যুগটা নগরায়ণের। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আবাসনচাহিদা। নির্মিত হচ্ছে নতুন নতুন ভবন। একটি ভবনের গা ঘেঁষেই আরেকটি। সবুজ বনানী ও জলাধার ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে যান্ত্রিক এ নগর থেকে। প্রকৃতির স্বাভাবিক উষ্ণতা বজায় রাখার প্রধান এই নিয়ামকদ্বয়ের অভাবে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে নগর। শীতাতপ যন্ত্র ছাড়া বসবাসই হয়ে উঠছে কঠিন। যন্ত্রগুলো ভবনের ভেতরকে শীতল করলেও বাইরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে তুলছে। ভবনের দেয়াল এই তাপ শোষণ করে বিধায় ভবনটির মধ্যে বিরাজ করে তপ্ত পরিবেশ। তাই প্রাকৃতিকভাবে তাপ থেকে বাঁচতে নির্মাণশিল্পে যুক্ত হয়েছে হলো ব্রিকস (Hollow Bricks) বা ফাঁপা ইট। এই ইটের অভ্যন্তর ফাঁপা হওয়াই বাইরের তাপ ভেদ করে ঘরের ভেতরে আসতে বাধা পায়। ফলে ভবনের ভেতরের পরিবেশ হয় শীতল।
এই ফাঁপা ইট আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের অভ্যন্তরীণ ও বাইরের ওয়াল, পার্টিশন ওয়াল, শব্দ প্রতিরোধী ওয়াল, রিটেইনিং ওয়াল ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া বর্তমানে ভবনের সম্মুখ বা বাইরের পাশে বিভিন্ন ডিজাইনের হলো ফেসিং (Facing) ব্রিকস ব্যবহার করা হচ্ছে। যার ফলে ভবনের সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি বৃদ্ধি পাচ্ছে ভবনের তাপ প্রতিরোধ ক্ষমতা। হলো ব্রিকস এমন একধরনের ইট, যার মোট আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগের বেশি ফাঁকা (Core or cell), যা সর্বোচ্চ ৭৫ ভাগ পর্যন্ত হতে পারে।
শুরুর কথা
খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ বছর আগে রোমানরা কংক্রিটের ব্যবহার শুরু করলেও প্রথম ১৮৯০ সালে আমেরিকার হারমন এস. প্লামার (Harmon S. Plamer) কংক্রিট হলো ব্লকের নকশা প্রস্তুত করেন। দীর্ঘ ১০ বছর গবেষণার পর ১৯০০ সালে তিনি কংক্রিট হলো ব্লক ডিজাইনের সরকারি সনদ পান। এ সময় ব্লকের আকার ছিল (৩০x১০x৮) ইঞ্চি এবং ব্লকগুলো অত্যন্ত ভারী হওয়ায় এগুলো ওপরে তোলার জন্য ক্রেন ব্যবহার করতে হতো। ১৯০৫ সালে মধ্য আমেরিকার প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোম্পানি কংক্রিট হলো ব্লক উৎপাদন শুরু করে। প্রথম অবস্থায় কংক্রিট হলো ব্লক শুধু হাতে তৈরি করা হতো। যার ফলে উৎপাদন ব্যয় ও সময় দুটোই বেশি লাগত। কিন্তু প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে স্বয়ংক্রিয় মেশিনে কংক্রিট হলো ব্লক উৎপাদিত হচ্ছে। যার ফলে বর্তমানে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় দুই হাজার ব্লক তৈরি করা সম্ভব।
হলো ব্রিকসের যত সুবিধা
- অত্যন্ত টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী
- অগ্নি প্রতিরোধক
- ওজনে হালকা
- পানি শোষণের পরিমাণ কম
- সময়ের অপচয় রোধ করে
- নিরাপদ
- ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার জন্য উপযোগী
- রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম
- দ্রুত ও সহজ নির্মাণ উপকরণ
- ভারবহন ক্ষমতা ও শক্তি প্রয়োজন অনুসারে নির্ধারণ করা সম্ভব
- চিত্তাকর্ষক ও সৃজনশীল
- পরিবেশবান্ধব
- সাশ্রয়ী।
বিশেষত্ব
- হলো ব্রিকসের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটা তাপ ও শব্দ অন্তরক (Insulator) হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ হলো ব্রিকস ব্যবহারের ফলে দেয়ালের বাইরের তাপ ভেতরে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধাপ্রাপ্ত হয়। যার কারণে গরমের দিনে ভবনের অভ্যন্তরের তাপমাত্রা কিছুটা কম থাকে, ফলে ঠান্ডা অনুভূত হয়। এ ছাড়া প্রচণ্ড শীতের সময় ভবনের অভ্যন্তর থাকে উষ্ণ।
- হলো ব্রিকসের দেয়াল শব্দ নিরোধক বিধায় কোলাহলপূর্ণ এলাকা, শিল্পনগরের মতো এলাকার ভবনে এই ইটের ব্যবহার খুবই উত্তম।
- হলো ব্রিকস ওজনে হালকা বিধায় বিল্ডিংয়ের টোটাল ডেড লোড অনেকাংশে কমে যায়। এ জন্য ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় এই ইট অধিক উপযোগী।
- এ ছাড়া গাঁথুনিতে সলিড ইটের জায়গায় হলো ব্রিকস ব্যবহার করলে নির্মাণব্যয় প্রায় ১৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ কমে যায়।
রকমফের
উপাদানের ওপর ভিত্তি করে হলো ব্রিকসকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:
১. মাটির তৈরি হলো ব্রিকস
২. কংক্রিটের হলো ব্রিকস বা ব্লক
কাঁচামাল
মাটির তৈরি হলো ব্রিকসের উপাদানসমূহ
- মাটি (Clay)
- শেইল (Shale)
- স্ল্যাগ (Slag)
- বালু (Sand)
- ফ্লাই অ্যাশ (Flyash)
কংক্রিট হলো ব্রিকসের উপাদানসমূহ
- সিমেন্ট (Cement)
- বালু (Sand)
- পাথর (Stone Clips)
- পানি (Water)
এ ছাড়া হালকা ওজনের কংক্রিট হলো ব্রিকস নির্মাণের ক্ষেত্রে বালু ও পাথরের পরিবর্তে শেইল বা স্লেট ব্যবহৃত হয়। সাধারণত অল্প ভারবহনশীল এবং পার্টিশন ওয়াল নির্মাণের ক্ষেত্রে হালকা ওজনের কংক্রিট হলো ব্রিকস ব্যবহৃত হয়।
বৈশিষ্ট্যসমূহ
কাঠামোগত চাহিদা ও ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন আকার-আকৃতির হলো ব্রিকস তৈরি করা হয়। তবে সচরাচর প্রচলিত কিছু কংক্রিট হলো ব্রিকসের সাইজ ও বৈশিষ্ট্য-
সাইজ (১৬x৮x৮) ইঞ্চি, গড় ওজন ২২ কেজি
একক ওজন ১.৩৭ গ্রাম/সেমি৩ এবং গড় কম্প্রেসিভ স্ট্রেংথ ৩৪.৯৯ কেজি/সেমি২।
সাইজ (৮x৮x৮) ইঞ্চি, গড় ওজন ১৩ কেজি
একক ওজন ১.৬০ গ্রাম/সেমি৩ এবং গড় কম্প্রেসিভ স্ট্রেংথ ২৮.০৫ কেজি/সেমি২।
কিছু মাটির হলো ব্রিকসের আকার এবং ওজন
(১৬x৮x৪) ইঞ্চি – ৬.৪ কেজি
(১৬x৮x৬) ইঞ্চি – ৮.৯ কেজি
(১৬x৮x৮) ইঞ্চি – ১১.২ কেজি
এ ছাড়া একক ওজন ৬৯৪ থেকে ৭৮৩ কেজি/মি৩।
সলিড কংক্রিট ব্লকের চেয়ে মাটির তৈরি হলো ব্রিকসের ওজন প্রায় ৬০ শতাংশ কম।
বর্তমানে গাঁথুনির বন্ডিংয়ের কথা মাথায় রেখে ব্লকে হোল সংখ্যা কম-বেশি করা হয়।
উৎপাদনের ধাপসমূহ
মাটির হলো ব্রিকস তৈরির উপাদানসমূহ
- ইটের উপাদানসমূহ নির্বাচন
- উপাদানসমূহের মিশ্রণ প্রস্তুতকরণ
- ইট কাটা
- ইট শুকানো
- ইট পোড়ানো
কংক্রিট হলো ব্রিকস উৎপাদনের ধাপসমূহ
- মোল্ড (Mold) প্রস্তুতকরণ
- উপাদানের আনুপাতিকীকরণ
- উপাদানসমূহের পরিমাপকরণ
- উপাদানের মিশ্রণ
- মোল্ডে কংক্রিট স্থাপন
- কংক্রিট ঘনসন্নিবিষ্টকরণ
- কিউরিং (Curing)
মান নিয়ন্ত্রণ
প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্যসহ হলো ব্রিকস উৎপাদনের ক্ষেত্রে এর মান নির্ণয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ছাড়া হলো ব্রিকসের মান নিয়ন্ত্রণ কষ্টসাধ্য। এ জন্য ইটের উপাদানসমূহের গুণগতমান নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া উপাদানসমূহের অনুপাত ও পরিমাপ সঠিক হতে হবে। মিশ্রণে পানি পরিমাণমতো মেশাতে হবে। এ ছাড়া উপাদানসমূহের সঠিক মিশ্রণ ও মাটির ইটের ক্ষেত্রে পোড়ানোর সময় তাপমাত্রা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যথাযথ সাইজ ও পুরুত্ব ইটের উপরিভাগ বা পার্শ্বের মসৃণতা নিশ্চিত করতে হবে।
কংক্রিট হলো ব্রিকসের অতিরিক্ত সুবিধা
বাংলাদেশে পোড়ামাটির ইটের ব্যবহার পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। কারণ, এই ইট তৈরি করতে গিয়ে প্রয়োজন হয় কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি, যা প্রাকৃতিক ভূ-তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটায়। এর ফলে একদিকে যেমন কৃষিজমির পরিমাণ কমছে অন্যদিকে এটি ভবিষ্যৎ খাদ্য উৎপাদনের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। ইট পোড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হয় কাঠ ও কয়লা। এতে বিপুল পরিমাণ বৃক্ষরাজি ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে। এ জন্য পরিবেশের ভারসাম্য নিশ্চিতভাবেই বিনষ্ট হয়। ইট পোড়ানোর কাজে ব্যবহৃত এই জ্বালানি থেকে নির্গত ভয়ানক বিষাক্ত গ্যাসসমূহ শুধু বায়ুদূষণই করছে না বরং তা জীবজগতের প্রতিটি প্রাণীর জন্যই ক্ষতিকর। এ জন্য ইটের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব কংক্রিট ব্লক ব্যবহার করাই শ্রেয়।
শেষের আগে
বর্তমানে সলিড ব্রিকসের পাশাপাশি হলো ব্রিকসের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। কারণ, ভবনে হলো ব্রিকস ব্যবহারের ফলে যেমন সময়ের অপচয় কমে, পাশাপাশি কমে নির্মাণব্যয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হলো ব্লকের আকার-আকৃতিতেও আসছে অনেক পরিবর্তন। যা হলো ব্রিকসকে করছে আরও যুগোপযোগী ও আকর্ষণীয়।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬১তম সংখ্যা, মে ২০১৫