কোনো বস্তুকে আমরা ইচ্ছে করলেই হাতের শক্তি দিয়ে ভাঙতে বা কাটতে পারি না। অবলম্বন করতে হয় কৌশলের; সাহায্য নিতে হয় যন্ত্রের। যেমন, কাঠ, বাঁশ বা ধাতব বস্তু কেটে প্রয়োজনীয় আকার দিতে দরকার বিভিন্ন ধরনের কাটার যন্ত্র। এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর এক অনুষঙ্গ করাত। অধুনা উন্নত প্রযুক্তির নানা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের সাহায্যে কাঠ বা ধাতব বস্তু কাটা সহজতর হলেও এখনো সাধারণ হস্তচালিত করাতের চাহিদা মোটেও কমেনি। দামে সস্তা ও সহজ প্রাপ্য হওয়ায় বিশে^র বিভিন্ন স্থানে এখনো হস্তচালিত করাতের ব্যবহারই বেশি। বাজারে ধরনভেদে নানা ধরনের করাত পাওয়া যায়। করাতের আদ্যান্ত থাকছে এবারের আয়োজনে।
করাত কী?
কাঠমিস্ত্রি ও রাজমিস্ত্রির কাছে করাত খুব পরিচিত ও দরকারি একটি অনুষঙ্গ। করাত হলো লোহা বা ইস্পাতের পাত দিয়ে তৈরি একদিকে দাঁত-কাটা একটি যন্ত্রবিশেষ। বিশেষ করে গাছ, কাঠ বা বাঁশ কাটার জন্য এর ব্যবহার ব্যাপক। এখন বিভিন্ন ধরনের করাত পাওয়া যায় যা দিয়ে নরম ও কঠিন উভয় ধরনের বস্তুও কাটা যায়। প্রাচীনকালে করাতের পাত ছিল মূলত হাঙ্গর মাছের দাঁত, কাচের মতো দেখতে আগ্নেয়শিলা বা পাথরের। তবে বর্তমানে স্টিল ছাড়াও বিভিন্ন ধাতুতে তৈরি করাত পাওয়া যায়।
যেভাবে কাজ করে করাত
করাতের কাটার অংশটিকে খাঁজকাটা করে তৈরি করা হয়। যেটি দিয়েই মূলত কোনো বস্তু কাটা হয়। রাজমিস্ত্রি বা কাঠমিস্ত্রি কাঠ কাটার সময় করাতটিকে শক্তি প্রয়োগ করে সামনে এগিয়ে নেয় আবার কম জোরে পেছনের দিকে আনে। এতে কাটার বস্তুটি ক্ষয় হয়ে কেটে যায়। এ ছাড়া মেশিনচালিত করাতগুলো হয় ঘূর্ণায়মান। এই ঘূর্ণনের ফলে বস্তুটি কেটে যায়।
ইতিহাসের পাতায়
প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে করাত। এর প্রমাণ মেলে পুরোনো সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থেকে। আনুমানিক ৩১০০-২৬৮৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতা থেকে প্রথম করাতের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। তবে ওগুলো ছিল সম্পূর্ণ খোলা। অর্থাৎ কোনো কাঠামো ছিল না যা ছিল কপারের তৈরি। প্রাচীন মিসরীয়রা অনেক কাজেই করাত ব্যবহার করেছিল। তাদের গুহায় আঁকা করাতের ছবি দেখে ধারণা করা যায়, প্রাচীনকালে করাতের আকার কেমন ছিল এবং কোন কোন কাজে তারা করাত ব্যবহার করত। কপারের তৈরি সে করাতগুলেতে খাঁজকাটা পাওয়া যায়নি। তারা আঘাত করে এটাকে ব্যবহার করত। পরবর্তী সময়ে কালের বিবর্তনে করাত উন্নত রূপ পায়। এতে সমান করাতগুলোতে খাঁজকাটা শুরু হয়। প্রাচীনকালে ব্র্রোঞ্জ দিয়েও করাত বানানো হয়েছিল। এরপরে লোহা দিয়ে। এ ছাড়া গ্রিক পৌরাণিক কাহিনিতে বর্ণিত আছে, ডাইডেলাসের ভাগনে টেলস প্রথম করাত আবিষ্কার করেছিল।
যে যে কাজে করাত ব্যবহৃত হয়
হস্তচালিত করাতগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এই করাত দিয়ে কাঠমিস্ত্রিরা কাঠ কাটে। রাজমিস্ত্রিরা ভবন তৈরির সময় সাটারিং কাজে হস্তচালিত করাত ব্যবহার করে। স্টিলবার বা রড কাটতেও ব্যবহৃত হয় এ অনুষঙ্গটি। ইন্টেরিয়র, এক্সটেরিয়র ও বিভিন্ন ইভেন্টের কাজে করাতের বহুল ব্যবহারও লক্ষণীয়।
করাতের বিভিন্ন অংশ
ব্লেড: করাতের প্রধান কাজ হলো কোনো বস্তুকে কাটা। আর এই কাটার কাজটি সম্পন্ন করার জন্য দরকার ব্লেড। ব্লেড তৈরি হয় লোহা, ইস্পাত, তামা প্রভৃতি ধাতু দিয়ে। ব্লেডের একটি পাশকে এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে তা দ্বারা বিভিন্ন বস্তুকে কাটা যায়। ব্লেড মজবুত ও শক্ত পদার্থে তৈরি। কেননা কোনো কঠিন বস্তুকে কাটতে হলে ব্লেডকে ওই বস্তু থেকে আরও কঠিন হতে হবে। ব্লেড মজবুত না হলে তা দ্বারা কোনো কিছুই কাটা সম্ভব নয়। তা ছাড়া ব্লেডকে যথেষ্ট দৃঢ় হতে হয়, যাতে তা যথেষ্ট পরিমাণে ওজন ও আঘাত সহ্য করতে পারে।
করাতের দাঁত বা খাঁজকাটা অংশ: করাতের যে পাশ দিয়ে কোনো কিছু কাটা হয় বা যে ব্লেড ব্যবহার হয় এই ব্লেডের কাটার অংশে অনেক খাঁজকাটা অংশ থাকে। এগুলোকে বলা হয় করাতের দাঁত। মূলত কাটার জন্য এই খাঁজকাটা অংশটিই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আবার অনেক করাতের দুপাশেই খাঁজকাটা থাকে।
কার্ফ: একটি করাতের কাটার অংশে অনেক দাঁত থাকে। আর এ দাঁতের মধ্যকার ফাঁকা অংশটির নাম কার্ফ। করাতের ব্লেডের সমাকীর্ণতা বোঝাতেও কার্ফ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। আর ব্যবহারের ভিত্তিতে আর করাতের আয়তন অনুযায়ী এই কার্ফের ফাঁকা অংশের পরিমাণ কমবেশি হয়ে থাকে।
হাতল: হস্তচালিত করাতে যে অংশে ধরা হয় তাকে হাতল বলা হয়। হাতলের ওপর চাপ সৃষ্টি করেই কাটা বস্তুটির ওপর চাপ সৃষ্টি করে কাটা হয়। বর্তমানে কাঠ এবং উন্নতমানের প্লাস্টিকের তৈরি করাতের হাতল পাওয়া যায়।
ব্যবহারের ভিন্নতার ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের পদার্থ দিয়ে তৈরি করাতসমূহ
ব্যবহারের ভিন্নতার ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের পদার্থ দিয়ে করাতের ব্লেডটি তৈরি হয়। কোন কাজে কোন ধাতবের ব্লেড ব্যবহার করা হয় তার বিস্তারিত-
ইস্পাতের ব্লেড
ইস্পাত সস্তা ধাতবগুলোর মধ্যে একটি হওয়ায় বেশির ভাগ করাতের ক্ষেত্রেই ইস্পাতের ব্লেড ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া ইস্পাত সহজে বাঁকানো ছাড়াও করাতের জন্য উপযুক্ত একটি সংকর ধাতু। হস্তচালিত বহুল ব্যবহৃত করাতগুলোর মধ্যে ইস্পাতই ব্যবহার করা হয় বেশি। এ ছাড়া আড়াআড়ি বা লম্বালম্বি কাঠ কাটার জন্য ইস্পাত দিয়ে তৈরি করাতের ব্লেডের জুড়ি নেই।
জিংক ও কপারের ব্লেড
লবণের ব্লক কাটার জন্য জিংক ও কপারের ধাতব দিয়ে তৈরি করাতের ব্লেড ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া রান্নাঘরে ব্যবহৃত করাতগুলোও এগুলো দিয়ে তৈরি।
হীরক
পৃথিবীর শক্ত বস্তুর মধ্যে একটি হলো হীরক। ব্লেডের মাথায় হীরক যুক্ত করে শক্ত বস্তু কাটা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের মূল্যবান বস্তু এবং মূল্যবান পাথর কাটার ক্ষেত্রে ডায়মন্ড করাতের ব্লেডে ডায়মন্ড যুক্ত করা হয়। ব্লেডের মাথায় নানা পদ্ধতিতে ব্যবহারের ভিন্নতার ভিত্তিতে বিভিন্নভাবে ডায়মন্ড যুক্ত করা হয়।
হাই স্পিড স্টিল (এইচএসএস)
হাই স্পিড স্টিল দ্বারা তৈরি করাত দিয়ে স্টিল, কপার, অ্যালুমিনিয়াম ও অন্যান্য ধাতব বস্তু কাটা হয়। বিদ্যুৎ-চালিত করাতগুলোতে হাই স্পিড স্টিলের তৈরি ব্লেড সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। ইস্পাত কাটার ক্ষেত্রে কোবাল্ট এইচএসএসও ব্যবহৃত হয়।
নিরেট কার্বাইড যুক্ত করাতের ব্লেড
নিরেট কার্বাইড টাংস্টেন যুক্ত ব্লেড দিয়ে তৈরি করাতগুলো উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। এই ব্লেডগুলো বিদ্যুৎ-চালিত করাতের মধ্যে কোনো শক্ত বস্তু কাটার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
দরদাম
বর্তমানে এখানকার বাজারে বিশ^খ্যাত টুলস কোম্পানিগুলোর করাত যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে নন-ব্র্যান্ড ও খোলাবাজারে তৈরি করা করাত। প্রয়োজন অনুযায়ী পছন্দ করে কিনতে পারেন। এ ছাড়া বিভিন্ন চায়না কোম্পানিরও করাত পাওয়া যায়। এ ছাড়া হস্তচালিত করাতগুলোরও রয়েছে বিভিন্ন সাইজ। বাজারে পাওয়া করাতগুলোর হাতল কাঠ বা প্লাস্টিকের। দেখে-শুনে কিনতে হবে। ব্র্যান্ড ও সাইজভেদে করাতের দরদাম-
এগুলো ছাড়া দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ধরনের করাত বাজারে পাওয়া যায়। আর গাছ কাটার জন্য দুপাশ থেকে দুইজনে চালানোর জন্য করাত ব্যবহৃত হয়। আপনি চাইলে এটি ফুট হিসেবে কিনতে পারবেন। দাম পড়বে প্রতিফুট ৮০-১৫০ টাকা। আপনার যেটুকু প্রয়োজন ততটুকু কিনে হাতল লাগিয়ে নিতে পারবেন।
সাবধানতা
- সঠিক বস্তু কাটার জন্য সঠিক ব্লেডের তৈরি করাত ব্যবহার করতে হবে।
- কোনো বস্তু কাটার সময় করাতের আঘাতে কোনো দুর্ঘটনা যেন না ঘটে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
- সচেতনভাবে সর্তকতার সাথে কাজ করবেন।
- কারখানায় ব্যবহৃত উচ্চগতিসম্পন্ন করাতগুলো ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে।
- ইলেকট্রিকচালিত করাতগুলো ব্যবহারের সময় ভালোমানের তারের ব্যবহার আবশ্যক।
- হস্তচালিত বা বিদ্যুৎ-চালিত করাত ব্যবহরের ক্ষেত্রে শিশুদেরকে দূরে রাখুন।
প্রাপ্তিস্থান
দেশের যেকোনো হার্ডওয়্যার দোকানেই করাত পাওয়া যায়। ঢাকার নবাবগঞ্জ, কারওয়ান বাজার, কেরাণীগঞ্জ, শ্যামপুর, শ্যামলী, মিরপুরসহ প্রায় সর্বত্রই মিলবে করাত। এ ছাড়া বিভিন্ন টুলস কোম্পানির শোরুমেও পাওয়া যায় করাত।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৮তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০২০।