ভবনধসে অসংখ্য মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু আর চিরজীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ আমাদের কাছে এখন আর নতুন কোনো খবর নয়। আমাদের খুব কাছের কেউ যদি এমন দুর্ঘটনার শিকার হন, তবে আমরা উপলব্ধি করতে পারব সেই মর্মান্তিক ঘটনা মানুষকে কত নিষ্ঠুরভাবে নিষ্পেষিত করে জীবনভর। এই তো কিছুদিন আগেই যা ঘটেছিল সাভারের রানা প্লাজায়। যাঁরা মৃত্যুবরণ করেছেন, তাঁদের পরিবারের কষ্টের কথা আমরা কজনই বা জানি! সারা জীবনের জন্য যাঁরা পঙ্গুত্ববরণ করেছেন, তাঁদের কষ্টের ভাগ কেউ কখনো নিতে পারবে না। এ ধরনের দুর্ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে; সচেতনভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে যেন পরবর্তী সময়ে আর এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা না ঘটে। যেকোনো ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সবারই ন্যূনতম কিছু করণীয় রয়েছে, যা সঠিকভাবে মেনে চললে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করা যাবে সহজেই। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সচেতনতার বিকল্প কিছু নেই। সবার মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হলে আসলে নিজেদের জেনে নেওয়া প্রয়োজন বাড়ি করতে আমাদের করণীয় কী?
মাটি পরীক্ষা বা সয়েল টেস্ট
ভবনধসে পড়ার যতগুলো মৌলিক কারণ আছে, তার মধ্যে সঠিকভাবে মাটি পরীক্ষা না করা অথবা আদৌ পরীক্ষা না করা অন্যতম। কেননা সয়েল টেস্টের রিপোর্টের ওপর নির্ভর করেই ভবনের ফাউন্ডেশন ডিজাইন করা হয়। এই ফাউন্ডেশনের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে ভবনটি। পরীক্ষাটি করতে খরচ কিন্তু তেমন নয়। কিন্তু যাঁরা বাড়ি বানান, তাঁদের প্রচণ্ড অনীহা রয়েছে এই কাজটি করতে। ধরুন, পাঁচ কাঠা জমির ওপর যদি একটি সুন্দর বাড়ি নির্মাণ করতে আনুমানিক খরচ হতে পারে চার কোটি টাকা। কিন্তু ভালো মানের একটি কোম্পানির মাধ্যমে সয়েল টেস্ট করাতে সর্বোচ্চ খরচ পড়বে মাত্র ৩০ হাজার টাকা। মোট ব্যয়ের তুলনায় সয়েল টেস্টের ব্যয় খুবই নগণ্য! অথচ মাত্র ৩০ হাজার টাকার জন্য চার কোটি টাকাসহ অসংখ্য জানমাল পড়ে মারাত্মক ঝুঁকিতে!! নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্মাণের আগে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সাহায্যে মাটি পরীক্ষা করানো খুবই জরুরি।
ভবন ডিজাইন
একটি ভবন ডিজাইনে জড়িত মূলত কয়েকটি দিক। একটি ডিজাইন অর্থাৎ নকশা, অপরটি নকশা অনুমোদন এবং সেই সঙ্গে নকশা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না তার তদারকি। ডিজাইনের এ মূল দুটি অংশ হচ্ছে আর্কিটেকচারাল ডিজাইন বা স্থাপত্য নকশা এবং স্ট্রাকচারাল ডিজাইন বা কাঠামো নকশা। এ ছাড়া আছে ইলেকট্রিক্যাল ডিজাইন ও প্লাম্বিং ডিজাইন। আমরা যারা সাধারণ মানুষ, তারা বিল্ডিং ডিজাইন করানোর ক্ষেত্রে সঠিক ধারণা রাখি না বলে অনেক ক্ষেত্রেই সঠিকভাবে বিষয়গুলো অনুসরণ করতে পারি না।
আর্কিটেকচারাল ডিজাইন
ভবনের বাহ্যিক আকৃতি, সৌন্দর্য ও ভেতরে জায়গার ব্যবহার উপযোগিতা স্থাপত্য নকশার মূল প্রতিপাদ্য। একজন স্থপতির নেতৃত্বে এই কাজটি করা হয়। ভবনের প্রবেশ, চলাচল, আলো-বাতাসের ব্যবস্থা, ওপরে নিচে ওঠানামা, সম্পূর্ণ জায়গার লে-আউট, ভেতরের প্লানিংয়ের খুঁটিনাটি কেমন হবে তার সম্পূর্ণ নকশা করেন স্থপতি নিজ দায়িত্বে। যদিও স্থাপত্য নকশার সঙ্গে ভবনের স্থায়িত্ব বা ভেঙে পড়ার মতো দুর্ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক নেই, তবে ভবনের সার্বিক বসবাসের পরিবেশ, অগ্নিনিরাপত্তা ইত্যাদি নিশ্চিত করতে হলে স্থাপত্য নকশা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্থপতি ও প্রকৌশলীর সমন্বিত ডিজাইন না হলে ভবনে মারাত্মক ত্রুটি থেকে যেতে পারে।
স্ট্রাকচারাল ডিজাইন
ভবনের স্থায়িত্ব ও জীবনের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এর স্ট্রাকচারাল ডিজাইন বা কাঠামোগত নকশা। স্ট্রাকচারাল ডিজাইনে মারাত্মক ত্রুটি থাকাটা সাভারের রানা প্লাজা ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ বলে ধারণা করা হয়। ফাউন্ডেশন, পিলার ও বিমÑ এ কয়টি কাঠামোগত উপাদানে কোনোভাবেই দুর্বলতা থাকা চলবে না। এ জন্যই অভিজ্ঞ ও পেশাদার প্রকৌশলীর মাধ্যমে স্ট্রাকচারাল ডিজাইন করাতে হবে। এ জন্য আমরা যে বিষয়ের দিকে নজর রাখতে পারি-
- স্ট্রাকচারাল ডিজাইনারকে অবশ্যই হতে হবে একজন গ্র্যাজুয়েট প্রকৌশলী (সিভিল) এবং তাঁকে প্রফেশনাল ডিজাইনারও হতে হবে। প্রফেশনাল বলতে বোঝায় স্ট্রাকচারাল ডিজাইনে তাঁর অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতা থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, সব বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারই স্ট্রাকচারাল ডিজাইনার নন।
- আমরা অনেকেই একটা ভুল করি, তা হলো কোনো ডিপ্লোমা প্রকৌশলী দিয়ে স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের কাজটি করিয়ে নিই। এ কাজ কখনোই করা যাবে না।
- অনেক সময় কোনো স্থপতির কাছে স্থাপত্য ডিজাইনের কাজটি করার পাশাপাশি স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের কাজটিও তাঁর মাধ্যমে করা হয়। সে ক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের কাজটি আসলে কে করছেন। যেকোনো প্রয়োজনে বা যথাযথ বোঝার সুবিধার্থে তাঁর সঙ্গেও সরাসরি বসতে হতে পারে।
- অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজমিস্ত্রি বা ঠিকাদারের সঙ্গে আলোচনা করেই চার-পাঁচতলা একটি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ভবনমালিকের খামখেয়ালি আর অজ্ঞতাই দায়ী। গ্রাম বা মফস্বল শহরে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। এ ধরনের খামখেয়ালিপনা থেকে আমাদের সরে আসতে হবে।
আমাদের কঠিন কোনো অসুখ হলে যেমন হণ্যে হয়ে ঘুরি ভালো ও সঠিক ডাক্তারের জন্য, ঠিক তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি গুরুত্ব দিয়ে সঠিক ডিজাইনার খুঁজে বের করা আমাদেরই দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে আমরাই হতে পারি ভবনধসের মতো ট্র্যাজেডির মহানায়ক!
কনস্ট্রাকশন ম্যানেজমেন্ট
তৃতীয় ও সর্বশেষ কাজটি হলো নির্মাণকাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাজের সঠিক তদারকি। আপনার ভবনের সব ড্রয়িং ডিজাইন সঠিকভাবে সম্পন্ন করে যদি নির্মাণকাজ সঠিক লোক দিয়ে সঠিকভাবে তত্ত্বাবধান করাতে না পারেন, তাহলে সবকিছুই অর্থহীন হয়ে যাবে। নির্মাণকাজ তদারকির জন্য কয়েকটি বিষয়ে আপনাকে গুরুত্ব দিতে হবে:
- সার্বক্ষণিক কাজ তদারকির জন্য একজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলীকে নিয়োগ দিতে হবে। তিনি একজন অভিজ্ঞ ডিপ্লোমা প্রকৌশলীও হতে পারেন।
- সম্ভব হলে যে প্রকৌশলী স্ট্রাকচারাল ডিজাইন করেছেন, তাঁকে দিয়ে প্রতি সপ্তাহে একবার অথবা প্রয়োজন অনুসারে তাঁকে দিয়ে সাইট ভিজিট করানো যেতে পারে।
- কনস্ট্রাকশন ম্যানেজমেন্টে পারদর্শী এমন একজন প্রকৌশলীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা এবং তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী সম্পূর্ণ কাজ পরিচালনা করা। এ ধরনের একজন প্রকৌশলীর সরাসরি তত্ত্বাবধান থাকলে বিশেষ কারণ ছাড়া স্ট্রাকচারাল ডিজাইনারের সাইট ভিজিট করার প্রয়োজন হবে না।
- নির্মাণকাজে ব্যবহৃত মৌলিক উপকরণসমূহের গুণগতমান নিশ্চিত হওয়া। এ কাজটি নিশ্চিত করবেন এ কাজে অভিজ্ঞ সাইট ইঞ্জিনিয়ার।
যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন
ভবন নির্মাণের আগে অবশ্যই যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে। ভবন নির্মাণে অনুমোদন নেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় গুরুত্ব দিই না। বাস্তবিক অনুমোদন নেওয়া ডিজাইনের কোনো অংশ নয় কিন্তু কয়েকটি কারণে এর গুরুত্ব রয়েছে। প্রথমত, রাজউক বা পৌরসভা থেকে অনুমোদন নিতে হলে তালিকাভুক্ত প্রকৌশলী বা স্থপতির স্বাক্ষর থাকতে হয়, এভাবে ন্যূনতম যোগ্যতা যাচাইয়ের সুযোগ থাকে। দ্বিতীয়ত, অনুমোদনের পরে ভবনের দায়দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী বা প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায়। এভাবে ডিজাইনারের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হওয়ার কিছুটা হলেও সুযোগ থাকে।
এটা সত্য যে আমাদের দেশে ডিজাইন, নির্মাণ, তদারকি ইত্যাদি বিষয়ে নিয়মকানুন এবং এর প্রয়োগের অভাব আছে। সবকিছু নিয়ম মেনে ঠিকভাবে হয়েছে কি না সে বিষয়ে অনুমোদন প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথা থাকে না। ভবন নির্মাণের অনুমতি দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ! আর নির্মাণকাজ সঠিকভাবে হচ্ছে কি না সে ক্ষেত্রেও তাদের কোনো তদারকি থাকে না। এ কারণে আমরা প্রতিনিয়ত সমস্যার মধ্যে পড়ছি, ক্ষতির মধ্যে পড়ছি, ক্ষেত্রবিশেষে প্রতারিতও হতে হচ্ছে। আমরা নিজেরা যদি সচেতন হই, তবে সেটা হবে আমাদের জন্য ভালো, তবেই সম্ভব হবে সব ধাপ অনুসরণ করে সঠিকভাবে ভবন নির্মাণ করে দুর্ঘটনার হাত থেকে মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৭তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৫