• Home
  • স্থাপত্য
  • পরিবেশ, মানুষ আর নান্দনিকতার অপূর্ব মহাকাব্যের এক শিল্পকারখানা
Image

পরিবেশ, মানুষ আর নান্দনিকতার অপূর্ব মহাকাব্যের এক শিল্পকারখানা

ধোঁয়া ওঠা চিমনী আর চার দেয়ালের একঘেয়ে কংক্রিটের বন্দিদশা—শিল্পকারখানা বললেই তো এমন এক প্রাণহীন ছবি চোখে ভাসে।

কিন্তু সেই একগুঁয়েমি ভেঙ্গে ভিয়েতনামের কোয়াং মিনহ শিল্পাঞ্চলে দাঁড়িয়ে এক রূপকথার নতুন অধ্যায় লিখলো ‘হুই হোয়াং লক ফ্যাক্টরি’। বিশ্বখ্যাত স্থাপত্যপ্রতিষ্ঠান বাউমশ্লাগার এবার্লে আর্কিটেকটেন (Baumschlager Eberle Architekten)-এর নকশায় নির্মিত এই কারখানাটি শুধু ভারি যন্ত্রপাতি ঘোরানোর জায়গা নয়; এটি পরিবেশ, মানুষ আর নান্দনিকতার এক অপূর্ব মহাকাব্য!

প্রতিষ্ঠানটির চার দশকের সাফল্যকে স্রেফ স্মারক দিয়ে নয়, তুলে ধরা হয়েছে এই সুবিশাল স্থাপত্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এটি শুধুই উৎপাদনের কারখানা নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে হাত মিলিয়ে কীভাবে টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা যায়—তার এক অনন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

চার দশকের ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি ভবনটি জলবায়ু-সহনশীল স্থাপত্যেরও একটি ভালো নমুনা। ছবি: আর্কডেইলি
শিল্প কমপ্লেক্সের পরিকল্পনা ও প্রেক্ষাপট

হুই হোয়াং লক ফ্যাক্টরি ভিয়েতনামের অন্যতম প্রধান তালা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। হ্যানয় থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে, তিন হেক্টর জমির কোয়াং মিনহ শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত এই কারখানা কমপ্লেক্সের নির্মিত আয়তন ৩০,০০০ বর্গমিটার। এখানে রয়েছে তিনটি ভবন, দুটিতে জার্মান প্রযুক্তি ও একটিতে ইতালীয় প্রযুক্তিতে উৎপাদন চলে। তৃতীয় ভবনটি সামনের প্রশাসনিক ভবনের সঙ্গে যুক্ত, যা পুরো কমপ্লেক্সকে একটি সমন্বিত রূপ দিয়েছে।

এখানে রয়েছে তিনটি ভবন, দুটিতে জার্মান প্রযুক্তি ও একটিতে ইতালীয় প্রযুক্তিতে উৎপাদন চলে। ছবি: আর্কডেইলি
উদ্ভাবন ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের প্রতীক

তৃতীয় কারখানাটির মূল লক্ষ্য ছিল স্থাপত্যের মাধ্যমে হুই হোয়াং-এর ৪০ বছরের যাত্রাকে তুলে ধরা। শুরু থেকেই ভবনটি LEED Gold Construction মান অর্জনের লক্ষ্যে গড়া হয়, পরে উৎপাদনেও LEED Gold Operation অর্জনের চেষ্টা করা হয়। ভবনের মূল কাঠামো ও বাইরের আবরণ (Core and Shell) কাঠামো ভেতরে বড় ও নমনীয় খোলা জায়গা তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে উৎপাদনের চাহিদা বদলালেও সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে।

ভেতরে বড়, নমনীয় খোলা জায়গা রেখেছে, যা ভবিষ্যতের চাহিদার সঙ্গে সহজে মানিয়ে নেবে। ছবি: আর্কডেইলি
জলবায়ুর প্রতিক্রিয়ায় ফ্যাসাড নকশা

হ্যানয়ের আর্দ্র-উষ্ণ জলবায়ু- গরম গ্রীষ্ম, ভারী বৃষ্টি ও শুষ্ক শীত- এই নকশায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। তাই ভবনের বাইরের দেয়ালে কংক্রিটের ল্যাম ব্যবহার করা হয়েছে, যার ঘনত্ব ও কোণ দিক অনুযায়ী ভিন্ন। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বে বেশি খোলা রাখা হয়েছে আলো-বাতাসের জন্য, উত্তরে ঘন ও বেশি কোণে রাখা হয়েছে শীতের ঠান্ডা আটকাতে, আর পশ্চিমে সবচেয়ে ঘন ও তীক্ষ্ণ কোণে রাখা হয়েছে রোদের তাপ ঠেকাতে। এই ব্যবস্থা ভবনকে ছায়া দেয়, বৃষ্টি থেকে রক্ষা করে এবং বাতাস চলাচলও নিশ্চিত করে।

প্রকল্পের এক্সোনোমেট্রিক ভিউ। ছবি: আর্কডেইলি
উন্মুক্ত ক্যাম্পাসের ধারণা

প্রকল্পটি সাধারণ কারখানার বদলে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ ধারণায় গড়া হয়েছে। যেখানে জনপরিসরকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক ভবনে প্রদর্শনী এলাকা, প্রশিক্ষণকক্ষ ও অফিস খোলামেলাভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে কর্মী, অতিথি ও দর্শনার্থীরা সহজে চলাচল ও যোগাযোগ করতে পারেন। এই স্থানগুলো শুধু উৎপাদনের জন্য নয়, জ্ঞান বিনিময় ও সামাজিক সম্পৃক্ততার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রকল্প প্রমাণ করে, টেকসই শিল্পভবনও একই সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপত্যে পরিণত হতে পারে। ছবি: আর্কডেইলি

হুই হোয়াং লক ফ্যাক্টরি শিল্পস্থাপত্যকে নতুনভাবে ভাবার সফল উদাহরণ। উৎপাদন দক্ষতার পাশাপাশি পরিবেশগত দায়বদ্ধতা, জলবায়ুর সদ্ব্যবহার ও মানুষের জন্য উন্মুক্ত পরিসর তৈরি করে বাউমশ্লাগার এবার্লে আর্কিটেকটেন এমন এক শিল্প কমপ্লেক্স গড়েছে, যা কার্যকারিতা ও নান্দনিকতার ভারসাম্য রেখে ভবিষ্যতমুখী স্থাপত্যচিন্তার প্রতিফলন ঘটায়। এই প্রকল্প প্রমাণ করে, টেকসই শিল্পভবনও একই সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপত্যে পরিণত হতে পারে।

ভিয়েতনামের কোয়াং মিনহ শিল্পাঞ্চলে ‘হুই হোয়াং লক ফ্যাক্টরি’-এর এই আধুনিক পরিবেশবান্ধব ভবনটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় ২০২৪ সালে।

তথ্যসূত্র

আর্কডেইলি

Related Posts

ZHA বুনছে আজারবাইজানের পাইন বনে ‘বাকু এক্সপো সিটি’

আজারবাইজানের রাজধানী বাকুকে বলা হয় “বাতাসের শহর”। এমন এক শহর, যেখানে বছরজুড়ে ক্যাস্পিয়ান সাগর ও ইরানি মালভূমি থেকে…

ডিজিটাল যাযাবরদের যুগে শহরের নতুন মালিক কারা?

সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে “ডিজিটাল নোম্যাড” বা ঘরে বসে কাজ করা কর্মীর সংখ্যা বাড়ায় শহরের স্থাপত্যও বদলে যাচ্ছে। লিসবন, মেক্সিকো…

বাউহাউস বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছের ডালই এখন অপোজিট অফিসের নতুন ঠিকানা 

স্থাপত্য অফিস বললেই সাধারণত মনে আসে কাচঘেরা বড় ভবন, খোলা ডেস্ক আর শহরের চড়া ভাড়া। জার্মানির মিউনিখভিত্তিক স্থাপত্য…

স্থাপত্যের মৃত্যুর পর কী হয়?

স্থাপত্যের জীবন সাধারণত ব্যবহারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। একটি ভবন নির্মিত হয় মানুষের বসবাস, কাজ, বিনোদন, বাণিজ্য কিংবা…