আপনার পরিবার যদি আমার মতো হয়, তবে সম্ভবত রান্নাঘরে এক কাপ গরম চা কিংবা কফি দিয়েই আপনার স্নিগ্ধ সকালকে কিক স্টার্ট করেন। অথবা ভাবুন তো একটি উষ্ণ ছুটির দিনের কথা, যেদিন মিলিত হয় পরিবারের সবাই, আর দিনের শুরুটাই হয় একটি রিফ্রেশিং ব্রেকফাস্ট দিয়ে। সারা দিনে আরও কত রসনাবিলাসের আয়োজন থাকে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্ত রান্নাঘরটি যদি মনের মতো না হয় তাহলে বিড়ম্বনার শেষ নেই। অনেক সময় রান্নাঘর বড় হওয়া সত্ত্বে ও কেন জানি যথেষ্ট বড় মনে হয় না। এমন আরও অনেক কিছুই রয়েছে, যা ছোটখাটো ইলুশন তৈরি করে, যা বড় জায়গাকে ছোট আর ছোট জায়গাকে বড় করে তোলে। আর তাই আপনার রান্নাঘরটি যেমনই হোক না কেন, কিছুটা পরিবর্তন এনে সাজিয়ে ফেলুন মনের মাধুরী মিশিয়ে।
আলো
রান্নাঘরে আলোর প্রয়োজনীয়তা বলে শেষ করার নয়। রোদ বা প্রচুর আর্টিফিশিয়াল (কৃত্রিম) আলো থাকলে যেকোনো রুমকেই বড় দেখায়। সঙ্গে যদি সাদা বা উজ্জ্বল রং করা হয়, তবে সেখানে আলোরা খেলে বেড়াবে আর কিচেনটিকে দেখাবে আরও বড়। জানেন কি সিরামিক টাইলস আর স্টেইনলেস স্টিলের মতো প্রতিফলিত পৃষ্ঠগুলো তীব্রভাবে বাড়ায় প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম আলোকে, যার ফলে রান্নাঘরটি আরও বড় বলে মনে হয়?
মেঝেতে জাদু
কিছু প্যাটার্ন মেঝেতে ভিজ্যুয়াল ক্লাস্টার তৈরি করে, যা একটি স্থানকে কিছুটা সংকীর্ণ বলে মনে হয়। ঠিক সেভাবেই কিছু প্যাটার্নের রয়েছে বিপরীত প্রভাব। এই যেমন মেঝের টাইলসগুলোকে যদি কিচেনের সমান্তরাল না করে কৌণিকভাবে বসানো যায়, তবে প্যাটার্নটি ঘরের এক পাশ থেকে অন্য দিকে দেখার জন্য চোখটিকে আরও দীর্ঘ পথ দেখায়, তাই ঘরটিকে আসলের চেয়ে আরও বিস্তৃত দেখায়। লো-কন্ট্রাস্ট রঙের সঙ্গে এই কৌশলের মিল হলে তো কথাই নেই। চেষ্টা করেই দেখুন না কেমন দাঁড়ায় আপনার রান্নাঘরটি। রুমের সঙ্গে সমান্তরাল স্ট্রাইপের ম্যাট বা কার্পেট ব্যবহার করবেন না, ভার্টিক্যাল স্ট্রাইপের ধাঁধায় রুমটি হবে দীর্ঘ।
সাদার ধাঁধা
রান্নাঘরে দৈনিক যে যুদ্ধ চলে, সাদা রংকে বেমানানই মনে হতে পারে। তবে, একটি রান্নাঘর সাদা পেইন্টিংয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ, নমনীয় রঙের ছোঁয়া ও টেক্সচার ঘরে আনে ভিন্নতা। যখন সাদার প্রবাহ ফ্লোর, কেবিনেট এবং দেয়ালের সিলিং ছুঁয়ে যায়, তখন ঘরটিকে একটি সীমাহীন প্রবাহ বলেই মনে হয়। কোনো সীমারেখা নির্ধারণ করা যায় না বিধায় ঘরটি হয়ে ওঠে আরও বড়।
ছাদ অবধি কেবিনেট
রান্নাঘরটি ছোট হলে, ঘরের উপযুক্ত আসবাব এবং অ্যাক্সেসরিজ নির্বাচন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রান্নাঘরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত আসবাব না রাখাই ভালো। কোনো আসবাব যখন নেই, তখন রান্নার এত সামগ্রী যাবে কোথায়? সে বুদ্ধিও আছে। সিলিং পর্যন্ত কেবিনেট ইনস্টল করুন। কম প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো ওপরের দিকে রাখুন। আর নিচে রাখুন রোজকার ব্যবহার্য জিনিসগুলো। ক্যাবিনেটস ডিজাইন করুন হরাইজন্টাল স্ট্রাইপ বা হরাইজন্টাল প্যাটার্নের গ্লাস দিয়ে।
হালকা রাখুন রান্নাঘর
রান্নাঘরটিকে কিছুদিন পরপরই হালকা করে ফেলুন অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো ফেলে দিয়ে। শত হোক অল্প কিছু বোতল/প্যাকেট জমিয়ে নিশ্চয়ই কেউ ধনী হয় না। যত কম সামগ্রী, ততই যেন বড় হয়ে উঠবে আপনার রান্নাঘর।
স্টোরেজ ট্রে/কিচেন অ্যাক্সেসরিস
রান্নাঘরে যদি রান্নার সামগ্রীগুলো এলোমেলো হয়ে থাকে তবে শত চেষ্টাই যেন বৃথা। অনেকের ধারণা, রান্নাঘরে এত এত কেবিনেট বানালেই বুঝি সব সমস্যার সমাধান মিলবে। বিষয়টা কিন্তু এমন নয়। কেবিনেটগুলো সাজিয়ে নিন স্টোরেজ ট্রে/আর অ্যাক্সেসরিজ দিয়ে। দেখবেন রান্নার যাবতীয় সব কিছুই ঢুকে যাবে এই কেবিনেটের ভেতরেই।
কেবিনেটের দরজা বদলে নিন গ্লাসে
শো কেইসে বাহারি জিনিসের পসরা দেখতে কার না ভালো লাগে! কিচেনে প্রবেশ করেই চোখ যদি সে দিকেই যায় তবে তো কথাই নেই। ক্যাবিনেটসের দরজাগুলো বদলে নিন গ্লাস দিয়ে। গ্লাসের দরজায় আপনার ঘরটিকে দেখাবে আরও বড়। আর কিচেনের কোথায় কী রাখছেন তা কষ্ট করে মনে রাখার ঝামেলাও আর রইলো না।
দরজার ওপরটি কেন থাকবে ফাঁকা
রান্নাঘরের দরজার ওপরেও শেলফ করে নিতে পারেন। সিলিং অবধি ছোট ছোট সেলফ আপনার চোখকে দরজা থেকে সিলিং অবধি নিয়ে যাবে। আর আপনার কিচেনটিকে মনে হবে অনেক দীর্ঘ।
দেয়াল যদি না থাকে
আপনার কিচেন আর ডাইনিংয়ের মাঝে যদি দেয়াল না থাকে তবে কেমন হয় বিষয়টা। পশ্চিমের দেশগুলোতে এই ট্রেন্ড বেশ পপুলার। রান্নাঘরটি পরিপাটি থাকলে আপনার ঘরটিকেও সাজিয়ে নিতে পারেন এমনি করে। রান্নাঘরের ছোট ভাবটি আর থাকবে না।
পেগ বোর্ড
এই বিষয়টির চল এই দেশে তেমন নেই। একটি কাঠের টুকরোতে অনেক ছিদ্র করা হয়, সেখানে রিমুভেবল হুক বা কাঠি থাকে। সেখানে আপনি রান্নাঘরের সব সামগ্রী থেকে শুরু করে শোপিসও রাখতে পারবেন। এলোমেলো রান্নাঘরটি হয়ে উঠবে পরিপাটি।
মডিউলার কিচেন
অথবা আপনার কিচেনে নিয়ে আসতে পারেন আলট্রা মডার্ন মডিউলার কিচেন কনসেপ্ট। মডিউলার কিচেন তৈরি করা খুব কঠিন কাজ নয়। দরকার শুধু সঠিক পরিকল্পনা। এতে এক দিকে যেমন ফ্ল্যাটের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবে, অন্য দিকে আপনার কিচেনের স্পেস ম্যানেজমেন্টও সহায়ক হবে।
মডিউলার কিচেনে যে কাজগুলো অবশ্যই করতে হয়-
- মডিউলার কিচেনটা হতে হবে ভালো কোম্পানির। কুক টপে গ্র্যানাইট বসান। গ্র্যানাইট গাঢ় রঙের কিনুন।
- দেয়ালের রং হালকা রাখুন। রংটা অবশ্যই নির্ভর করবে রান্নাঘরের অন্য সরঞ্জামের ওপর।
- রান্নাঘরে চিমনি থাকলেও ভেন্টিলেশন থাকা আবশ্যক। আর যদি চিমনি না থাকে সেক্ষেত্রে একটা পাখা লাগিয়ে নিন।
- সপ্তাহে একবার বা পনেরো দিনে একবার ভেজা কাপড় দিয়ে রান্নাঘর মুছবেন। তবে চিমনি আর গ্যাস যেন নিয়মিত পরিষ্কার হয়।
- প্রয়োজন হলে বছরে একবার কোম্পানির লোক দিয়ে সার্ভিসিং করান।
- রান্নাঘরের ড্রেনেজ সিস্টেমটা ঠিক রাখুন।
- কিচেনে জানালা থাকলে ফেব্রিকের পর্দা না দিয়ে রোলার ব্লাইন্ডস দিতে পারেন।
- মনে রাখবেন কাজ করতে গিয়ে রান্নাঘর কিছুটা ভিজে যায়। তাই মেঝেতে অবশ্যই অ্যান্টিস্কিড ভিট্রিফায়েড টাইলস লাগিয়ে ফেলুন। প্রয়োজন হলে দেয়ালে সিরামিক টাইলস অথবা ডেকোরেটিভ ওয়ালও ব্যবহার করতে পারেন।
এতক্ষণ তো আমরা জানলাম রাঁধুনির রান্নাঘরের সাজ কেমন হওয়া উচিত। এখন থাকবে ছোট কিছু টিপস, যেগুলো আপনার হেঁশেলে নিয়ে আসবে চোখে পড়ার মতো কিছু পরিবর্তন-
- প্রতিদিনই নিয়ম করে রান্না শেষে চুলার আশপাশ পরিষ্কার করুন।
- রান্নাঘরের কাবার্ড, তাক, কেবিনেটের অবশ্যই পাল্লা রাখবেন।
- রান্নাঘরের জিনিসপত্র যেন চুলার উচ্চতার থেকে নিচু জায়গায় রাখা হয়। কারণ, রান্নার তেলযুক্ত ধোঁয়া ওপরের দিকে ওঠে।
- রান্নাঘরে যদি ওভেন, বেøন্ডার, ফ্রিজ থাকে, তবে প্রতিদিনই এসব যন্ত্রের বাইরের অংশ পরিষ্কার করা উচিত। তা না হলে প্রতিদিনের রান্না থেকে উৎপন্ন ধোঁয়াযুক্ত বাষ্প তেল চিটচিটে আঠালো ভাবটা স্থায়ী হয়ে যাবে। পরে এগুলো পরিষ্কার করা খুব কষ্টসাধ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
- ফ্রিজ, ওভেন বাইরে রাখা ভালো। যেগুলো রান্নাঘরে না রাখলেই নয়, সেগুলো কেবিনেটের ভেতরে রাখতে হবে।
- আর সবশেষে যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেটা হলো রান্নাঘরে কিচেন চিমনি, হুড, এগজস্ট ফ্যান, ভেন্টিলেটর থাকা। এতে রান্নার সময় উৎপন্ন হওয়া ধোঁয়া, তেল, বাষ্প বাইরে বের হয়ে যাবে। রান্নাঘর তেল চিটচিটে হবে কম।
আপনার রান্নাঘরটিতে নাটকীয় পরিবর্তন অচাঁদকে হাতে পাওয়ার মতো বিষয় নয়। শুধু দরকার একটুখানি সদিচ্ছা! মনে রাখবেন রান্নাঘর যেন অবশ্যই আপনার রিল্যাক্সেশনের জায়গা হয়ে ওঠে।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২২তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০২০