ঐতিহাসিক স্থানকে বলা হয় ইতিহাসের আয়না। পৃথিবীতে এমন অনেক ভূ-অভ্যন্তরস্থ শহর রয়েছে, যা শুধু তার অবকাঠামোর বিশেষত্বের জন্য নয় বরং অনেক ইতিহাসগাথার জন্যও বিখ্যাত। আদি মানুষের বাস ছিল মাটির নিচে পরিত্যক্ত কোনো গুহা বা খনির একাংশে কিংবা সাবওয়ে টানেলে। অনেকেরই জানা নেই পৃথিবীতে রয়েছে ভূগর্ভস্থ শহর। এটা স্বাভাবিক না হলেও বাস্তবতা বলছে অনেক মানুষই আছে, যারা মাটির নিচে বসবাস করে।
ভূগর্ভস্থ শহর, বেইজিং, চীন
১৯৬৯ সালের শুরুর দিকে জরুরি ভিত্তিতে সোস্যালিস্ট সরকারের আশ্রয়ে থাকতে মাও জিডোং আদেশ দিয়েছিলেন বেইজিংয়ের ভূগর্ভস্থ শহর নির্মাণের। এটি তৈরির উদ্দেশ্য ছিল সামরিক প্রতিরক্ষায় সুবিধা আদায়। ভূ-গর্ভস্থ এ শহরের অভ্যন্তরে রয়েছে স্টোর, রেস্তোরাঁ, স্কুল, থিয়েটার এমনকি সেলুনও! এখানে আছে রোলার স্কেটিং করার জায়গাও। ভূ-অভ্যন্তরস্থ এ শহরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এখানে এক হাজারের বেশি জানালা দিয়ে অবাধে বাতাস প্রবেশ করতে পারে। এটি এমনভাবে তৈরি, যাতে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ এখানে থাকতে পারে যদি কখনো তারা শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয়। এখানকার প্রতিটি বাড়িতে রয়েছে একটি করে ছাদের দরজা। এতে যে কেউ খুব দ্রুত ভূ-অভ্যন্তর থেকে বেরিয়ে ওপরে আসতে পারে। ২০০০ সালে ভূ-অভ্যন্তরের প্রায় ৩০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এই চমৎকার শহরটি সরকারিভাবে খুলে দেওয়া হয় পর্যটকদরে আকৃষ্ট করতে।
সিটি অব গড, গিজা প্ল্যাটো
বিশালকায় গিজা নামক পিরামিডটি প্রাচীন বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম আশ্চর্য হয়ে আজও ঠায় দাঁড়িয়ে। স্থাপত্যসমৃদ্ধ মার্বেল দেখে অনেকে বিশ্বাস করে গিজা প্ল্যাটোর ভূ-অভ্যন্তরে হয়তো বিশেষ এমন ধরনের কিছু রয়েছে, যা সচরাচর দেখা যায় না। হতে পারে এটি ভূ-অভ্যন্তরে বিশাল এলাকাজুড়ে বৃহদায়ন শক্তিশালী টানেল কিংবা চেম্বার। ১৯৭৮ সালে শুরু হয় একে ঘিরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। গবেষকেরা মানচিত্র তৈরি করে ভূ-অভ্যন্তরে পেয়েছেন বৃহদায়তন শক্তিশালী কমপ্লেক্সের অস্তিত্ব। পরে তারা মাটির নিচে বিশালাকৃতির স্থানটিকে রাজধানী বা প্রধান শহর আখ্যা দিয়েছেন, নাম যার ‘সিটি অব গড’। যেটি আজও রহস্যময়। ভূ-অভ্যন্তরে এই বিশাল শহরের অস্তিত্ব এখনো ঐতিহাসিকদের কাছে বিশ্বখ্যাত ঐতিহাসিক অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত। যাতে মনে হচ্ছে রহস্যময়তার এই দ্বার এত তাড়াতাড়ি খুলবে না। কোনো নিয়মের মধ্যে না পড়ায় ভূগর্ভস্থ এই শহরটির নাম ‘দ্য সিটি অব গড’।
ভিলিজকা সল্ট মাইন, পোল্যান্ড
ভিলিজকা নামক লবণের খনিটির অবস্থান পোল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে ভিলিজকা নামক শহরে। এই খনিটি ত্রয়োদশ শতাব্দীতে নির্মিত; ২০০৭ সাল পর্যন্ত খনিটিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে লবণ উৎপাদিত হয়। কারণ এটিই ছিল বিশে^র একমাত্র পুরোনো লবণের খনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানরা লবণের খনিটি গুহা হিসেবে ব্যবহার করত সমর উপকরণের ঘাঁটি হিসেবে। ভূগর্ভস্থ এ খনিটিতে রয়েছে একটি লেক, যা পরিদর্শন করতে বছরে এক মিলিয়ন পর্যটক আসে। লবণ খনিটির গভীরতা ৩২৭ মিটার আর প্রশস্ততায় যা প্রায় ২৮৭ কিলোমিটার। এখানকার শিলা লবণ বিভিন্ন স্তরে তৈরি হওয়ায় এটি মসৃণ না হয়ে অমসৃষ গ্র্যানাইট রঙের। অথচ খনির লবণ বলে এটি সাদা ও দানাদার হওয়ার কথা, যা বেশির ভাগ পর্যটকেরই প্রত্যাশা। ভূ-অভ্যন্তরীণ লবণের খনিটি ‘ক্যাথেড্রাল অব পোল্যান্ড’ নামে খ্যাত। ১৯৭৮ সালে ইউনেসকো এটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের স্বীকৃতি দেয়।
কুবার পেডি, অস্ট্রেলিয়া
দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার শহর কুবার পেডি। এটি উত্তর এডিলেড থেকে ৮৪৬ কিলোমিটার দূরে স্টুয়ার্ট হাইওয়েতে। ২০১১ সালের হিসাবমতে, শহরটির মোট লোকসংখ্যা ১ হাজার ৬৯৫। এর মধ্যে ৯৫৩ জন পুরুষ এবং ৭৪২ জন নারী। শহরটিকে আগে বলা হতো পৃথিবীর রঙিন রত্নের রাজধানী। কেননা এখানে বিশেষ ধরনের রঙিন রত্ন পাওয়া যেত। ছিল রত্ন খনিও। কুবার পেডির মাটির নিচে বাসস্থান ছিল, যাকে বলা হতো ‘ডুগোটস’। কুবার পেডি নামটি এসেছিল ওখানকার স্থানীয় শব্দ কুপ-পিটি থেকে যার অর্থ ‘সাদা মানুষের গর্ত’।
১৯১৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি এখানে বর্ণালি পাথরের সন্ধান পাওয়া যায়। যা সরবরাহ করা হতো বিশে^র নানা প্রান্তে। বর্তমানে কুবার পেডিতে অনেক পর্যটকই আসে এখানকার রত্নখচিত বর্ণালি পাথর দেখতে। এখানকার আদিবাসীদের বাস এই এলাকায় দীর্ঘদিন থেকেই। গ্রীষ্মকালে মরুভূমির মতো তাপমাত্রা বেশি হওয়ায় অনেকেরই মনে হয়েছে মাটিতে গর্ত করে গুহাতে বসবাসের। এখানকার গর্তের ভেতর গুহাতে তিনটি বেডরুম, একটি রান্নাঘর, একটি শৌচাগার আছে যেমনটা থাকে গুহার বাইরেও। ডুগোটস নামে পরিচিত এ আবাসস্থলে সব সময় একই তাপমাত্রা বিরাজ করে ফলে বাইরের তাপমাত্রার প্রভাব অনুভূত হয় কম। এখানকার গড় তাপমাত্রা ৩০-৩২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তবে শীতে বেশ ঠান্ডা পড়ে। কুবার পেডি খুব ছোট একটি শহর হলেও বিশেষত ভ্রমণক্লান্তদের জন্য ১৯৮৭ সাল থেকেই এটি ক্রমেই তাদের বিশ্রামের স্থান হিসেবে দারুণ জনপ্রিয়। এখানে ভ্রমণরত ব্যক্তিদের প্রবল আকর্ষণ বর্ণালি পাথর খনি, কবর, ভূগর্ভস্থ চার্চকে (সার্বিয়ান অর্থোডেক্স চার্চ ও ক্যাথোলিক চার্চ) ঘিরে।
ক্যাপাডোসিয়া, তুরস্ক
তুরস্কের ক্যাপাডোসিয়া নামক জায়গাটি ইতিমধ্যে বেশ বিখ্যাত হয়ে উঠেছে এর ভূ-অভ্যন্তরীণ শহর ডেরিনকুইউয়ের জন্য। ভূ-অভ্যন্তরে এটি সাতটি স্তরে নির্মিত। আবাসনব্যবস্থা প্রায় ২০ হাজার জনের। শহরটি বেশ পুরোনো। ডেরিনকুইউ শহরজুড়ে ছিল গির্জা, স্কুল আর আবাসিক নিবাস। ক্যাপাডোসিয়ার ৯৮ বর্গ কিলোমিটারজুড়ে রয়েছে অদ্ভুত সুন্দর প্রাকৃতিক ভূ-দৃশ্য। পাউডারের মতো এখানকার সাদা মাটিতে হাঁটলে মনে হবে মহাকাশযানে চাঁদের মাটিতে আছি। মাটির নিচটা যদিও অবাক করার মতো, তবে মাটির নিচে গর্তগুলো যেন ভূ-অভ্যন্তরের একটির সঙ্গে অপরটির ভালো যোগাযোগ রেখেছে। ডেরিনকুইউ ছিল দক্ষিণ ক্যাপডোসিয়াতে, যেখানে ভূ-অভ্যন্তরে ২০ হাজার মানুষ বাস করতে পারত। দীর্ঘদিন পড়ে থাকা ভূ-অভ্যন্তরস্থ শহর ক্যাপাডোসিয়া হঠাৎ করে নতুনভাবে আবিষ্কৃত হয় প্রডুইস ইন্ডাস্ট্রিজের হাত ধরে। মাটির নিচে নিরবচ্ছিন্নভাবে থাকা ১৩ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের তাপমাত্রার জন্য গুহাটি একটি আদর্শ স্থান। সেখানে হাজার হাজার টনের মতো ফলমূল ও শাকসবজি সংরক্ষিত অবস্থায় রাখা সম্ভব। এখানে আপেল, বাঁধাকপি, ফুলকপি সতেজ থাকে প্রায় চার সপ্তাহ। বাতাবিলেবু, কমলা, আঙুর, নাশপতি আর আলুর জন্য এ সময় এক মাস। গুহাটির ধারণক্ষমতা প্রায় ১০০ টন। কিন্তু এখানে কোনো বড় ধরনের জায়গা নেই, যেখানে আলু সংরক্ষণ করা যায়। তাই স্থানীয় বাসিন্দারা ভান্ডার ভাড়া করেন আলু রাখতে। যখন দাম বাড়ে তখন তা শীত কিংবা বসন্তে বিক্রি করে। ক্যাপাডোসিয়া ভ্রমণফেরত এক দল শিক্ষার্থী মনে করত গুহাটি খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ শতাব্দীতে তৈরি। তাদের ভাষ্য বলছে, শস্য, চাল, তরকারি, বার্লি ইত্যাদি এখানে মজুত করে রাখা হতো বড় বড় পাত্রে।
বার্লিংটন, ইংল্যান্ড
অনেকেই হয়তো জানেন চেইয়ানি পাহাড় ইংল্যান্ডের মাটির নিচের একটি গুপ্তস্থান। সেখানে সরকারি সুযোগ-সুবিধাদিসহ সবকিছুই রয়েছে। এমন জায়গা খুব একটা দেখা যায় না। যেখানকার একই ধরনের অবকাঠামো আছে ইংল্যান্ডের অন্যান্য শহরে। শহরটি কোড নাম বার্লিংটন। এটির সৃষ্টি ১৯৫০ সালে ব্রিটিশ সরকারের সহায়তায়। ব্রিটেনের সঙ্গে রাশিয়ার বিরোধকে কেন্দ্র করে ব্রিটেন এখানে ২ হাজার ৫০০টি বাংকার তৈরির পরিকল্পনা করেছিল। যেগুলো পারমাণবিক বোমার আঘাত প্রতিরোধে সক্ষম। যদি ব্রিটেনে রাশিয়া পারমাণবিক বোমা ফেলে এমন চিন্তা থেকেই তারা ভূগর্ভস্থ কমপ্লেক্স তৈরিতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। তাদের ধারণা ছিল যদি ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো তৈরি করা যায়, তাহলে বোমা পড়লেও অনেকেই রক্ষা পাবে। যদি পারমাণবিক বোমা ব্রিটেনের ওপর ফেলা হতো, তাহলেও মাটির নিচে বসবাসরত ব্যক্তিরা সামান্যই বেঁচে থাকত। যারা বেঁচে থাকত তারাও হয়তো মাস খানেক বাঁচত। যদি মাটির ওপরে থাকত তাহলে অনেকেই হয় মারা যেত নতুবা পারমাণবিক বোমার তেজস্ক্রিয়ায় মরে যেত।
বার্লিংটন তৈরি করা হয়েছিল পুরোনো পাথর দিয়ে, যা সংগ্রহ করা হয়েছিল পাথরের খনি থেকে। ২৪০ একর জায়গাজুড়ে তৈরি করা এখানে প্রায় ৪০০ সরকারি কর্মকর্তার থাকার ব্যবস্থা করা যেত। তা ছাড়া অন্যান্য সুবিধার মধ্যে বালিংটনে রয়েছে ৬০ মাইল দীর্ঘ রাস্তা। একটি রেলওয়ে স্টেশন, হাসপাতাল, ভূ-অভ্যন্তরীণ লেক, পানি বিশুদ্ধকরণ সুবিধাদি ও পানশালা। এখানে ছিল বিবিসি স্টুডিও যেখান থেকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দিতে পারতেন যতক্ষণ পর্যন্ত চান। এটা বেশ মজার যে মাটির নিচে বক্তার মঞ্চ; তাতে উনি বক্তব্য দিচ্ছেন স্বাচ্ছন্দ্যে।
স্থপতি মেইকের ডিজাইনকৃত ভূ-অভ্যন্তরস্থ আবাস
স্থপতি মেইক ইংল্যান্ডের ফুটবল তারকা গেরি নেভেলির জন্য এমনই কৃত্রিম এক বাড়ির ডিজাইন করেছেন, যেটায় ভূ-অভ্যন্তরে শব্দের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। এমন অদ্ভুত ধরনের অবকাঠামো তৈরিতে তিনি একসটিকেল এবং পুরকৌশলবিদ্যাকে সমন্বয় করে একটা নতুন দিগন্তের অদ্বিতীয় পথ তৈরি করেছেন। যেখানে বিদ্যুতের ব্যয় হয় কম। যেটি পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত। ভবনটি নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে স্থানীয় নির্মাণসামগ্রী। যেখানে ভূ-অভ্যন্তরীণ তাপকে কাজে লাগিয়ে হিট পামের মাধ্যমে ফটোভল্টিক প্যানেল ও উইন্ড টারবাইন দ্বারা রিনিউবল বা নরায়নযোগ্য শক্তিকে কাজে লাগানো হয়েছে। বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছে পাহাড়ের ঢালে। যাতে মনে হয় বাড়িটির চারদিক ঘিরে আছে পাহাড়ঘেরা মায়াবী প্রকৃতি। নকশাটি করা হয়েছিল এমনভাবে যেন প্রতিটি ঘরে ফুলের বদলে ফুলের পাপড়ি সজ্জিত থাকে। রান্নাঘরের চারদিক সুসজ্জিত। বাড়িটির ল্যান্ডস্কেপ এমন, যাতে রাতে যখন বাতি জ্বলে ওঠে, তখন মনে হয় ফুলের উজ্জ্বল শোভা বিরাজ করছে, যা দেখলে সহজেই অভিভূত হওয়া যায়।
ডিম্বাকৃতির ভূ-অভ্যন্তরীণ বাড়ি
এই বাড়িটিরও অবস্থান পাহাড়ে। কিন্তু ডিজাইন কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। এই ভূ-অভ্যন্তরীণ বাড়িটি তৈরি করেছেন নেদারল্যান্ডের একজন ও সুইজারল্যান্ডের স্থপতি ক্রিস্টান মুলার যৌথভাবে। বাড়িটি আবিষ্কার ছিল সত্যিই কঠিন, কেননা ওখানে অনেক বাড়ি ছিল। তবে বাড়িটি খুব সহজেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করত। বাড়িটি মূলত পাহাড়র ওপর পাথরের তৈরি। এটার প্রবেশপথ দুই দিকে। একটি ছিল প্রধান প্রবেশদ্বার অপরটি বের হওয়ার পথ। দ্বিতীয় প্রবেশদ্বারটি খামারবাড়িতে, যেখানে যে কাউকে সহজেই ভূ-অভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়া যেত। চারদিকে খোলা থাকার জন্য ছিল অনেক জানালা। যেখানে থেকে পর্যাপ্ত আলো আসত ঘরের ভেতর। যদিও এটা ভূ-অভ্যন্তরে ছিল তথাপি যথেষ্ট পরিমাণ সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারত। এই পাথরের বাড়িটির একটা মজার ব্যাপার আছে। যে কেউ কারও অনুমতি ছাড়া খুব সহজেই পাহাড়ের অভ্যন্তরে পাথরের তৈরি এই বাড়িতে প্রবেশ করতে পারত। সত্যিই এটি আশ্চর্য হওয়ার মতো এক আবিষ্কার।
পরিবেশবান্ধব গ্রাম, পশ্চিম ওয়েলস
পশ্চিম ওয়েলসের প্রেসিলি পর্বতের কাছের স্থানগুলো সবই বাড়ি। বাড়িগুলো সবই পরিবেশবান্ধব। কারণ, বেশির ভাগই কুঁড়েঘর, যা কাদামাটির তৈরি। তৈরি করা হয়েছে পাহাড়ের কোলঘেঁষে। বাড়িগুলো কৌতূহলোদ্দীপক, মুগ্ধ জাগানিয়া। পরিবেশবান্ধব এ গ্রামের বাসিন্দারা নিজেরাই বিদ্যুৎ উৎপাদন করে নিজেদের ফসল নিজেরাই ফলায়। গ্রামটি আবিষ্কার হয় ১৯৯৮ সালে। গাছগাছালি চারদিক ঘিরে রেখেছে গ্রামটিকে।
বিশ্বের প্রথম হোবিট মোটেল, উডলীন পার্ক, নিউজিল্যান্ড
যখন কেউ ভূ-অভ্যন্তরস্থ বাড়ির কথা ভাববে, তখন এটি কেমন তা ভাবতেই পারবে না যদি না সে হোবিট গ্রামটি না দেখে থাকে। মাটির নিচে কীভাবে মানুষ বাস করছে যদি কেউ দেখে তবে তারও ইচ্ছে হবে সেখানে থাকার। এই হোবিট মোটেলের যারা ভক্ত, তারা চেষ্টা করে ছোট্টবাসাকে কীভাবে আরও তিন গুণ বড় করা যায়। বিশেষ করে পাহাড়ঘেঁষা অট্টালিকাকে। অনেকে এটাকে উন্নত করছে মনে রাখার মতো অবকাঠামো তৈরি করে। যেহেতু পাহাড়ঘেঁষে মাটির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা অবকাঠামো আগ থেকেই ছিল। তাই এটাকে আরও সমৃদ্ধ করা হয়েছে। নিউজিল্যান্ডের উত্তরের দ্বীপ এই উডলীন পার্ক। এটাই পৃথিবীর প্রথম হোবিট মোটেল। এটা তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে পলিসটিরিন ব্লক, যার ফলে প্রতিটি ঘর ঠান্ডা থাকে গ্রীষ্মকালে। এই প্রকল্পের জন্য এটাই ছিল সঠিক ইনসুলেশন পদ্ধতি। প্রতিটি ঘরই অবাক করার মতো। যাতে রয়েছে সম্পূর্ণ উন্নতমানের গুণাগুণসম্পন্ন আসবাবপত্র। প্রতিটি অবকাঠামোতে রয়েছে রান্নাঘর, বাথরুম এবং প্রতিটি ইউনিটে মোট ছযজন থাকার ব্যবস্থা। অতিথিদের জন্য রয়েছে একটি পানশালা ও রেস্তোরাঁ।
মিসোরির গুহাবাড়ি
বেশির ভাগ ভূ-অভ্যন্তরে বাড়ি অথবা অবকাঠামো তৈরি হয় পাহাড়ি এলাকায়। এমনটা করার কারণ বেশির ভাগ প্রস্তুতকারক ‘লর্ড অবরিং’ ছবির মডেল অনুসরণ করে। যেমন কোনো স্থানের গুহা বা গর্ত থাকলে সেখানে এমন বাসস্থান তৈরি করা খুবই যুক্তিসংগত। পাহাড়ি এলাকায় নির্মিত সুন্দর বাড়িগুলো পাওয়া যাবে আমেরিকার মিসোরির ফেসটাসে। এর অভ্যন্তরীণ স্থান দেখতে অত্যাধুনিক ও অদ্বিতীয় স্টাইলের। যেমন- স্যান্ড স্টোনের মসৃণ দেয়াল ব্যবহারের ফলে খুব সহজেই সৌন্দর্যবর্ধন বাড়ানো যায়। এটা শুধু এর অবস্থানের জন্যই সুন্দর নয়, বাড়িটিতে আরও অনেক কিছুই আছে, যা সচরাচর দেখা যায় না। এখানে বৈদ্যুতিক শক্তির ব্যবহার করা হয় মাটির নিচের তাপকে বা জিয়োথার্মাল হিটকে কাজে লাগিয়ে। ডিজাইন এমন স্মার্ট, যেখানে এয়ারকন্ডিশনিংয়ের প্রয়োজন পড়ে না। এই গুহাটিতে তিনটি ঘর এবং চেম্বার আছে, যার দেয়ালগুলো অমসৃণ। এ ধরনের বাড়িতে যেকোনো অতিথি এলে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। কেননা তার মনে হবে সে কোনো জাদুঘরে বেড়াতে এসেছে।
পিটার ভেটজের আদিবাড়ি
সুইজারল্যান্ডের ডায়েটিকের ভূ-অভ্যন্তরের অস্বাভাবিক অবকাঠামো এটি। এটা পরিচয় করিয়ে দেয় নতুন পরিবেশবান্ধব উন্নত স্থাপত্যকর্মের সঙ্গে। স্থানটির পরিচিতি আর্থ হাউস এস্টেট লেটেন স্ট্রাসি নামে। এটির ডিজাইনার স্থপতি পিটার ভেটজ। এর নয়টি ঘরের মধ্যে তিনটিই বেডরুম। ঘরগুলো আকারে অনেক বড় এবং বেশির ভাগই গ্লাসে মোড়ানো। ঢুকলে মনে হবে এখান থেকে বের হওয়ার পথ নেই। পাহাড়ি এলাকায় এমনভাবে নির্মিত হয়েছে যেন মনে হবে ছোট একটি কৃত্রিম লেক। প্রতিটি ঘর মাটির তৈরি, যা তাপ ও ঠান্ডানিরোধক হিসেবে কাজ করে। প্রকৃতির বৃষ্টি ও বাতাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রয়েছে বিশেষ সুরক্ষা। অবকাঠামোর বাহ্যিক মাপই সুবিধা করে দেয় বাড়ির ভালো ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনে।
ওয়েলস কোস্টের মেলাটর হাউস
বেশির ভাগ ভূ-অভ্যন্তরের বাড়ি তৈরি হয় পাহাড়ের পাদদেশে। মেলাটরের বাড়িটির অবস্থান ওয়েলস কোস্টে। এটা সহজে পাওয়া যাবে না যদি না কেউ সঠিক অবস্থান না জানে। কারণ, বাড়িটি এখন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে মাটির নিচে। বাড়িটি ছিল একটি প্রতীক, যা নির্দেশ করত আগামীর বাড়ি কেমন হবে। এটা তৈরি হয়েছিল মানুষ্য তৈরি টিলায়। আর অবস্থান পাহাড়ের চূড়ায়। এর ডিজাইন সৌন্দর্য বাড়িয়েছে ওয়েলসের সমুদ্র উপকূল। পরিবেশবান্ধব স্থানে এটি ছিল সত্যিকার অর্থে সঠিক ডিজাইন। বাড়িটি প্রায় বেশির ভাগই ভূ-অভ্যন্তরে পরোক্ষভাবে বৈদ্যুতিক শক্তি নিয়ন্ত্রিত। যে কারণে সামনের দিকের বেশির ভাগ স্থান প্রশস্ত রাখা হয়েছে উন্মুক্ত পরিসরের জন্য। বাড়িটির দুই ধারে বাতাস চলাচলের জন্য রয়েছে দুইটি প্রবেশপথ। মেলাটর বাড়িটি প্রায়ই হারিয়ে যায় অবারিত প্রাকৃতিক ভূ-দৃশ্যে।
সাইক্লেডিক দ্বীপের এলোনি হাউস
বেশির ভাগ পাহাড়ি এলাকায় বাড়ি তৈরি হয় স্থানীয় নির্মাণ উপকরণে। এলোনি হাউসটি ডিজাইন করা হয়েছে ঠিক এ ধারায়। যদিও এটির অবস্থান কিছুটা দূরে সাইক্লেডিক দ্বীপে। বাড়িটির প্রাকৃতিক ভূ-দৃশ্য তৈরি হয়েছিল স্থানীয় মাটি দিয়ে। ডেকা আর্কিটেকচারের ডিজাইনারা এখানে সচরাচর যেসব প্রকল্প নিয়েছিল, সেগুলোর আদলেই এটি তৈরি। তারা বাড়ির নির্মাণে যে ধরনের সামগ্রী ব্যবহার করেছে, সেগুলো পরিবেশে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর, অপর দিকে ভালো তাপনিরোধক ইনসুলেশন হিসেবেও কাজ করে। ২৪০ বর্গমিটারজুড়ে বিস্তৃত বাড়িটি এক তলাবিশিষ্ট অবকাঠামোর। এর দেয়াল এমনভাবে নির্মিত যাতে তাপমাত্রা কমবেশি হলেও নিরাপদে থাকা যায়। ছাদ ছিল সবুজে আবৃত, যা সরাসরি তাপনিরোধক হিসেবে কাজ করে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৯তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৬।