এখনকার অবকাঠামো জলবায়ুসহিষ্ণু হতে হবে

দোহাজারী-কক্সবাজার নতুন রেলপথটি চলতি বছরের অক্টোবরে উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে। এর ফলে স্বল্প খরচ ও ভোগান্তি ছাড়াই ঢাকা থেকে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে যাওয়া যাবে। প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে গত আগস্টের শুরুতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে রেকর্ড বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ি ঢলে রেললাইনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বেঁকে যায় রেললাইন।

কাজের গুণগত মান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ওঠে সমালোচনা। পাশাপাশি বন্য প্রাণীর বিচরণস্থল দিয়ে এমন যোগাযোগব্যবস্থার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব বিষয়ে বন্ধন ম্যাগাজিনকে নিজের ভাবনার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাইফুল হক মিঠু

বন্ধন: ঢাকা-কক্সবাজার রেল পথ চালু হলে কক্সবাজারে পর্যটনের নতুন দিগন্তের সূচনা হবে।ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক উন্নয়ন হবে।এলাকার মানুষের কর্মস্থান বৃদ্ধি পাবে।যোগাযোগ ব্যবস্থা ও শিক্ষারমানোন্নয়নহবে।ঢাকা কক্সবাজার রুটে রেল চালু হলে আর কী ধরনের সুফল আসবে বলে আপনি মনে করেন?

ড. মো. হাদিউজ্জামান: শ্রীলঙ্কা, ভারত, নেপাল ও মালদ্বীপে মোট দেশীয় উৎপাদনের (জিডিপি) একটা বড় অংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। পর্যটনকে কেন্দ্র করে এশিয়ার অন্যান্য দেশ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বাংলাদেশেরও পর্যটন খাতে ব্যাপক সম্ভাবনা ছিল। আমাদের সর্ববৃহৎ সমুদ্রসৈকত আছে, ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট আছে। পাহাড়, নদীসহ পর্যটন আকর্ষণের অনেক উপাদান আছে। অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে দেশের পর্যটন ব্যাপকতা লাভ করেনি। সড়কপথে কক্সবাজারে যেতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা সময় লাগছে; যানজটের ভোগান্তিতো আছেই! দীর্ঘ সময় পাড়ি দিয়ে কক্সবাজারের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন না পর্যটকেরা।

এ ছাড়া স্বল্প সময়ে ভ্রমণ করা গেলেও বিমানে খরচ বেশি ও যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতাও কম। এসব বিবেচনায়, নতুন এই রেল নেটওয়ার্কের ফলে ঢাকা-কক্সবাজার গন্তব্যে যুগান্তকারী পরিবর্তন হবে হবে। এতে ঘুচবে দূরত্ব। সময় ও খরচ কম লাগবে। এর ফলে রাজধানী ও এর আশপাশের জেলা থেকে কক্সবাজারে যাওয়ার ভোগান্তি অনেকটাই কমে যাবে। শুধু পর্যটনই না, কক্সবাজারের লবণশিল্প, শুঁটকি, পান ও সামুদ্রিক মাছের ব্যবসার প্রসার হবে। কক্সবাজার থেকে এই পণ্যগুলোকে যদি সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে চাই, সে ক্ষেত্রে রেল সংযোগের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হতে হবে। এই রেল নেটওয়ার্কের ফলে কক্সবাজারে ব্যবসার সম্প্রসারণ হবে। পর্যটকেরা দ্রুত ও কম খরচে কক্সবাজারে পৌঁছাতে পারবেন।

বন্ধন: দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প সরকারের অগ্রাধিকার(ফাস্টট্র্যাক) প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত।দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিভিন্ন প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে বিশাল এইলাইন নির্মাণে গুণগতমান নিশ্চিত হবে কি?

ড. মো. হাদিউজ্জামান: আমি মনে করি, এই প্রকল্প যারা ফিজিবিলিটি স্টাডি করেছেন, সেখানে পৃথিবীর স্বনামধন্য বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন। কিন্তু চট্টগ্রামের যে ইকোলজিক্যাল বিষয় অর্থাৎ এখনে বনাঞ্চল রয়েছে, এখানে পাহাড় রয়েছে এবং এখানে যে জলভূমি আছে, এই বিষয়গুলো স্টাডির ক্ষেত্রে দুর্বলতা আছে। এখানকার যে হাইড্রোলজি বা পানি প্রবাহের বিষয়, এটা বাংলাদেশের যেকোনো এলাকা থেকে ভিন্নতর। দেশের অন্যান্য জায়গায় যখন পানি প্রবাহিত হয়, সেটা উত্তর-দক্ষিণ বরাবর। এ কারণে যখন ভূমিতে বাঁধ দিয়ে কোনো স্থাপনা তৈরি করা হয়, তাতে সমস্যা হয় না। কিন্তু এই রেললাইন প্রকল্পটা এমন এক জলাভূমি দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে পানিপ্রবাহের ডায়নামিকস একেবারে ভিন্নতর। কারণ পশ্চিমে যেখানে উঁচু উঁচু পাহাড় আছে।

সেখান থেকে বৃষ্টির ফলে যখন পানি গড়িয়ে আসে, অনেক সময় ফ্ল্যাশ ফ্ল্যাড হয়। এত দ্রুত বেগে পানি নামে, সেই পানিটা যাওয়ার জন্য যে জলাভূমির কথা আমি বলছি, সেখানে ক্যানেল রিভার সিস্টেম কাজ করে। কিন্তু যখন সেখানে বাঁধ দিয়ে এই রেলটা তৈরি করে ফেলেছি। এর ফলে আমরা হাইড্রোলিক ডায়নামিকসকে বাধাগ্রস্ত করে ফেললাম। সেখানে একটা পরিবর্তন এসেছে। প্রকৃতিতে যখন আপনি বাঁধ দেবেন, প্রকৃতি কিন্তু সেটা প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করবে। সেটি কিন্তু এখানে হয়েছে। ফিজিবিলিটি স্টাডিতে এনভায়রনমেন্টাল ইম্পাক্ট অ্যাসেসমেন্ট সঠিকভাবে হয়েছে কি না তা যাচাই-বাছাইয়ের দাবী রাখে।

আরেকটা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে। এখানে শুধু বৃষ্টিপাত নিয়ে কাজ করলে হবে না। এখানে যে বড় বড় নদী আছে- বাঁকখালী, সাঙ্গু বা মাতামহুরী প্রতিটা নদী আমাদের বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের তলদেশ প্রতিবছর একটু একটু করে বাড়ছে। তার মানে আশপাশের জায়গাগুলো অতি বন্যার ঝুঁকিতে পড়ে গেছে। তাহলে শুধু বৃষ্টিপাত না, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের তলদেশ যে ওপরে উঠছে এটার যে প্রভাব তাও কিন্তু বিবেচনায় নিতে হবে। সেই জায়গায় একটা দুর্বলতা আমি দেখছি।

পাহাড় থেকে গড়িয়ে আসা পানিটা ধারণ করার বিষয়টা বিবেচনা আনা হয়েছে কি না সেটা অনেক বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি আমরা যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখলাম, যে রেলটা এখনো চলাচল শুরু করেনি, সেখানে রেললাইন বেঁকে যাওয়া ও পানিতে ডুবে যাওয়া দেখেছি (সম্প্রতি ভারী বৃষ্টিপাতে সাতকানিয়ার তেমুহনী এলাকায় রেল অংশের ক্ষতিগ্রস্ত হয়) এবং ওই এলাকার তিন কিলোমিটারের আশপাশে যারা থাকে, তাদের জন্য নবনির্মিত রেললাইন অনেকটা মরণফাঁদ হয়ে গেছে। সেখানে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। আমাদের রেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বন্ধন: বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ রেললাইন প্রকল্প পরিকল্পনার সময় জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি মাথায় রাখা হয়নি।কম সময়ে অধিক বৃষ্টিপাতের বিষয়টি নজরে রাখা হয়নি যার প্রমাণ সম্প্রতি ভারী বর্ষণও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় নির্মাণাধীন রেললাইনের প্রায় এক কিলোমিটার অংশে পাথরও মাটি সরে গিয়ে দেবে যায়; আঁকাবাঁকা হয় লাইনের কিছু অংশ। প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের এ মেগাপ্রকল্প কতটা পরিকল্পিত, নিরাপদ, টেকসই ও জলবায়ুবান্ধব হচ্ছে। আসলে সমস্যাটা কোথায় বলে আপনি মনে করেন?

ড. মো. হাদিউজ্জামান: আমরা শুধু রেলের ক্ষতি দেখছি। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার আশপাশে যারা থাকে, তারা যে একটা দীর্ঘমেয়াদি ওয়াটার লগিং সমস্যার মধ্যে পড়ে গেল। এটার যে প্রভাব, এটা অপূরণীয় ক্ষতি। পূর্বে পাহাড়ি অঞ্চল এবং আবার অন্য পাশে রেলবাঁধ। মাঝখানে তারা এখন ফাঁদে পড়ে গেছে। এখানে যে জনবসতি আছে, তারা ভুক্তভোগী হবে। এটা কোটি কোটি টাকার বিষয় না; এটা অপূরণীয় দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষতি। এই রেল যত দিন থাকবে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতিবৃষ্টি হওয়া ও সমুদ্রের তলদেশ ওপরে ওঠা, প্রতিবছরই এই ধরনের বন্যার শঙ্কা বা সম্ভাবনা তৈরি হবে। তখন এই মানুষগুলো বারবার ভুক্তভোগী হবে। পাশাপাশি হাতির যে বিষয়টি, বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য দিয়ে রেল যাবে বলছি।

এই ধরনের বন্যায় বন্য প্রাণীর ওপরও প্রভাব ফেলবে। পরিবেশ অধিদপ্তরও বলেছে, এটা রেড ক্যাটাগরির একটা প্রকল্প। আইওসিএন বা উন্নত দেশের বিভিন্ন সংস্থা যারা আছে, যারা পরিবেশ নিয়ে কাজ করে তারাও বলছে এটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। সেখানে এই ধরনের প্রকল্প করতে আরও গভীর জনসম্পৃক্ততা দরকার ছিল। স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার দরকার ছিল। যাঁরা পরিবেশ নিয়ে কাজ করেন, হাইড্রোলিকস নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের সম্পৃক্ত করার দরকার ছিল।

বন্ধন: দুর্যোগ কবলিত এলাকাবাসীর অভিযোগ, রেললাইনের কারণে পানি নিষ্কাশনের পথ আটকে যাওয়ায় আগের তুলনায় বন্যার মাত্রা বেড়েছে; ডুবে গেছে বাড়িঘর।রেললাইনে পর্যাপ্ত কালভার্ট ও সেতু নির্মাণ হলে হয়তো ক্ষতি কম হতো।তাদের দাবি কতটা যৌক্তিক?

ড. মো. হাদিউজ্জামান: অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে গত আগস্টে এর ক্ষতি হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এখানে যদি ৭-৮টা কালভার্ট দেওয়া হতো, তাতেও নাকি এই ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো যেত না। এলাকাবাসী বলছে, ওই এলাকায় অল্প কিছু কালভার্ট আছে। পানিপ্রবাহ বা নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাহলে এখন প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, বাঁধের ওপর রেল কেন করা হলো। আপনিই বলছেন, ৭-৮টা কালভার্ট দিয়েও সমস্যা নিরসন করতে পারবেন না।

এলাকাবাসীর অভিযোগ আমলে নিতে হবে। ১৯৯৭-৯৮ সালে চট্টগ্রামের দক্ষিণে যে সাইক্লোন হয়েছিল, তখন জলোচ্ছাসে পানির উচ্চতা অনেক বেশি ছিল। এখন এলাকাবাসী বলছে, এই রেল করার পর, সম্প্রতি ভারি বৃষ্টি ও পাহাড় থেকে নেমে এসে পানির ঢলে নিম্নাঞ্চল যেভাবে প্লাবিত হয়েছে তার ফলে সৃষ্ট পানির উচ্চতা পূর্বের সাইক্লোনের পর সৃষ্ট পানির উচ্চতা থেকে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। প্রকৃতিকে বাধাগ্রস্ত করায়, প্রকৃতি প্রতিশোধ নেওয়া শুরু করেছে।

বন্ধন: প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করছেন, আন্তর্জাতিক পরামর্শকেরা বিগত ১০০বছরের বন্যা, জলোচ্ছাস ও বৃষ্টির হিসাবকরেই এ প্রকল্পের ডিজাইন করেছে।কিন্তু এবার সব রেকর্ড ভেঙে দুইদিনে এক মাসের সমপরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে।তাই রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।এ ব্যাপারে আপনার কী মত?

ড. মো. হাদিউজ্জামান: রেললাইনটি একটি সেনসেটিভ জায়গা দিয়ে করেছি। এখানে শুধু বৃষ্টিপাত না, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টাকে বিবেচনায় নেওয়া দরকার। সি লেভেল রাইজের বিষয়টি প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা একেবারে বিবেচনায় নেয়নি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এখন থেকে যে অবকাঠামো হবে বা হচ্ছে প্রতিটিকে জলবায়ুসহিষ্ণু হতে হবে। জলবায়ুর প্রভাব মাথায় রেখেই এটা তৈরি করতে হবে। বাঁধ করে রেল করার প্রযুক্তি সনাতন। আখাউড়া ও আগরতলা যে রেললিংকটি হচ্ছে প্রায় ১৫ কিলোমিটার,  তার মধ্যে ৫ কিলোমিটার ভারতের মধ্যে পড়েছে। আমরা এখানেও বাঁধ দিয়ে রেল করলাম।

ভারতের অংশ ভায়াডাক্ট করে বা খুঁটির ওপরে করা হয়েছে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পানির প্রবাহকে নিরবচ্ছিন্ন রাখা, পাশাপাশি বন্য প্রাণীর চলাচল যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, এটাও তারা বিবেচনায় নিয়েছে। এটাই টেকসই উন্নয়নের দর্শন। যদিও দোহাজারি-কক্সবাজার প্রকল্প বাস্তবায়ন একেবারে শেষের পথে কিন্তু জলবায়ুসহিষ্ণু ও বন্য প্রাণীদের চলাচলের বিষয়ে যে পদক্ষেপগুলো নেওয়ার দরকার ছিল, সেগুলো যদি সঠিকভাবে না নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে এর প্রভাব আমাদের বিশ্লেষণ করতে হবে। কোনো সংস্কারের প্রয়োজন হলে সেটা করতে হবে।

বন্ধন: রেললাইন বেঁকে যায়নি বরংযে সব জায়গায় এখনো জয়েনিং ও ওয়েল্ডিংয়ের কাজ শেষ হয়নি, সে সব জায়গায় ডিসপ্লেস হয়েছে দাবি প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের। বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?

. মো. হাদিউজ্জামান: রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যে যুক্তি দিচ্ছেন তার সঙ্গে আমি একমত না। কারণ বৃষ্টির পর রেল যেভাবে বেঁকে গেছে, তার ধরন দেখলে দেখা যায়, নিচ থেকে সাপোর্ট সরে যাওয়ার ফলে রেল তার নিজের ওজনেই বেঁকে গেছে। এটা ওয়েল্ডিংয়ের বিষয় না। এখানে পরিবেশগত সমীক্ষাটা আরও গুরুত্বের সঙ্গে করা উচিত ছিল।

বন্ধন: পাহাড়ি ঢল বন্যাপ্রবণ এলাকার রেললাইনের ডিজাইন বা নির্মাণ কোন পদ্ধতিতে হলে রেলপথ নিরাপদ রাখা যায়?

. মো. হাদিউজ্জামান: কিছু প্রজেক্টে রেললিংককে আমার ভায়াডাক্টের ওপর করে ফেলেছি। পদ্মা রেললিংকের বড় অংশ প্রায় ৩০ কিলোমিটার, আমরা ভায়াডাক্টের ওপর করে ফেলেছি। এখানে অভয়ারণ্যের কথা বলছি, জলজ প্রাণীর জীবনের কথা বলছি। এসব কিছু বিবেচনায় নিয়ে এটাকে যদি ভায়াডাক্টের ওপর করা হতো, তাহলে এটা অনেক যুক্তিসঙ্গত হতো। টেকসই উন্নয়নের দর্শনের যে কথা আমরা বলি, সেটির বাস্তবায়ন হতো।

বন্ধন: এই মেগা প্রকল্প নির্মাণের আগে যথাযথভাবে প্রকৌশল, পরিবেশ জলবায়ুগত সমীক্ষা বা ফিজিবিলিটি টেস্ট করা হয়েছে কি? বিশেষজ্ঞ জনগণের সম্পৃক্ততাই বা কেমন ছিল বলে আপনি মনে করেন?

. মো. হাদিউজ্জামান: স্বনামধন্য কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান, অস্ট্রেলিয়ান প্রতিষ্ঠান এর সমীক্ষা করেছে। তার সঙ্গে আমাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানও ছিল। এদের রেলের ব্যাপারে ভালো অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু যে এলাকা দিয়ে আমরা রেলটা করলাম, সেই এলাকার হাইড্রোলিকস ও হাইড্রো ডায়নামিকস বোঝার মতো তাদের সক্ষমতা কতটুকু ছিল, সেটা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এখানে ব্যতিক্রমধর্মী বৈশিষ্ট্যের শতবর্ষ ধরে পানির প্রবাহ আছে। পাহাড়ি ঢল নেমে এলে এই ক্যানেল রিভার সিস্টেমটা পানি সংরক্ষণ করে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে এটার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। শুষ্ক মৌসুমে সেখানে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে গেলে দেখবেন এখানে কোনো ক্যানেল নেই। তাহলে কিন্তু ধরে নেওয়া হবে এখানে বাঁধ দিয়ে রেল করা যথোপযুক্ত। এনভায়রনমেন্টাল অ্যাসেসমেন্ট যেটার কথা বারবার বলেছি, এটা দীর্ঘমেয়াদি হওয়া উচিত ছিল। এটা হয়নি। এখানে স্থানীয়দের অল্প পরিসরে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। যে যে উপজেলার ওপর দিয়ে এটা যাচ্ছে, প্রতি উপজেলার মানুষের সঙ্গে কিন্তু আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই প্রকল্প সম্পর্কে এলাকাবাসীকে কতটুকু বলছেন বা প্রকল্পের ব্যাকগ্রাউন্ড কতটা বলেছেন, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, তারা এলাকাবাসীর সামনে যোগাযোগের সুবিধা তুলে ধরেন। কিন্তু প্রকল্পের জটিলতাগুলো নিয়ে যেমন বন্য প্রাণীর চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে, পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে, এ বিষয়ে তাদের কী অভিমত তা জানাতে চান না। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল। এই স্ট্যাডি কত দিন যাবৎ করছেন, কাদের সম্পৃক্ত করলেন, এলাকাবাসীর সামনে কোন প্রেক্ষাপটে কথা বলেছেন এসব বিষয়ে দুর্বলতা রয়েছে। যার কারণে আমরা দেখলাম উদ্বোধনের আগেই ফ্ল্যাশ ফ্ল্যাডে সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অবকাঠামোগত ক্ষতির চেয়ে বড় বিষয় এলাকাবাসীর দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতার আশঙ্কায় পড়ে গেল। তারা মরণফাঁদে পড়ে গেছে। কারণ এক পাশে পাহাড়, এক পাশে বাঁধ দিয়ে রেল করা হয়েছে আর এলাকাবাসী পড়েছেন এ দুটোর মাঝখানে।

বন্ধন: রেললাইন তৈরির জন্য কাটা হয়েছে তিনটি অভয়ারণ্যের অসংখ্য পাহাড়, টিলা, শতবর্ষী মা গর্জন বৃক্ষসহ লক্ষাধিক গাছ। ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে অভয়ারণ্যের জীববৈচিত্র্য প্রতিবেশব্যবস্থা। পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন বিশেষজ্ঞের আপত্তি উপেক্ষা করে অভয়ারণ্যের ভেতর দিয়ে রেলপথ নির্মাণ কেন করা হলো? বিকল্প পথে না হওয়ার যৌক্তিকতা কী?

. মো. হাদিউজ্জামান: ২০০১ সালে রেললাইনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। ২০১৩ ফের আবার সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের বিষয়ে খুব বেশি হেরফের হয়নি। কিছু জায়গায় এলাকাবাসীর জনঘনত্ব বা পুকুর এসব অ্যাভয়েড করা হয়েছে। এখানে বিকল্প অ্যাসাইনমেন্টের সুযোগ ছিল। সেটি হচ্ছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সমান্তরালে চিন্তা করার সযোগ ছিল। যদিও এখানে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ ছিল। আশপাশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। কিছু জাংশন পয়েন্ট আছে। সেটা বাণিজ্যিকভাবে অনেক সমৃদ্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু এসব বাইপাস করার সুযোগ ছিল।

বনের ভেতর দিয়ে যখন নিয়ে গেছেন, তখন অধিগ্রহণ করতে হয়েছে। সেটা স্বল্পমূল্যে করা গেছে। এনওয়ানের সমান্তরালে গেলে অধিগ্রহণের খরচটা বেশি হতো। ইকোলজিক্যাল সেনসেটিভ জায়গা দিয়ে নিয়ে জমি অধিগ্রহণের খরচ কমাতে পারলাম। কিন্তু আমি বলব, ইকোলজিক্যালি এটা একটা রেকলেস প্রজেক্ট। এখানে ইকোলজিক্যালি ড্যামেজ শুরু হয়ে গেছে। কারণ এই এলাকায় ইতিমধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প আসতে শুরু করেছে, ব্যবসা, বাণিজ্য ও শিল্পায়নে শুরু হয়েছে। বে অব বেঙ্গলের এটিই হলো সর্বশেষ অভয়ারণ্য, পাহাড়ি এলাকা ও বন। ট্রপিক্যাল বা পাহাড়ের ওপর বন এবং বন্য প্রাণী এই ধরনের পরিবেশ এটাই সর্বশেষ। এ জন্য অনেক দেশ এই প্রকল্প নেওয়ার সময় কিছুটা সোচ্চার ছিল।

বন্ধন: জাতিসংঘেরইকুয়েটর পুরস্কারপ্রাপ্ত এশিয়ান হাতির অন্যতম আবাসস্থল প্রজননকেন্দ্র চুনতি অভয়ারণ্য। সেই অভয়ারণ্যের বুক চিরে (কোর জোন) নির্মিত হয়েছে রেললাইন। রেললাইনের ২১টি স্থানে রয়েছে হাতির বসতি চলাচলের পথ। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি হাতির চলাচলের জন্য তৈরি করা হয়েছে ওভারপাস। রেললাইন নির্মাণের ফলে রেল চলাচল শুরু হলে তা হাতিদের জন্য কতটা সংকটময় হয়ে উঠবে?

. মো. হাদিউজ্জামান: এখানে রেল লাইনটার ২৯ কিলোমিটার বনের ভেতর দিয়ে গেছে। মেধাকচ্ছপিয়া, চুনতি, ফাশিয়াখালী এই জায়গাগুলো আসলে বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য। চুনতি দিয়ে ভারত, বাংলাদেশ ও বার্মার বন্য প্রাণীর চলাফেরার করিডর গেছে। এইটা এশিয়ান এলিফ্যান্টের অ্যাকটিভ প্যাসেজ। এখান দিয়ে হাতি প্রায়ই চলাফেরা করে। এখানে ১৩টা ওভারপাস দেওয়ার কথা ছিল। যদিও চুনতিতে একটা ওভারপাস করা হয়েছে। সবুজ বেষ্টনী দেওয়া হয়েছে হাতিকে গাইড করার জন্য। তবে হাতিকে গাইড করা এতা সহজ হবে না। রেলের দুই পাশে ব্যারিয়ার দেওয়া হয়েছে, কিছু লবণ পানির লেক করা হয়েছে। কারণ হাতি লবণ খেতে পছন্দ করে। কিন্তু হাতির এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে চলাচলের জন্য আরও বেশি ওভারপাসের দরকার ছিল। যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা ‘গ্রিন ওয়াশিং’ মেজার। এখান পরিবেশবাদীদের মনোযোগকে ডাইভার্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমার জানামতে, পৃথিবীর কোথাও অভয়ারণ্য বন দিয়ে ট্রেন নেওয়া হয়নি। ভারতে খুবই সামান্য করিডর বনের ভেতর দিয়ে গেছে। সেখানেও প্রায়ই হাতির দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়।

রেলের লেভেল ক্রসিংয়ে মানুষ প্রায়ই কাটা পড়ে মারা যাচ্ছে। এটার সমাধান রেলওয়ে এখনও করতে পারেনি। এখন আরেকটা সমস্যা টেনে নিয়ে এল, হাতির সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষ! এই জায়গায় রেল আরও চাপের মধ্যে পড়ে গেল।

বন্ধন: বাংলাদেশের রেলপথে ছোটবড় দুর্ঘটনা প্রায় ঘটে। নবনির্মিতব্য রেলপথকে নিরাপদ রাখতে কোনো ধরনের প্রযুক্তিবান্ধবব্যবস্থা রাখা হয়েছে কি? দুর্ঘটনা রোধে বা সীমিত করতে কী কী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা রাখা উচিত?

. মো. হাদিউজ্জামান: এখানে খুব বেশি প্রযুক্তির ব্যবহার হয়নি। পদ্মায় যেমন কম্পিউটার বেইজড ইন্টারলকিং সিস্টেম দেখছি। ব্যালাস্টলেস ট্র্যাক দেখছি। ভায়াডাক্টের ওপর রেল নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই দোহাজারী-কক্সবাজার নতুন রেলপথটি অনেকটা সনাতন বা যেভাবে আগে রেল করেছে, সেভাবেই করা হয়েছে। এই রেলটা তিন-চারবার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ক্রস করবে। মহাসড়কে ট্রাফিক যেহেতু বেশি, সেহেতু সেখানে লেভেল ক্রসিংয়ের গেট আছে, সেটা সিগন্যালের সঙ্গে ইন্টারলক করা আছে। অর্থাৎ গেট না নামলে ট্রেন চলাচলে গ্রিন সিগন্যাল পাবে না। এটুকুই প্রযুক্তি ব্যবহার হয়েছে। ১৪৪টা লেভেল ক্রসিং করে ফেলেছি, আমি বলব, লেভেল ক্রসিংয়ের সড়কে স্পিডব্রেকার করতে হবে। ফ্ল্যাশ লাইন দেওয়া, ট্রেন এলে যেন ফ্ল্যাশিং করে। পাশাপাশি শ্রবনযোগ্য বেলের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে দুর্ঘটনা কমানো যায়।

হাতির জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ভারতে হাতি কাটা পড়ার ঘটনা ঘটেছে সামান্য বনেই। এখানে হাতির জন্য ক্যামেরা ট্র্যাকিং এর ব্যবস্থা করতে হবে। ট্র্যাকে হাতি বা অন্য বন্য প্রাণীর অস্তিত্ব পেলে সঙ্গে সঙ্গে ট্রেনের লোকমাস্টারকে জানাতে হবে। ট্রেন হঠাৎই থামতে পারে না, সেহেতু নির্দিষ্ট সময় রেখেই লোকমাস্টারকে থামার বার্তা দিতে হবে। এই ব্যবস্থা আমাদের করতেই হবে।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৫৮তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০২৩।

+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top