Image

অদৃশ্য কাঁচের গোপন রহস্য

প্রিয়জনের কাছ থেকে পাওয়া উপহার, শখের শোপিস, পুরাকীর্তি, বইসহ মূল্যবান সামগ্রীকে ধুলা থেকে বাঁচাতে কাচঘেরা শোকেসের কোনো বিকল্প নেই। এতে একদিকে এগুলো দেখতে যেমন সমস্যা হয় না, অন্যদিকে থাকে সুরক্ষিত। অনেকটা ফ্রেমে বাঁধানো ছবির মতো, যা অনেকটাই জাদুঘরের কাচের বাক্সে রক্ষিত মসলিন শাড়ি, নবাব সিরাজ-উদ্দৌলার তলোয়ার, গাছের বাকলে লেখা পাণ্ডুলিপির অনুরূপ। কিন্তু সব ঠিক থাকলেও কাচ নামক বাধাটা কিন্তু থেকেই যায়। মানে কাচের দেয়াল ভেদ করেই তা দৃশ্যমান হয়। ঘটনা যা-ই ঘটুক না কেন, বস্তুটি দেখার সঙ্গে সঙ্গে নিজেরই প্রতিচ্ছবি ও আলোর প্রতিবিম্ব দেখতেই হয়। খুবই বিরক্তিকর ব্যাপার এটি!

আবার ধরুন, গয়নার দোকানে যে ধরনের চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল আলোর ব্যবহার হয়, তাতে অলংকারটি হাতে নিয়ে না দেখলে তেমন কোনো ধারণাই পাওয়া যায় না। কিন্তু সব সময় বিক্রেতা এ কাজটি সহজে করতে চান না। যতক্ষণ তিনি বুঝতে না পারেন যে আপনি এখানে অলংকার কিনতে এসেছেন অথবা পছন্দ হলে কিনতেও পারেন ততক্ষণ পর্যন্ত অলংকারটি কাচের খাঁচায় থাকে।

আমরা অবশ্য এভাবে দেখতেই অভ্যস্ত বলে এসব আর তেমন গায়ে লাগে না। কিন্তু কোনো দর্শনীয় জিনিস কাচের মধ্য দিয়ে দেখা আর সরাসরি দেখার মধ্যে যে একটা সুস্পষ্ট ব্যবধান রয়েছে তা নিয়ে মনে হয় না কারও দ্বিমত আছে। যদিও গ্যালারি বা জাদুঘরে বিভিন্ন ধরনের লাইট ব্যবহার করে বা ফ্রেমের কিংবা নিদর্শনের অবস্থান পরিবর্তন করে সমস্যা সামান্য কমিয়ে আনা যায়, কিন্তু বাসায় যে পেইন্টিং বা ছবিটি জানালার ঠিক উল্টো দিকের দেয়ালে ঝোলানো রয়েছে, তার কোনো সহজ সমাধান কিন্তু নেই।

দেখার এই ব্যবধান তৈরির মূলে যে বস্তুটি দায়ী নাম তার কাচ। কাচের স্বচ্ছতা বা আলোকভেদ্যতার জন্যই এ রকম হয়। কাচের স্বচ্ছতা বা আলোকভেদ্যতার সাধারণ মাত্রা সর্বোচ্চ ৯২ শতাংশ হতে পারে। অর্থাৎ এসব কাচ দিয়ে শতকরা ৯২ ভাগ আলো ভেদ করে চলে যায় আর আট ভাগ আলো প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে। এই ফিরে আসা আলোই দেখার ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করে।

এ সমস্যাকে মাথায় রেখে বিজ্ঞানীরা অনেক দিন থেকেই চেষ্টা করে যাচ্ছেন যে কীভাবে এই কাচের প্রতিফলন (Reflection)কমানো যায়। কাচের লেন্স আবিষ্কার হয় খ্রিষ্টের জন্মের ৩০০ বছর আগে। তারও অনেক বছর আগে আবিষ্কৃত হয় কাচ। মাত্র কয়েক বছর হলো বিজ্ঞানীরা একটি নতুন ধরনের কাচ উদ্ভাবন করেছেন, যার স্বচ্ছতা বা আলোকভেদ্যতা প্রায় ১০০ শতাংশই বলা চলে।

নেগ কো

জাপানের নিপ্পন ইলেকট্রিক গ্লাস কোম্পানি এই কাচের উদ্ভাবক। তাদের দাবি, এই কাচ দেখা যাবে না। তারা এটির নামও দিয়েছে Invisible Glass বা অদৃশ্য কাচ। তারা জানাচ্ছে, এই কাচ তৈরি করতে একধরনের বিশেষ উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, যা কাচের প্রতিফলন কমিয়ে কাচকে প্রায় অদৃশ্য করে ফেলে। ২০১১ সালে জাপানের ইয়োকোহামায় অনুষ্ঠিত ‘এফপিডি ইন্টারন্যাশনাল-২০১১’ নামক প্রদর্শনীতে প্রথম তারা এই কাচটি প্রদর্শন করে।\

কাচটির প্রতিফলন (Reflection) কমানোর জন্য তারা এক ধরনের বিকীরণরোধী (Anti Reflecting) ফিল্ম ব্যবহার করেন। কাচের দুই পাশে ৩০টি স্তরে এ ধরনের অ্যান্টি-রিফ্লেক্টিং ফিল্ম ব্যবহার করা হয়। অ্যান্টি-রিফ্লেক্টিং ফিল্মগুলোকে ন্যানো মিটার স্কেলে একটির ওপর আরেকটি খুব সূক্ষ¥ভাবে স্থাপন করা হয়। ফলে মানুষের চোখে দৃশ্যমান আলোর শতকরা ৯৯ দশমিক ৮ ভাগ আলো কাচ ভেদ করে চলে যায়। আর বাকি দশমিক দুই ভাগ আলো, যেটা রিফ্লেক্ট করে তা মানুষের মস্তিস্কে তেমন গুরুত্ববহ প্রভাব ফেলে না।

এজিসি গ্লাস এশিয়া

এই ইনভিজিবল গ্লাসের আগে যে অ্যান্টি-রিফ্লেক্টিং কাচ কেউ তৈরি করেনি তা কিন্তু নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানই করেছে কিন্তু তাদের তৈরি কাচের প্রতিফলনের পরিমাণ এতটা কমিয়ে আনতে পারেনি। সাধারণ অ্যান্টি-রিফ্লেক্টিং কাচে পাঁচ থেকে আটটি অ্যান্টি-রিফ্লেক্টিং কোটিং ব্যবহার করা হয়, আর নতুন এই গ্লাসে ব্যবহার করা হয়েছে ৩০টি এবং এর পুরুত্ব খুব সূক্ষ্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। নিপ্পন ইলেকট্রিক গ্লাস কোম্পানির দাবি, Ultra-thin manufacturing technology ও Superior film design/control technology ব্যবহার করার ফলে সহজেই এই অদৃশ্য কাচকে মাস্টার পিস হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৫তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৫

Related Posts

বিকল্প কংক্রিট: টেকসই নির্মাণের আরও এক ধাপ

বিশ্বজুড়ে নির্মাণশিল্প দ্রুত প্রসার লাভ করছে। এর সঙ্গে বাড়ছে কংক্রিটের ব্যবহারও। প্রচলিত কংক্রিট তৈরির প্রধান উপাদান সিমেন্ট উৎপাদনের…

আধুনিক নির্মাণ উপকরণ হিসেবে মাটি

মানবসভ্যতার ইতিহাসে নির্মাণশিল্পের অন্যতম মৌলিক উপাদান হলো মাটি। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ ঘরবাড়ি, দুর্গ, উপাসনালয় এবং নগর…

ByBySarwar Alam Jun 11, 2026

স্মার্ট বিল্ডিং নয় মাটির দেয়ালে হোক আরামদায়ক আবাসন

সময়ের ব্যবধানে ভবনের দেয়ালগুলো আধুনিক হয়ে উঠছে। কাদামাটি আর চুনসুরকির প্রলেপ নয় প্রযু্ক্তির ছোঁয়ায় স্মার্ট হয়ে উঠেছে আমাদের…

আগামী দিনের নির্মাণ উপকরণ (পর্ব ১)

আধুনিক সময়ের সাথে তাল মিলিয়েই চলতে হচ্ছে আমাদের। প্রতিদিন বিশ্বের বুকে গড়ে উঠছে কোন না কোন আকাশচুম্বী ভবন।…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

Water Crisis
রাগীব আলী ভবন: নকশাগত মূল্যবোধ ও সমকালীন বাস্তবতা
নিওমের স্বপ্ন প্রকল্পে বিরতি: ২০৩০ পর পর্যন্ত স্থগিত ‘দ্য লাইন’
ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ট্রায়াম্ফাল আর্চ যে কারণে ক্লাসিক্যাল স্থাপত্যের ভুল পাঠ
AN’s 2026 Best of Design Awards এ আপনার প্রকল্পটি জমা দিয়েছেন তো?
মুরগির ঘরের নকশা: মানুষ ও প্রাণীর একসঙ্গে থাকার নতুন ভাবনা
Takwa Mosq.
Concreate
Cameron