প্রাণের নগরী তিলোত্তমা ঢাকার আজকের যে রূপ, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিপুল জনসংখ্যার ভারে নগরের এখন বেহাল দশা। ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বর্ষায় নিত্য জলাবদ্ধতা, খোঁড়াখুঁড়ি, গণপরিবহনসংকট, শব্দদূষণ, বায়ুদূষণসহ নানান সমস্যা। এই অসংগতিগুলোই আমাদের নাগরিক জীবনকে করে তুলেছে অসহনীয়। তবে নগর কাঠামোব্যবস্থায় কৌশলগত পরিবর্তন আনা সম্ভব হলে বাঁচানো যাবে আমাদের প্রাণের শহর ঢাকাকে। শুধু বাঁচানোই নয়, গড়ে তোলা যাবে বাসযোগ্য এক নগর। আর সে স্বপ্নটিই দেখাচ্ছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগ। সম্প্রতি বুয়েটের এক গবেষণায় ‘গ্র্যান্ড ক্যানাল’ নামক প্রকল্পে উঠে এসেছে এমন সম্ভাবনা, যা ঢাকার খালগুলোকে এক সুতোয় বেঁধে জলকেন্দ্রিক যাতায়াতব্যবস্থার পাশাপাশি বৈপ্লবিক ও যুগান্তকারী এক পরিবর্তন আনবে নগরের পরিবেশগত সৌন্দর্যে।
বিশেষজ্ঞ মত
অধ্যাপক ড. খন্দকার সাব্বির আহমেদ
বিভাগীয় প্রধান, স্থাপত্য বিভাগ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববদ্যালয়ের (বুয়েট)
আমাদের দেশে নগরকে ঘিরে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়। কিন্তু সে সব প্রকল্পসমূহ প্রকৌশলগতভাবে কতটা গ্রহনযোগ্য; কতটা টেকসই হবে; তাতে নাগরিকদের কোন উপকারে আসবে কিনা বা তাতে তাদের সম্মতি আছে কি না তা সাধারণত যাচাই করা হয় না। অর্থাৎ প্রকল্পগুলোতে জনগণকে সম্পৃক্ত করা হয় না। ঢাকার চারপাশ নদী বেষ্টিত, যেগুলোর সঙ্গে সংযোগ ছিল অসংখ্য খালের। দখল, দূষণ, অবহেলা এবং পরিচর্যার অভাবে অধিকাংশ খালই এখন মৃতপ্রায়। মহামূল্যবান এই খালগুলো এখন পানি নিষ্কাশন ড্রেন। এই খালগুলোর মূল্য বুঝতে পারিনি বলেই আজ এই অসহনীয় যানজট এবং জলাবদ্ধতা। বৃটিশ আমল থেকেই খালকে ড্রেনে পরিণত করার প্রবণতা শুরু হয়েছে। অথচ ঢাকাকে যদি আমাদের ঘর এবং খালগুলোকে আমরা যদি উঠোন সংলগ্ন পুকুর মনে করি তাহলে কি দৃশ্যপট হতে পারতো অন্য রকম। সে ভাবনা থেকেই আমরা এই প্রকল্পটিকে বলছি “গ্র্যান্ড ক্যানাল”।
যখন কোন বিষয়ের সঙ্গে গ্র্যান্ড জুড়ে দেয়া হয় তখন স্বাবাবিকভাবেই তার গুরুত্ব বেড়ে যায়। ধরুণ ইতালির ভেনিস নগরের ক্যানালটি নগর কেন্দ্রিক নৌপরিবহন ব্যবস্থা চালু করে বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। এই ক্যানালটিই হয়ে উঠেছে পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষণ। ভেনিসের খালের দৈর্ঘ্য যেখানে মাত্র ৩.৮ কি.মি সেখানে ঢাকার গ্র্যান্ড ক্যানালের দৈর্ঘ্য হবে ২৮.৫ কি.মি। অনেক স্থানে প্রশস্তও বেশি। বাংলাদেশ নদীর দেশ হলেও হয়ে উঠেছে সড়ক নির্ভর। গ্র্যান্ড ক্যানালে অনায়াসে ওয়াটার ট্যাক্সি বা ওয়াটার বাস চালু করে গণপরিবহন সেবা প্রদান করা যাবে। কোন যানজট ছাড়াই মানুষ সল্প সময়ে নির্দিষ্ট দূরত্বে যেতে পারবে। ইতোপূর্বে সদরঘাট থেকে আমিন বাজার পর্যন্ত ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু করা হলেও সেখান থেকে সহজ কোন সড়ক যোগাযোগ রাখা হয় নি। কিন্তু গ্র্যান্ড ক্যানালের ডিজাইন করা হয়েছে শহরের মধ্য দিয়ে যেখানে থাকবে পর্যাপ্ত ল্যান্ডিং ষ্টেশন।
এছাড়াও গ্র্যান্ড ক্যানালটি হবে একটি সামাজিক পরিসর। মানুষ মাছ ধরবে, ঘুরবে, হাটাবে, নৌকা ভ্রমন করবে, অবসর কাটানোসহ বিনোদনের নানা ব্যবস্থা থাকবে এই প্রকল্পকে ঘিরে। আবার আপদকালে অতিরিক্ত পানিও বহন করে জলাবদ্ধতা রোধ করবে। কমাবে নগরের অতিরিক্ত তাপমাত্রা। খালপাড়ের বৃক্ষয়ন করার ফলে বাড়বে সবুজ ও জীববৈচিত্র। যদিও ঢাকার খালগুলো আগের মত নেই, তবুও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব। খুব বেশি অর্থায়নের প্রয়োজনও হবে না। খালের মজে যাওয়া অংশগুলোকে খনন করলেই চলবে। স্থাপনারও ক্ষতি হবে না বা ভাঙ্গা লাগবে না। শুধুমাত্র ৫-৭ শতাংশ কালভার্ট ভাঙ্গতে হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে হাতিলঝিলের থেকেও আরো নান্দনিক একটি প্রকল্প উপহার পাবে নগরবাসী।
বর্তমান ঢাকার যে বেহাল দশা তা থেকে মুক্তি পেতে গতানুগতিক প্রকৌশল ও পরিকল্পনা ধারণায় কিছুতেই যানজট ও জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এই উপলব্ধি থেকেই বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী শুভ দত্ত তাঁর থিসিস প্রজেক্ট হিসেবে গবেষণা করেন ‘গ্র্যান্ড ক্যানাল’-বিষয়ক প্রকল্পটি। প্রক্রিয়াটি যেন নির্ভুলভাবে পরিকল্পিত হয় এর জন্য একটি কার্যকর মাস্টারপ্ল্যান করার উদ্দেশ্যে শহরজুড়ে বেশ কবার জরিপ চালানো হয়। আর এ সম্পূর্ণ কাজটি পরিচালিত হয়েছে বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. খন্দকার সাব্বির আহমেদ, সহকারী অধ্যাপক তাসনিম তারেক ও প্রভাষক মাহেরুল কাদেরের তত্ত্বাবধানে। এ গবেষণাকর্মে অকুণ্ঠ সহযোগিতা ছিল স্থাপত্য বিভাগের ’০৯ ব্যাচের। এর মুখ্য উদ্দেশ্য, উপর্যুক্ত সমস্যাগুলো থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে একটি নির্দিষ্ট সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া। আর এভাবে নগরীর একটি টেকসই সুনিশ্চিত ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিশ্চিত করা। ‘নগরীর বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত জলাশয় এবং খালগুলোকে সংযুক্ত করে একটি জলাশয়কেন্দ্রিক নগর সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা’ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এক সমাধান হতে পারে।
নগরায়ণের চাহিদা মেটাতে গিয়ে আমরা সমস্যাগুলোকে অবজ্ঞা করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। এই নগরে ছিল অনেক জলাশয়, পুকুর, খাল, যা ক্রমবর্ধমান জমির চাহিদা পূরণে ভূমিদস্যুরা ধীরে ধীরে দখল ও পরে ভরাট করে ফেলেছে। ফলে পতন ঘটেছে স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্রের (Ecology), স্বাভাবিক নর্দমা ব্যবস্থাপনা, ওয়াটার ফ্লো সিস্টেম প্রভাবিত হয়েছে প্রবলভাবে। আর ফলস্বরূপ বেড়েছে জলাবদ্ধতা, বন্যার প্রাদুর্ভাব, ভূমিধস, ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪, ২০০৭-এর বন্যা এবং বর্তমান সময়ের নিত্যদিনের জলাবদ্ধতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় নগর ব্যবস্থাপনায় আমাদের ভয়াবহ দুর্বলতার কথা। পানি, যা আমাদের জন্য আশীর্বাদ, সেই পানিই আমাদের নিজেদের ব্যর্থতায় ক্রমেই অভিশাপে পরিণত হচ্ছে। এককালে ৫০টিরও বেশি সমৃদ্ধ খাল আমাদের নগরীর পানির সঠিক প্রবাহ বজায় রাখত। এগুলোর মোটামুটি সবই আজ পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ভরাট হয়ে গেছে। অবশিষ্ট যা আছে সেগুলোও বিলুপ্তির পথে। এ রকম অবস্থায় বাস্তুতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা (Ecological Reilience) অর্জন করা রাজধানী ঢাকার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য সবচে বড় চ্যালেঞ্জ। জলকেন্দ্রিক নগর ব্যবস্থাপনা (Water Based Urbanism) বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ শহরের বর্তমান রূপে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
গৃহীত এই পরিকল্পনায় ঢাকা শহরের খালগুলোকে সংযুক্তকরণের মাধ্যমে একটি গ্র্যান্ড ক্যানাল শহরজুড়ে বিস্তৃত হবে। এর মাধ্যমে একটি উন্নততর বাসযোগ্য শহর বাস্তবায়ন করা সম্ভব। অনেকের অভিমত হতে পারে যে ঢাকা শহরের মতো জনবহুল একটি শহরের জন্য এ রকম পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের জন্য হয়তো অনেক দেরি হয়ে গেছে। দেরি হলেও তা অসম্ভব নয়। এই গবেষণার উদ্দেশ্য হচ্ছে, ঢাকার একসময়ের প্রাণসমৃদ্ধ জলাশয় ও খালগুলোকে পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে মৃতপ্রায় নগরীর হারানো হৃৎস্পন্দন পুনরায় চালু করা। এখানে কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উল্লেখের দাবি রাখেÑ
- নগরীর জলাশয় এবং খালগুলোকে সংযুক্তকরণের এই প্রয়াস কি ঢাকা মহানগরীর বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারবে?
- বিদ্যমান অবকাঠামোর ন্যূনতম পরিবর্তন ঘটিয়ে নগরীতে ফলপ্রসূ প্রভাব সৃষ্টির উদ্দেশ্যে খাল ও জলাশয়গুলোকে সংযুক্ত করার সম্ভাব্য যাত্রাপথ বা রুট কী হবে?
- ভবিষ্যতে খালগুলোর পুনর্দখল ঠেকাতে এবং পুনরুদ্ধার করতে স্থাপত্যের ভূমিকাই বা কী হবে?
বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা বিরাট এক সমস্যা। এই মুহূর্তে শহরের মাত্র ২৫ শতাংশ অংশ পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার আওতায়। অবশিষ্টাংশের বৃষ্টিতে জমা পানি অপরিকল্পিতভাবে প্রবাহিত হয়ে নিচের দিকে দূরবর্তী জলাশয় খুঁজে নেয়। গত সেপ্টেম্বর ২০০৪-এ নগর ঢাকায় গত ৫০ বছরে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত (৩৪১ মি.মি.)-এর ফলে সৃষ্টি হয়েছিল ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। দুই দিনব্যাপী প্রবল বর্ষণে সমস্ত নাগরিক ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছিল। ঢাকা শহরের ইতিহাস বলছে, ১৯৫৪, ১৯৫৫, ১৯৭০, ১৯৭৪, ১৯৮০, ১৯৮৭ এবং ২০০৪ সালের প্রলয়ংকরী বন্যা আমাদের নগর ব্যবস্থার মূল ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। ১৯৮৮ সালের বন্যায় নগরীর প্রায় ৮৫ শতাংশ স্থান বন্যাকবলিত হয় (০.৩ থেকে ৪.৫ মিটার গভীর)। ১৯৯৮ সালের বন্যায় নগরীর প্রায় ৫৬ শতাংশ এলাকা প্রত্যক্ষভাবে আক্রান্ত হয় বন্যার পানিতে। আর ২০০৪ সালের বন্যায় পরিমাণটি ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ।
দ্রুত নগরায়ণ ও জনসংখ্যাবৃদ্ধির চাপে ঢাকা শহরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ব্যাপক আকারে পরিলক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রতিরোধব্যবস্থা। ঢাকা শহর সাধারণভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র তিন মিটার উচুঁতে অবস্থিত। অনেক বস্তি এলাকা এই শহরের বিদ্যমান ‘ফ্লাড ফ্লো জোন’ এর আওতাধীন। ফলে লাগাতার বন্যা এসব এলাকার নিত্যসঙ্গী। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের ফল হিসেবে বন্যা ও মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দিন দিন আরও বাড়বে। আমাদের নগরের বিদ্যমান ড্রেনেজব্যবস্থা ও বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর এর সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। ঘটবে অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের আবির্ভাব ও অনিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা বৃদ্ধি, এর ফল নগরবাসীর জন্য কখনোই সুখকর হবে না। ইতিমধ্যে ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নিবন্ধিত হয়েছে। অর্থাৎ, খুব দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই অবস্থার ভয়াবহতা দিনকে দিন বাড়বে।
ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের এক জরিপ বলছে, গত ১০ বছরে ঢাকা শহরের গড় ট্র্যাফিক গতিবেগ ২১ কি.মি. থেকে নেমে এসেছে ৭ কি.মি. প্রতি ঘণ্টায়, যা মানুষের হেঁটে চলার গতির প্রায় কাছাকাছি। ঢাকার ট্র্যাফিক জ্যাম প্রতিদিন মোট ৩.২ মিলিয়ন কর্মঘণ্টা কেড়ে নিচ্ছে। যদিও মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে তথাপি একটি বিকল্প ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনার দাবি দানা বাঁধছে ক্রমেই।
নীল করিডরসহ প্রয়োজন উন্নত শহর, নতুন দিকনির্দেশনা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ তথা জলবায়ু পরিবর্তন রুখতে বিভিন্ন এলাকার জন্য ভিন্ন ভিন্ন উপযুক্ত সমাধান। ভূমিকম্পের আশঙ্কা রুখতে ভূগর্ভ থেকে নিষ্কাশিত পানি পুনর্বহালের ব্যবস্থা করা, নীল করিডরের পাশাপাশি সবুজ করিডর বাস্তুসংস্থানসংক্রান্ত উন্নয়নের উদ্দেশ্যে একটি যুক্তিপূর্ণ ও নির্দেশনামূলক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। অর্থাৎ সেই ঢাকার কাছে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা, যে ঢাকার কথা আমরা একসময় শুনতাম।
ঢাকার দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা, পশ্চিমে তুরাগ, উত্তরে টঙ্গী এবং পূর্বে বালু নদী দ্বারা ঢাকা শহর চতুর্দিকে বেষ্টিত। এমনকি বর্তমানে যে কয়টি খাল অবশিষ্ট আছে তা ঢাকার পানি নিষ্কাশনব্যবস্থাপনার প্রাথমিক ধাপ। কিন্তু সরকারি বিভিন্ন এজেন্সির সমন্বয় এবং পরিচর্যার অভাবে বেশির ভাগ খাল এখন মৃতপ্রায়। অবহেলা আর অযত্নের কারণে খালগুলোর গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। কিছু খাল দখল এবং অনিয়ন্ত্রণযোগ্য অবকাঠামো দ্বারা অবরুদ্ধ অবস্থায় স্রোতহীন হয়ে বিলুপ্তির পথে। ফলে বর্ষাকালে ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতা নিত্য এক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে ঢাকা শহর এককালে ৫০টির ওপরে খালে সমৃদ্ধ ছিল, যা একসময় ঢাকার লাইফলাইন হিসেবে কাজ করত, সেসব খালের বেশির ভাগই আজ রুদ্ধ, যার কয়েকটি আবার প্রবল হুমকির সম্মুখীন।
উদাহরণস্বরূপ,
- জাইকার কার্যক্রমের একটি অংশ হিসেবে ১৯৮৮ সালে পান্থপথ খালের ওপর বক্স-কালভার্ট নির্মাণ করা হয়
- পান্থপথ খাল ধানমন্ডি লেক এবং হাতিরঝিল লেককে সংযোগ করে রেখেছিল।
- কেরিভান (কারওয়ান) নদী এবং পূর্ববর্তী গতিপথে বেগুনবাড়ি খাল গ্রিনরোড-কলাবাগান-ধানমন্ডি লেক থেকে তুরাগ নদী পর্যন্ত একই অ্যালাইনমেন্টে ছিল
- এর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বহুল আলোচিত হাতিরঝিল
- গুলশান লেকের মাধ্যমে ঢাকার দক্ষিণ-পশ্চিমের পানি সরাসরি হাতিরঝিলের মাধ্যমে পূর্বদিকে রামপুরা খালের মধ্যদিয়ে বালু নদীতে নিষ্কাশিত হতো
- গুলশান লেক বেগুনবাড়ির মাধ্যমে ধানমন্ডি লেকের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। তখন তা কাটাসুর খাল হয়ে তুরাগ নদীতে প্রবাহিত হতো
- পশ্চিমে কাটাসুর খাল মোহাম্মদপুর এবং রায়েরবাজার এলাকার পানি নিষ্কাশনে সাহায্য করত
- পান্থপথ ভরাট হওয়ার মাধ্যমে পূর্বদিকের বেগুনবাড়ি খালের সঙ্গে হাতিরঝিলের মাধ্যমে ধানমন্ডি লেকের সংযোগ নষ্ট হয়। ফলে, এই সমগ্র পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
ঢাকার দক্ষিণে হাজারীবাগ থেকে উত্তরে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত অসংখ্য জলাশয়ের অবস্থানের প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৫৩-১৯৫৪ সালে ঢাকার ভূ-তাত্ত্বিক মানচিত্র থেকে। বিগত বছরগুলোতে ভূমিদখল ও মাটি ভরাটের কারণে এই সব জলাশয়ের মধ্যকার সংযোগ হারিয়ে গেছে। নিচু জমিগুলো বসবাসের জন্য ব্যবহৃত হতে শুরু করায় এলাকাটি স্থলবেষ্টিত অবস্থার পরিবর্তিত হওয়ায় প্রাকৃতিক নিষ্কাশন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এবং সমগ্র জীববৈচিত্র্য বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়।
সাম্প্রতিককালে রাজউক কর্তৃক প্রস্তাবিত ২০১৬-২০৩৫-এর স্ট্র্যাকচার প্ল্যান (ড্র্যাফট)-এ এ ধরনের জলাশয়কে সংরক্ষণ করার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। ধানমন্ডি লেক, হাতিরঝিল এবং গুলশান-বারিধারা লেকসমূহকে সংযোগ করে এটি নীল কোর (blue core)-এর প্রস্তাবনা ও শহরের উত্তর-পশ্চিমে একটি সাব-ব্লু কোর এর উল্লেখ আছে।
বন্যার প্রভাব থেকে শহরকে রক্ষার জন্য জাইকা কর্তৃক ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান (flood action plan, FAP-2 & FAP-8) প্রস্তাবিত হয়। নদীর বহির্মুখী বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য নদীর পাশে pump station & dykes-এর প্রস্তাবনা আছে। এ ছাড়া কিছু কৌশলগত এলাকায় বক্স কালভার্টের প্রস্তাব আছে যেন কালভার্টের নিচে পানির প্রবাহ বজায় থাকে এবং ওপরে যানবাহন চলাচল ব্যাহত না হয়। এ ধরনের প্রস্তাব হয়তো শহরকে সাময়িকভাবে নদীর পানির বহির্মুখী বন্যা থেকে রক্ষা করবে কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব শহরের জন্য আশঙ্কাজনক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে অতিবর্ষণ বা বন্যায় শহরের নিচু এলাকায় বসবাসকারীরা অনবরত জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে। বর্ষার মৌসুমে নদীর পানির উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহর যেন এক বদ্ধ নগরীতে পরিণত হচ্ছে।
সময়ের পরিক্রমায় ঢাকা শহরে জমি ব্যবহারের রূপ বদলেছে। বদলেছে ব্যবহারের ধরন। অধিকাংশ জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ার মূল কারণ ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন স্থাপনার প্রয়োজনে জমির চাহিদা। এ ছাড়া আরও নানা কারণে আমাদের খাল-বিলগুলো ভরাট হচ্ছে। যার কারণ-
- গণসচেতনতার অভাব
- জমি মালিকের উদাসীনতা
- বিদ্যমান জলাশয় থেকে সরাসরি আর্থিক লাভের অনুপস্থিতি
- রক্ষণাবেক্ষণের নিম্নমান
- সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহের মাঝে সমন্বয়হীনতা প্রভৃতি।
এ ছাড়া উল্লেখ করতে হয়, নগরীর বিশাল একটি অংশজুড়ে রয়েছে সেনানিবাস। উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্ব দিকের নিচু জমি ও জলাশয় ভরাট হয়েছে বা হচ্ছে নাগরিকদের আবাস চাহিদা মেটাতে। শহরের ‘হাইড্রোলজিক্যাল ম্যাপ’ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অদ্যাবধি অনেক বিক্ষিপ্ত জলাশয় এলাকা এখনো রযেছে। এই বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত এলাকাগুলো সংযুক্তকরণের মাধ্যমেই নগরীর উত্তরের সঙ্গে দক্ষিণের জলসংযোগ সম্ভব। কিন্তু দুঃখের বিষয় বিদ্যমান জলাশয়গুলোর অবস্থা এতটাই করুণ যে এগুলো বর্তমানে নর্দমা আর উচ্ছিষ্টের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এমনকি বর্তমানে এটি মানব উচ্ছিষ্ট ধারণে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে এসব জলাশয়ের কোনো বাস্তুতান্ত্রিক সুবিধা তো নেই-ই বরং তা নগরীর জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এসব কারণেই নগর পরিকল্পনায় পানিকে কখনো সামনে নয়, সব সময় পেছনের সারিতে রেখেই চিন্তা করা হয়েছে। আর তাই, কাজটি কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়। ‘চ্যাংগেচেয়ন’ দক্ষিণ কোরিয়ার ডাউনটাউন সিউলে অবস্থিত ১০.৯ কি.মি. (প্রায় ৭ মাইল) দীর্ঘ আধুনিক চিত্তবিনোদন কেন্দ্র। দক্ষিণ কোরিয়ার যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যে দ্রুত অর্থনৈতিক বিপ্লব শুরু হয়, এরই ফলাফলের সূত্র ধরে এই স্থানটির উৎপত্তি। রাস্তা, ফ্লাইওভার আর নাগরিক কোলাহলে স্থানটি হয়ে ওঠে ব্যস্ততম এক স্পট। অনেকটা আমাদের ঢাকার পান্থপথের মতো। প্রতিষ্ঠার সময়ে এই ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রকল্প নানা মহলের প্রবল সমালোচনার মুখে পড়ে। কিন্তু ২০০৫ এ উদ্বোধনের পরপরই এটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সিউলের অধিবাসী আর ভ্রমণপিয়াসীদের কাছে। হয়ে ওঠে নগর সিউলের প্রাণ।
প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটি নগরীর সার্বিক সাম্যাবস্থা আর স্থিতাবস্থা সমাধানের উদ্দেশ্যে রচিত। তাই জলাশয় আর খালের সঙ্গে দেশের উন্নয়ণের পারস্পরিক সম্পর্কের দিকটি এখানে বিশেষভাবে বর্ণনার সুযোগ রয়েছে। ঢাকার জলাশয় আর পার্শ্ববর্তী এলাকাকে এখানে ৮টি জোনে ভাগ করা হয়েছে। দক্ষিণে হাজারীবাগ থেকে উত্তরে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত এই জোনকেন্দ্রিক জরিপ পরিচালিত হয়েছে।
এখানে ঢাকাকে যুক্ত করে যে সমন্বিত খালের কথা আলোচনা করা হচ্ছে, তাকে আমরা ‘গ্র্যান্ড ক্যানাল’ (Grand Canal) বলব। এই ক্যানাল প্রায় ২৮.৫ কি.মি. দীর্ঘ। এর গতিপথের ভিত্তি হিসেবে স্থানভেদে ফিজিক্যাল জরিপ করা হয়েছে। কোনো কোনো স্থানে আগের ইতিহাস, ভূমির ব্যবহার পর্যালোচনা করা হয়েছে। ঢাকা ওয়াসা থেকে প্রাপ্ত সুয়ারেজ ম্যাপ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই গ্র্যান্ড ক্যানালের চূড়ান্ত গতিপথ নির্ধারণ করা হবে। বিশেষ খেয়াল রাখা হবে যেন বর্তমান স্থাপনাসমূহের ন্যূনতম ক্ষতিসাধন না করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যায়। গ্র্যান্ড ক্যানাল ঢাকার দক্ষিণে হাজারীবাগ বাই লেন থেকে যাত্রারম্ভ করে যে দুটি রুটে প্রবাহিত হবে।
শাখা ১:
বুড়িগঙ্গা > হাজারীবাগ বাই লেন > হাজারীবাগ বক্স কালভার্ট > হাজারীবাগ ট্যানারি এলাকা > পিলখানা এলাকা > ধানমন্ডি লেক > রাসেল স্কয়ার > পান্থপথ বক্স কালভার্ট > হাতিরঝিল > বনানী লেক > করাইল > চেয়ারম্যানবাড়ি > এয়ারপোর্ট রোড > নির্ঝর আবাসিক এলাকা > মাটিকাটা > শাহীন লেক > উত্তরা থার্ড ফেইজ > আব্দুল্লাহপুর তুরাগ
শাখা ২:
বুড়িগঙ্গা > হাজারীবাগ বক্স কালভার্ট > ধানমন্ডি লেক > পান্থপথ বক্স কালভার্ট > হাতিরঝিল > গুলশান লেক > গুদারাঘাট > কালাচাঁদপুর রোড > বারিধারা ডি.ও.এইচ.এস > এয়ারপোর্ট রোড > এয়ারপোর্ট এলাকা > উত্তরা সেক্টর ১ > উত্তরা মডেল টাউন > আব্দুল্লাহপুর > তুরাগ
হাজারীবাগ জোন
কোম্পানীঘাট থেকে শুরু হবে এই জোন। বর্ষাকালে এ এলাকা অতিরিক্ত পানি ধারণ করবে ফলে বছরের অন্য সময় ব্যবহৃত হবে চিত্তবিনোদনের এলাকা হিসেবে। এখানে উন্মুক্ত খালের পরে বিশাল বক্স কালভার্ট স্থাপন করা হবে। হাজারীবাগ ট্যানারি শিল্প এলাকা সাভারে স্থানান্তরিত হবে ফলে এখানে আবাসিক এলাকা হিসেবে বাসস্থানের চাপ ও জনসংখ্যা উভয়ই বাড়বে। বিদ্যমান বক্স কালভার্টটিকে অপসারণ করা হবে যাতায়াতের পথ ও জলপ্রবাহ সুগম করতে। গ্র্যান্ড ক্যানালের এ শাখাটি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর নিয়ন্ত্রণাধীন পিলখানা এলাকা ধরে ধানমন্ডি লেকের সঙ্গে যুক্ত হবে। এই পুরো খালটি এখন বিদ্যমান কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের ফলে বক্স কালভার্ট ও বিজিবির সংরক্ষিত এলাকায় এর বর্তমান অবস্থা খুবই শোচনীয়। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের পরবর্তী সময়ে পরবর্তী প্রস্তাবে এই জলপথকে এ এলাকার পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবিলায় অন্যতম একটি সমাধান হিসেবে উল্লেখ করা হবে।
পান্থপথ
এ বক্সকালভার্টটি রাসেল স্কয়ার থেকে শুরু হয়ে হাতিরঝিল পর্যন্ত যাবে। খালের দুই পাশে থাকবে দুই লেনের সড়ক। প্রয়োজনে যানবাহনের জন্য একটি আন্ডারপাস প্রস্তাব করা হবে। এ স্থলে একটি উড়ালসড়কও প্রস্তাবিত হতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে নজরে রাখতে হবে, উড়ালসড়কের নিচে অন্ধকার অস্বাস্থ্যকর স্থান যেন সৃষ্টি হতে না পারে।
কড়াইল
এ পুরো নেটওয়ার্কের প্রায় মাঝ বরাবর অবস্থান কড়াইলের। এখানে একটি নৌ-ঘাট স্থাপনের প্রস্তাবনা রয়েছে। এর সঙ্গে থাকবে ভাসমান মাছ বাজার। স্থলপথ ব্যবহারের বিকল্প হিসেবে জলপথ ব্যবহার করে নগরবাসী ওয়াটার ট্যাক্সিতে ট্রাফিক জ্যাম এড়িয়ে সহজে দূর-দূরান্ত হতে প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা যেমন মহাখালী, গুলশানে যাতায়াত করতে পারবে। কড়াইলের পার্শ্ববর্তী বস্তি এলাকার মানুষেরা এই নৌ-ঘাট, ওয়াটার ট্যাক্সি ও ভাসমান বাজারে তাদের কর্মসংস্থান খুঁজে পাবে।
এয়ারপোর্ট রোড
সড়কটি ধরে এগিয়ে চলা জলাশয়গুলোকে বিচ্ছিন্ন করে চিন্তা করা হয়েছে এ সড়কের পার্শ্ববর্তী সড়কসমূহের সঙ্গে সংযোগের কথা। পরে এই বিচ্ছিন্ন জলাশয়গুলোকে মধ্যবর্তী সবুজ দ্বীপ (Green Island) দ্বারা সংযুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এটি পানির সঠিক প্রবাহ বজায় রাখবে; পানিকে রাখবে পরিচ্ছন্ন। আশার কথা হচ্ছে, এই জোনের অধিকাংশ এলাকাই বর্তমানে উন্মুক্ত ও অব্যবহৃত। মোটামুটি সন্তোষজনক অবস্থায় আছে। তবে বর্তমানে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ ও উন্নয়ণকাজে এখানকার কিছু অংশ ইতিমধ্যে ভরাট হয়ে গেছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে এ এলাকার জলাশয়গুলোকে নিয়ে বিশেষ সম্ভাবনা এখনো বিদ্যমান। কেননা এলাকাটি অতটা ভরাট বা জনবহুল হয়নি। দ্রুত সঠিক পরিকল্পনা ও তদারকির ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অচিরেই এই এলাকা অনাকাঙ্খিত হস্তক্ষেপ ও অস্বাস্থ্যকর অবস্থার দিকে এগুতে পারে।
উত্তরা থার্ড ফেইজ
এ এলাকাটি বর্তমানে একটি নির্মাণাধীন অঞ্চল, যা ক্রমবর্ধমান আবাসনের চাহিদা মেটাতে দিন দিন অগ্রসর হচ্ছে। এই পুরো এলাকাটি এককালে পতিত জলাশয় সমৃদ্ধ জমি ছিল, যা আশপাশের এলাকায় বৃষ্টির পানিবাহিত অঞ্চল হিসেবে (rain water flow area) ব্যবহৃত হতো। ফলে নগরীর মূল অংশে জলাবদ্ধতার একটি সমাধান হিসেবে এই এলাকা ভূমিকা রাখত। যেহেতু এই এলাকাটি ধীরে ধীরে ভরাট হচ্ছে এবং মাটি তার জলীয় বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। তাই শহরে জলাবদ্ধতা ও বন্যার সম্ভাবনাও বাড়ছে। এ প্রসঙ্গেই নদী ও জলাশয়ের ধার ঘেঁষে স্থাপনা নির্মাণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই প্রথম ধাপের ডিজাইন এমন হতে হবে যেন তাদের অবস্থানের ফলে খালসমূহের নাব্যতা প্রভাবিত না হয় এবং জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে না পারে।
প্রতিরক্ষা এলাকা
নিচু জমিতে প্রতিরক্ষা (রিটেনশন) এলাকাগুলো নাগরিকদের চিত্তবিনোদন ও প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানসমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে নকশা করা হবে। পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধাদান করে এমন কোনো স্থাপনা নির্মাণ সচেতনভাবে নিরুৎসাহিত করা হবে। এভাবে পরিবেশের স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব থাকবে। নগরীর হাজারীবাগ, পুরোনো এয়ারপোর্ট, হাতিরঝিল, নতুন এয়ারপোর্ট, কালশী এবং উত্তরা থার্ড ফেইজ এই এলাকাগুলো প্রধান প্রতিরক্ষা তথা রিটেনশন অঞ্চল হিসেবে প্রস্তুত করা হবে। এসব রিটেনশন এলাকা বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধারণের পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্বহালে ভূমিকা রাখবে।
নাগরিক সমস্যার সমাধানে আমরা কত কিছুই না করছি। কি অর্থ, কি সময়, কি জীবন ব্যয় করে একের পর এক আমরা নির্মাণ করছি ফ্লাইওভার আর উড়ালসড়ক। ভবিষ্যতের তোয়াক্কা না করে জনবহুল এলাকায় নির্মাণ করছি কংক্রিটের ফ্লাইওভার। আর একেকটি ফ্লাইওভার নির্মাণকালীন নগরবাসীর যাতায়াত আর জীবনধারণে যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয় তা বর্ণনাতীত। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে করা হচ্ছে নগরীর জলাশয় ভরাট করে। এমআরটি নগরীর বুক থেকে উপড়ে ফেলছে গাছপালার সারি। বিআরটি উল্টো বাড়িয়ে তুলছে শহরের যানজট। একের পর এক নতুন রাস্তা কেড়ে নিচ্ছে নাগরিকের ব্যক্তিগত মালিকানার জমি। নতুন নতুন আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকার জন্য ভরাট করা হচ্ছে আরও আরও জলাশয়। তথাকথিত উঁচু জমিকে রক্ষার জন্য নির্মিত হচ্ছে বাঁধ। মোট কথা প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট করার জন্য যা যা প্রয়োজন তার সবকিছু আমরা করছি মহা সমারোহে। আর প্রকৃতি দেবীও ভারসাম্যহীন এ অবস্থার প্রতিশোধ নিচ্ছে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর বিপর্যয়ের মাধ্যমে। নগরীর উন্নয়নে আমরা কত কিছু করছি কিন্তু সবচেয়ে সহজ সমাধানটাই সব সময় থাকছে উপেক্ষিত। আমার এই গবেষণাকর্মের প্রচ্ছন্ন উদ্দেশ্য মূলত এই উপেক্ষিত বিষয়টিকেই জনসমক্ষে উপস্থাপন করা। এ গবেষণাকর্মের মাস্টারপ্ল্যানে বেশ কিছু বক্সকালভার্ট অপসারণের কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে হাজারীবাগের ট্যানারি অপসারণের কথা। চেয়ারম্যানবাড়ি এলাকায় চারটি সরকারি ভবন আংশিক ভেঙে ফেলার কথা বলা হয়েছে। জনবহুল কয়েকটি এলাকা যেমন পান্থপথ ও উত্তরা ১ নম্বর সেক্টরে বেশ কিছু স্থাপনা আংশিক ভাঙার কথা বলা হয়েছে। আপাত দৃষ্টিতে এসব কর্মকাণ্ড ব্যয়সাপেক্ষ হলেও নগর ঢাকা রক্ষার্থে আমরা যেসব পরিকল্পনা বর্তমানে করছি সে তুলনায় এই ব্যয় অতি নগণ্য। এই কাজে ব্যয়িত সময় আর কর্মযজ্ঞের পরিমাণও তুলনামূলক অনেক কম।
কম্পিউটারে সিমুলেশনের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, গবেষণার প্রস্তাবনায় বিদ্যমান সড়কসমূহের ওপর চাপ কমবে। এ ছাড়া নগরীর তাপমাত্রাও কমবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। উদাহরণস্বরূপ, পান্থপথের তথ্যাবলি নিয়ে দুটি আলাদা অবস্থার প্রেক্ষিতে বিবেচনায়-
প্রথম অবস্থায় অ্যাসফাল্টের সড়ককে এমনভাবে বিবেচনা নেওয়া হলো যেন সড়কটি কোনো খাল বা জলাশয়মুক্ত। আর দ্বিতীয় অবস্থায় বিবেচনায় নেওয়া হলো ২৫ ফুট চওড়া দ্বিমুখী সড়ক, যার সঙ্গে ৩৬ ফুট চওড়া ও ন্যূনতম ১০ ফুট গভীর খাল মাঝ বরাবর প্রবাহিত হয়েছে। প্রথম অবস্থায় ৬০ মিনিটে বাতাসের তাপমাত্রা বেড়েছে ৪.২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং দ্বিতীয় অবস্থায় বেড়েছে ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই প্রকল্প যদি ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি), ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)-এর সমন্বিত প্রয়াসে বাস্তবায়িত করা যায়, তবে নগরবাসী ঢাকা দক্ষিণ থেকে ঢাকা উত্তরে যাতায়াতের একটি সহজ বিকল্প পথ পেতে পারে। সেই সঙ্গে নগরীর মনোরম পরিবেশ শোভিত চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং জলাবদ্ধতা সমস্যা থেকে মুক্তির মাধ্যমে এই প্রকল্প খুলে দেবে ঢাকাবাসীর জন্য নব সম্ভাবনার দুয়ার। উপকৃত হবে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা, বাস্তুতন্ত্রের সাম্যাবস্থা অর্জনসহ নানা বিষয়। সম্পূর্ণ প্রকল্প ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনায় অনেক সীমাবদ্ধতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। পুরো বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বুঝতে এবং সূক্ষ্ম ও নির্ভুল ফলাফল পেতে সিমুলেশন প্রক্রিয়া বেশ কয়েকবার করা হয়েছে। সময়স্বল্পতার জন্য ডিটেইল ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক নিয়ে কাজ করা সম্ভব হয়নি। এই পরিকল্পনায় বর্জ্য পরিবহনে খালগুলো ব্যবহৃত হবে না।
অনেক বছর ধরে আমরা আমাদের প্রিয় ঢাকাকে ধ্বংস করছি। অচিরেই এর অবসান হওয়া প্রয়োজন। সময় এখন ঘুরে দাঁড়ানোর। আমাদের উচিত অগ্রযাত্রার সমৃদ্ধ এ ধারায় শামিল হওয়া। সবাইকে প্রবলভাবে বিশ্বাস করতে হবে আমাদের এ শহর আবার বাসযোগ্য হয়ে উঠবে আগেরই মতো। আসুন, বিশ্বাস করি ঢাকা তার বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকা থেকে বেরিয়ে পরিণত হবে তিলোত্তমা ঢাকায় আবার। আসুন, আমরা প্রকৃতির কাছে ফিরে যাই। প্রকৃতিকে বাঁচতে দিই ইট-কাঠ-পাথরের এ শহরে হাতে হাত রেখে। নিশ্চিত করি প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সহাবস্থান, বহতা নদীর মতন নিরন্তর বয়ে চলুক শহুরে এ জলাশয় আর খাল-বিল।
এই প্রকল্পটিতে বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের যেসব শিক্ষার্থীরা সহযোগিতায় ছিলেন: জুবায়ের, তুষার, মারুফ, সৌর, সাইফ, পঙ্কজ, বাশার, ডেভিড, প্রসেন ও অর্ণব।
প্রকাশকাল: বন্ধ, ৮৯তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৭।