অর্থ, শ্রম ও সময় সাশ্রয়ে ফাস্ট কনস্ট্রাকশন

ভবন নির্মাণ দীর্ঘ এক সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। এই সময়ের স্থায়িত্বের ওপরই নির্ভর করে স্থাপনার নির্মাণব্যয়। সময় বাড়লে ভবন নির্মাণব্যয় বেড়ে যায় বহুলাংশে। সেই সঙ্গে বাড়ে ঝক্কি-ঝামেলাও। তাই বিশ^ব্যাপী চেষ্টা চলছে নির্মাণসময় কমিয়ে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নির্মাণকাজকে সহজ থেকে সহজতর করার। সাটারিং, কিউরিং, সেটিং টাইম প্রভৃতি কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষা; বৃষ্টি, ঝড়, বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ; লেবার ও নির্মাণসামগ্রীর সহজ প্রাপ্যতাসহ নানা কারণেই নির্মাণকাজ হয় বিঘ্নিত ও ব্যাহত। আর তাই নির্মাতারা চাইছেন একটি ওয়ার্কশপ বা ফ্যাক্টরিতে ভবনের সব প্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরি করে নির্মাণসময় ও ব্যয় কমাতে। আর এসবেরই অত্যাধুনিক সমাধান ফাস্ট কনস্ট্রাকশন মেথড।

সময়সাশ্রয়ী নির্মাণের পদ্ধতি

দীর্ঘদিন ধরে দ্রুত এক নির্মাণকৌশল বিকাশে কাজ করছেন প্রকৌশলীরা। গুণগতমান বা কাঠামোগত অখণ্ডতার সঙ্গে কোনো ধরনের আপস না করেই চলে চলমান এই উন্নয়নের প্রচেষ্টা। নির্মাণের আধুনিক পদ্ধতির আগমন এটিকে রূপ দিয়েছে বাস্তবে। অনন্য উদাহরণ হিসেবে, নির্মাণে এখন প্রি-ফেব্রিকেটেড নানা উপকরণ পাওয়া যাচ্ছে। আর এসব নির্মাণ উপকরণ দিয়ে উচ্চমানের ভবনে ডিজাইন করা হচ্ছে দ্রুত নির্মাণের জন্য।

সময়সাশ্রয়ী-আধুনিক নির্মাণপদ্ধতির সুবিধা

নির্মাণে গতির পাশাপাশি, আধুনিক ভবন নির্মাণকৌশল ব্যবহারে রয়েছে নানাবিধ সুবিধা। যেমন-

  • নির্মাণের সঙ্গে প্রযুক্তি ও আধুনিক কৌশলের সম্মিলন
  • দ্রুততম নির্মাণ
  • ব্যয় সাশ্রয়
  • পরিবেশবান্ধব নির্মাণ সুবিধা
  • মালামালের অপচয় রোধ
  • শ্রমিক ব্যয় সাশ্রয়
  • সহজেই বহনযোগ্য স্থাপত্যের অংশবিশেষ
  • স্ট্রেন্থ যাচাইয়ের সুবিধা
  • গুণগতমানের নির্মাণ
  • নিখুঁত ফেয়ারফেস
  • নির্মাণ প্রকল্পের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সুবিধা
  • দুর্ঘটনা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি রোধ
  • সর্বোচ্চ থার্মাল নিশ্চিতে দেয় বসবাসে প্রশান্তি
  • কম মেইনটেইন্যান্স ব্যয়
  • ইউটিলিটি বিল সাশ্রয় প্রভৃতি।

আধুনিক এবং দ্রুত নির্মাণপদ্ধতির কিছু কৌশল

থ্রিডি ভলিউমেট্রিক নির্মাণপদ্ধতি (3D Volumetric Construction System)

এই মডিউলার নির্মাণপ্রযুক্তি ব্যবহার করে, প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রীর সাহায্যে কোনো কারখানা বা ওয়ার্কশপে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে একটি ভবনের বিভিন্ন ইউনিট প্রস্তুত করা হয়। এসব ইউনিটের মধ্যে রয়েছে ফিনিশড কলাম, বিম, ওয়াল প্যানেল প্রভৃতি বেসিক স্ট্রাকচারাল, যা মডিউল বা ব্লক আকারে নির্মাণ সাইটে স্থানান্তরিত হয়। এসব মডিউল সাইটে আনার পর দ্রুততার সঙ্গে একটি আরেকটির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। কংক্রিট ব্লকসমূহ তার গুণগত বৈশিষ্ট্য যেমন- অগ্নি, শব্দ ও তাপ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশ ভালোভাবেই বজায় রাখে।

প্রিকাস্ট ফ্ল্যাট প্যানেল মডিউল (Precast Flat Panel Module)

প্রিকাস্ট ফ্ল্যাট প্যানেল আসলে স্থাপনা নির্মাণের প্রাথমিক ওয়াল ও ফ্লোর মডিউল, যা প্রকৃত সাইট থেকে দূরে তৈরি করা হয়। এরপর নির্মাণ সাইটে স্থানান্তর করা হয়। এটি এমন একধরনের নির্মাণ প্রযুক্তি, যা প্রথাগত নির্মাণপদ্ধতির তথা সাইট বেজড কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কের বদলে ভিন্ন স্থানে নির্মাণ স্বাধীনতা দেয়। এই পদ্ধতি অনুসরণ করে অধিকসংখ্যক প্যানেল নির্মাণ করে অসংখ্য সাইটে প্রেরণ করা যায়। প্রিকাস্ট ফ্ল্যাট প্যানেল মডিউলের মধ্যে রয়েছে বিম, কলাম, ওয়াল প্যানেল। এ ছাড়া রয়েছে ডেকোরেটিভ ওয়াল, ইনস্যুলেশন ওয়াল, ক্রস ওয়াল অ্যাপ্লিকেশন সুবিধাও।

টানেল ফর্মওয়ার্ক সিস্টেম (Tunnel Formwork System)

টানেল ফর্মওয়ার্ক টেকনিকের সাহায্যে প্রতিদিন একক অপারেশনে মনোলিথিক দেয়াল বা স্ল্যাব ইউনিট তৈরি করা হয়। একই প্যাটার্নের সেলুলার স্ট্রাকচার ইউনিট তৈরির ফলে নির্মাণকাজের গতি বাড়ানো সম্ভব। ফ্যাক্টরি অবস্থার সুবিধার্থে ফর্মওয়ার্ক এবং সহজে মিশ্রিত কংক্রিট স্থাপন করে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করা যায়। তবে এতে মানের কোনো হেরফের হয় না। টানেল আকারে ফর্মওয়ার্কগুলো স্ট্যাক করে ক্রেন দিয়ে সাইটে ব্যবহার করা হয়।

উচ্চ প্রযুক্তির স্টিল ফর্মওয়ার্কের সাহায্যে নির্মিত টানেল হয় অধিক শক্তিশালী ও স্থায়ী। এই পদ্ধতি এমন লোড বিয়ারিং ক্ষমতা অর্জন করে, যা ভূমিকম্প প্রতিরোধী। টানেল নির্মাণে এটা বেশ নিরাপদও বটে। এ ছাড়া সাশ্রয় করে সময়, অর্থ ও শ্রম।

ফ্ল্যাট স্ল্যাব কনস্ট্রাকশন (Flat Slab Construction)

ফ্ল্যাট স্ল্যাব একধরনের আরসিসি স্ল্যাব, যা নির্মিত হয় মনোলিথিকালি কলাম ও রিইনফোর্সমেন্টের সাহায্যে। এই লোড সরাসরি কলামের ওপরই বর্তায়। এই কৌশলটি ব্যবহার করা হয় দ্রুত সমতল ফ্ল্যাট নির্মাণ, সহজে এবং দ্রুত অনুভূমিক সুবিধা স্থাপনসহ পার্টিশনের জন্য। প্রি-ফেব্রিকেটেড সার্ভিসের ম্যাক্সিমাইজেশন ঘটে এখানে। কারণ ফ্লোর স্লাবগুলোর নিচের জোনে পরিসেবাগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়।

প্রতিটি শীর্ষস্থানীয় বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি কাজ করছে একইভাবে। কারণ অভ্যন্তরীণ লে-আউটগুলো পরে পরিবর্তনের জন্য সুবিধামতো পরিবর্তন করা যেতে পারে। উপরন্তু শক্তি বৃদ্ধির প্রয়োজন কম, যা শ্রম, খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।

প্রিকাস্ট ফাউন্ডেশন টেকনিক (Precast Foundation Technique)

প্রিকাস্ট কংক্রিট ইউনিটগুলোর সঙ্গে ভিত্তিগুলো দ্রুত তৈরি করা সম্ভব। একটি কারখানায় উৎপাদিত হয় ফাউন্ডেশনের কলাম ও বিম। এগুলো বাইর থেকে এনে স্থাপনার ভিতে সহজে স্থাপন করা যায়। একটি অন্যটির সঙ্গে জোড়া লাগানোর জন্য রাখা হয় বিশেষ সংযোগব্যবস্থা। এ পদ্ধতিতে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও নির্মাণকাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। এ ছাড়া ফুটিংয়ে বেশি খননও করতে হয় না।

হাইব্রিড কংক্রিট বিল্ডিং টেকনিক (Hybrid Concrete Building Technique)

হাইব্রিড কংক্রিট বিল্ডিং টেকনিকের সাহায্যে সহজেই কংক্রিট স্ট্রাকচার নির্মাণ করা যায়। এটি এমন একটি নির্মাণ মেথড বা কৌশল, যা প্রিকাস্ট কনক্রিট ও কাস্ট ইন-সিটু কংক্রিটকে একসঙ্গে ব্যবহার করে অধিক গুণগত মানসম্পন্ন স্থাপনা গড়ে তোলে। এই পদ্ধতির নির্ভুল কৌশল, দ্রুতগতি এবং অধিক গুণগতমানের প্রিকাস্ট কম্পোনেন্টসের ফিনিশিং বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি কমায় নির্মাণব্যয়।

থিন জয়েন্ট ম্যাশনারি টেকনিক (Thin Joint Masonry Technique)

এই কৌশলটি ব্যবহারের ফলে ইটের গাঁথুনির সিমেন্ট-বালু মর্টারের প্রথাগত পুরুত্ব ১০ মি.মি. থেকে ২-৩ মি.মি. পর্যন্ত কমিয়ে ফেলে। এটা মূলত একধরনের অ্যাডহেসিভ মর্টার, যা ইট বা ব্লক দ্রুত জোড়া লাগতে সাহায্য করে। দীর্ঘ দেয়ালে এই টেকনিক ব্যবহারে দ্রুত মর্টার স্থাপন করা যায় বিধায় নির্মাণসময় ও ব্যয় উভয়ই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে।

ইনস্যুলেটিং কংক্রিট ফর্মওয়ার্ক টেকনিক (Insulating Concrete Formwork Technique)

ইনস্যুলেটিং কংক্রিট ফর্মওয়ার্ক বা আইসিএফ টেকনিকের সাহায্যে নির্মাণকাজ করা হয় মূলত পলিস্টাইরিন ব্লক ব্যবহার করে, যা যমজ দেয়ালের বৈশিষ্ট্যযুক্ত এবং বিল্ডিং ওয়াল ফর্মওয়ার্ক তৈরির জন্য দ্রুত একত্র করা যায়। এই প্যানেল মূলত থার্মাল ব্যবস্থাকে নিশ্চিত করতেই ব্যবহৃত হয়। ইনস্যুলেটিং কংক্রিট ফর্মওয়ার্ক একটি সাধারণ নির্মাণপ্রক্রিয়া, যেখানে পলিস্টাইরিন প্যানেলের সাহায্যে ব্লক তৈরি করে সিটু কংক্রিট গঠন করা হয়। তাপ, শব্দরোধী স্থাপনা নির্মাণে এই প্রযুক্তি দারুণভাবে কাজ করে।

নির্মাণপদ্ধতির সঙ্গে নতুন উদ্ভাবনী কৌশল ক্রমাগত পরিবর্তনশীল। দ্রুত ও সাশ্রয়ী নির্মাণপদ্ধতিগুলো গুণগতমানের দিক থেকে আমাদের দেশে ফাস্ট কনস্ট্রাকশনের কাজকে দারুণ এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। সময়ের আধুনিকতম প্রকৌশলবিদ্যার উপহার হিসেবে ফাস্ট কনস্ট্রাকশন পদ্ধতি দ্রুতই হয়ে উঠছে নতুন ভবন নির্মাণে নির্ভরতার অনন্য এক মাধ্যম।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১৩৩তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০২১।

মুহাম্মদ আহসান
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top