উইন্ড টারবাইন এমন একটি যন্ত্র, যা বাতাসের গতিশক্তিকে বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে। উইন্ড টারবাইন ব্যবহার করে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, তা ব্যাটারি চার্জিংয়ের কাজে লাগে। এটাকে উইন্ড চার্জার বলে। সবচেয়ে ছোট আকারের উইন্ড টারবাইন ব্যবহৃত হচ্ছে ব্যাটারি চার্জিংয়ের জন্য। নৌকায় সহায়ক চার্জার হিসেবে এবং রাস্তার ট্রাফিক ওয়ার্নিং সাইনের জন্য এর রয়েছে বহুল ব্যবহার। এর চেয়ে সামান্য বড় আকারের উইন্ড টারবাইন দিয়ে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হয়, সেটা বাসাবাড়িতে ব্যবহার করা যায়। যদি একই সারিতে অনেক উইন্ড টারবাইন থাকে, তবে তা উইন্ড ফার্ম নামে পরিচিত। বর্তমানে উইন্ড ফার্মগুলোর প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে দিন দিন। কেননা উন্নত দেশে ক্রমেই বাড়ছে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের চাহিদা।
উইন্ড টারবাইন তৈরির ইতিহাস
উইন্ড টারবাইন মূলত একটি মেশিন, যা বাতাসের গতিশক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তর করে। তারপর এটাকে শক্তি উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা হয়। প্রায় এক হাজার বছর আগে মানুষ উইন্ড মিল ব্যবহার করে পানি উত্তোলনসহ শস্য মাড়াইয়ের কাজে ব্যবহার করত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উইন্ড টারবাইনকে উন্নত করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়।
১৯৩৪ সালে পালমার কসলেট পুটম্যান প্রথম বড় আকারের উইন্ড টারবাইন তৈরির কাজে হাত দেন। যাঁর টাওয়ারের উচ্চতা ছিল ৩৩ দশমিক ৫ মিটার। এটাতে দুইটি স্টেইনলেস স্টিলের ব্লেড ছিল, যার ব্যাসার্ধ ছিল ৫৩ মিটার। পুটম্যানের তৈরি উইন্ড টারবাইনে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ছিল ১ হাজার ২৫০ কিলোওয়াট, যা একটি ছোট শহরকে আলোকিত করার জন্য যথেষ্ট। ১৯৪৫ সালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এটি পরিত্যক্ত হয়।
১৯৭০ সালে আমেরিকায় যখন তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, তখন আবার খোঁজা হচ্ছিল কমমূল্যে কীভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় উইন্ড টারবাইন ব্যবহারে। বর্তমানে আমেরিকার বিদ্যুৎ অধিদপ্তরের মূল লক্ষ্য আরও শক্তিশালী উইন্ড টারবাইন তৈরি করা। যাতে ৩ হাজার ২০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায় প্রতিটি উইন্ড টারবাইন থেকে।
বিভিন্ন মডেলের উইন্ড টারবাইন রয়েছে। তবে সবচেয়ে কার্যকরী উইন্ড টারবাইন হচ্ছে ভূমি থেকে লম্বভাবে আকাশের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা ডেরিয়েস উইন্ড টারবাইন, যা দেখতে অনেকটা ডিম ফোটার যন্ত্রের মতো। এর প্রতিটি ব্লেড ৩০ মিটার লম্বা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১০০ কিলোওয়াট। এতে আছে তিনটি ব্লেড, যা নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘুরতে পারে এবং খুব সহজেই ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম। তা ছাড়া এ ধরনের উইন্ড টারবাইন অধিক পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। উইন্ড টারবাইনের কোম্পানি রয়েছে আমেরিকা জুড়েই। বর্তমানে আমেরিকায় ১৭ হাজার উইন্ড টারবাইন কোম্পানি রয়েছে, যার থেকে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, যা যথেষ্ট পাঁচ লাখ বাড়ি আলোকিত করতে।
উইন্ড টারবাইনের নির্মাণকৌশল
উইন্ড টারবাইন প্রধানত তিনটি যন্ত্রাংশের সমন্বয়ে তৈরি। টাওয়ার, ন্যাসেল ও রোটর ব্লেড। টাওয়ারটি স্টিলের লেটিকস (Latlice) টাওয়ারের মতো অর্থাৎ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে যেভাবে টাওয়ার তৈরি করে, ঠিক তেমনি। যখনই কোনো স্থানে উইন্ড টারবাইন স্থাপন করা হবে, সে স্থানের সর্বপ্রথম কাজ যোগাযোগের জন্য রাস্তা নির্মাণ করা। অর্থাৎ রাস্তা কেটে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে উইন্ড টারবাইনের তৈরি করা যন্ত্রাংশ সহজেই স্থানান্তর করা যায়।
উইন্ড টারবাইন স্থাপন করার প্রধান ধাপ হচ্ছে টাওয়ারটিকে মাটিতে পুঁতে খাড়া করা। টাওয়ারের যন্ত্রাংশগুলো প্রথমে বোল্টের মাধ্যমে জোড়া লাগানো এবং সম্পূর্ণ টাওয়ারটি জোড়া দেওয়ার পর সোজাসুজিভাবে মাটিতে শোয়ানো অবস্থায় রাখা। এরপর ক্রেনের সাহায্যে তৈরি করা টাওয়ারটি যথাস্থানে স্থাপন করা। লক্ষ রাখতে হবে, যাতে সব নাট-বোল্ট সঠিকভাবে টাইট দেওয়া হয়। টাওয়ারটির কাজ শেষ হলে সর্বশেষে টাওয়ারটির স্থায়িত্ব পরীক্ষা করা হয়। এরপর ফাইবার গ্লাসের তৈরি ন্যাসেলটি (Nacelle) বসানো হয়। এটির অভ্যন্তরীণ অংশ, যা দিয়ে চালিত হয়, সেগুলো প্রধান ড্রাইভ শেফট, গিয়ার বক্স, ব্লেড পিচ এবং ইয়া (Yaw) এবং টাওয়ারের বেইস ফ্রেমকে আটকানো হয় কারখানায়। এরপর ন্যাসেলটি বোল্ট দিয়ে চারদিকে আটকানো হয়। যেখানে টাওয়ারটি করা হয়েছে, সেখানে সম্পূর্ণ ন্যাসেলটি লিফটের মাধ্যমে স্থাপন করে ভালোভাবে বোল্ট দিয়ে আটকানো হয়। বেশির ভাগ টাওয়ারের গাই (Guy) ওয়ের থাকে না অর্থাৎ টাওয়ারটিকে চারদিক থেকে টেনে রাখা হয়, যাতে প্রচণ্ড বাতাসের বেগে ভেঙে বা পড়ে যেতে না পারে। যে কেব্লগুলো দিয়ে টাওয়ারের চারদিকে টানা দেওয়া থাকে, সেগুলো বেশির ভাগই স্টিলের তৈরি এবং এর ওপর জিঙ্ক অ্যালোয়ের প্রলেপ দেওয়া থাকে, যাতে মরিচা না ধরে এবং নিরাপদে থাকে। যদিও অনেক ওয়ের রোপ শুধু পেইন্ট করা হয়। আমেরিকার তৈরি টাওয়ারগুলো লম্বায় প্রায় ৮০ ফুটের মতো হয়, যার ওজন প্রায় ১৯ হাজার পাউন্ড।
ন্যাসেল একটি শক্তিশালী ফাঁপা সেল, যার ভেতর উইন্ড টারবাইনের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়। এটা সাধারণত ফাইবার গ্লাসে তৈরি। ন্যাসেলে মূলত থাকে মেইন ড্রাইভ শ্যাফট এবং গিয়ার বক্স। এটাতে ব্লেড পিচ কন্ট্রোল এবং হাইড্রোলিক সিস্টেমও রয়েছে, যা ব্লেডের অ্যাঙ্গেল কন্ট্রোল করে এবং ইয়া ড্রাইভ যা টারবাইনকে সঠিক পজিশনে রাখে বাতাসের গতিবেগের সঙ্গে। জেনারেটর ও ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল হচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড ইকুইপমেন্ট, যার প্রধান কম্পোনেন্ট হচ্ছে স্টিল ও কপার। স্ট্যান্ডার্ড যে ন্যাসেলগুলো তৈরি করে, সেগুলোর ওজন প্রায় ২২ হাজার পাউন্ড।
উইন্ড টারবাইনের একটি ইউটিলিটি বক্স থাকে, যা বায়ুকে বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তর করে এবং এটি টাওয়ারের গোড়ায় সংযোজন করা হয়। অন্যান্য কেব্ল ইউটিলিটি বাক্সে এসে সংযুক্ত হয়ে ন্যাসেলে যায়। অন্যান্য ঝুঁকি সংযোগগুলো টারবাইন এবং ট্রান্সফরমারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।
বাংলাদেশে উইন্ড এনার্জির ব্যবহার
বাতাসকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ইতিমধ্যে জরিপ করা হয়েছে। অর্থাৎ কোথায় এ ধরনের প্রকল্প স্থাপন করা হলে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। দেখা গেছে, সমুদ্রের পারে বাতাস সর্বক্ষণ থাকে এবং এর বেগও মোটামুটি মন্দ নয়। তবে অনেক স্থানে কম-বেশি বাতাসের বেগের তারতম্য তো আছেই। এ ছাড়া ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের তারতম্য তো থাকেই। তবে বাতাসের আধিক্য এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরে থাকে বেশি এবং বাকি সময় সারা বছর বাতাসের তীব্রতা তেমন একটা থাকে না।
বাংলাদেশে এমন প্রতিকূল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও বাতাসকে শক্তি হিসেবে কাজে লাগানো হয়েছে পানির পাম্প করার জন্য এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে। সবচেয়ে বড় আকারের প্রকল্পটি বাতাস এবং সোলার এনার্জির মিশ্রণে হাইব্রিড করে ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে সেন্ট মার্টিনে। অপর একটি ছোট আকারের প্রকল্প পর্যটকদের জন্য করা হয়েছে কুয়াকাটা সমুদ্রপারে। সমুদ্র উপকূলে বাতাসের গতিবেগ অনেক বেশি। যার জন্য উইন্ড টারবাইন ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। উইন্ড টারবাইন ব্যবহার বাংলাদেশের জন্য উত্তম। কেননা বাংলাদেশের দক্ষিণে বিরাট জলরাশি এবং বাতাসের এই গতিবেগ উইন্ড টারবাইন ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগানো যেতে পারে। উপকূল তীরবর্তী বাতাসের গতিবেগকে ব্যবহার করে উইন্ড টারবাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে একদিকে সাশ্রয়ী হবে, অন্যদিকে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। এসব কথা মাথায় রেখে যদি উইন্ড টারবাইনে সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়, তবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক দিক থেকে আরও এগিয়ে যাবে।
বাংলাদেশে উইন্ড টারবাইনে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা
বাংলাদেশে প্রায় এক দশক থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সংকটে নিমজ্জিত। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার অপ্রতুলতার কারণে। জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত। ২৫ শতাংশ শহর এলাকায় এবং ১০ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে। অথচ যেখানে জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ লোকই বাসাবাড়িতে বাস করে। তাই গ্রামের প্রতিটি বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। কারণ, গ্রামের বেশির ভাগ বাসাবাড়ি অনেক দূরে দূরে এবং বিচ্ছিন্ন এলাকায়। বাণিজ্যিক এলাকা ও অন্যান্য স্থায়ী সংস্থাগুলো অদূর ভবিষ্যতে গ্রিডের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেশির ভাগই নির্ভর করে প্রাকৃতিক জ্বালানির ওপর। বাংলাদেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বেশির ভাগই প্রাকৃতিক গ্যাস ভান্ডারে মজুদ আছে। এটাকেই ধরে নিয়ে প্রাথমিক শক্তির উৎস, যা জাতীয় ভান্ডারে সীমিতসংখ্যক রয়েছে। তা ছাড়া গ্রামাঞ্চলের দূরবর্তী এলাকায় উচ্চ ট্রান্সমিশন লাইন দিয়ে সংযুক্ত। এ কারণে সিস্টেম লস হয় বেশি। এ দিক থেকে বিবেচনা করলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সাশ্রয়ী হয় না।
শেষের কথা
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি শক্তিকে কম খরচ করে উইন্ড টারবাইন ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। এটার উৎপাদন ক্ষমতা কম হলেও উপকূল তীরবর্তী এলাকায় যাঁরা বসবাস করেন, তাঁদের জন্য হতে পারে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী প্রকল্প। বিশ্বের অনেক দেশেই উইন্ড টারবাইনের ব্যবহার আছে। যেহেতু বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ এবং দক্ষিণে বিরাট সাগর রয়েছে, তাই আমাদের সৌভাগ্য বলা যেতে পারে সারা বছরই উচ্চ ও নিম্ন গতিবেগের বাতাস আমরা পেতে পারি এবং এটাকে কাজে লাগিয়ে উপকূল তীরবর্তী অঞ্চলগুলোকে আলোকিত করা যায়।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৩তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৫