১৬৪ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সিঙ্গাপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেন বা উদ্ভিদ উদ্যান। সিঙ্গাপুরের ‘শপিং-ডিস্ট্রিক্ট’ বা কেনাকাটার কেন্দ্রীয় এলাকা অর্চার্ড রোডে এই উদ্যানের অবস্থান। ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের আওতাধীন পৃথিবীর তিনটি মাত্র উদ্যানের অন্যতম এই উদ্যানটি। এ ছাড়া এটি পৃথিবীর একমাত্র ট্রপিক্যাল বা গ্রীষ্মমÐলীয় উদ্যান। ট্রি অ্যাডভাইজার ট্রাভেলার্স চয়েস অ্যাওয়ার্ড ২০১৩ সালে এই উদ্যানকে এশিয়ার অন্যতম দর্শনীয় স্থান বলে ঘোষণা করে। ২০১২ সালে গার্ডেন ট্যুরিজম অ্যাওয়ার্ডেও ভূষিত হয় এই বিশেষ উদ্যান। ভবন বা নির্মাণকাঠামো যেমন বিশাল এলাকাজুড়ে থাকে এবং তাদের চারপাশে সুদৃশ্য ল্যান্ডস্কেপের সমন্বয়ে অবস্থান করে, তেমনি করে একটি উদ্যানেও অনেক ধরনের গাছপালার সংগ্রহ থাকে, এমনভাবে সাজানো থাকে যেন ভালোভাবে ঘুরে দেখা যায়। এমন করে দেখার অনেক অভিজ্ঞতা এবং সাসটেইনেবিলিটিসংক্রান্ত বিষয়গুলো এক করে একটা সংরক্ষণের জায়গা হয়ে ওঠে উদ্ভিদ উদ্যান। ফলে উদ্যানগুলো অনেকের জন্য শেখার জায়গায় পরিণত হয়ে ওঠে।
১৮৫৯ সালে প্রথম অ্যাগ্রো হর্টিকালচারাল সোসাইটি সিঙ্গাপুরের উপক‚লে উদ্যানের কাজ শুরু করে। বিশ শতকের শুরুর দিকে এই উদ্যানে উৎপাদিত রাবার গাছের অধিক ফলন তাদের বাণিজ্য বাজারে প্রভাব ফেলে। রাবার উৎপাদনে তাদের গবেষণা থেকে উদ্ভূত পদ্ধতির প্রয়োগ ও যতেœর কারণে অর্থনৈতিকভাবে রাবারকে একটা লাভজনক উৎপাদনে তারা নিয়ে যেতে পেরেছিল। এখনো সারা বিশ্বে তাদের এই পদ্ধতির প্রয়োগের মাধ্যমে রাবার উৎপাদন করা হয়ে থাকে। রাবারের এই লাভজনক অবস্থাটি তৎকালীন অনেককে রাবার উৎপাদনে অনুপ্রাণিত করেছিল। এই উৎপাদন এতটাই বেশি ছিল যে ১৯২০ সালের দিকে মালায়ান পেনিসুয়ালা পৃথিবীর অর্ধেক লেটেক্স উৎপাদকে পরিণত হয়েছিল।
আগে হর্টিকালচারের অধীনে থাকা উদ্ভিদ উদ্যানগুলো মূলত ঔষধি গাছপালাকে কেন্দ্র করে বানানো হতো কিন্তু এখন এমন উদ্যানের চিন্তা বদলেছে। এখন বাস্তুসম্পর্ককে বেশি প্রাধান্য দিয়ে সবার মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে উদ্যানগুলোকে সাজানো হচ্ছে। তাই এখনকার উদ্যানে দর্শনার্থীদের জন্য কিছু ভবন, প্রশাসনিক ভবন এবং গ্রিন হাউসের মতো নির্মিত স্থান লক্ষণীয়। এই স্থাপনাগুলো উদ্যানের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এগুলো আছে বলেই উদ্যানের সঙ্গে জনসাধারণের একটা ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের বিনির্মাণ হয়।
সিঙ্গাপুর বে সাউথ গার্ডেন মেডিটেরিয়ান এবং ক্লাউড ফরেস্ট অঞ্চলের গাছগুলোর জন্য বিশেষভাবে নির্মিত হয়েছিল। প্রকল্পের মাঝে ভীষণ লম্বাটে আকারের গাছের জন্যও জায়গা আছে, আর আছে অভ্যন্তরীণ ঝরনাধারা এবং চিরকাল ফোঁটা ফুলের তৃণভূমি। ১৯৬০ সাল থেকে এই উদ্যানে দেখার মতো পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর সরকার যখন ক্যাম্পেইং করে যে শহরের ফাঁকা জায়গায় গাছ লাগানো কর্মসূচি গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে প্রায় ৫০ শতাংশ এলাকা সবুজ করার মধ্য দিয়ে তারা প্রথম সবুজের নগরী হিসেবে সিঙ্গাপুরকে বিশ্ব মানচিত্রে প্রকাশ করে। উদ্যানটি এখনো সেই পুরোনো আউটলাইনকে ধরে রেখেছে। সাধারণত দেখা যায় যে নির্মাণের উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বারা শহরের উদ্যানগুলো ঢেকে যায় কিন্তু এখানে সেটা ঘটেনি। কিছু ঐতিহাসিক উদ্ভিদ, বাগানের শৈলী এবং ঐতিহাসিক ছোট ছোট ভবন সব মিলিয়ে ইতিহাসের বহমানতা এই উদ্যানে সুন্দরভাবে সংরক্ষিত আছে। নিত্যনতুন পলিসি রচনার মধ্য দিয়ে এই উদ্যানটি ক্রমশ মানব ইতিহাসের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছে। যেহেতু উদ্যানটি একটি গবেষণাক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, তাই এখানে উদ্ভিদগুলোকে যথাযথভাবে গবেষণার সুবিধার্থে সাজিয়ে যতœসহকারে রাখা হয়েছে, যেটার পেছনেও গবেষণা রয়েছে। স্পেসের যে ডিজাইন, নির্মিত কাঠামো এখানে যে উদ্দেশ্যে সাজানো আছে, সেগুলো তাদের কাজ বুঝেই সেবাটা সবাইকে দিয়ে যাচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
সিঙ্গাপুরের এই জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের আওতায় আছে সংরক্ষণের জায়গা, বৃক্ষ সংরক্ষণের জায়গা এবং প্রাকৃতিক অঞ্চল, যা রেইনফরেস্ট এলাকা বলেও পরিচিত। ৪৪টি ঐতিহ্যবাহী বৃক্ষ আছে এই উদ্যানে, একই সঙ্গে কিছু ঐতিহ্যবাহী ইতিহাসের মূল্যসংবলিত নির্মিত কাঠামোও আছে। উদ্যানটি মূলত সিঙ্গাপুরের পরিকল্পনা আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে, যা সংরক্ষণ এবং উন্নয়ন কর্মগুলোকে দেখভাল করে থাকে। বৃক্ষভিত্তিক সবুজ শহর গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই উদ্ভিদ উদ্যান সিঙ্গাপুরের হৃৎপিÐ হিসেবে কাজ করছে। সবুজায়নকে কেবল সৌন্দর্যের খাতিরে নয়, বরং নগরের একটি ফাংশনাল উপাদানে পরিণত করতে পেরেছে তারা। সবুজায়নের মাধ্যমে বাফারজোন তৈরি করার বুদ্ধিটি দারুণ। নিচু উচ্চতার কম বসতিপূর্ণ এলাকা, উঁচু ইমারতের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মাঝ দিয়ে এমন সবুজায়ন একটা চমৎকার বাফারজোন হিসেবে অর্থাৎ বোঝা যায় না এমন এক পৃথক্্করণের কাজ করে, যেগুলোর মাঝে যাতায়াতের পথ, বেঞ্চ ইত্যাদির দ্বারা সবার জন্য দম নেওয়ার সুন্দর পরিবেশ করে দেওয়া হয়েছে। তবে প্রশাসনিক কাঠামো জোরদার হওয়ায় এই ব্যবস্থা যেন লোকজন মেনে চলে তা তারা নিশ্চিত করতে পেরেছে বলেই সিঙ্গাপুর আজ সফল একটি রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের সামনে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।
সিঙ্গাপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেন দীর্ঘ বছর ধরে তা তার সৌন্দর্য নিয়ে উত্তরোত্তর আরও ব্যবহারোপযোগী হয়ে উঠছে। এর পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণ, তাদের উদ্যানের মেইনটেন্যান্স ম্যানুয়াল। সেটারই একটা অংশ হিসেবে আছে সোশ্যাল মিডিয়া এবং ওয়েবসাইট। উদ্যানকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এর চেয়ে ভালো উপায় আর কিছু হতে পারে না। ঠিক এই কাজটি করেছে সিঙ্গাপুরের উদ্যানটি। তাদের ভ্যারিফাইড ফেসবুক পেজ আছে, যেখান থেকে জনসাধারণ উদ্যানের সমস্ত ইভেন্টের খোঁজখবর পাবেন, নতুন যা কিছু সংযোজন হচ্ছে সেসব খবরাখবরও পাবে। এর মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক চর্চাও বজায় থাকে। এমনকি কোন বাস, ট্রেন বা গাড়ি করে কীভাবে কোন এলাকা থেকে এলে ভালো হবে, সেট পর্যন্ত উল্লেখ করা থাকে। তাই বিদেশি অতিথিদের জন্যও বিষয়টা সহজ হয়। তা ছাড়া উদ্যানের সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটা ভালো প্রামাণ্যিকরণও এভাবে হয়ে থাকে, যেটি সংরক্ষণ পরিকল্পনার অন্যতম একটি অংশ। আশু ভবিষ্যতে বৃক্ষপ্রেমী এবং গবেষণাকারীদের জন্য এই অনলাইন সংগ্রহশালা এক অমূল্য রতœ বলেই পরিগণিত হচ্ছে এবং হবে।
২০২১ সালের ১৩ মার্চ সিঙ্গাপুর উদ্ভিদ উদ্যানের ন্যাশনাল পার্ক বোর্ড গ্যালপ এক্সটেনশন নামে একটা নতুন অংশ তুলে ধরেন। এর ফলে উদ্যানের দুটি সংরক্ষিত ভবনকে ফরেস্ট ডিসকভারি সেন্টার এবং বোটানিক্যাল আর্ট গ্যালারিতে রূপান্তরিত করা হয়। গ্যালাপো হাউস নম্বর-৫ এবং ব্যারেল হাউস দুটোই নির্মিত হয় ১৮৯৮ সালে। ব্রিটিশ স্থপতি রেজেন আলফ্রেড জন বিডোয়েল এই ভবন দুটির প্রণেতা। কেবল বৃক্ষরাশি নয় এখানে যে সামান্য ভবন আছে, সেগুলোর প্রাণের চিন্তাও এখানে সুন্দরভাবে করা হয়েছে। গ্যালপ এক্সটেনশন সংরক্ষণের এই প্রকল্পটি ২০১৬ সালে সিঙ্গাপুরের নিই স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান থেকে বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। সাম্প্রতিককালে বিশাল উদ্যান ভালো করে ঘুরে দেখতে রেলপথ, বিস্তৃত লন বা উঠোন এবং কোম অ্যাডভেঞ্চার তরুবীথি বানানো হয়েছে, যাতে করে দর্শনার্থীরা আরও ভালোভাবে জায়গাটির রস আস্বাদন করতে পারেন।
গ্রান্ট অ্যাসোসিয়েটস স্থাপত্যের ফার্ম ২০১২ সালে গার্ডেন বাই দ্য বে নামে এই উদ্যানে আলাদা একটি প্রকল্পের কাজ করেছে। এটি বাগান সম্পর্কিত বিশ্বের সব থেকে বড় প্রকল্প। ২০০৬ সালে একটি প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ল্যান্ডস্কেপবিষয়ক স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান গ্রান্ট অ্যাসোসিয়েটস এই কাজটি পায়। লেকের পাশ ধরে জায়গাটার উন্নয়নমূলক কাজের জন্য এই প্রকল্পটি স্থির করা হয়। এই বিশাল প্রকল্পের জন্য আরও অনেক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যেখানে পরিবেশ ডিজাইন, যোগাযোগ ডিজাইন, স্ট্রাকচার ডিজাইন, মিউজিয়াম এবং ভিজিটর সেন্টার ডিজাইনের বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। প্রকৃতি ও প্রযুক্তিকে সাধারণ অর্থে দুটো বিরোধী দিক মনে হলেও এই প্রকল্পে এই প্রযুক্তি নামক উপাদানটিকে প্রকৃতির সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। পুরো এলাকার প্রাণ প্রতিবেশকে প্রযুক্তির দ্বারা রক্ষণাবেক্ষণের উন্নত বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ এই উদ্যানে করা হয়েছে। গাছের প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে স্থাপনার সংমিশ্রণের দ্বারা এখানে দুটো বিশাল টাওয়ার ডিজাইন করা হয়েছে, যেগুলোর মধ্য দিয়ে মেডিটেরিয়ান আবহাওয়ার গাছগুলোকে সংরক্ষণ ও দৃশ্যায়ন করা হয়েছে। কাঠামোর মাঝে গাছের সাধারণ কাঠামোর ছোঁয়া যেমন আছে, তেমন তা হুবহু গাছের কাঠামোর নকল নয় বলেও ডিজাইনের নিজস্ব সৌন্দর্য বহাল থেকেছে। ২৫ থেকে ৫০ মিটার উচ্চতার ১৮টি সুপার ট্রি নির্মিত করা হয়েছে এই ভার্টিক্যাল গার্ডেনে মূলত অন্যান্য গাছকে এখানে সাজিয়ে একটা চমকপ্রদ ব্যাপার তৈরির প্রচেষ্টা ছিল তাদের। রাতের বেলা এই পল্লববিতান আলোকিত হয়ে আরও জ্যান্ত হয়ে ওঠে। এই উঁচু বাগানে উঁচু স্থান থেকে দেখা ও হেঁটে চলার একটা রাস্তা আছে, যা আরও সুন্দরভাবে উদ্যানকে উপভোগের একটা সুযোগ করে দেয়। সাসটেইনেবল এনার্জি এবং পানির উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে একটা বিশেষ তাপমাত্রা বজায় রেখে গাছপালা সংরক্ষিত করা হয়েছে এখানে। প্ল্যান্টস অ্যান্ড পিপল (গাছ ও মানুষ) ও প্ল্যান্টস অ্যান্ড প্ল্যানেট (গাছ ও পৃথিবী) নামে দুটো বিশেষ বনায়ন অঞ্চল আছে এখানে। দুটোকে দুই চিন্তাধারণায় ভাগ করে দুই মাত্রায় সাজানো হয়েছে, যা দর্শকদের জন্য চমৎকার এক অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করে।
উদ্ভিদ উদ্যানে তার সমস্ত উপাদানকে বৃক্ষের সংরক্ষণ ও গবেষণার জন্য নিবেদিত করা হয়ে থাকে। সেই সঙ্গে বৃক্ষের প্রজাতির ভিন্নতা সম্পর্কে জনমানুষের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়াতেই সাহায্য করে। মানুষের প্রয়োজনে প্রকৃতির অবদান এসব উদ্যানের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানসিক স্বাস্থ্য বিবেচনায় সবুজের থেরাপি এখন খুব জনপ্রিয় একটি মাধ্যম। কেননা প্রাকৃতিক পরিবেশে এলে মানুষের হৃদয় কোমল হয়ে ওঠে, পবিত্র হয়ে ওঠে। তাই শহুরে জীবনে এমন একটা দম নেওয়ার জায়গা থাকার খুব প্রয়োজন। আর সে ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের এই উদ্যান আমাদের জন্য আদর্শনীয়।
স্থপতি সুপ্রভা জুঁই
ংযঁঢ়ৎড়াধলঁর@মসধরষ.পড়স
ছবি ও তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট
প্রকাশকাল: বন্ধন ১৫৭ তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০২৩