সংস্কার ও সংরক্ষণে দেশীয় প্রত্নতত্ত্ব

প্রত্নসম্পদ বা প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের ভেতর জড়িয়ে থাকে একটি জাতির অহংকার। কোনো জাতি যখন কোনো ধরনের সংকটে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে, তখন উজ্জ্বল ঐতিহ্যই তাকে নতুন জীবনীশক্তি দিতে পারে। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শুরু করে প্রাচীন, মধ্য ও ঔপনিবেশিক যুগ পর্যন্ত নানা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। আমাদের প্রচলিত ইতিহাস ও সংস্কৃতিবিষয়ক গ্রন্থগুলোতে তেমনভাবে জায়গা করে নিতে পারেনি সব ঐতিহ্যের সম্ভার। নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারসমূহের চিত্র এখনো সব স্তরের মানুষের সামনে উন্মোচিত হয়নি। তবে বিগত দুই দশকে এ দেশে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় এসেছে নতুন গতি। পাকিস্তান আমল থেকেই এই অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে প্রত্নতত্ত্ব পাঠ ও প্রত্ন গবেষণার সুযোগ ছিল না। ফলে অনেকটা অবৈজ্ঞানিকভাবে আমাদের জাতীয় ইতিহাস লিখিত হয়েছে। দুই দশক আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ যাত্রা শুরু করে। এর পর থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার দ্বার উন্মোচিত হয়। আর এর ফসল হিসেবে নতুন নতুন প্রত্নক্ষেত্র আবিষ্কৃত হতে থাকে দেশের নানা অঞ্চলে। এর সঙ্গে সরকারি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মভূমিকাও যুক্ত হয়। ফলে সুযোগ তৈরি হয় আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্য উন্মোচনের। এই সূত্রেই পুরাতাত্ত্বিকেরা কুমিল্ল¬ার লালমাই ও হবিগঞ্জের চুনারুঘাট অঞ্চলে প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নস্থল খুঁজে পেয়েছেন। বৌদ্ধ ঐতিহ্যের ধারক প্রত্নস্থলসমূহ আবিষ্কৃত হয়েছে দেশের নানা অঞ্চলে। এগুলোর মধ্যে পাহাড়পুর বিহার ও ময়নামতি অঞ্চলের বিহারসমূহ অনেকটা পরিচিত হলেও প্রাচীন বৌদ্ধ ও হিন্দু ঐতিহ্য বুকে নিয়ে যশোরে অবস্থিত ভরতভায়না প্রত্নস্থল এখনো সাধারণ্যে সুপরিচিত নয়। গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন প্রত্নস্থল মহাস্থানগড় ইতিহাসের পাদপীঠে চলে এলেও নরসিংদীর উয়ারি-বটেশ্বর প্রত্নস্থল এখন নতুন সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে। বাংলাদেশজুড়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সংস্কারকৃত এবং ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় রয়েছে মধ্যযুগের মসজিদ, মাদ্রাসা, সমাধি, দুর্গ, প্রাসাদ ইত্যাদি। মধ্যযুগের কয়েকটি নতুন প্রত্নস্থলও আবিষ্কৃত হয়েছে। দেশের নানা স্থানে রয়েছে ঔপনিবেশিক যুগের ইমারত। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মন্দির, ধ্বংসপ্রায় বা সংরক্ষিত জমিদারবাড়ি ও অন্যান্য ভবন। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুসন্ধানে যেসব আকর সূত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়, তা প্রধানত এ দেশে অনুসন্ধান ও উৎখননে প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক সূত্র। সাম্প্রতিককালে প্রত্নসূত্র অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ করে যে অনুদ্ঘাটিত ইতিহাস যুক্ত হচ্ছে, তাতে ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছে এ দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনর্গঠনের।

বাংলাদেশে প্রাগৈতিহাসিক কালপর্ব

বাংলাদেশে প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানববসতি ছিল কি না, এ পর্বে বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে ভান্ডার শূন্য কি না, এ নিয়ে বিতর্ক পুরোনো। ভূমি গঠনের বিবেচনায় বাংলার অধিকাংশ অঞ্চলের মাটি বেশ নবীন। পলিমাটিতে গড়ে উঠেছে এই তো সেদিন। এ কারণে মনে করা হতো ঐতিহাসিক যুগ অতিক্রম করে আরও প্রাচীন ঐতিহ্য আবিষ্কারের সম্ভাবনা নেই। কিন্তু আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরো বাংলা না হলেও এ দেশের কোনো কোনো অংশের মাটি অনেক প্রাচীন। প্লায়স্টোসিন যুগে গঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশের ভূখণ্ড বিচারে উত্তরের বরেন্দ্রভূমি, মধ্যাঞ্চলের মধুপুরের গড় এবং পূর্বদিকে লালমাই, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মাটি লাখা বছরের পুরোনো। আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে পুরোনো মাটির কোনো কোনো অঞ্চলে প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষের বিচরণ ছিল। পৃথিবীতে মানুষের ক্রমবিকাশের প্রাথমিক ধারায় ভারত উপমহাদেশের আদিমানবের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে। পাওয়া গেছে পুরোপলীয় বা পুরোনো পাথরযুগের বেশ কিছুসংখ্যক হাতিয়ার। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রথম প্রাগৈতিহাসিক মানুষের ব্যবহার করা অস্ত্র পাওয়া যায় চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে। এভাবে ধীরে ধীরে পুরোপলীয় ও নবোপলীয় যুগের হাতিয়ার পাওয়া যায় নোয়াখালীর ছাগলনাইয়ায়, কুমিল্লার লালমাইয়ে, নরসিংদীর উয়ারি-বটেশ্বরে। সম্প্রতি হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে (চাকলাপুঞ্জি) উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পাথরযুগের হাতিয়ার পাওয়া গেছে। এই আবিষ্কার প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন গবেষকের গবেষণার ফসল।

সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্য

প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রাপ্ত প্রামাণ্য সূত্র থেকে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কয়েকটি অঞ্চলে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সন্ধান পাওয়া গেছে। তাতে গোটা বাংলার প্রতিচ্ছবি নেই। হিউয়েন সাং সমতট অঞ্চলে ৩০টি সংঘারাম ও বিহার প্রত্যক্ষ করার দাবি করেছেন। কিন্তু এর অধিকাংশ এখনো উন্মোচিত হয়নি। সেনযুগের রাজধানী বিক্রমপুরের প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রায় পুরোটাই অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। শুধু ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক সূত্রের তথ্যেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। একই মন্তব্য করা যায় প্রাচীন ও মধ্যযুগের সোনারগাঁওয়ের ক্ষেত্রে। ভূ-প্রাকৃতিক বাস্তবতায় অনেক প্রত্নস্থল এখন আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। দুর্বল নির্মাণ উপকরণ, বন্যা, নদীভাঙন, ভূমিকম্প প্রভৃতির কারণে বিস্তারিত প্রত্নক্ষেত্র আবিষ্কারের সুযোগ সীমিত হয়ে গেছে। এ ছাড়া এ দেশে প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের একমাত্র আইনসম্মত অধিকর্তা সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ নানা সীমাবদ্ধতার জন্য কার্যক্রম বিস্তৃত করতে পারছে না। এসব কারণে প্রাচীন বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনেকটাই অনুদ্ঘাটিত রয়ে গেছে। উৎখননের মাধ্যমে আবিষ্কৃত প্রাচীন বাংলার উজ্জ্বল প্রত্নক্ষেত্রসমূহ মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর ও ময়নামতির মধ্যেই সীমিত। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন ও অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালিত হলে আরও অনেক প্রত্নস্থল আবিষ্কার যে সম্ভব, তা নরসিংদীর উয়ারি-বটেশ্বর ও যশোরের ভরতভায়না প্রত্নস্থল আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে।

প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্য অনুসন্ধানে নতুন সংযোজন ‘প্রত্নস্থল উয়ারী-বটেশ্বর’

প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও উৎখননের মধ্য দিয়ে প্রত্নস্থল উয়ারী-বটেশ্বর বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাস পুনর্গঠনে এক নতুন সম্ভাবনা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। নরসিংদী জেলার বেলাব থানা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত দুটি গ্রাম উয়ারী ও বটেশ্বর। বিশ শতকের ত্রিশের দশকেই নিভৃত গ্রাম দুটো প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের কথা সীমিতভাবে সংস্কৃতি অনুসন্ধানী মানুষের নজরে আসে। প্রথম বসতি বা নগরায়নের কাল নির্ণয়ের জন্য উয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নস্থলের কিছু নমুনার কার্বন-১৪ পরীক্ষা করা হয়েছে। প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় এখানে নগরায়ন ঘটেছিল ৪৫০ খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দে। উয়ারী-বটেশ্বরে প্রত্ন গবেষণা এখনো চলছে। প্রতি খনন মৌসুমেই নতুন নতুন প্রত্ন নিদর্শন উন্মোচিত হচ্ছে আর তা বাঙালি সভ্যতাকে করে তুলছে আরও বেশি অহংকারী। 

ভরতভায়না

ভরতভায়না প্রত্নস্থলটির অবস্থান বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলায় ভরতভায়না নামের একটি ছোট্ট গ্রাম রয়েছে। এই গ্রামটি গৌরিঘোনা ইউনিয়নের অন্তর্গত। ভরতভায়না প্রত্নস্থলের পূর্ব দিক দিয়ে বহমান বুড়িভদ্রা নদী। বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সংরক্ষিত প্রত্নস্থলটি একটি একক বিচ্ছিন্ন ঢিবি। ‘ভরতভায়না ঢিবি’ বা স্থানীয়ভাবে ‘ভর্তের দেউল’ নামে পরিচিত এই ঢিবিকেই সাধারণভাবে ভরতভায়না প্রত্নস্থল বলে শনাক্ত করা হয়। উৎখননের পর ভরতভায়না ঢিবির ভেতর থেকে একটি মন্দির পরিকল্পনার কাঠামো উন্মোচিত হয়েছে। প্রত্নস্থলে পাওয়া গেছে পোড়ামাটির উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ফলক। তবে এর একটিও পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় পাওয়া যায়নি। ছাঁচে তৈরি এবং হাতে গড়া দুই ধরনের ফলকেরই খণ্ডাংশ পাওয়া গেছে। সাধারণত মন্দিরের দেয়াল অলংকরণ করার জন্য এসব ফলক ব্যবহার করা হতো। সম্ভবত এ যাবৎ বাংলাদেশে পাওয়া পোড়ামাটির ফলকের সর্ববৃহৎটি পাওয়া

ভরতভায়না, ছবিঃ উইকিপিডিয়া

গেছে এখানে। পোড়ামাটির আরও বিচিত্র প্রত্নবস্তু পাওয়া গেছে ভরতভায়না ঢিবিতে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মানুষ ও গরুর মাথা, তেলপ্রদীপ, মৃৎপাত্র, অলংকৃত ইটের টুকরো, পদচিহ্নযুক্ত ইট, পোড়ামাটির অলংকার ইত্যাদি। প্রাপ্ত নিদর্শন থেকে বোঝা যায়, সে যুগে নানা ধরনের মৃৎপাত্র তৈরি হতো। যেমনÑ প্রদীপ, কলসি, বাটি, ছোট থালা, গোলাপদানি বা ফুলদানির ওপরের অংশ, বড় পাত্রের ভাঙা অংশ, খেলনা ইত্যাদি। পোড়ামাটি ছাড়াও এই প্রত্নস্থল থেকে পাওয়া গেছে লোহার অস্ত্র ও দ্রব্যসামগ্রী, কড়ি এবং বেশ কিছুসংখ্যক পশুর হাড়ের খণ্ড। ভরতভায়না প্রত্নস্থলের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অনেক গভীরে প্রোথিত। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাপ্ত প্রত্ননিদর্শন ইঙ্গিত দেয় যে শুধু বর্তমানে উন্মোচিত এবং চিহ্নিত প্রত্নস্থলেই নয়, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও উৎখনন পরিচালনা করে একটি বিস্তৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উন্মোচনের সম্ভাবনা রয়েছে।

মধ্যযুগের প্রত্ন-ঐতিহ্য

মধ্যযুগের প্রত্ন-ঐতিহ্য অনুসন্ধানেও অনেক নতুন সংযোজন ঘটেছে। মধ্যযুগ ছিল বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে সমৃদ্ধ সময়কাল। স্বাধীন সুলতান ও মোগল সুবাদারদের সুশাসন এবং বাংলার সমৃদ্ধ কৃষি ও শিল্প-অর্থনীতি এই সমৃদ্ধিকে নিশ্চিত করেছিল। এর সাক্ষী হিসেবে এ দেশের সর্বত্র মধ্যযুগের স্থাপত্যিক নিদর্শন পাওয়া যায়। গত দুই দশকে প্রত্ন গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে ঝিনাইদহে সুলতানি যুগের নগর বারোবাজার, চাঁপাইনবাবগঞ্জে দরাসবাড়ি মাদ্রাসা, রাজশাহীর বাঘা মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, বাগেরহাটে খানজাহান আলীর বসতবাড়ি। তা ছাড়া সোনারগাঁওয়ের ওপর চলছে বিস্তৃত গবেষণা। একে একে উন্মোচিত হচ্ছে উজ্জ্বল ঐতিহ্যের নানা নিদর্শন। সাম্প্রতিক গবেষণায় সমকালীন শিলালিপির সাক্ষ্য এবং অন্যান্য সূত্র নিশ্চিত করছে অন্তত ৮০০ বছর আগে ঢাকায় নাগরিক জীবন বহমান ছিল। আর মোগলরা বাংলার স্বাধীনতা গ্রাস করার ২০০ বছর আগে অর্থাৎ এখন থেকে ৬০০ বছর আগে স্বাধীন সুলতানি রাজ্যের একটি প্রদেশের রাজধানী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল ঢাকা। একসময় ভাবা হতো মোগল অধিকারের পর অর্থাৎ ৪০০ বছর আগে ঢাকার নাগরিক জীবনের যাত্রা শুরু হয়েছে। প্রত্নসূত্র এখন তা বাতিল করে দিয়ে জানাচ্ছে, ৮০০ বছর আগেও নগরজীবন ছিল ঢাকায়। এরপর মোগলদের গড়া সুবে বাংলার রাজধানীর ধারণা থেকে বলা হতো ঢাকা রাজধানীর মর্যাদা পেয়েছে ৪০০ বছর আগে। কিন্তু এখন প্রত্নসূত্র নিশ্চিত করছে, স্বাধীন সুলতানি বাংলার পূর্বাঞ্চলে দুটো ‘ইকলিম’ বা প্রদেশ ছিল। এর একটি মুয়াজ্জমাবাদ আর অন্যটি মুবারকাবাদ। পনেরো শতকের মাঝপর্বে মুবারকাবাদ ইকলিমের রাজধানী ছিল ঢাকা। ‘খাজা জাহান’ উপাধিধারী একজন এই ইকলিমের প্রশাসক ছিলেন। আমরা মধ্যযুগের বাংলার দু-একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থলের বর্তমান ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে চাই।

প্রত্ননিদর্শনপ্রাপ্তির আলোকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল বাগেরহাট। গুরুত্ব বিবেচনায় প্রত্ন অঞ্চল বাগেরহাট ‘বিশ্ব ঐতিহ্যে’র অংশ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করছে পাহাড়পুর-ময়নামতি প্রত্ন অঞ্চল। এই দিক বিচারে বাগেরহাট প্রত্নস্থলের গুরুত্ব কিছুটা ভিন্ন। কারণ, এই প্রত্নস্থল প্রধানত বাংলার মধ্যযুগের সুলতানি পর্বের প্রতিনিধিত্ব করছে। পশ্চিম বাংলার গৌড়-পান্ডুয়া মধ্যযুগের স্বীকৃত প্রত্ন অঞ্চল। যদিও সমগ্র বাংলাদেশজুড়ে মধ্যযুগের মুসলিম স্থাপত্য ও প্রত্নবস্তু ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তথাপি গৌড়-পান্ডুয়ার পরে বাগেরহাটই একমাত্র প্রত্নস্থল, যেখানে সীমিত ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে সুলতানি পর্বের নির্দিষ্ট সময়কালের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ধর্মীয় ইমারত ও প্রত্নবস্তু পাওয়া গেছে এবং এখনো দু-একটি সম্ভাবনাময় স্থান শনাক্ত করা গেছে, যেখানে উৎখননের মাধ্যমে প্রত্নসম্পদ উন্মোচনের অপেক্ষায় আছে।

বাগেরহাটের প্রত্ন স্থাপনাসমূহের মধ্যে মসজিদের সংখ্যাই বেশি। বর্তমানে টিকে থাকা মসজিদের অধিকাংশই সরকারি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পুনর্নির্মাণ করেছেন। এসব নির্মাণে স্থাপত্যসমূহ সুলতানি স্থাপত্যের একটি আদল পেয়েছে ঠিকই, তবে অনেক ক্ষেত্রে স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ না করায় এবং ঐতিহাসিকতাকে গুরুত্ব না দেওয়ায় একদিকে যেমন তা সঠিকভাবে ইতিহাসকে উপস্থাপন করতে পারছে না, অন্যদিকে সংস্কার সংরক্ষণকাজ সহজ করার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ অলংকরণশৈলীর বিলুপ্তি ঘটানো হয়েছে। কোথাও কোথাও সংস্কার-দুর্বলতার কারণে ইমারত হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে।

সংকট যখন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের

অভ্যন্তরীণ নানা রকম সংকট ছাড়া বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত মসজিদের শহর বাগেরহাট প্রত্ন অঞ্চলের সংরক্ষিত ইমারত ও প্রত্নস্থলসমূহ সংস্কার-সংরক্ষণে ইউএনডিপির তত্ত্বাবধানে ইউনেসকোর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থ সহযোগিতা থাকায় প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে সমুন্নত রেখে অনেক বেশি বিজ্ঞানমনস্কভাবে ঐতিহ্য রক্ষা করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে অনুমান করা সহজ যে সে দায়িত্ব আমরা যথাযথ পালন করতে পারিনি।

ষাটগম্বুজ মসজিদের অভ্যন্তর, ছবিঃ উইকিপিডিয়া

বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ রক্ষা ও তদারকির মুখ্য দায়িত্ব সরকারের। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় তার নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ওপর এ ক্ষেত্রটি তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব অর্পণ করেছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯৩৮ সালে প্রণীত Archaeological Works Code অনুসারে কর্মসম্পাদনে দায়বদ্ধ। এই কোডে প্রাচীন ইমারত সংস্কার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যে ধারাটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে তা হলো, ‘All archaeological works including those involving restoration or the preservation of new feartures not integral but incidental to the preservation of ancient monuments.’ -এর পাশাপাশি আরও স্পষ্ট করা হয়েছে ১৯৬৮ সালের পুরাকীর্তি আইনে। ১৪ নং ধারার ১৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংরক্ষিত কোনো পুরাকীর্তির কোনো প্রকার পরিবর্তন (Alter) বা বিকৃতি (Deface) শাস্তিযোগ্য অপরাধ। শুধু বাংলাদেশই নয়, বিশ্বের সব সভ্য দেশই তাদের ঐতিহ্য পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপস্থাপনের জন্য নানা প্রকার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করে প্রত্ননিদর্শন অবিকৃত রেখে সংরক্ষণের চেষ্টা করে এবং পুরাকীর্তি আইন কঠোরভাবে মান্য করে। কিন্তু আমাদের দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়িত্বশীলতার পরিচয় না দেওয়ায় এবং পুরাকীর্তি আইন মান্য না করায় যে ক্ষতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তার একটি চিত্র হলো- 

ক. ষাটগম্বুজ ও রণবিজয়পুর মসজিদের অভ্যন্তরভাগ মোটা প্লাস্টারে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। ষাটগম্বুজ মসজিদের অন্যতম স্থাপত্যিক অহংকার পাথরের স্তম্ভগুলো প্লাস্টারের আড়ালে অন্তরীণ থাকায় এগুলো আর পাথর হিসেবে শনাক্ত করার উপায় নেই। এটি সরাসরি পুরাকীর্তি আইনের লঙ্ঘন। এই ভুল সংস্কারকর্ম ইতিহাসকেও বিকৃত করেছে। সুলতানি ও মোগল যুগ শিল্পশৈলীর বিচারে মধ্যযুগের দুটো স্বতন্ত্র পর্ব। স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্যে এই দুই যুগের শৈলীতে বড় দাগে কিছু পার্থক্য রয়েছে। এই স্বাতন্ত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ইমারতে প্লাস্টারের ব্যবহার করা না করা। প্লাস্টারের ব্যবহার মোগল যুগের আগে তেমন দৃশ্যমান ছিল না। এই স্বতঃসিদ্ধ বিষয়টি অধ্যাপক দানীর ভাষায় প্রামাণ্য করা যায়। তিনি বলেছেন, ‘…Lime has also been used as a plaster, especially on the parapet, roof and dome in order to make building water-tight. In the Mughal period plaster was widely used on the surface of the walls as well.’ (Ahmad Hasan Dani, Muslim Architecture in Bengal, Dacca, 1961, Asiatic Society of Pakistan, p.11).

অতএব সরাসরি বলা যায়, ষাটগম্বুজ ও রণবিজয়পুর মসজিদের অভ্যন্তর দেয়াল, স্তম্ভ প্লাস্টারে আবৃত ও চুনকামে উজ্জ্বল করে সুলতানি ইমারতের বৈশিষ্ট্য বিনষ্ট করা হয়েছে। স্তম্ভসমূহ প্লাস্টারে অন্তরীণ হওয়ায় সাধারণ দর্শক যেমন ঐতিহ্যিক সৌন্দর্যদর্শনে বঞ্চিত হচ্ছেন তেমনি ভবিষ্যৎ গবেষকের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টিরও অবকাশ তৈরি হয়েছে। পাথর সহজলভ্য না হওয়ায় বাংলার মধ্যযুগের সৌধ প্রধানত ইটে নির্মিত। সীমিতভাবে কোথাও কোথাও পাথরের ব্যবহার দেখা যায়। মালদহ জেলার রাজমহলের পাহাড় থেকে আনা হতো কালো ব্যাসল্ট পাথর। খুব কম বেলে পাথর ও গ্রানাইট পাথরের ব্যবহার দেখা যায়, যা আমদানি করা হতো বিহার থেকে। এসব আমদানির সঙ্গে খানজাহান আলীর সময় বাগেরহাট যে যুক্ত ছিল সে ইতিহাস রচনার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হতে পারে ষাটগম্বুজ মসজিদের পাথুরে স্তম্ভ এবং জাহাজঘাটা প্রত্নস্থল। কিন্তু ভবিষ্যৎ গবেষক পাথর খুঁজে না পেয়ে ইতিহাসের সূত্র হারিয়ে ফেলতে পারেন বলে শঙ্কা থাকছেই।

ষাটগম্বুজ মসজিদের পূর্বদিকের মূল প্রবেশ দরজার খিলানের ওপরে এবং ছাদের নিচে ত্রিকোনাকার পেডিমেন্ট ছিল। কিন্তু সংস্কারের সময় কোনো রকম নিয়ম না মেনে তা নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়েছে। এটি নিছক সংস্কারের নিয়মভঙ্গই নয়, নষ্ট করা হয়েছে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। সুলতানি যুগে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সুলতান ও সুফিদের উদার দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এ দেশে একটি সাংস্কৃতিক সমন্বয় ঘটেছিল। তার অনেক প্রমাণ পাওয়া যায় স্থাপত্যিক শৈলী এবং অলংকরণে। উল্লিখিত পেডিমেন্টের ব্যবহার বাংলাদেশের সুলতানি ইমারতে সহজলভ্য নয়। গ্রিক ঐতিহ্যে এর খোঁজ পাওয়া যায় বেশি। তা ছাড়া পেডিমেন্টের নিচে একটি পোড়ামাটির অলংকরণ এখনো অক্ষত। অনেকটা হিন্দু মোটিফের সঙ্গে মেলানো যায়। এটি প্রতিমার পেছনে জ্যোতির্বলয় এবং সর্প ফণাসদৃশ্য। মসজিদের পোড়ামাটির অলংকরণগুলো রক্ষা পেলে সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের বিষয় আরও স্পষ্ট করা সম্ভব হতো।

ষাটগম্বুজ মসজিদের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ সম্পর্কেও প্রশ্নের অবকাশ আছে। ইউএনডিপি ১৯৮৩ সালে ‘Master plan for the conservation and preservation of the ruins for the Buddhist Vihara at Paharpur and the Historic Msque-city of Bagerhat.’  শিরোনামে বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটি কর্মপ্রস্তাব পেশ করেছিল। এখানে ষাটগম্বুজ মসজিদের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের প্রস্তাব ছিল। ইউনেসকো তাদের কাজের একটি অগ্রগতির প্রতিবেদন প্রকাশ করে ১৯৯১ সালে। সেখানে দেখা যায়, সীমানাপ্রাচীর ও অন্যান্য প্রস্তাবিত কাজের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে খননকার্য পরিচালনা করে একটি সীমানাপ্রাচীরের ভিত্তিও পাওয়া গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, খনন রিপোর্ট প্রকাশের আগে যে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে, তার সঙ্গে কতটা যুক্ত করা হয়েছে ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে? সীমানাপ্রাচীরের উচ্চতা নির্ধারিত হওয়ার ভিত্তি কি? দেয়ালের শীর্ষের জন্য যে বিশেষ আকৃতির ইট ব্যবহার করা হয়েছে, স্থাপত্যের ভাষায় যাকে বলা হয় Coping Brick  তা এই সুলতানি স্থাপত্যের পাশে কোন বিবেচনায় জায়গা করে নিল? মসজিদ স্থাপত্যের একমাত্র ব্যতিক্রম ষাটগম্বুজ মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে একটি দরজা ছিল। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে এটি ইট দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

খ. প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত প্রত্নস্থল হওয়ার পরও কীভাবে খানজাহান আলীর মাজারের বহির্দেওয়াল ও ফটকে উৎকট রঙের ব্যবহার সম্ভব হলো, মাজারসংলগ্ন মসজিদের আদি রূপে নানা ধরনের বিকৃতি সাধন করা হলো, ঠাকুরদিঘির ঘাটের সিঁড়ি আধুনিকায়ন করা সম্ভব হলো তা এক বিস্ময়। এসব ক্ষতি সুলতানি যুগের স্বাভাবিক ধারণাকে বিভ্রান্ত করবে।

গ. সংরক্ষিত স্থাপত্যের পরিচিতিমূলক সাইনবোর্ড না থাকায় দর্শনার্থীদের অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। আবার প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অনেক চিহ্নিত প্রত্নস্থল রয়েছে, যা সাধারণ দৃষ্টিতে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এখানেও পরিচিতিমূলক সাইনবোর্ড থাকা আবশ্যক।

ঘ. খুলনা ও বাগেরহাট জাদুঘরে স্থাপনাসমূহের সংস্কার-পূর্ব ও সংস্কার-পরবর্তী আলোকচিত্র পাশাপাশি প্রদর্শনের ব্যবস্থা রাখা জরুরি। এতে একদিকে দর্শনার্থীর ধারণায় পূর্ণতা আসবে এবং গবেষকেরা অনেক প্রশ্নের মীমাংসা করতে সক্ষম হবেন।

সাম্প্রতিক গবেষণায় সোনারগাঁওয়ের গুরুত্ব

চৌদ্দ শতকের প্রথমার্ধের মধ্যেই সমগ্র বাংলায় মুসলমান সুলতানদের তিনটি শাসনকেন্দ্র সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রথমটি উত্তর বাংলার লখনৌতে (বর্তমান পশ্চিম বাংলার মালদহ জেলা), দ্বিতীয়টি সাতগাঁও (পশ্চিম বাংলার রাঢ় অঞ্চল) এবং তৃতীয়টি পূর্ব বাংলার সোনারগাঁও। মুদ্রা প্রমাণে জানা যায় সুলতান শামসউদ্দিন ফিরোজ শাহের সময় (১৩০১-১৩২২ খ্রি.) সোনারগাঁও প্রথম মুসলিম শাসনাধীনে আসে। তাঁর নামাঙ্কিত মুদ্রা ‘হজরত সুনারগাঁও’ টাঁকশাল থেকে জারি হয়েছিল। সোনারগাঁওয়ের শাসক বাহরাম খানের বর্মরক্ষক ‘ফখরা’ ১৩৩৮ খ্রিষ্টাব্দে বিদ্রোহ করেন এবং এ সময় ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ নাম নিয়ে তিনি সোনারগাঁওয়ে স্বাধীন সুলতানি শাসনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত করেন। এরই ধারাক্রমে ১৩৫২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে পুরো বাংলায় স্বাধীন সালতানাত সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। সোনারগাঁও টাঁকশাল থেকে ফখরউদ্দিন মুবারক শাহের নামাঙ্কিত মুদ্রাও জারি হয়েছিল। এই সুলতানি শাসন যুগেই সোনারগাঁও একসময় রাজধানীর মর্যাদা পায়। কিন্তু প্রত্নসূত্র অবলম্বনে ইতিহাস গবেষণার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত না হওয়ায় সোনারগাঁওয়ের মর্যাদা ও গুরুত্ব তেমনভাবে উন্মোচিত হয়নি। বাংলার পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত সোনারগাঁও সুলতানি যুগে কখনো ছিল শিল্প-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, আবার কখনো লাভ করেছিল রাজধানী শহরের মর্যাদা।

কতগুলো বৈশিষ্ট্য ধারণ করে সুলতানি যুগে বাংলায় নগরের বিকাশ ঘটেছিল। বখতিয়ার খিলজির নদীয়া বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গেই বাংলায় নগর বিন্যাসের গতিধারায় একটি নতুন রূপ দেখা যায়। নতুন প্রতিষ্ঠিত মুসলিম রাজ্যে স্থিতিশীলতা অর্জনের পূর্ব পর্যন্ত রাজধানী পরিবর্তিত হতে থাকে। একই সঙ্গে নতুন নতুন শহরের পত্তন হয়। ‘খিত্তা’ নামে দুর্গ সুরক্ষিত শহর যেমন ছিল, আবার ‘কসবাহ’ নামে প্রাচীরবিহীন শহরও ছিল। গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে সুলতানগণ প্রতিষ্ঠা করতেন টাঁকশাল। শিল্প-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো শহরগুলো। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নদীর সান্নিধ্য শহর গড়ে তুলতে উৎসাহ দিত। এই শহরকেন্দ্রিক বন্দরের মাধ্যমে। বাণিজ্যের গতিশীলতা বৃদ্ধি পেত। এই বৈশিষ্ট্যসমূহের অধিকাংশই সুলতানি যুগের শহর সোনারগাঁওয়ে পাওয়া যায়। এই শহরটির গুরুত্ব ও গতিশীলতার সন্ধান লাভ করা যায় সমকালীন মুদ্রা ও শিলালিপি বিশ্লেষণে, বিদেশি পর্যটকদের বিবরণীতে আর সুফি সাধকদের আগমন সূত্র থেকে।

ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্তব্য ছিল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিবেচনায় সোনারগাঁওয়ের প্রত্নস্থলগুলোকে একটি প্যাকেজের অধীনে নিয়ে আসা। এই জরুরি কাজটি না হওয়ায় কৌতূহলী পর্যটক ও গবেষকদের কাছে অসম্পূর্ণ সোনারগাঁও দৃশ্যমান হবে। এখনো সোনারগাঁও পর্যটন করে আসা কাউকে প্রশ্ন করলে জানা যাবে তাঁরা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে এগিয়ে সোনারগাঁও পয়েন্ট থেকে বাঁয়ে নামেন। তারপর দেখে আসেন লোকশিল্প জাদুঘর, সরদারবাড়ি আর পানামনগর। অর্থাৎ তাঁদের দেখা হয় মধ্যযুগ নয়, ঔপনিবেশিক যুগের স্থাপনা। অথচ অতটা পরিচিত না হওয়ায় মহাসড়কের ডানে নামা হয় না। নামলে যাওয়া যেত মোগড়াপাড়া। সুলতানি যুগের মূল রাজধানী শহর। এখানে এখনো টিকে আছে তেরো শতকে ইসলাম প্রচার করতে আসা সুফি শরফউদ্দিন আবু তাওয়ামার সমাধি, আছে সুফি ইব্রাহীম দানিসমন্দের সমাধি, সুলতান জালালউদ্দিন ফতেহ শাহের মসজিদ, সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমাধিসহ আরও কিছু স্থাপনা। কাছাকাছি দূরত্বে আছে হিন্দুদের তীর্থকেন্দ্র লাঙ্গলবন্দের পঞ্চমি ঘাট। মদনপুর ক্রসিং থেকে পূর্ব দিকে প্রায় আট কিলোমিটার গেলে পৌঁছানো যায় মজমপুর বা মহজমপুরে। ব্রিটিশ আমলে যার নাম ছিল মুয়াজ্জমপুর আর সুলতানি যুগে মুয়াজ্জমাবাদ। এটি ছিল সুলতানি আমলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ টাঁকশাল নগর। এখন কালের সাক্ষী হয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছে সুলতান আহমদ শাহের মসজিদ আর সাধক শাহলঙ্গরের সমাধি। মদনপুর ক্রসিং থেকে পশ্চিম-দক্ষিণে ১০-১২ কিলোমিটার এগুলো সোনারগাঁওয়ের বিখ্যাত নৌবন্দর বন্দর উপজেলায় পৌঁছানো যায়। এখানে টিকে আছে সুলতানি ও মোগল যুগের বেশ কটি স্থাপনা। যেমন- শাহি মসজিদ নামে পরিচিত সুলতান ফতেহ শাহের মসজিদ, সুলতানি যুগের নৌবন্দরের শুল্ক আদায়কারী কর্মকর্তা পরে সুফি হিসেবে পরিচিত বাবা সালেহর সমাধি ও মসজিদ। আছে মোগল যুগের অন্যতম জলদুর্গ সোনাকান্দা দুর্গ আর কদমরসুল ইমারত। এভাবে পরিপূর্ণভাবে ঐতিহ্যের সোনারগাঁওকে উপস্থাপন না করতে পারলে প্রকৃতপক্ষে ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।

সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমাধি

সময়ের কথা বিবেচনা করে আজ এ পর্যন্তই। তবে বলতে চাই, ঠিক একইভাবে পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়, ময়নামতি, বারোবাজার, বাঘা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পুঠিয়ার মতো প্রত্নঅঞ্চলগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিন্ন সংকট ব্যাখ্যা করা যাবে। আমরা জানি, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের ঐকান্তিকতা থাকলেও নানা রকম সীমাবদ্ধতা তাঁদের প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখায় অন্তরায় সৃষ্টি করে। এর মধ্যে প্রধান সমস্যা বাজেটস্বল্পতা এবং জনবলসংকট। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয়েরও অভাব রয়েছে। দুর্বল প্রত্ন-ঐতিহ্য সংরক্ষণ আইন যুগোপযোগী করারও প্রয়োজন রয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রত্ন-ঐতিহ্যের সঙ্গে জনসম্পৃক্তি বৃদ্ধি করা। প্রত্ন-ঐতিহ্যের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও মমত্ববোধ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত ঐতিহ্য রক্ষা করা কঠিন।

[পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনÑপবা আয়োজিত ‘প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন রক্ষা ও সংরক্ষণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ পঠিত গবেষণাপত্র]

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৭তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৫

শামস আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top