২০১৩ সালের ডিসেম্বরে মানবহিতৈষী সংগঠন আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের প্রধান কার্যালয় নির্মাণে আয়োজিত স্থাপত্য ডিজাইন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় ৪৭টি দল। এদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তরুণ একদল স্থপতির সংগঠন, কিউব ইনসাইড ডিজাইন লিমিটেড। ভিন্নধর্মী, নান্দনিক স্থাপত্য ডিজাইনের কারণে প্রকল্পটিতে জয়ী হয় তারুণ্যের এ প্রতিষ্ঠানটি। ডিজাইনের মাধ্যমে তারা ফুটিয়ে তোলে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সামাজিক মূল্যবোধকে স্থাপত্যের ক্যানভাসে শৈল্পিক সৌন্দর্য আর দারুণ দক্ষতায়।
বিজয়ী দলের অন্যতম সদস্য স্থপতি মো. শাখাওয়াত হোসেন জানান, তাঁদের দলটি এমন একটি ভবনের ডিজাইন করছে, যেটি আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মানবতাবাদী কর্মকাণ্ডের চিহ্ন বহন করার পাশাপাশি মানবতার মূর্তপ্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আমাদের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানটি সর্বোচ্চ দক্ষতায় কাজটি সুসম্পন্ন করবে। রাজধানীর ব্যস্ততম স্থান কাকরাইলে তিনটি ভিন্ন ধর্মের ভৌগোলিক আকৃতির বিল্ডিং নির্মিত হবে। এই স্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত হবে বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ড। অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, লাশ দাফন, এতিমদের পুনর্বাসন আর চিকিৎসাসেবার মতো মানবহিতৈষী কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে স্থাপনাটি পরিচালিত হবে। ৪২ কাকরাইলের অফিসে শতবর্ষী কার্যক্রম পরিচালনার পর আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের পরিচালনা পর্ষদ ৩০ কাঠা জমির ওপর নবনির্মিত ভবনটিকে বাণিজ্যিক ভবনে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়।
এরই ফলে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী ৪৭টি দল চমৎকারভাবে তাদের নৈপুণ্যতা ও ডিজাইনের যথার্থতা তুলে ধরে সাত সদস্যের বিচারক প্যানেলের সামনে। বিচারকদের বিচারে ৪৭টি দলের মধ্যে কিউব ইনসাইড ডিজাইন লিমিটেড সম্মানজনক অবকাঠামো ডিজাইনের এ প্রতিযোগিতায় জিতে নেয় প্রথম পুরস্কার। বুদ্ধিদীপ্ত ডিজাইনের সৌন্দর্য নির্ভর করে ডিজাইনটির পরিশুদ্ধির ওপর। প্রকল্পটির প্রধান লক্ষ্য আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সত্তার আদলে পরিশুদ্ধি সংরক্ষণ করা। কিউব ইনসাইড ডিজাইন দলের ডিজাইনাররা তাঁদের পূর্ববর্তী রূপরেখা অনুয়ায়ী নির্দেশনা মোতাবেক ডিজাইনের উন্নয়ন ঘটিয়েছিলেন। স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানটির চার অংশীদার খন্দকার আশিকুজ্জামান আহমেদ, ফিরোজুল হক, মো. শরীফুজ্জামান ও মো. সাখাওয়াত হোসেন বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রিধারী।
সুরুচি ভাবনা আর সৎ চিন্তা-চেতনা দলটির মূলমন্ত্র। যেখানে প্রতিটি অংশীদারদের প্রতি রয়েছে সমান ও অবিচল আস্থা। ভোকেশনাল হাউস, অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং, হাউসিং কাম কমপ্লেক্স, বাণিজ্যিক বিল্ডিং, ফ্যাক্টরি বিল্ডিং আর প্রার্থনাগারের মতো প্রকল্পে সফলতার সঙ্গে কাজ করছে চার স্থপতির দলটি। কিউব ইন সাইড তাদের নিত্যনতুন প্রতিযোগিতামূলক কাজের পাশাপাশি রাজধানীর কলাবাগানের লেক সার্কাসে অ্যাটলার ৫২-এর ডিজাইন উন্নয়নের কাজ করছে। উদ্যমী স্থপতি, প্রকৌশলী ও অন্যান্য কর্মীরা তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে তাঁদের প্রযুক্তিগত প্রয়োগিক ধারণা শেয়ার করছেন যথার্থভাবে।
কিউব ইনসাইডের ডিজাইন করা বিল্ডিংসমূহ: ইসলামপুরের ভাস্কর্য নির্মাণ হাউস, অগ্রণী ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, দিলকুশা, সাদমুসা হাউজিং, চট্টগ্রাম, এইচ এন এস টায়ার, চট্টগ্রাম, চট্টগ্রামের রিদিনক বিলের মতো দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী স্থাপনার কাজ অতীতে কিউব ইনসাইড করেছে। ভবিষ্যতেও এমন দারুণ সব কাজের সঙ্গে থাকবে।
১৯০৬ সালের স্বেচ্ছাসেবী ইব্রাহিম মোহাম্মদের স্বেচ্চাসেবামূলক কাজ নিয়ে যাত্রা শুরু করে মানবতার সেবায় যুক্ত সংগঠনটি। সুরুচিসম্পন্ন এমন কিছু মানুষের সহযোগিতায় পথ হাঁটতে শুরু করেছিল আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম নামের আজকের এ মানবতাবাদী প্রতিষ্ঠানটি। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের পরিচালনা পরিষদ তাদের নর্বনির্মিত প্রধান কার্যালয়ের অবকাঠমো পরিবর্তনের কথা বিবেচনায় নিয়ে দ্বারস্থ হয় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেকচারের। তাদের উদ্যোগে অয়োজিত হয় স্থাপত্য ডিজাইন প্রতিযোগিতা। স্থপতিদের বার্তা দেওয়া হয় ডিজাইনটি যেন আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের পরিশুদ্ধতার ভিত্তিতে বিন্যস্ত হয়। পাশাপাশি প্রাধান্য পায় বাণিজ্যিক ভবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতাবিন্যাসও।
কিউব ইনসাইডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্থপতি খন্দকার আরিফুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, প্রতিযোগিতাটি ছিল একটি যুদ্ধ জয়ের মতো, যা আমাদের মতো তরুণ স্থপতিদের উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়ার ভালো প্রশিক্ষণক্ষেত্রও বটে। কাজটি ছিল সবার সম্মিলিত কঠোর পরিশ্রমের ফল। আর তাই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়ায় স্বভাবতই ছিলাম অনেক উল্লসিত ও আনন্দিত। সম্মানিত বিচারকমণ্ডলী আমাদের ডিজাইনকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেছেন, এটাই ছিল আমাদের প্রত্যাশিত।
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম আত্মমানবতার সেবায় নিয়োজিত। প্রকল্পটির চারতলা ভবনসহ ৩০ কাঠা জমিটি আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামকে দান করেন জামিলুর রেজা নামক এক দাতা। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের নতুন ভবনটি নির্মিত হচ্ছে বাণিজ্যিক ভবন হিসেবে। প্রতিষ্ঠানটি যেহেতু আত্মমানবতার সেবায় নিয়োজিত, সেহেতু এ কাজে প্রয়োজন প্রচুর অর্থের। সব অর্থই আসে দান থেকে। ভবনটি নির্মিত হলে এখান থেকে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের বড় অঙ্কের অর্থের জোগান আসবে। আর এ জন্যই ভবনটিকে বাণিজ্যিক ভবনে রূপ দেওয়া হচ্ছে। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সব ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহৃত হবে নির্মীয়মাণ ভবনটির দুটি ফ্লোর। এ ছাড়া বেজমেন্ট ব্যবহার করা হবে অ্যাম্বুলেন্স রাখার জন্য। দুটি ফ্লোর ব্যবহৃত হবে জামিলুর রহমান ইনস্টিটিউটের কাজে। ভবনটি হবে তিনটি বেজমেন্টসহ ১৪ তলা। বাকি ১০ তলা ব্যবহার করা হবে অর্থসংস্থানে বাণিজ্যিক প্রয়োজনে।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৫ তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৪