অনলাইন শপিং এখন প্রযুক্তিনির্ভর। প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসার পাশাপাশি মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এটি ভালো এক দিক। সমমনা শপিং সেন্টারের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায় যা যুক্ত করেছে ভিন্নমাত্রা। বেশির ভাগ দোকানমালিকেরা ইতিমধ্যে অনলাইন শপিংয়ে প্রযুক্তিনির্ভর বেচাকেনা শুরু করেছে। কিন্তু অনেক খুচরা বিক্রেতা বিস্ময়কর এই প্রযুক্তিকে এখনো সেভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। আর তাই এ ধরনের শপিং সেন্টারগুলো পিছিয়ে আছে খুচরা বিক্রেতা থেকেও। তারা এখন চেষ্টা করছে বৈপ্লবিক এমন পরিবর্তন আনার।
প্রযুক্তি যখন অফিস, অ্যাপার্টমেন্ট আর বিপণিবিতানে
কয়েক বছর আগেও শপিংমলের প্রধান ফটক বন্ধ থাকত। কিন্তু এখন শপিংমলগুলোর প্রধান ফটক খোলাই থাকে। এতে শপিং করতে আসা ব্যক্তিরা মনে করতে পারে বিপণিবিতানটি বন্ধ, তাই তাঁরা ফিরে যান কাছাকাছি কোনো ছোট শপ স্টোরে। এতে বিপণিবিতানের মালিকদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়। এসব ঝামেলা এড়াতে এসেছে অনলাইন শপিংসেল, যার মাধ্যমে সহজেই এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
গাড়ি পার্কিং-সুবিধা
লস এঞ্জেলস, ক্যালিফোর্নিয়া আর ওয়েস্ট ফিল্ট সেঞ্চুরি সিটির বিপণিবিতানগুলো ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে সংস্কার করে অনলাইনভিত্তিক শপিং মলে রূপান্তর করা হয়েছে, যার একাংশে রয়েছে পার্কিং-সুবিধা। কোনো ক্রেতা গাড়িসহ বিপণিবিতানে প্রবেশের আগে রয়েছে স্ক্যান করার সুব্যবস্থা। এতে লাইসেন্স, প্লেট, গাড়ি উত্তোলনব্যবস্থাসহ কোথায় গাড়িটির অবস্থান তা জানা যাবে সহজেই। এমনকি গাড়িটির অবস্থান জানা যাবে টিভি মনিটরে। কমপক্ষে ৪ ঘণ্টার জন্য বরাদ্দ থাকবে এটি, যার জন্য গাড়ির মালিককে প্রতি ৪ ঘণ্টায় পরিশোধ করতে হবে ২০ ডলার।
কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে কেনাকাটা
গলার কণ্ঠস্বরকে ব্যবহার করে গুগলের সঙ্গে ওয়ালমার্ট, হোম ডিপোট এবং কিছু খুচরা বিক্রেতা অ্যামাজান ডট কমকে ব্যবহার করছে। যাতে ফোনের মাধ্যমেই ক্রেতা তাঁর চাহিদামতো পণ্য ঠিক দামে কিনতে পারে। এতে সুবিধা হয় ক্রেতার। তদুপরি বিপণিবিতানে চাহিদামতো পণ্য পাবে কি না তা ক্রেতা মোবাইলের মাধ্যমেই নিশ্চিত হতে পারে। এ জন্য আইফোন বা এনড্রয়েড মোবাইলই যথেষ্ট। কোনো ক্রেতা মোবাইলেই জানতে পারবেন সেই পণ্যটি স্টোরে আছে কি নেই। এমনকি ক্রেতা কোনো ব্র্যান্ডের পণ্য চান, সেটাও ফোনে সঞ্চিত মেমোরি থেকে ক্রেতাকে জানাতে পারবে। সেখানে ক্রেতাদের জন্য পণ্য সরবরাহ করা হয় তাৎক্ষণিক অর্ডারে অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে। সরবরাহকৃত প্রতিটি পণ্যের মূল্য ৩৫ ডলারের কম হবে না। তবে ক্রেতাকে দুই দিনের মধ্যেই পণ্যটি স্টোর থেকে নিতে হয়। গুগল এক্সপ্রেসে অ্যাকাউন্টস অপশনে গিয়ে মূল্য পরিশোধ করতে হবে।
চ্যাটবোট
সাইমন প্রপার্টি গ্রুপের তৈরি চ্যাটবোট (Chatbot) যোগাযোগের সূত্রধর হিসেবে ব্যবহৃত হয় বিপণিবিতানে। এতে যেকোনো ধরনের প্রশ্ন ফেসবুকের মাধ্যমে ক্রেতারা জানান বিপণিবিতানে। তাৎক্ষণিকভাবে এই তথ্যটি সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ২০৮টি বিপণিকেন্দ্রে পৌঁছে যায়। চ্যাটবোটটি ক্রেতা ও বিপণিবিতানের সঙ্গে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে। যাতে রয়েছে পণ্যসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য, তথ্য রয়েছে পার্কিং সম্পর্কেও। এটা ক্রেতাদের জানায় পণ্য সম্পর্কিত দরদাম ও পরিমাণ। এমনকি জানায় এটিএম বুথ কিংবা বিশেষ কোনো রেস্তোরাঁর অবস্থানও।
চ্যাটবোটটি সব ধরনের তথ্য ক্রেতাদের দিতে না পারলে তা বিপণিবিতানের প্রতিনিধিকে জানানো হয়। ক্রেতারা ইচ্ছা করলে ল্যাপটপ অথবা পার্সোনাল কম্পিউটারের মাধ্যমে তথ্যটি বিপণিবিতানের কর্তাব্যক্তিকে জানাতে পারে। চ্যাটবোট ব্যবহারে ক্রেতারা ইট বা মর্টার স্টোরে না গিয়ে বরং অনলাইন শপিংয়ের মাধ্যমে পণ্য কিনতে পারে সহজেই।
বিনা মূল্যে আইনসংক্রান্ত পরামর্শ
আগামীর শপিংমলে এমন ব্যবস্থা থাকবে, যেখানে ক্রেতাদের আইনি বিষয়ে কোনো আইন সংস্থার কাছে যেতে হবে না। অনেক বিপণিবিতানেই থাকবে বিনা মূল্যে আইনি পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা। যদি কোনো ক্রেতার অ্যার্টনির প্রয়োজন হয়, তাহলে মেশিনই সব ধরনের আইনবিদদের তথ্য ও তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার শিডিউল দিতে পারবে। যদিও এ ধরনের তথ্যের জন্য মেশিন রয়েছে। সেখানে প্রিন্টেট ফরমের সব তথ্য লিপিবদ্ধ করে দিলেই তা ঠিক স্থানে ঠিক ব্যক্তির কাছে পাঠিয়ে দেবে। এখানে ফ্রি ইলেকট্রনিক লিগ্যাল অ্যাডভাইসের জন্য থাকে অপেক্ষাকৃত মধ্যবিত্ত পরিবার, যারা লিগ্যাল অ্যাডভাইজারের ফি পরিশোধ করতে পারবে অনলাইনে, রয়েছে এমন ধরনের আইনবিদদের সঙ্গে যোগাযোগের সুব্যবস্থাও।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
বিপণিবিতানগুলোতে নাটকীয়ভাবে ব্যবসা কমে যাওয়ার পেছনের কারণ ছিল খুচরা বিক্রি কমে যাওয়া। যাঁরা ইট এবং মর্টার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তাঁরা মনে করছে, যদি অনলাইন শপিং চালু থাকে, তাহলে তাঁদের সুবিধা হয়। যা আগে ছিল না। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় খুচরা ব্যবসায়ীরা তাঁদের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে সহায়ক হবে। সনাতন বিক্রয়কেন্দ্রগুলো এই নতুন প্রযুক্তির আড়ালে ক্রেতাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্কের বিনিময়ে ভালো ব্যবসা করতে পারে। কিন্তু তাতে দেখা গেছে, এটা শুধু যোগাযোগ হয় যাঁরা সেই বিপণিবিতানে কিনতে আসে। অর্থাৎ শুধু ক্রেতাদের সঙ্গেই তাঁদের যোগাযোগটা বেশি হয়।
এ ধরনের স্টোরে রাখা যায় থ্রি ডাইমেনসেনাল ছবিও; ক্রেতাদের জন্য। বিশেষ করে যাঁরা ফ্যাশনেবল পোশাক কিনতে চায়। এই পোশাকগুলো ৩৬০০-তে ওলটপালট করে দেখা যায় হাতের কোনো স্পর্শ ছাড়াই। এতে বাড়ছে আগ্রহী ক্রেতার সংখ্যা। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে বিপণিবিতানে সরাসরি না এসে মোবাইলে ছবিসহ দেখা ও আলাপ হচ্ছে। প্রযুক্তির এই ব্যবহারে প্রায় ৩৮% পণ্যের দেখা ও দরদামসহ সফটওয়্যারের সব প্রশ্নের সমাধান সহজেই পাওয়া যাবে। পরিসংখ্যান বলছে, বেশির ভাগ ক্রেতা যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে কথা বলা ও দেখার ব্যাপারে অধিক মনোযোগী সরাসরি বিপণিবিতানে এসে বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলার চেয়ে। যখন দেখা যায়, বিক্রেতা কোনো ক্রেতার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না, তখন বুঝতে হবে সেই বিক্রেতা হয়তো অন্য কোনো ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগে ব্যস্ত।
মালামাল সরবরাহে ই-কমার্স
সিঙ্গাপুরের শপিংমলে একই জায়গায় শুরু হয়েছে অনলাইন-অফলাইন বাণিজ্য। খুচরা বিক্রেতাদের জন্য যা বিপ্লব ঘটিয়েছে। বিক্রেতারা ইট বা মর্টারের মতো উপাদান কিনে সেখানেই রেখে দেন। পরে বিক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অনলাইনেই তা বিক্রি করে ফেলেন। এতে ক্রেতাকে কোনো কিছু বয়ে নিয়ে যেতে হয় না বাসায়। এতে খুচরা বিক্রেতাদের বাড়তি স্টোরের প্রয়োজন পড়ে না। ই-কমার্সের বদৌলতে খুচরা বিক্রেতাদের অফলাইন শপেও ভালোভাবে পণ্য বিক্রি করা যায়। বিক্রেতারা এমন ব্যবস্থায় শপিংমলে বসেই সব কাজ শেষ করতে পারে; যে কারণে এ ধরনের বিপণিবিতান থেকে পণ্য ক্রয় যেমন সুবিধাজনক, তেমনি সাশ্রয়ী।
স্বাস্থ্যসেবা
নিউইয়র্কের ‘আলবেনী’ শপিংমলে ক্রেতাদের ডাক্তার দ্বারা সেবা প্রদান করা হয়। সেই শপিংমলের কর্তব্যরত ব্যক্তি নির্বাচিত ডাক্তারের সঙ্গে রোগীর যোগাযোগ স্থাপন করে। এ ধরনের বিপণিবিতান কেন্দ্রে রয়েছে হাসপাতালের মতো স্থানও, যেখানে ডাক্তার অন কল এসে থেরাপি দিয়ে যায়। এটা ওখানকার তৃতীয় হাসপাতালনির্ভর বিপণিবিতান। আরও রয়েছে একটি ফিজিক্যাল থেরাপি সেন্টার, যার অবস্থান বিপণিবিতানের কাছেই।
কিমকো রিয়েলিটি শপিংমলে রয়েছে বৈদ্যুতিক সুবিধাসহ মেডিকেলের মিশ্র ব্যবস্থা। এতে আছে আর্জেন্ট কেয়ার ক্লিনিক। এতে আরও রয়েছে জীবন রক্ষার জন্য স্যাটেলাইট ব্যবস্থা, পেডিয়েট্রিক মেডিকেল কেয়ার, ওয়েলনেস সেন্টার, এমনকি ডায়ালাইসিস সেন্টারও। এ ধরনের সার্ভিস অনলাইনে দ্বিতীয়বার দেওয়া হয় না।
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার বাসস্থান
আমেরিকার দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় মানুষের মৃত্যুর পর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যবস্থা করে শপিংমল। তারা কফিন সংগ্রহ করে পরিকল্পনা করে কীভাবে শবদেহ কবরস্থ করা যায়। তারা মরদেহের জন্য কফিন কিনে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যবস্থা করে থাকে। এ ধরনের ব্যবসার জন্য তারা অপেক্ষা করে মৃত ব্যক্তির।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৬তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৮।