নিরাপদ ভবন নির্মাণে নব প্রযুক্তি

কংক্রিট বহুতল ভবন, সেতু, শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন নির্মাণে ব্যবহৃত বহুল প্রচলিত নির্মাণ উপকরণ। অবকাঠামো নির্মাণে কংক্রিটের শক্তি বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হচ্ছে পাথরের নুড়ি, বালু, সিমেন্ট, পানি, রড বা স্টিল। কংক্রিটের শক্তি মূলত নির্ভর করে ফাউন্ডেশন পাইলের ওপর। পাইল মোন (Pile-Mon) ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। এটা মূলত কয়েকটি কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়াম। যার প্রধান কাজ নব নির্মিত প্রি-কাস্ট কংক্রিট ফাউন্ডেশন পাইলিং মনিটরিং করা। অর্থাৎ কংক্রিটের কর্মক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করা। যখন কংক্রিটের পাইলিং করা হয়, সে সময় পাইলিংয়ের লোহার খাঁচায় বৈদ্যুতিক সার্কিট বা সেনসিং ওয়েরট্যাগ যুক্ত করা হয়। একটি রিমোট মনিটরিং ডিভাইস পাইলের সঙ্গে সংযুক্ত করে এর মাধ্যমে বৈদ্যুতিক সিগন্যাল পাওয়া যায়। যদি কোনো বিশেষ স্থান ভেঙে যায় বা এতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে স্থানীয়ভাবে পাইলিংয়ের ক্ষতি হয়, এ সময় সেনসিং সার্কিট সিগন্যাল দেয়। বেশির ভাগ অবকাঠামো ও সেতু নির্মিত হয় মাটির নিচে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে, যা সাধারণত প্রি-কাস্ট কংক্রিট পাইলে সম্পন্ন। সারফেস লেবেল হ্যামারিং এর মাধ্যমে যা মাটির নিচে গাঁথা হয়। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি প্রি-কাস্ট সেগমেন্ট মাটির নিচে একটি একটি করে এভাবে পুঁতে ফেলা হয়। কিন্তু সেনসিং টেকনোলজি ব্যবহারের মাধ্যমে পাইলিংয়ের সবচেয়ে ওপরের এবং নিচের অংশের সেগমেন্টের অবস্থান জানা যায় প্রতিমুহূর্তে।

পাইল মোন কনসোর্টিয়াম মূলত আয়ারল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, আইসল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের একটি গবেষণাধর্মী সংস্থা। যা গঠন করা হয়েছিল ২০০৮ সালে। প্রি-কাস্ট কংক্রিট পাইলিং এর জন্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে তাদের উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তি নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণে রাখছে বিশেষ অবদান। এই প্রকৌশল কনসোর্টিয়ামটি খুব কম খরচে উদ্ভাবিত তাদের ওয়েরট্যাগ (Weretags) আরও উন্নত করার চেষ্টা করছে, যা কংক্রিটের বিভিন্ন ধাপে খুব সহজেই যুক্ত করা যায়। এভাবে খুব সহজেই প্রতিটি ধাপে প্রি-কাস্ট কংক্রিট পাইলের অবস্থান জানা যায়। এতে যদি পাইল সেগমেন্টের কোনো ত্রুটি ধরা পড়ে, তাহলে পরবর্তী সময়ে তা সহজেই প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। এ কারণে সম্ভব সঠিক লোড ক্যালকুলেশন করাও।

এই প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে খুব সহজেই বিল্ডিং, ব্রিজ অথবা অন্য কোনো স্পর্শকাতর অবকাঠামোয় যদি আগে থেকেই কোনো ত্রুটি থাকে তবে তা অনায়াসে শনাক্ত করা সম্ভব। এই প্রযুক্তি ব্যবহারে যদি কোনো কংক্রিট পাইল পুনর্ব্যবহার করা যায়, যা অন্য প্রকল্পের জন্য প্রযোজ্য, সেটাও নিরাপদ মনে করা যেতে পারে। পাইল মোন সেনসিং প্রযুক্তি অনেক বেশি সাশ্রয়ী। ভূগর্ভস্থ গভীর অংশে কংক্রিট পাইলের প্রতি সেগমেন্টের রয়েছে মনিটরিং করার সুবিধা। ইউরোপিয়ান কমিশন অনেক স্থান চিহ্নিত করেছে, যেখানে পাইল মোন প্রযুক্তি কাজে লাগানো সম্ভব। আর প্রকল্পগুলো ফান্ডিং করছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন নিজেই। প্রবর্তিত এ প্রযুক্তিটি ভূকম্পনপ্রবণ জোনেও ব্যবহৃত হচ্ছে। তা ছাড়া আগে থেকেই নিরাপদ অবকাঠামো তৈরির কাজে প্রযুক্তিটির রয়েছে বহুল ব্যবহার।

অনেক সময় ওয়েবট্যাগ প্রযুক্তিটি ব্যবহার করা হয় ক্রিটিক্যাল কংক্রিট জয়েনিং-এ। এতে আশা করা যায়, খুব শিগগিরই কোনো স্থানে ভূমিকম্প হওয়ার পর সেখানকার সার্বিক অবস্থা জানা যাবে সহজেই। প্রযুক্তিটি ব্যবহারের মাধ্যমে একদিকে যেমন সময় বাঁচে, ঠিক তেমনি সঠিক ব্যবহার হয় কাঁচামালের। ভূমিকম্পনজনিত কারণে অথবা মাটি কাঁপনের জন্য প্রকৌশলীরা পাইল মোন কর্তৃক উদ্ভাবিত যন্ত্রাংশ ভবন তৈরিকালীন ব্যবহার করছে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে জানা সম্ভব ভবন তৈরিতে কোথায় কোনো ত্রুটি হচ্ছে কি না। ত্রুটি সারিয়ে এতে সহজেই নিরাপদে হাইরাইস বিল্ডিং তৈরি করা সম্ভব। পাইল মোন ইন্সপেকশন পদ্ধতি ব্যবহারে নতুন ডিজাইনকৃত ভবন হচ্ছে আরও উন্নত। বিশেষত যেসব স্থানে ভূমিকম্প হয়েছে, সেখানকার ভূগর্ভস্থ মাটির পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে তার ওপর ভিত্তি করে বহুতল ভবনের ডিজাইন করতে সুবিধা হয়।

পাইল মোনের আবিস্কৃত ডিভাইসটি অদূর ভবিষ্যতে বিবেচিত হবে একটি উন্নতমানের অবকাঠামো নির্মাণের  কার্যকর মাধ্যম হিসেবে। ইউরোপসহ বিশ্বের ভূমিকম্পনপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে উন্নত এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিরাপদ ভবন নির্মাণ সম্ভব। যেটার সঠিকতা নিরূপিত হচ্ছে প্রি-কাস্ট কংক্রিট বিল্ডিং ডিজাইনেও। বাংলাদেশ যেহেতু ভূমিকম্প বলয়ে অবস্থিত, তাই পাইল মোন টেকনোলজি ব্যবহারের মাধ্যমে ভূমিকম্পনপ্রবণ স্থান চিহিৃত করে নিরাপদ জায়গায় সহজেই বহুতল ভবন তৈরি করা সম্ভব।

প্রকাশকাল: ৫৬তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৪

প্রকৌশলী মহিউদ্দীন আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top