কিছু ব্যক্তির পোশাক দেখে সহজেই বোঝা যায় তাঁর পেশা সম্পর্কে। অর্থাৎ পোশাকই পেশার প্রতিফলন। যেমন, একজন আইনজীবী বা বিচারক পরেন বিশেষ ধরনের কালো গাউন, যেটা ১৬৮৫ সাল থেকে প্রচলিত এবং বর্তমানে এই পেশার জন্য আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক পোশাক। ডাক্তারের পোশাক তাঁর সাদা রঙের অ্যাপ্রন। এ ছাড়া পুলিশ, আর্মি, সিকিউরিটিসহ অসংখ্য পেশার মানুষকে তাঁর পোশাকই দেয় পরিচিতি। স্থাপত্য একটি ব্যতিক্রর্মী পেশা। একজন স্থপতির হয়তো-বা নির্দিষ্ট কোনো পোশাক-পরিচ্ছদ নেই, তবে প্রত্যেকেরই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন পোশাকি স্টাইল। এসব স্টাইল একজন স্থপতির স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে!
বাংলায় একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে, ‘আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারি’। সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে পোশাক মানুষের নিজেকে উপস্থাপনের সর্বপ্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত, এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একজন স্থপতির ক্ষেত্রে নিজেকে উপস্থাপন কতটুকু জরুরি এ বিষয়টি দেখতে গেলে পোশাক গণ্য হোক বা না হোক, কিন্তু তাঁর কথা বলার বা নিজের কাজকে কথায় উপস্থাপন করাটা সর্বকালেই স্থাপত্যের অপরিহার্য একটি অনুষঙ্গ হয়ে রয়েছে। স্থাপত্যশিক্ষার শুরু থেকেই উপস্থাপনা স্থাপত্যশিক্ষার অবিচ্ছেদ্য এক অংশ। সারা বিশ্বে স্থাপত্যশিক্ষায় ‘জুরি’ হিসেবে পরিচিত যে বিষয়টি, তা প্রজেক্ট, আইডিয়া বা গ্রাফিক্যাল উপস্থাপনার পাশাপাশি খুব গুরুত্বপূর্ণ মৌখিক উপস্থাপনাও। স্থাপত্যশিক্ষায় এই উপস্থাপনাকে অপরিহার্য এক অংশ হিসেবে বিবেচনা করার পেছনে নিঃসন্দেহে যে বিষয়টি যুক্ত, তা হলো একজন স্থপতির পেশাগত জীবন। যেখানে একজন স্থপতি প্রতিনিয়ত সম্মুখীন হন উপস্থাপনার, কথা বলার, ব্যাখ্যা করার কিংবা নেতৃত্ব দেওয়ার। তাই পোশাকে সুনির্দিষ্ট কোনো বাধাধরা নিয়ম না থাকলেও একজন স্থপতি কিন্তু নিত্যদিনের উপস্থাপক, এ বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশের সুযোগ নেই একদমই।
ঐতিহ্যগতভাবেই তাই স্থপতির সঙ্গে, স্থাপত্য চর্চার সঙ্গে উপস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে জড়িয়ে আছে। উপস্থাপনা বিস্তৃত একটি বিষয়। উপস্থাপনার বৈশিষ্ট্য নিয়ে রয়েছে নানা গবেষণা। একজন উপস্থাপক কী উপস্থাপন করছেন তা যেমন উপস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততটাই গুরুত্ব বহন করে তাঁর উপস্থাপনার কৌশলশৈলী। উদারহণস্বরূপ বলা যায়, যেমন ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথলেসের ওয়েবসাইটে শিক্ষার্থীদের উপস্থাপনার কৌশল হিসেবে বলা হয়েছে, উপস্থাপনার সময় শারীরিক ভাষার দিকে লক্ষ রাখাটা জরুরি। দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা, তাকানোর ভেতরও থাকা উচিত সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য, যা শ্রোতার আকর্ষণকে সমান মাত্রায় ধরে রাখে। গবেষক রিসেল ডেবিস তাঁর একটি লেখায় বলেছেন, মৌখিক উপস্থাপনা শুধু কী উপস্থাপন করা হচ্ছে তা নয়, খুব গুরুত্বপূর্ণভাবে এটি কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভরশীল। তিনি আরও বলেছেন, গলার স্বর নিয়ে, ভঙ্গিমা নিয়ে। উপস্থাপনার বৈশিষ্ট্য নিয়ে রয়েছে এমন আরও অসংখ্য গবেষণা। কিন্তু উপস্থাপনার সঙ্গে পোশাকের গুরুত্ব কতটুকু আর কীভাবে পোশাক উপস্থাপন করে, উপস্থাপক কে তা নির্ধারণ করাটাই ব্যাখ্যা করতে পারে একজন স্থপতির পোশাক ও ভূষণ।
উপস্থাপনার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পোশাককে নির্দেশ করেছে আমেরিকার দি ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস। একটি লেসনে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, প্রফেশনাল ড্রেস-আপ একজন শিক্ষার্থীর উপস্থাপনার গুণকে বাড়িয়ে দেয়, উপস্থাপককে গুরুত্বপূর্ণ কওে তোলে শ্রোতার কাছে। একজন উপস্থাপকের পোশাক তাঁর শ্রোতা বা দর্শকের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। যদিও সব ধরনের উপস্থাপনার পোশাক এক রকম নয়। পথে গান শুনিয়ে যে উপার্জন করে, তার পোশাক আর একজন রাষ্ট্রপতির পোশাক কখনোই এক নয়। কিন্তু কাজের সঙ্গে, উপস্থাপনার জায়গা, মূল্যমান হিসেবে পোশাক সংগতিপূর্ণ হওয়াটা জরুরি। দ্য প্রেজেন্টেশন ম্যাগাজিন উপস্থাপনার সঙ্গে পোশাকের সামঞ্জস্য নিয়ে একটি প্রবন্ধে লিখেছে, ‘গবেষণায় দেখা গেছে উপস্থাপনার প্রথম প্রভাবক হিসেবে যা কাজ করে তা কথা নয়, তা হলো একজন উপস্থাপককে সর্বোপরি দেখতে কেমন লাগছে সেটাই’। অর্থাৎ একজন উপস্থাপকের পোশাক তাঁর উপস্থাপনায় অনেক বড় মাত্রায় গুরুত্ব বহন। সে অর্থে এটা একজন স্থপতির ক্ষেত্রেও বিশেষভাবে প্রযোজ্য, যেহেতু একজন স্থপতি একজন নিত্যদিনের উপস্থাপক। অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট কোনো পোশাক না থাকলেও একজন স্থপতির পোশাক-সচেতন থাকা উচিত। আর এই বিষয়টি আরও বহু গুণে ফুটে উঠেছে কালে কালে, মডার্ন, পোস্ট-মডার্ন থেকে শুরু করে সমসাময়িক স্থপতিদের বেশ ও ভূষণে।
১৮০০ সালের প্রথম থেকে বর্তমান সময়ের নামী স্থপতিদের অধিকাংশ ছবিতে দেখা যায় কোর্ট, শার্ট এবং টাইকে প্রাধান্য দিতে। ছবিতে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর ২০টি দেশের বিভিন্ন সময়ের স্থপতিদের প্রোর্ট্রেট থেকে ধারণা করা যায়, তাঁদের পোশাকের প্রাধান্যের দিকটি। একই সঙ্গে এই বিষয়টিও পরিষ্কার হয় যে নিজেকে উপস্থাপনকে স্থপতিরা গুরুত্ব দিয়েছেন সব সময়। উপমহাদেশের স্থপতিদের ক্ষেত্রেও লক্ষ করা যায় স্বদেশি পোশাকের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ উপস্থাপনায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে ফরমাল পোশাক নির্বাচন করতে।
মার্জিত পোশাক এবং সঠিক পোশাকের নির্বাচন যেকোনো মানুষকেই আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। একজন স্থপতির জন্য এই আত্মবিশ্বাস আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পেশাগতভাবে উপস্থাপনা তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। আর পোশাকের গুরুত্ব শুধু পেশাগত জীবনে নয়, এটি একজন স্থাপত্যের শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনেও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয় স্থাপত্য-বিষয়ক ওয়েবসাইট আর্ক-ডেইলি ‘একজন স্থপতির পোশাক’-বিষয়ক একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে। যেখানে গ্রহণযোগ্য শার্ট, গ্রহণযোগ্য প্যান্ট বা এর রঙের সম্পর্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। পোশাক অবশ্যই একজন স্থপতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কোন ধরন বা রঙের পোশাক তা নির্ধারণ করে বলাটা যুক্তিযুক্ত নয়। পোশাক সংস্কৃতির অনেক বড় একটা অংশ। একটি দেশের স্থাপত্য যেমন তার ঐতিহাসিক, স্বদেশি এবং আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভরশীল, ঠিক তেমনি একটি দেশের পোশাক তার সংস্কৃতির এবং আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ। একজন স্থপতির কাজে যেমন স্বদেশি বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়, ঠিক পোশাকের ক্ষেত্রেও প্রতিফলন থাকা উচিত স্বদেশি বৈশিষ্ট্যের। একই সঙ্গে উপলক্ষ বা আনুষ্ঠানিক দিকটি পোশাক নির্বাচনে স্থপতিরা প্রাধান্য দিয়েছেন। স্বদেশি বা বিদেশি, পোশাকের ধরন অথবা রং একটি ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়, কিন্তু যেকোনো পোশাকের ভেতরেই উঠে আসতে পারে মার্জিতভাব এবং উপযুক্ত উপস্থাপনা, যা একজন স্থপতির নেতৃত্বগুণ ও আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয় বহু গুণে।
- তাহিয়া তৃণা, স্থাপত্যে ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৮তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৫