ড. কাজী আজিজুল মাওলা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একসময় দায়িত্ব পালন করেছেন বিভাগীয় প্রধান হিসেবে। এরও আগে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, স্থাপত্য বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে আরবান ডিজাইন, ইকোলজি, বিল্ট এনভায়রনমেন্ট বিষয়ে তার সরব পদচারণ। শিক্ষকতার পাশাপাশি ২৫ বছর ধরে দেশে-বিদেশে স্থাগত্য, নগর পরিকল্পনা, স্থাপত্য ঐতিহ্য বিষয়ে লেখালেখি করছেন, সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণ করেছেন। জাহাঙ্গীরনগর প্ল্যানিং রিভিউ, প্ল্যান পাস, প্রতিবেশ জার্নালের রিভিউয়ার হিসেবে কাজ করছেন। খুলনা ইউনিভার্সিটি স্টাডিজ নামক জার্নাল এবং আইইবি/আইএবি নিউজলেটার-এর ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।
স্থপতি ছাড়াও তিনি একজন নগর পরিকল্পনাবিদ। ১৯৯০ সালে ইউনিভার্সিটি অব হংকং থেকে আরবান ডিজাইনে মাস্টার্স শেষ করার করার পরে ইউনিভার্সিটি অব লিভারপুল, যুক্তরাজ্য থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন ১৯৯৭ সালে। আরবান ডিজাইনে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট রিসার্চে কমনওয়েলথ, এডিবি, জেএসপি এবং ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিসার্স থেকে স্কলারশিপ পান। নগর পরিকল্পনার বিভিন্ন ইস্যুতে অর্ধশতকের অধিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছেন বিভিন্ন প্রকল্পে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য অধিদপ্তরের সমন্বয়ে শেরেবাংলা নগর মহাপরিকল্পনা পর্যালোচনা প্রকল্প, তেজগাঁও পুরোনো পার্লামেন্ট কমপ্লেক্সকে প্রধানমন্ত্রীর অফিস ও সম্মেলন কেন্দ্রে রূপান্তর প্রকল্প, সৌদি আরব সরকারের অর্থায়নে ঘূর্ণিঝড়-দুর্গত উড়িরচরের সেটেলমেন্ট প্ল্যানিং, রমনা মন্ত্রীপাড়ার পরিকল্পনা ইত্যাদি। রাজশাহী বিভাগের অন্তর্গত উপজেলা পোরশা, মান্ডা এবং মহাদেবপুরের অঞ্চল পরিকল্পনা করেছেন। ঢাকা শহরের মহাপরিকল্পনা, ঐতিহ্য সংরক্ষণ, পরিবেশ উন্নয়ন, সাসটেইনেবিলিটি ইত্যাদি তাঁর বর্তমান আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। গুণী এ স্থপতি ও নগরবিদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্থপতি খালিদ মাহমুদ।
একটি সুশৃঙ্খল নগর বা শহর গড়তে মাস্টারপ্ল্যানের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু। ঢাকার ক্ষেত্রে তা কতটা মানা হয়েছে?
একটি শহরের জন্ম হয় প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার সমন্বয়ে বেশ কিছুটা সময় নিয়ে। জনমানবহীন একটি জায়গায় আগে পরিকল্পনা হয়েছে, তারপর সেই অনুযায়ী রাতারাতি শহর গড়ে উঠেছে এ রকম উদাহরণ কমই বলা চলে। তবে তার মানে এই নয় যে শহরের কোনো প্ল্যান থাকে না, বরং একটা ইনটুইশনাল প্ল্যান অনুযায়ী শহরের পত্তন ও ক্রমবিকাশ ঘটে। আমরা যাকে মাস্টারপ্ল্যান বলি, সেটি আসলে একধরনের গাইডলাইন। শহরের অবস্থান, ভৌগোলিক এবং স্থানিক সুযোগ-সুবিধা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, চলাচল, জনসংখ্যার আকার, তাদের সব ধরনের নাগরিক প্রয়োজন, শহরের এবং তার জনসংখ্যার সম্ভাব্য ব্যাপ্তি ইত্যাদি বিবিধ বিষয়গুলো ভবিষ্যৎমুখী অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিচার করে একটি পর্যায়ভিত্তিক নির্দেশনা তৈরি করা হয়। এই গাইডলাইন অনুযায়ী চলতে সবাই বাধ্য। শহরের নাগরিকেরা, সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন, উন্নয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন সংস্থা, সরকার, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান কেউই এ নির্দেশনার বাইরে নয়। এভাবে চললেই একটি শহরের বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন সুশৃঙ্খল হয়। সুতরাং মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া একটি সুশৃঙ্খল শহরের স্বপ্ন দেখা অবান্তর।
পরিকল্পিত নগরীর প্রসঙ্গ যখন সামনে আসে তখন ঢাকার অবস্থান হয় দুঃখজনকভাবে একদম শেষের দিকে। দেড় কোটিরও বেশি মানুষ অধ্যুষিত দেশের ঘিঞ্জি রাজধানীর এ শহরে রয়েছে পরিকল্পনার অভাব। এর চেয়েও বেশি অভাব প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় আসতে থাকা বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার চাপে এদের বাসস্থানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করা।
প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে ১৯১৭ সালে প্যাট্রিক গেডস (Patrick Geddes) প্রথম ঢাকার জন্য আনুষ্ঠানিক মহাপরিকল্পনা করেন। এর পরে সময়ের পরিক্রমায় আরও কয়েকটি পরিকল্পনা তৈরি হয়। তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, এর কোনোটিই খুব সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। তার চেয়েও বড় বিষয়, এই পরিকল্পনার ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করে তা থেকে যথাযথ শিক্ষা নেওয়ার কোনো ঘটনাও ঘটেনি।
ঢাকার স্ট্রাকচার প্ল্যানের দুর্বলতা নিয়ে আপনারা কথা বলছেন। আসলে কী কী দুর্বলতা উল্লেখ করা যায়?
ঢাকার স্ট্রাকচার প্ল্যানের একটি খসড়া কপি এখন অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। জনগণের মতামতের জন্য এটিকে দেওয়া হয়েছে। আমি নিজেও সেটি দেখেছি, এর ওপরে রিভিউ করে কিছু লেখালেখি করেছি। ব্যক্তিগত উদ্যোগে রাজউকেও পাঠিয়েছি। আসলে প্রতিটি কাজেরই কিছু সমালোচনা থাকে। যে কোন কাজে কিছু ভুল থেকে যাবে, যা অন্যের চোখে ধরা পড়বে। প্রতিটি প্ল্যানেরই কিছু স্ট্রাটেজিক ভুল থাকে। এগুলোকে ভুল না বলে অসম্পূর্ণতাও বলা যেতে পারে। ভুল ধরা উদ্দেশ্য নয়, তবে একটি নির্দেশনামূলক স্ট্রাটেজিক প্ল্যানে যে দুর্বলতা বা অসম্পূর্ণতা থাকা উচিত নয়, সে বিষয়ে আলোচনা হওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যানের মৌলিক কয়েকটি বিষয় আমি উল্লেখ করছি।
প্রথম বিষয়টি হচ্ছে মিশন বা দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের অনুপস্থিতি। প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনারই একটি লক্ষ্য বা মিশন থাকে, যাকে সামনে রেখে এর কার্যপরিকল্পনা ঠিক করা হয়। প্রস্তাবিত ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যানের মধ্যে এই দীর্ঘমেয়াদি টার্গেট অনুপস্থিত। স্বাভবিকভাবেই সেই লক্ষ্য পূরণে যথাযথ কর্মপরিকল্পনার খোঁজ পাওয়া যায় না অথবা পেলেও খুব দুর্বল। একটি কার্যকর কাঠামো পরিকল্পনার জন্য যে উপাদানগুলো থাকা জরুরি ঢাকার জন্য প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় (২০১৬-২০৩০) তার ঘাটতি রয়েছে।
একটি চলমান পরিকল্পনাকে নতুনভাবে সাজাতে গেলে বর্তমান অবস্থাকে পর্যালোচনা করাটাই প্রথম কাজ। প্রস্তাবিত কাঠামো পরিকল্পনা ঘাঁটাঘাঁটি করলে কিন্তু মনে হয় না যে পুরোনো পরিকল্পনাগুলোকে যত্ন নিয়ে অধ্যয়ন করা হয়েছে কিংবা সেখান থেকে কোনো শিক্ষা নেওয়া হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে যদি বলি বিগত কয়েকটি পরিকল্পনাতেই পিলখানা থেকে বিজিবি সদর দপ্তর সরানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেটা স্থানান্তর সম্ভব হয়নি। এখন আপনাকে ভাবতে হবে আসলেই সরানো সম্ভব কি না, এর সঙ্গে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, কিংবা অন্য কোনো বিষয় জড়িত আছে কি না। যদি ব্যাপারটা অসম্ভব হয় তাহলে বিকল্প চিন্তা করতে হবে। কিন্তু আপনি যদি প্রতিটি পরিকল্পনাতেই একই পরামর্শ দিয়ে যান, তাহলে ধরে নিতে হবে এ বিষয়ে আসলে কোনো গবেষণা হচ্ছে না। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ রকম কিছু ঢালাও পরিকল্পনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এমন কিছু আছে যেখানে বলা যায় পূর্ববর্তী পরিকল্পনার ব্যর্থতাকে বিশ্লেষণ করে সেখান থেকে শিক্ষা নিতে পারিনি।
একইভাবে একটি বর্ধিষ্ণু শহরের অবস্থা সামনের দিকে কেমন হবে অর্থাৎ জনসংখ্যা, আয়তন, চাহিদা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, সেটার একটি গবেষণা থাকা দরকার। সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টট বা টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত কাঠামো পরিকল্পনায় আপনি দেখবেন সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ভবিষ্যৎমুখী ধারা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে এবং কোনো পর্যালোচনা ছাড়াই গড়পড়তা আরও খানিকটা বাড়বে এটা ধরে নিয়েই পরিকল্পনা এগিয়েছে। আসলে ভবিষ্যতে কী হবে সেটা এভাবে সিদ্ধান্ত নিলে এর দুর্বলতা থেকেই যাবে। হতে পারে খুব দ্রুতই পুরো পরিস্থিতি অন্য রকম হতে পারে।
সামাজিক, অর্থনৈতিক বিবেচনায় ঢাকা একটি বহুমুখী সত্তা। একটা একদম অক্ষত কোনো ভূমি নয় এবং বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ইস্যু এর বহুমুখিতা ধরে রেখেছে। অতএব বাস্তব সমস্যা এবং সীমাবদ্ধতাকে খুব সাবধানে যত্নের সঙ্গে সমাধান করতে হবে। প্যাট্রিক গেজ ঢাকার পরিকল্পনার জন্য ‘কনজারভেটিভ সার্জারি’ বলে একটি টার্ম ব্যবহার করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মত হচ্ছে, ঢাকার মতো একটি পুরোনো এবং জনবহুল শহরের জন্য এটাই সবচেয়ে কার্যকর। প্রস্তাবিত কাঠামো পরিকল্পনায় এটির প্রতিফলন থাকা দরকার ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ঢাকার জন্য একদম নতুন কোনো রাস্তার পরিকল্পনা করা যুক্তিসংগত নয়। বরং পুরোনো রাস্তাগুলোকে কীভাবে প্রশস্ত করে, দখলমুক্ত করে, ক্ষেত্রবিশেষে সংযোগ তৈরি করে উপযোগিতা বাড়ানো যায় তার পরিকল্পনা করতে হবে। নতুন কিছু প্রস্তাব করা হবে একদম চূড়ান্ত পর্যায়ের সমাধান। এর পাশাপাশি আরও যেটা অধ্যয়ন জরুরি, সেটা হচ্ছে রাস্তার প্রয়োজন এবং চাহিদা বৃদ্ধির ধরন। যেমন ধরুন ঢাকায় গণপরিবহনের চাহিদা বাড়ছে আর আপনি যে সমাধান দিচ্ছেন সেটা হচ্ছে আসলে ব্যক্তিগত পরিবহনের জন্য উপযোগী। তাহলে এটি হবে মারাত্মক ভুল।
কার্যকর ভূমি ব্যবহার, যাতায়াতব্যবস্থার উন্নয়ন, সবার জন্য আবাসন, নির্মল পরিবেশ, উন্মুক্ত সবুজ খোলামেলা জায়গা সংরক্ষণ ইত্যাদি নিয়ে কথা আছে, প্রতিটি পরিকল্পনাতেই থাকে কিন্তু এর বাস্তবায়নের দিকগুলো অস্পষ্ট এবং ক্ষেত্রবিশেষে সাংঘর্ষিক। কোনো পরিকল্পনাতেই একটি কার্যকর দিকনির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে না। আপনি যদি বাস্তবায়ন করতে না পারেন তাহলে পরিকল্পনা তার জায়গায় থেকে যাবে। বাস্তবে তাই হচ্ছে। মেয়াদ শেষে মহাপরিকল্পনা হচ্ছে, আলোচনা হচ্ছে, আর সবাই যার যার সুবিধামতো কাজ করে যাচ্ছে।
ঢাকার উন্নয়নে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ডিআইটি এবং পরবর্তী সময়ে রাজউকের কাজের মূল্যায়ন করবেন কীভাবে?
ঢাকার উন্নয়নের জন্য ডিআইটি গঠন করা হয় কিন্তু আসলে এর কাজের সুস্পষ্ট ক্ষেত্র এবং পরিধি নির্ধারণ করা ছিল না বিধায় এটি কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। ১৯৫৩ সালে যে নগর উন্নয়ন বিধি তৈরি করা হয় তা সংশোধন করা হয় ১৯৮৭ সালে, যেখানে ডিআইটিকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউক হিসেবে বলা হয় এবং পরিকল্পনা, সমন্বয় এবং নির্দেশনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
রাজউকের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে রাজউকের কাজের পরিধি আসলে কত দূর সেটা রাজউক আজ পর্যন্ত নির্ধারণ করতে পারেনি। আপনি যদি অধ্যাদেশ দেখেন তাহলে দেখবেন যে রাজউকের সবচেয়ে বড় কাজ ছিল সমন্বয়। রাজউক সবসময়ই এখানে ব্যর্থ হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা তাদের ইচ্ছেমতো কাজ করেছে, ফলে জনদুর্ভোগ বেড়েছে, খরচ বেড়েছে, ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে বিভিন্নভাবে।
রাজউককে কোনো পরিকল্পনা সরাসরি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি বরং বাস্তবায়ন সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে কি না তার দেখভাল এবং প্রয়োজনে নির্দেশনা দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্ত বাস্তবে রাজউক সব সময়ই আগ্রহী ছিল প্রকল্প বাস্তবায়নে। রাজউক বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে। কিন্তু অনুমোদনের পরে ভবনের নকশা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না সেটা দেখার মতো লোকবল তাদের ছিল না। ফলে শহর গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। রাজউকের ব্যাপারে আরেকটি বড় অভিযোগ হচ্ছে রাজউক নিজেই স্ট্রাকচার প্ল্যান এবং ডিটেইল প্ল্যান লঙ্ঘন করছে। পূর্বাচল উপশহর করতে গিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর গতিপথ পরিবর্তন করেছে। ঝিলমিল করতে গিয়ে নিচু জলাভূমি ভরাট করেছে।
ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?
স্ট্রাকচার প্ল্যান এবং ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানের পার্থক্য আপনাকে আগে বুঝতে হবে। স্ট্রাকচার প্ল্যানের কাজ হচ্ছে কী করতে হবে হবে, কী করা যাবে এবং কী করা যাবে না, এ ধরনের একটি গাইডলাইন দেওয়া। ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান প্রণীত সেই নির্দেশনা অনুসরণ করে। ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে একদম বিস্তারিত সবকিছু থাকতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে সেই অর্থে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান তৈরিই হয়নি। যেমন পুরান ঢাকার একটি ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান যখন তৈরি হবে, তখন সেখানে রাস্তার প্রশস্ততা দেওয়া থাকবে, রাস্তার পাশে ভবনের উচ্চতা নির্ধারণ করা থাকবে, ভবনের সামনে কোনো ধরনের গাছ থাকবে, রাস্তার ফুটপাতের ডিজাইন, লাইটপোস্ট কোথায় কীভাবে বসবে তা দেওয়া থাকবে, ড্রেনেজ, বিদ্যুতের লাইন, অগ্নি লাইন দেখানো থাকবে এমনকি ভবন নির্মাণ করতে হলে সে ভবনের সম্মুখ দৃশ্য বা এলিভেশন কী হবে, সেটাও ঠিক করে দিতে হবে। ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানের গভীরতা আসলে এতটাই বেশি। কিন্তু আমাদের ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে জায়গার ব্যবহারের ধরন এবং সম্মুখ রাস্তার প্রস্থ ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। সুতরাং প্রথম কথা হচ্ছে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান বলতে যা বোঝায় সেটা আগে তৈরি করতে হবে। আমি জানি এটা যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ এবং এই লেভেলে কাজ করার মতো যোগ্য লোকের যথেষ্ট অভাব আছে, তবে সব না হলেও বিশেষ বিশেষ কিছু জায়গার ডিটেইল প্ল্যানিং অন্তত করতে হবে। আর তা ছাড়া বাংলাদেশের প্রতিটি স্থাপত্য স্কুলেই ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানিংয়ের প্রাকটিস করানো হয়। তারা বিভিন্ন এলাকা নিয়ে কাজ করছে, ডিটেইল প্ল্যানিং তৈরি করছে এবং নকশা, দৃশ্য, প্রস্থচ্ছেদ এবং এমনকি প্রস্তাবিত ছবিসহকারে খুবই চমৎকারভাবে উপস্থাপন করছে। সুতরাং তাদের একাডেমিক ওয়ার্কের সঙ্গে বাস্তব প্ল্যানিংকে সমন্বয় করে দিলে সফলভাবে কাজটি করা সম্ভব।
দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, ড্যাপের আওতায় যতটুকু হচ্ছে তাও ঠিক বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ড্যাপের নকশার সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই, যেখানে জলাধার দেখানো আছে বাস্তবে সেখানে উঁচু ভূমি বিদ্যমান। প্রভাবশালীরা নিজের জায়গাকে বাঁচিয়ে অন্যের ব্যবহৃত জায়গাকে ড্যাপের আওতায় ফেলে দিয়েছেন। বিভিন্ন উপায়ে ড্যাপের নকশা পরিবর্তন এবং সেই অনুযায়ী সংরক্ষিত এলাকায় প্ল্যান অনুমোদনের অনেক অভিযোগ শোনা যায়। বাস্তব অবস্থার আলোকে ড্যাপের বাস্তবায়ন তাই জরুরি।
পরিবেশবান্ধব শহরের ধারণা নতুন কিছু না হলেও এ দেশে সম্প্রতি বেশ আলোচনায় আসছে, ঢাকাকে পরিবেশবান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ আছে কি?
পরিবেশবান্ধব হওয়া একটি শহরের জন্য খুবই মৌলিক প্রয়োজন। এর সঙ্গে আসে টেকসই হওয়ার শর্ত। মানুষ এবং প্রকৃতির সহাবস্থান ছাড়া একটি ভালো আবাস গড়ে তোলা সম্ভব না। শহরে অল্প জায়গায় অনেক মানুষের বাস। অপরিকল্পিত এবং নিয়ন্ত্রণহীন বেড়ে ওঠা বিভিন্ন সমস্যার জন্ম দেয়। কিন্তু শহরের বৃদ্ধি এবং উন্নয়নকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। সুতরাং পরিকল্পনা করার সময় একটি পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই শহরের চিন্তা মাথায় রাখতে হবে।
পরিবেশবান্ধব হওয়ার জন্য আসলে দরকার প্রতিটি ধাপে পরিবেশবান্ধব কৌশল এবং কাজের সমন¦য় ঘটানো। যেমন, মাস্টারপ্ল্যান করার সময় পরিবেশ এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান, জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন। ভৌত উন্নয়ন ও সম্প্রসারণকাজে পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য ও নির্মাণকাজের ব্যবহার নিশ্চিত করা দরকার। শহরের দৈনন্দিন প্রয়োজনের সঙ্গে টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব রক্ষণাবেক্ষণ নীতির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। থ্রি আর (3R) বলে একটি শব্দ আমরা ব্যবহার করি, যার অর্থ হচ্ছে রিডিউস। অর্থাৎ পরিমিত ব্যবহার, রি-ইউজ অর্থাৎ পুনর্ব্যবহার এবং রি-সাইকেল অর্থাৎ পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করা। এই তিনটি নীতিকে আমরা যদি সব কাজে ব্যবহার করতে পারি তাহলে আমাদের সম্পদের সুষম বন্টন সম্ভব, সম্পদের অপচয় কম হবে এবং নষ্ট হওয়ার পরিমাণ কমবে। সর্বোপরি পরিবেশবান্ধব শহর গড়ে উঠবে।
ঢাকা শহরকে পরিবেশবান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। শতভাগ পরিবেশবান্ধব হওয়া হয়তো সম্ভব নয় বা এক হিসেবে দরকারও নেই। প্রকৃতির একটি নিজস্ব ক্ষমতা থাকে কিছু চাপ সয়ে যাওয়ার। ঢাকা শহরের জন্য দরকার পর্যায়ক্রমে একটি একটি করে চাপ অপসারণ করা।
ঢাকাকে পরিবেশবান্ধব নগর হিসেবে গড়ে তুলতে মেয়রদ্বয় নানা পদক্ষেপ নিচ্ছেন, এটা কি ঠিক পথে এগোচ্ছে বলে আপনি মনে করেন?
এটা খুবই ভালো যে ঢাকাকে পরিবেশবান্ধব নগর হিসেবে গড়ে তুলতে মেয়রদ্বয় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছেন। অতীতেও আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা শুনেছি কিন্তু সামান্য তোড়জোড়ের পরে আবার সব স্তিমিত হয়ে যায়। পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ যদি কেবল গাছ লাগানো, পরিচ্ছন্নতা আর ফুটপাত উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে আসলে এ পদক্ষেপ ব্যর্থ হয়ে যাবে। সবার আগে দরকার পরিবেশবান্ধব ধারণাটাকে সবার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া। ঢাকার সম্মানিত মেয়রদ্বয়ের উদ্যোগকে সফল করতে হলে তিনটি বিষয়ের প্রতি বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। প্রথমত, টেকসই উন্নয়ন, দ্বিতীয়ত, সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপ এবং তৃতীয়ত জনগণের অংশগ্রহণ। এই প্রতিটি বিষয়ের জন্য বিস্তারিত কর্মকৌশল আছে, যা হয়তো এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে বলা সম্ভব নয়।
প্রস্তাবিত ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যানের (২০১৬-২০৩৫) ওপরে আপনার পরামর্শ কী?
সর্বপ্রথম দরকার রাজউকের সামর্থ্য বৃদ্ধি করা। একটা সর্বব্যাপী কাঠামো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের কারিগরি জনশক্তি দরকার, রাজউকে তার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। দেশের সার্বিক নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের জাতীয় ভৌত অবকাঠামো পরিকল্পনা নীতিতে ঢাকা কাঠামো পরিকল্পনাকে স্থাপন করতে হবে এবং অন্যান্য জাতীয় ইস্যুর সঙ্গে একে সমন্বিত করতে হবে। পূর্বের ১৫ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানকে গাইডলাইন হিসেবে নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। পুরোনো পরিকল্পনার যে অংশটি বাস্তবায়িত হয়নি, সেটার বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। বর্তমান পরিকল্পনায় সেটার যৌক্তিক কারণগুলো আমলে নিতে হবে।
ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার সময় একটা ভূখণ্ডের ভৌগোলিক মরফোলজি কাঠামো বিশেষ বিবেচ্য বিষয়। বন্যা, ভূমিকম্প, জলাভূমি, জীববৈচিত্র্য ইত্যাদি বিষয়গুলো সমান গুরুত্বপূর্ণ। মনুষ্যসৃষ্ট এবং ঢাকার জন্য সংরক্ষণমূলক নীতিমালা অনুসরণের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রাকৃতিক এবং সময়ের পরিক্রমায় গড়ে ওঠা ঢাকাকে একদম পাল্টে ফেলা যাবে না। সেখান থেকেই শুরু করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন বর্তমান সময়ের একটি আলোচিত বিষয়। টেকসই উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে দীঘর্মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকার জন্য প্রস্তাবিত কাঠামো পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। ঢাকার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এর চারপাশের শহরগুলো। টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, সোনারগাঁ এই শহরগুলোকে কিন্তু কোনোভাবেই আলাদা করা যাবে না। এসব শহরের সাথে ঢাকার যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আছে সেগুলোকে মাথায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। রোড নেটওয়ার্ক নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিতে হবে।
একটি পরিবেশবান্ধব নগর গড়তে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের কোনো সুপারিশ ও কার্যাবলি আছে কি? থাকলে তার রূপরেখা সম্পর্কে কিছু বলুন?
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ এবং সেই সঙ্গে নগর এবং অঞ্চল বিভাগের শিক্ষাক্রম আসলে একটি পরিবেশবান্ধব নগর ও পরিসর তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত করেই তৈরি। আমাদের প্রতিটি ছাত্রকেই এমন বাস্তানুগভাগে শিক্ষা দেওয়া হয়, যেন তারা কর্মক্ষেত্রে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। আপনি যদি স্থাপত্য বিভাগের কথা বলেন, তাহলে বলতে হয় চতুর্থ বর্ষে নগর পরিকল্পনার ওপর একটি বিষয় রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের একটি শহরের বাস্তব সমস্যা এবং সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে নগর প্ল্যানিংয়ের প্রস্তাব তৈরি করতে হয়। এদের এই শিক্ষা পুরোপুরিই কাজে লাগানোর মতো। হাতিরঝিল এর একটি উদাহরণ। আপনাদের জানা থাকতে পারে হাতিরঝিলের উন্নয়ন প্রস্তাবনা ও পরিকল্পনা প্রথমত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণারই ফসল। জাহিদ নামের এক শিক্ষার্থী এটি তৈরি করে তাঁর থিসিস প্রকল্প হিসেবে। স্থাপত্য বিভাগের পক্ষ থেকে একে আরেকটু ঠিক করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরে অবশ্য বিভিন্ন নিয়মের অজুহাতে স্থাপত্য বিভাগকে বাদ দিয়ে এ জন্য আলাদাভাবে স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়। আবার যেমন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারকে স্থানাস্তর করার পরে এই জায়গায় কী হবে তা নিয়ে সরকারের কোনো পরিকল্পনা না থাকলেও বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগ কিন্তু এ নিয়ে গবেষণা করেছে। কয়েকটি প্রস্তাবনাও তৈরি করেছে। এগুলো নিয়ে কাজ করা সম্ভব। একইভাবে সাম্প্রতিক মেট্রোরেল (এমআরটি) স্টেশনগুলো নিয়ে ছাত্ররা অনেক কাজ করছে এবং স্থাপত্য বিভাগ থেকে এগুলোর প্রদর্শনী এবং প্রকাশনা তৈরি হয়েছে। এর প্রতিটি নিয়ে বাস্তবিক কাজ করা সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ আসলে গবেষণা করা, প্রস্তাবনা তৈরি করা। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় সে কাজগুলো নিয়মিত করে যাচ্ছে। তাদের কাজে লাগানোর দায়িত্ব আসলে সরকারের। সরকার চাইলেই এদের অনেক বেশি কাজে লাগাতে পারে।
বন্ধনকে সময় দেয়ায় আপনাকে ধন্যবাদ।
তোমাকে ও বন্ধন পরিবারকেও ধন্যবাদ।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৪তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৭।