অন্দরসাজে নতুনত্ব আনতে হাল ফ্যাশনে যোগ হয় কত-না অনুষঙ্গ। তবে কিছু ট্রেন্ড চলে আসছে সেই অনাদিকাল থেকে। যেমন: কাঠ, পাথর বা মাটির ভাস্কর্য, টেরাকোটা, ফুলদানি, পোর্ট্রেট প্রভৃতি। প্রকৃতিকে ঘরে আনার প্রচেষ্টা সৌন্দর্যপ্রিয় সবারই। তাই তো সে চাই ফুল, লতা, গাছকে ঘরে এনে সাজাতে। আর তাই আসবাব, দামি কার্পেট, শো-পিসের পাশাপাশি মাটির ফুলদানিও রয়েছে ঘরের সৌন্দর্যবর্ধনকারী উপকরণের তালিকায়। তা ছাড়া দামে সাশ্রয়ী হওয়ায় খুব একটা বেগ পেতে হয় না রংবেরঙের ফুলদানি দিয়ে ঘর সাজাতে। তাই আপনিও মাটির এই শৈল্পিক অনুষঙ্গ দিয়ে আকর্ষণীয়ভাবে সাজাতে পারেন আপনার অন্দর।
সুন্দরভাবে ঘর সাজাতে গেলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রুচিবোধের। এরপর যার যার আর্থিক সামর্থ্যরে। তবে যেকোনো শ্রেণির মানুষেরই সামর্থ্য রয়েছে মাটির তৈরি ফুলদানি দিয়ে ঘর সাজানোর। উপহার কিংবা গৃহসজ্জার উপকরণ হিসেবেই হোক মাটির ফুলদানি বেশ সমাদৃত দুটি ক্ষেত্রেই। শুধু ফুল রাখার পাত্র হিসেবেই নয়, শো-পিস হিসেবেও মাটির ফুলদানির রয়েছে সমান কদর। অন্দরসজ্জার ভিন্নমাত্রা যোগ করার পাশাপাশি মাটির ফুলদানি যুগ যুগ ধরে বাঙালি ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে। চলুন, জেনে নেওয়া যাক সাধ ও সাধ্যের সমন্বয়কারী এই অনুষঙ্গটির টুকিটাকি-
আকার-আকৃতি ও নকশা সমাচার
ছোট, মাঝারি ও বড় সব আকারেরই ফুলদানি পাওয়া যায় বাজারে। কিছু ফুলদানির গায়ে খোদাই বা রিলিফের কাজ করা থাকে, যা হালকা বা গাঢ় রঙে পোড়ানো। কিছু ফুলদানিতে গাঢ় রঙের জরির কাজ করা থাকে। তা ছাড়া টুকরো টুকরো আয়না বসানো বর্ণিল ফুলদানিও বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে অধুনা। প্লেন ফুলদানিতে অ্যাম্বুসের ফুল ও লতাপাতার কাজও চোখে পড়ে ফুটপাত ও বিপণিবিতানগুলোতে। সাধারণত পোড়ানো লালচে রঙের ফুলদানির কদর বেশি থাকলেও বর্তমানে হরেক রং ও ডিজাইনের ফুলদানিও চোখে পড়ে। অনেকেই আবার হালকা রঙে পোড়ানো একরঙা ফুলদানিতে বিভিন্ন রং ও নকশার আল্পনা এঁকে নিচ্ছেন ঘরের পর্দা ও দেয়ালের রঙের সঙ্গে ম্যাচ করে। বাজারে সাধারণত গোল, ত্রিভুজ, যেকোনো সিলিন্ডার ও ডিম্বাকৃতির ফুলদানি বেশি চোখে পড়ে। মূলত আকৃতি, নকশা ও রঙের ওপর নির্ভর করেই নির্ধারণ করতে হবে ফুলদানিটি বাসগৃহের কোন স্থানে মানানসই। আপনার একটুখানি স্মার্ট পরিকল্পনাই বদলে দেবে আপনার ঘরের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যকে।
যাঁরা দেশীয় ঘরানার সাজ পছন্দ করেন, তাঁদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে রয়েছে পোড়ামাটির ফুলদানি-
- প্রকৃত ও কৃত্রিম দুই ধরনের ফুলই চমৎকার লাগে মাটির ফুলদানিতে। তবে ফুলদানি নির্বাচন করার সময় ঘরের আকৃতি, রং ও অন্যান্য সাজসজ্জার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। এমন ফুলদানি নির্বাচন করতে হবে, যা ঘরটির অভ্যন্তরীণ পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- ঘরের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে খাওয়ার ঘর, রান্নাঘর এমনকি বাথরুমও সাজাতে পারেন মাটির ফুলদানিতে। ফুল ছাড়াও ফুলদানি দিয়ে ঘর সাজানো যায় বৈচিত্র্য আনতে। ঘরের প্রবেশদ্বারে বিভিন্ন আকারের ফুলদানি রাখতে পারেন ভিন্নতা আনার জন্য।
- অনেকেই ঘরের প্রবেশদ্বারে জুতার তাক রাখেন। সে ক্ষেত্রে ওপরের একটি তাক খালি রেখে ছোট ছোট ফুলদানিতে সাজিয়ে নিতে পারেন। তাতে রাখুন কাপড় বা প্লাস্টিকের ফুল। চাইলে পাতাবাহারের গাছ ও সাজিয়ে দিতে পারেন ফুলদানিটিতে।
- বসার ঘরের কর্নারে রাখতে পারেন বড় আকৃতির মাটির ফুলদানি। এবার ফুলদানিতে সাজিয়ে দিন লম্বা মাটির রংবেরঙের কাপড়ের ফুল। অনেকে আবার ড্রয়িংরুমের বড় ফুলদানিতে লম্বা কয়েকটা পাটখড়িও সাজিয়ে রাখেন। আবার বড় ফুলদানির ওপর বসিয়ে নিতে পারেন প্লেটে বসানো ইকেবানা বা বনসাই।
- বসার ঘরের চারকোনায় ৪টি বড় ফুলদানি বসাতে পারেন। কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী লুক আনার জন্য ফুলদানির ওপরে কাচ কেটে বসিয়ে সেন্টার টেবিল হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। তাতে সাজিয়ে রাখতে পারেন ছোট শো-পিস, রঙিন মোম বা ফটোফ্রেম যা আপনার সৃষ্টিশীল রুচিবোধের পরিচয় প্রকাশ করবে।
- যেহেতু বসার ঘরটিই গৃহকর্তার ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করে, এ ঘরটিকে সাজানোর ক্ষেত্রে বিশেষ মনোযোগের প্রয়োজন। তাই এ ঘরের ফুলদানিটিও নির্বাচন করা উচিত পর্দা, কার্পেট ও সোফার কুশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। সোফা বা চেয়ারের মাঝের টেবিলের ফুলদানিতে সাজিয়ে দিতে পারেন একগুচ্ছ কাঁচা ফুল। সাইড টেবিলেও রংবেরঙের ফুলদানিতে তাজা ফুল রাখতে পারেন। এতে করে আপনার বসার ঘরের স্নিগ্ধতা বাড়বে বহুগুণে।
- খাবার টেবিলে মাটির ফুলদানি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে মাঝারি বা ছোট আকারের ফুলদানিই ব্যবহার করা ভালো। তবে খেয়াল রাখতে হবে ফুলদানি ও ফুলের উচ্চতায় টেবিলের অপর পাশে বসা মানুষের চেহারা ঢেকে না যায়।
- বাথরুমে মাটির ফুলদানি ব্যবহার করতে চাইলে দেয়ালে ছোট গ্লাস কর্নার করে নিন। এর ওপর ছোট মাটির ফুলদানিতে ঝুলিয়ে দিন মানিপ্ল্যান্টের লতা। এতে করে সতেজ একটা লুক পাবেন বাথরুমের অভ্যন্তরীণ পরিবেশে।
- শোবার ঘরে মাটির ফুলদানিতে সুগন্ধি ফুল রেখে দিতে পারেন। এতে করে মিষ্টি সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়বে ঘরটিতে। তবে বেডরুমে মাঝারি আকারের ফুলদানিই ব্যবহার করা উত্তম।
যত্নআত্তি
- প্রতিদিনই পরিষ্কার সুতি কাপড় দিয়ে ফুলদানি পরিষ্কার করুন।
- সপ্তাহে অন্তত একদিন নরম ব্রাশ দিয়ে ফুলদানির নকশার ভেতরটা পরিষ্কার করুন। এতে করে নকশার ভেতরে জমে থাকা ময়লা-ধুলাবালু দূর হবে।
- মাটির ফুলদানিকে সরাসরি টেবিলে বা তাকে না রেখে ম্যাট ব্যবহার করুন। গোল, চৌকোনা, ত্রিভুজ বা তারার আকৃতির ম্যাট বাজারে পাওয়া যায়। এতে করে যেমন সৌন্দর্যবর্ধনে বৈচিত্র্য বাড়বে, তেমনি টেবিল বা তাকেও মাটির দাগ পড়বে না।
- কেনার সময় ফুলদানিতে টোকা দিয়ে দেখা উচিত ফুলদানিটি ফাটা কি না। ফিনিশিং সুন্দর কি না সেটিও দেখে কেনা উচিত।
- ফুলদানিতে কাঁচা ফুল পানি দিয়ে রাখলে অবশ্যই পানি বদলাতে ভুলবেন না। এতে করে ফুলদানি ও ফুল দুটোই ভালো থাকবে। যেসব ফুলদানিতে পানি ব্যবহার করবেন তা দুই মাস পরপর রৌদ্রে শুকিয়ে নিতে পারেন। এতে করে ফুলদানির ভেতরকার স্যাঁতসেঁতে ভাব দূর হবে।
প্রাপ্তিস্থান
ঢাকার নিউমার্কেট, শিশু একাডেমীর দোয়েল চত্বর, ঢাকা কলেজের সামনের ফুটপাত, ধানমন্ডি ৬ নম্বর সড়কের ফুটপাত, শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেট, মিরপুর-২ এর ফুটপাতের পটারিশপগুলোতে মিলবে মাটির ফুলদানি। এ ছাড়া আড়ং, মেলা, যাত্রা ইত্যাদি ব্র্যান্ডের শোরুমগুলোতেও পাওয়া যাবে ব্যতিক্রমধর্মী ডিজাইনের মাটির ফুলদানি।
দরদাম
ফুটপাতের পটারিশপগুলোতে আকৃতি ও নকশাভেদে মাটির ফুলদানির দাম পড়বে ৫০ টাকা থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে। তবে ব্র্যান্ডের শোরুম থেকে কিনলে কিছুটা বাড়তি টাকা গুনতে হতে হবে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯০তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৭।