কংক্রিটের দীর্ঘস্থায়িত্ব (১ম পর্ব)

কংক্রিট সারা বিশ্বে বহুল ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রী। আমাদের জীবনে কংক্রিটের ব্যবহার এতটাই বিস্তৃত যে আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এক মুহূর্তও এর বাইরে যেতে পারি না। কংক্রিটের ফ্লোরে ঘুমাই, কংক্রিটের ফ্লোরের ওপর বসে ব্রেকফাস্ট করি, কংক্রিটের তৈরি রাস্তা দিয়ে আমরা কাজে যাই, এমনকি কংক্রিটের তৈরি অফিসে আমরা কাজ করি। কংক্রিট আমাদের জীবনকে করেছে দারুণ আরামদায়ক, বৈচিত্র্যময়, আনন্দময়, ফ্যাশনেবল ও নিরাপদ। আমরা শুধু ভবন এবং অবকাঠামো নির্মাণের জন্যই কংক্রিট ব্যবহার করি না, পারমাণবিক বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য চুিল্লর রেডিয়েশন শিল্ড তৈরিতেও ব্যবহার করে থাকি। বিশ্বব্যাপী কংক্রিটের ব্যবহার প্রায় ২১০০ কোটি টন। অর্থাৎ বিশ্বের ৭০০ কোটি মানুষ ২১০০ কোটি টন কংক্রিট ব্যবহার করছে, তার মানে বিশ্বের প্রত্যেক ব্যক্তি প্রতিবছরে ৩ টন কংক্রিট ব্যবহার করে। এই চাহিদাকে আমরা একজন ব্যক্তির এক দিনে ৮.৫ কেজিতে রূপান্তর করতে পারি।

পানির পরপরই কংক্রিট মানবজাতির বহুল ব্যবহৃত উপাদান। কংক্রিট তৈরির জন্য আমরা বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করছি। পৃথিবীতে প্রতিবছর ৪০০ কোটি টন সিমেন্ট উৎপাদনের জন্য প্রচুর পরিমাণ চুনাপাথর (৩০০ কোটি টন) ব্যবহার করা হয়। ২১০০ কোটি টন কংক্রিট তৈরির জন্য প্রতিবছর পাহাড় কেটে ১০০০ কোটি টন পাথর নেওয়া হয়, নদী ড্রেজিং করে ৬০০ কোটি টন বালু সংগ্রহ করা হয়। যদি আমরা প্রাকৃতিক সম্পদকে এমনভাবে নিঃশেষ করি, ভবিষ্যতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কংক্রিট তৈরির জন্য প্রাকৃতিক উপাদানগুলো পেতে সমস্যার সম্মুখীন হবে এবং এটি আমাদের পরিবেশকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ বজায় রাখতে কার্যকর উপায় খুঁজে বের করতে হবে। এটি নির্মাণসামগ্রীর প্রাপ্যতা ধরে রাখার জন্যও জরুরি। তাই এই সম্পদগুলো যথাযথ ব্যবহার আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।

একটি প্রকল্পে বাজেটের সিংহভাগ অংশ নির্মাণকাজে ব্যয় হয়। তা ছাড়া বাড়ি তৈরির জন্য অর্থ ব্যয় হচ্ছে একজন ব্যক্তির সারা জীবনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। এসব বাড়ি নির্মাণের ডিজাইনে স্থাপনার স্থায়িত্ব নিয়ে কমই প্রশ্ন তোলা হয় বা আপস করা হয়। এই স্থাপনাগুলোকে দেখে চাপ সহনীয় ও শক্তিশালী মনে হলেও, নির্মাণের কয়েক বছর পর সেগুলোর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষয় হতে পারে। এই ক্ষয় হওয়ার কারণে আমরা অনেক স্থাপনাকে পরিত্যক্ত হতে দেখি। নিরাপত্তার কারণে অনেক দুর্বল স্থাপনা আমরা ভেঙেও ফেলি। বাংলাদেশে ১৯৯১ সালের দিকে যেসব সাইক্লোন শেল্টারগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল তার বেশির ভাগই কয়েক বছরের মধ্যে দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই স্থাপনাগুলো দ্রæত ক্ষয় হওয়ার কারণ অনুন্ধান করা জরুরি। এসব অনুসন্ধান থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত নথিভুক্ত করতে হবে এবং যথাযথভাবে তা স্থায়িত্বের উপযোগী স্থাপনা ডিজাইনের গাইডলাইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই দীর্ঘস্থায়ী কংক্রিট স্থাপনা নির্মাণ গাইডলাইন অনুসরণ করে আমাদের স্থাপনাগুলোর স্থায়িত্ব ১০০ বছরেরও বেশি সময় টেকসই করা সম্ভব। ফলে নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহারও কমে আসবে এবং পক্ষান্তরে তা ভবিষ্যতে নির্মাণসামগ্রীর প্রাপ্যতা সুনিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।

অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট

ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০১তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৮

ড. মো. তারেক উদ্দিন, পি.ইঞ্জি
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top