• Home
  • টপ-পোস্ট
  • কংক্রিটের আড়ালে সাও পাওলোর স্থাপত্য ও নগরজীবন
Image

কংক্রিটের আড়ালে সাও পাওলোর স্থাপত্য ও নগরজীবন

ব্রাজিলের বৃহত্তম শহর সাও পাওলোকে অনেকে শুধু একটি কংক্রিটের জঙ্গল হিসেবে চেনেন। রিও দে জেনেইরোর সৈকত বা ব্রাজিলের ঐতিহাসিক শহরগুলোর ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের মতো নয় এই শহর। এটি লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় অর্থনীতির কেন্দ্র।

প্রায় দুই কোটি মানুষের বিশাল এক মহানগর। ঊনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত সাও পাওলো ছিল একটি প্রাদেশিক শহর। কফি ব্যবসার উত্থান শহরটিকে দ্রুত শিল্পায়নের পথে নিয়ে যায় এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শ্রমিকরা এখানে আসতে শুরু করে।

এভাবেই গড়ে ওঠে আজকের দ্রুতগতির, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এই মহানগর, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে চমকপ্রদ কিছু স্থাপত্যকীর্তি।

কোপান ভবনের ঢেউ খেলানো সম্মুখভাগ দেখতে অনেকটা বাতাসে উড়তে থাকা পতাকার মতো। ছবি: সংগৃহীত

শহরের উঁচু ভবন থেকে দৃশ্য ও আধুনিকতাবাদী স্থাপত্য
সাও পাওলোর প্রকৃত বিশালতা বোঝার জন্য একে উপর থেকে দেখা দরকার। ১৯৬০-এর দশকে নির্মিত একটি আকাশচুম্বী ভবনের চূড়ায় অবস্থিত তেরাসো ইতালিয়া থেকে শহরের কেন্দ্রীয় এলাকাগুলোর বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়। রেস্তোরাঁয় না গিয়েও এখানকার পিয়ানো বারে গিয়ে একটি পানীয় অর্ডার করলেই উপর থেকে শহর দেখার সুযোগ মেলে।

এর কাছেই রয়েছে স্থপতি অস্কার নিমেয়ার নকশা করা কোপান ভবন। এর ঢেউ খেলানো সম্মুখভাগ দেখতে অনেকটা বাতাসে উড়তে থাকা একটি বিশাল পতাকার মতো। এই বিশাল কমপ্লেক্সে এক হাজারেরও বেশি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে এবং এর নিজস্ব একটি পোস্টাল কোডও আছে। ভবনের নিচের তলাগুলোতে আছে ক্যাফে, বার, রেস্তোরাঁ, একটি আইসক্রিমের দোকান। এ ছাড়াও আছে সমসাময়িক শিল্প গ্যালারি এবং মেগাফাউনা বইয়ের দোকান।

আরেকটি জনপ্রিয় পথ হলো আভেনিদা পাউলিস্তা। ছবি: সংগৃহীত

গাড়িমুক্ত রাস্তা ও সড়ক-স্থাপত্য
সপ্তাহের রোববারগুলোতে শহরের কিছু প্রধান সড়ক গাড়ির জন্য বন্ধ রেখে পথচারী ও সাইকেল আরোহীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এমনই একটি পথ হলো মিনহোকাও উড়াল সড়ক, যাকে স্থানীয়রা “বড় কেঁচো” বলে ডাকে। এটি সান্তা সেসিলিয়া ও বারা ফুন্দা এলাকার ভেতর দিয়ে গেছে, যেখানে দেখা যায় বড় আকারের দেয়ালচিত্র ও অন্যান্য স্ট্রিট আর্ট।

২০০৬ সালের একটি আইনে শহরের বেশিরভাগ ভবনের বাইরের দেয়ালে বিজ্ঞাপন সীমিত করা হয়, ফলে বড় সম্মুখভাগগুলো স্ট্রিট আর্টের জন্য খালি হয়ে যায়। পাশাপাশি সাও পাওলোর দেয়ালগুলোতে দেখা যায় “পিশাসাও” নামের এক ধরনের গ্রাফিতি, যার তীক্ষ্ণ ও রুন-সদৃশ লেখাগুলো ১৯৭০-এর দশকের নিউইয়র্কের আক্রমণাত্মক ট্যাগিংয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।

আরেকটি জনপ্রিয় পথ হলো আভেনিদা পাউলিস্তা। একসময় এই সড়কের দুই পাশে ছিল কফি ব্যবসায়ীদের প্রাসাদোসম বাড়ি। অথচ আজ একে ঘিরে আছে আধুনিকতাবাদী উঁচু ভবন ও রেডিও টাওয়ার।

আইএমএস পাউলিস্তা, যেখানে আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও একটি আর্টহাউস সিনেমা হল রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

আভেনিদা পাউলিস্তার জাদুঘর-স্থাপত্য
পাউলিস্তা সড়ক শহরের একটি প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এর এক প্রান্তে আছে আইএমএস পাউলিস্তা, যেখানে আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও একটি আর্টহাউস সিনেমা হল রয়েছে। অন্য প্রান্তে আছে ইতাউ কালচারাল, যেখানে ঘুরেফিরে নানা প্রদর্শনী হয় এবং ব্রাজিলের প্রাথমিক ইতিহাসের চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে।

ধ্রুপদী সংগীত ও নাট্য প্রদর্শনী হয় সালা সাও পাওলো-তে। ছবি: সংগৃহীত

থিয়েটার ও সাংস্কৃতিক ভবনের স্থাপত্য
ধ্রুপদী সংগীত ও নাট্য প্রদর্শনী হয় সালা সাও পাওলো, তিয়াত্রো মুনিসিপাল এবং সম্প্রতি পুনরায় খোলা তিয়াত্রো কুলতুরা আরতিস্তিকায়। এই তিনটি ভবনই শহরের কেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন।

সেসক সম্প্রদায়ভিত্তিক কেন্দ্রগুলো বিনামূল্যে বা সামান্য খরচে কনসার্ট, নৃত্য অনুষ্ঠান ও নাটক আয়োজন করে। সেসক পোম্পেইয়া গড়ে উঠেছে সাবেক এক ব্যারেল কারখানার ভেতরে, যাকে নতুনভাবে নকশা করেছেন স্থপতি লিনা বো বার্দি।

সাও পাওলোর স্ট্রিট আর্ট। ছবি: সংগৃহীত

কংক্রিটের এই বিশাল শহরের আড়ালে লুকিয়ে আছে বৈচিত্র্যময় স্থাপত্যের এক জগৎ। অস্কার নিমেয়ারের ঢেউখেলানো কোপান ভবন থেকে শুরু করে লিনা বো বার্দির নকশা করা চ ও সেসক পোম্পেইয়া, কিংবা মিনহোকাও উড়াল সড়কের স্ট্রিট আর্ট। এসব স্থাপনা শুধু নান্দনিক সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং শহরের অভিবাসনের ইতিহাস, সামাজিক পরিবর্তন ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যেরও সাক্ষী। কড়া ও রুক্ষ চেহারার আড়ালে সাও পাওলো এভাবেই তার শিল্প, সংগীত ও স্থাপত্যের প্রাণবন্ত রূপ প্রকাশ করে।

তথ্যসূত্র
মেঝহা

Related Posts

বেঙ্গাজির নতুন পরিকল্পনার রূপরেখা আঁকছে ZHA

লিবিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের ঐতিহাসিক বন্দরনগরী বেঙ্গাজি। এখানে ২০৫০ সাল সামনে রেখে তৈরি হচ্ছে এক নতুন নগর-পরিকল্পনা। জাহা হাদিদ…

ফেসবুক পোস্ট থেকে ফিরে এলো ফুটুরো হাউস

বিশ শতকের ষাটের দশকের শেষভাগে ফিনল্যান্ডের স্থপতি মাত্তি সুরোনেন যে উড়ন্ত সসারসদৃশ বাড়িটি ডিজাইন করেছিলেন, তা স্থাপত্যের ইতিহাসে…

ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচার ও কার্বন নি:সরণ

শহরের পার্ক, বাগান, প্লাজা, রাস্তার পাশের সবুজ এলাকা—এসবকে আমরা সাধারণত পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের অংশ হিসেবে দেখি। গাছপালা ও সবুজ…

আসন্ন RIBA ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজের শর্টলিস্টে রংপুরের গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি

বিশ্বের সেরা নতুন ভবনের জন্য রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস (RIBA) তাদের ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজের শর্টলিস্ট প্রকাশ করেছে। তালিকায়…