নির্বাচন করুন।

লাইটিং

শীতের দিনে সূর্যের আলো পাওয়া যায় স্বল্প পরিমাণে। এ অল্প আলোকেও ব্যবহার করে আলোকিত করা যেতে পারে আপনার পুরো ঘরটিকে। সে জন্য ঘরের যে স্থানটিতে আলো পড়ছে, সেখানে সুবিধামতো আয়না স্থাপন করে রিফ্লেক্টের মাধ্যমে আলো ছড়িয়ে দিতে পারেন সর্বত্র। এ সময় ন্যাচারালের তুলনায় ঘরে কৃত্রিম আলোর ওপর বেশি নির্ভর করতে হয় বলে লাইটিংয়ের মাধ্যমে ঘরের পরিবেশে আনতে পারেন উষ্ণতার আমেজ। বাজারে আজকাল নানা ধরনের, নানা সাইজ ও রঙের ল্যাম্পশেড পাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে বেডরুমের লাইটিংয়ের জন্য ওয়ার্ম আলো যেমন- হলুদ, লাল, কমলা, বেগুনি ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। বেডরুমের বেডের হেড রেস্টের দুই পাশে অথবা সাইড দিয়ে লাইটিং সিস্টেম করতে পারেন। ঘরের কোণে এক কর্নারে অথবা বেডসাইড টেবিলের ওপর রেখে দিতে পারেন ডেকোরেটিভ ল্যাম্পশেড। তা ছাড়া বেডের ওপর অথবা এক কর্নারে ফলস সিলিং ডিজাইন করে সেখানে বিভিন্ন ধরনের লাইট ব্যবহার করে তৈরি করতে পারেন অসাধারণ এক পরিবেশ। দেয়ালে ব্যবহার করতে পারেন ওয়াল মাউন্ট লাইট। ডাইনিং স্পেসের আলো সাধারণত সলিড হয়। তাই স্যান্ডেলিয়ার ও বিভিন্ন ধরনের ল্যাম্পের ব্যবহার করে রুমে আনা যেতে পারে বৈচিত্র্য। ডাইনিং টেবিলকে সাজানো যেতে পারে বর্ণিল সব প্লেট-গ্লাসে। সঙ্গে যদি মোমের আলো থাকে, তবে তো কথাই নেই। অসাধারণ একটা পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে এই ক্যান্ডেল লাইট ডিনারে। বসার ঘরের একপাশ বেছে নিতে পারেন ডেকোরেশনের জন্য। সেই কর্নারে বিভিন্ন ধরনের মাটির পটারির সঙ্গে রাখতে পারেন বাঁশ ও বেতের ল্যাম্প শেড। আর ফ্লোরে বড় গামলাতে ফুলের পাপড়ি দিয়ে তাতে ছেড়ে দিন ফ্লোটিং মোমবাতি। ফলস সিলিং করে স্পটলাইটের মাধ্যমে কর্নারগুলোকে আলোকিত করে তৈরি করতে পারেন আলো-আঁধারের খেলা। প্রয়োজনে সিলিং থেকে ঝুলিয়ে দিতে পারেন বিভিন্ন ধরনের ঝুলন্ত লাইট। সামান্য এই পরিবর্তন যেমন আরামদায়ক, উপভোগ্য তেমন নান্দনিক ও আভিজাত্যের ছাপবাহী।

প্রয়োজনীয় টিপস

  • কার্পেট ঘরের উষ্ণতা বাড়িয়ে দেয়। সৃষ্টি করে প্রচুর ধুলার। তাই এক সপ্তাহ পর পর ঘরের কার্পেট উঠিয়ে ঝেড়ে তা বিছিয়ে দিন।
  • শীতে দুই সেট পর্দা থাকা ভালো। যাতে ময়লা হলে খুব সহজেই পাল্টে ফেলা যায়। কারণ, শীতে কাপড় সহজে শুকাতে চায় না।
  • শীত এলেই বেড়ে যায় কার্পেটের ব্যবহার। উলেন, হ্যান্ড মেইড উলেন, অ্যাক্রেলিক, পিভিসি ইত্যাদির নানা ধরনের কার্পেট পাওয়া যায় বাজারে। ঘরের রং, পর্দা, কুশন ও বেড কভারের সঙ্গে মিল রেখে বাছাই করুন কী ধরনের এবং কী রঙের কার্পেট আপনি নির্বাচন করবেন।
  • দেয়ালের রং করানোর সময় লক্ষ রাখবেন যেন সেটা খুব বেশি কটকটা রং না হয়। কারণ, শীত আমাদের এখানে বেশি সময় থাকে না, তাই এমন রং নির্বাচন করুন, যেটা গরমের দিনে যেন অস্বস্তির কারণ না হয়ে ওঠে।
  • শীতের দিনে যেহেতু পাতা ঝরে যায়, তাই ঘরের ইনডোর প্লান্টসগুলো সরিয়ে আর্টিফিসিয়াল ফুলগাছ দিয়ে ঘরকে সাজান।
  • শোবার ঘরের বিছানার লেপ, কাঁথা, কম্বল যা-ই থাকুক না কেন, সেগুলো সুন্দরভাবে ভাঁজ করে রাখুন। এগুলোকে বিছানার একদিকে জ্যামিতিক নকশা যেমন চতুর্ভুজ, ত্রিভুজ, আয়তাকার আকৃতিতে ভাঁজ করে রাখতে পারেন।
  • শীতের দিনে বিছানা গরম রাখতে ব্যবহার করতে পারেন খাদি চাদর। কারণ, খাদির কাপড়ে ওম ওম ভাবটা যেন বেশি থাকে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৯তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৬

ফারজানা গাজী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top