অধ্যাপক ড. মো. শাকিল আকতারের জন্ম চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর ভর্তি হন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা বিভাগে। ১৯৯৫ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর এক বছর চাকরি করেন তেল, গ্যাস ও খনি আবিষ্কারক ও আহরণকারী যুক্তরাষ্ট্রের মাল্টিন্যাশনাল এক কোম্পানিতে। ১৯৯৬ সালে উচ্চশিক্ষার্থে যান সুইডেনে। সুইডেনের KTH, Stockholm থেকে MSc. in Environmental Engineering and Sustainable Infrastructure ডিগ্রি অর্জন করে ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ২০০৪ সালে জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে JICA Scholarship নিয়ে যান Ph.D করতে। ২০০৭ সালে পিএইচডি শেষে আবার যোগ দেন নিজ বিভাগে। ২০১৩-১৫ সালে বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের Center for Regional Development Studies-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনার বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর প্রায় ৮০টি পেপার, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নাল, সেমিনার, কনফারেন্স ও ওয়ার্কশপে উপস্থাপিত ও প্রকাশিত হয়েছে। শিক্ষা ও কর্মসূত্রে ঘুরেছেন পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম ইউরোপের বেশ কটি দেশ। ঢাকার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নগরায়ণ, সিটি করপোরেশনের সার্বিক কর্মকাণ্ড ও নগর পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন বন্ধন-এর সঙ্গে। আলাপচারিতার সূত্রধর ছিলেন শরিফুল বারী টুটুল
বন্ধন: নগরের সামগ্রিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য নগর পরিকল্পনার গুরুত্ব কতটুকু?
আমাদের মহানগর ঢাকার আজকের এ অবস্থার জন্য দায়ী অপরিকল্পিত নগরায়ণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যানজট। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, যানজট হচ্ছে নগরের সমস্যাগুলোর আউটপুট। সমস্যাকে সামগ্রিকভাবে চিন্তা করলেই সম্ভব সুষ্ঠু নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন। নগর পরিকল্পনা ব্যাপারটা কিন্তু এক বা দুই দিনের নয়, দীর্ঘ মেয়াদের। কমপক্ষে ১০ বছরের চিন্তা মাথায় রেখে নগরের পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। যদিও রাজধানী ঢাকার একটা মাস্টারপ্ল্যান আছে; এটা নিয়ে একটা ভালো স্টাডি হতে পারে। এ পরিকল্পনা অনুয়ায়ী নগরে কতটুকু কাজ হয়েছে বা হচ্ছে? এটা খুব ভালো উদ্যোগ হবে। ঢাকার জন্য তৈরি মাস্টারপ্ল্যানটির এক নম্বর অগ্রাধিকার ছিল রাজউকের ইনস্টিটিউশনাল পরিবর্তন আনা। সেটাও কিন্তু হয়নি। তবে নির্মাণসংক্রান্ত ব্যাপার যেখানে জড়িত, শুধু সেগুলোই বাস্তবায়িত হয়েছে। নগর পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় মনিটরিং ইনভলভমেন্ট কম হবে কিন্তু সোশ্যাল ইনভলভমেন্টটা থাকবে বেশি। আমাদের নগর পরিকল্পনায় অন্যতম প্রধান সমস্যা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। গাড়ি কেনায় সরকারি ট্যাক্স কমায় দ্রুতগতিতে এ নগরে বেড়েছে গাড়ির সংখ্যা। সমানতালে বেড়েছে যানজট। এ সংকট মোকাবিলায় পুরো ঢাকাকে ফ্লাইওভারে মুড়ে ফেলা হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে থাইল্যান্ডের ব্যাংকক শহরকে ফ্লাইওভারে ভরে ফেলা হয়েছিল। ২০০৫ সাল পর্যন্ত না থাকলেও আবারও ব্যাংককে ফিরে এসেছে আগের ট্রাফিক জ্যাম। এর সমাধানটা কিন্তু রয়েছে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহারে, প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণে।
বন্ধন: বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে নগর পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা বা সমস্যাটা কোথায়?
নগর পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়নে প্রধান প্রতিবন্ধকতা আমলাতন্ত্র। ডিএমডিসিতে রাজউকের ইনস্টিটিউশনাল পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এটা করা হলে আমলাদের ক্ষমতা কমে যায়। টেকনিক্যাল এসব অর্গানাইজেশনে স্কিলড ও এক্সপেরিয়েন্স টেকনিক্যাল জনবল দরকার। রাজউকের ব্যুরোক্রেসি সেটআপ চেঞ্জ করতে হবে। অর্গানাইজেশনাল, পলিটিক্যাল ও লিগ্যালি সেটআপ বদলালেই সম্ভব নগর পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন।
আমাদের নগর পরিকল্পনা এখন অনেকটাই ডোনার এজেন্সি ফান্ডিং হয়ে গেছে। দাতারা অর্থ দিলে পরিকল্পনা হবে, না দিলে নয়। পরিকল্পনা কিন্তু চলমান একটি প্রক্রিয়া। এটি সব সময় আপডেটেড হতে হবে। সব ধরনের পরিকল্পনা টপ লেভেল থেকে না এসে আসতে হবে রুট লেভেল থেকে। তবেই এর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন সম্ভব।
বন্ধন: ঢাকায় ৫২টি সরকারি প্রতিষ্ঠান নগর সেবা প্রদানের কাজে নিয়োজিত। সংস্থাগুলো ২০টি মন্ত্রণালয় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এ অবস্থায় ঢাকায় নগর সরকারের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?
সিটি করপোরেশনকে ক্ষমতায়িত করতে হবে। নগরপিতা যেই হোক না কেন, তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে নগর পরিকল্পনার সাযুজ্য থাকতে হবে। নগরপিতা জনগণের ভোটে ইলেকটেট কিন্তু আমলারা সিলেকটেট। আর তাই নগরপিতার হাতেই থাকা উচিত সর্বময় ক্ষমতা। একটা উদাহরণ দিই, সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের সরকার হিথরো বিমানবন্দরে তৃতীয় রানওয়ে করতে চেয়েছিল কিন্তু লন্ডনের মেয়র ভেটো দেওয়ায় তা আর করা হয়নি। নগর সরকার হবে সিটি কপোরেশনের সব ক্ষমতার উৎস। নগরপিতা শুধু মতামত দেবেন তা কিন্তু নয়, যেকোনো ব্যাপারে ভেটো প্রদানের ক্ষমতা থাকতে হবে তাঁর। নগর সরকার বলবে আমি এ প্রজেক্ট চাই বা চাই না। এটা চাইছি মন্ত্রণালয় এখন তা বাস্তবায়ন করুক। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক পুলিশ পর্যন্ত নিউইয়র্ক মেয়রের অধীনে। ঢাকার সিটি করপোরেশন বর্তমানে দুটি (উত্তর ও দক্ষিণ) হওয়ায় আমার তো মনে হয়, তাঁদের পরিচালনায় এখন আরেকটা রেগুলেটরি বডি দরকার।
বন্ধন: সুশাসনের উন্নয়ন সম্ভব হলে নগর উন্নয়নের সমস্যা সমাধানের পথ খুলবে বলে কি আপনি মনে করেন?
আমাদের নগর পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় সমস্যা সুশাসনের অভাব। গুড গর্ভনেন্সের যে ছয়টি বিবেচ্য বিষয় রয়েছে, এখানে তা পরিষ্কারভাবে অনুপস্থিত। স্বচ্ছতা, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি কমে এলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব; সম্ভব নগরের উন্নয়ন সাধন। যেটা ভারতের নয়াদিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল করেছেন। তিনি নয়াদিল্লিবাসীকে প্রতিদিনের আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব জানাচ্ছেন স্বচ্ছতার সঙ্গে।
বন্ধন: একটি আদর্শ ও পরিবেশবান্ধব নগর গড়তে নগর ব্যবস্থাপনা সংস্থা তথা সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীরা তাঁদের প্রতিশ্রুত ওয়াদা রক্ষা করতে পারবেন কি?
মশা মারা, স্ট্র্রিট লাইট দেওয়া ও ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করাÑ এর মধ্যেই সীমিত সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাজের পরিসর। এর বাইরে সব কাজই আমলাদের হাতে, যা করছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা। এমতাবস্থায় মেয়র কতটুকু তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারবেন, এ ব্যাপারে আমি সন্দিহান।
বন্ধন: নগরের উন্মুক্ত স্থান, খেলার মাঠ, নদী, জলাশয় ক্রমেই দখল হয়ে যাচ্ছে। নগরবাসীর জন্য এটা কতটা হুমকিস্বরূপ?
দীর্ঘদিন ধরেই একদল দুষ্টচক্রের হাতে দখল হচ্ছে নগরবাসীর উন্মুক্ত স্থান, খেলার মাঠ, নদী, জলাশয় প্রভৃতি। দখলকৃত এসব জায়গা আমরা হয়তো আর ফিরে পাব না, তবে যেগুলো রয়েছে সেগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। যেমন, বুড়িগঙ্গার পাশের ট্যানারি সরিয়ে নদীকে রক্ষার পাশাপাশি এর পাড় ঘিরে পার্ক গড়ে তুলতে পারি। প্রয়োজনে সরকারকে এগুলো অ্যাকোয়ার করতে হবে।
বন্ধন: একটি নগরের বিভিন্ন আয়ের মানুষের জন্য আলাদা আলাদা আবাসনসুবিধা থাকা উচিত। কিন্তু এ নগরে এমন কোনো সুযোগ নেই। এমন নাগরিক আবাসনসুবিধা কি আদৌ বাস্তবায়নযোগ্য?
দেশে আবাসন খাতে মন্দা চলছে। এর কারণ, ফ্ল্যাট ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার অভাব। একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তির পাঁচ বছরের আয়ের সমান একটা ফ্ল্যাটের দাম হওয়া উচিত। এটাকে আমরা বলি রুল অব থাম্ব। সারা বিশ্বেই এমন নিয়ম, যার যেমন আয়, পাঁচ বছরের মাথায় সেই আয় মোতাবেক ফ্ল্যাটের মালিক হন তিনি। তবে এখানকার বাস্তবতা ভিন্ন। ঢাকায় এখন রিহ্যাব নির্মিত সবচেয়ে ছোট ফ্ল্যাট ১২০০ স্কয়ার ফিটের আর প্রতি স্কয়ার ফিট সর্বনিম্ন ৪৫০০ টাকা। এতে একটা ফ্ল্যাটের মালিক হতে ৫০-৬০ লাখ টাকা লাগবে। ৫০০ থেকে ৬০০ স্কয়ার ফিটে ভাষানটেকের নিম্নবিত্তের জন্য যে আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, এ উদ্যোগটা ভালো ছিল। কিন্তু অব্যবস্থাপনার কারণে পুরো প্রকল্পটাই ব্যর্থ হয়েছে।
বন্ধন: বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নগরায়ণের রূপরেখা সম্পর্কে বলুন?
নগরায়ণের বর্তমান অবস্থা তো দৃশ্যমান। আর ভবিষ্যৎটা নির্ভর করছে ঢাকার নীতিনির্ধারকেরা কী চান? ঢাকাকে সত্যিকার অর্থে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। ঢাকাকে রক্ষা করতে ঢাকামুখী জনস্রোত কমাতে হবে।
বন্ধন: বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ কর্তৃক গৃহীত পরিকল্পনায় দেশ কতটুকু উপকৃত হচ্ছে বা হয়েছে?
এখানকার পরিকল্পনাবিদদের বড় একটা অংশ রাজউকে কাজ করছে। কাজ করছে সরকারি ও বেসরকারি সব বড় বড় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থায়। এভাবেই বুয়েটের পরিকল্পনাবিদেরা দেশ সেবায় তাঁদের অবদান রাখছেন।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬১তম সংখ্যা, মে ২০১৫