শিল্পকর্মের যেনো কোন শেষ নেই। স্থাপত্য এমনই এক শিল্প যা প্রতিদিন বলদাচ্ছে প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে। প্রকৃতিতে যেমন মুহূর্তে মুহূর্তেই পরিবর্তন আসে স্থাপত্যেও ঠিক তেমনি। ভবনের ডিজাইন এবং নির্মাণ কৌশল সময়ের সাথে সাথেই উন্নত হচ্ছে।
আধুনিক সময়ে এমন সব স্থাপনা নির্মাণ হচ্ছে যা দেখে চোখে কপালে উঠে। স্থপতিদের চিন্তার প্রসারতার বহি:প্রকাশই হলো এসব জটিল নকশা। এমন কিছু ভবনের গল্পই জানাবো।

চীনের বাকানো ইটের দেয়ালে নির্মিত পাঠাগার
চীনের এইচসিসিএইচ স্টুডিও নির্মাণ করেছে এই পাঠাগারটি। দেশটির লংইউ কাউন্টিতে অবস্থিত এই প্যাভিলিয়নটি দুটি পরস্পর যুক্ত গোলার্ধের সমন্বয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। এটি দেখতে শামুকের খোলসের মতো আকৃতির। স্থাপত্য সংস্থা এইচসিসিএইচ স্টুডিও এটিকে এমন একটি স্থান হিসেবে ডিজাইন করেছে যা দর্শনার্থীদের চারপাশ ঘুরে দেখার পাশাপাশি বই পড়তেও উৎসাহিত করে।
অর্ধবৃত্তাকার ইটের ভিত্তির উপর নির্মিত হয়েছে এই পাঠাগারটি। দুটি ইটের গোলার্ধকে ছিদ্রযুক্ত ইস্পাতের পাত এবং কংক্রিট দিয়ে তৈরি একটি পেঁচানো দেয়ালের সাথে ইটগুলোকে যুক্ত করা হয়েছে।

দ্য অ্যান্থিল, ভারত, কৌশল তাতিয়া আর্কিটেক্টস দ্বারা নির্মিত
দ্য অ্যান্থিলের ডিজাইনের ধারণা নেয়া হয়েছে উইপোকার ঢিবির গুহাময় মাটির প্রকোষ্ঠ থেকে। স্থানীয় স্টুডিও কৌশল তাতিয়া আর্কিটেক্টস ভারতের মহারাষ্ট্রে এই স্থাপনাটি নির্মাণ করে। এই বাড়ির ভেতরে ছায়া দেয়ার জন্য তিনটি বাঁকানো ইটের বারান্দা ডিজাইন করা হয়েছে।
সাবলীল আকৃতির সম্মুখভাগের ইটগুলো টেক্সচারযুক্ত নকশার সারিতে গাঁথা হয়েছে। এর মধ্যে ছিদ্রযুক্ত ইটের সারিও রয়েছে যা বায়ুচলাচলে সাহায্য করে। প্রখর রোদে আলোর-ছায়ার খেলা তৈরি করে পাঠাগারের ভেতরে।

ডব্লিউ-মিশন সদর দপ্তর
দক্ষিণ কোরিয়ার ডব্লিউ-মিশন সদর দপ্তর নির্মাণ করেন বেহেত বন্ডজিও লিন আর্কিটেক্টেন এবং বিসিএইচও আর্কিটেক্টস। সিউলে অবস্থিত টেক্সটাইল প্রস্তুতকারক ডব্লিউ-মিশনের সদর দপ্তরে, স্থাপত্য সংস্থা বেহেত বন্ডজিও লিন আর্কিটেক্টেন এবং বিসিএইচও আর্কিটেক্টস একটি লাল ইটের দেয়াল ডিজাইন করেছে।
দেয়ালটি উপরের দিকে ওঠার সাথে সাথে ধীরে ধীরে একটি ঢেউ খেলানো নকশায় রূপান্তরিত হয়। কাপড়ের উপাদানগত বৈশিষ্ট্য এই সদর দপ্তরের গতিশীল সম্মুখভাগটিকে প্রভাবিত করেছে। এখানে সাত তলা অফিস স্পেস এবং তিন তলা জনসাধারণের জন্য বিভিন্ন সুবিধা রাখা হয়েছে। এসব সুবিধার মধ্যে একটি ক্যাফে, দোকান, প্রদর্শনী এবং কর্মশালার স্থান অন্তর্ভুক্ত।

এ সার্পেন্টাইন
লন্ডনের কেনসিংটন গার্ডেনের ঘাসের উপর দিয়ে একটি আঁকাবাঁকা ইটের দেয়াল সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে গেছে। স্থাপনাটি এ বছরের সার্পেন্টাইন প্যাভিলিয়ন ‘এ সার্পেন্টাইন’-কে ঘিরে রেখেছে। এই নকশাটি ঐতিহ্যবাহী ইংরেজ ক্রিঙ্কল-ক্র্যাঙ্কল দেয়ালের কথা মনে করিয়ে দেয়। নান্দনিক এই স্থাপনাটি নির্মাণ করেছে লানজা অ্যাটেলিয়ার।
মেক্সিকান স্টুডিও লানজা অ্যাটেলিয়ারের নকশায়, ইটের এই কাঠামোটি মর্টার ছাড়াই তৈরি করা হয়েছে যাতে এটিকে সহজে খুলে ফেলা যায়। এর পরিবর্তে, দেয়াল এবং স্তম্ভগুলোকে স্থিতিশীল করতে স্টিলের প্লেট ব্যবহার করা হয়েছে।

হাইকো গাওশিংলি ইনসান সিনেমা হল
চীনা স্টুডিও ওয়ান প্লাস পার্টনারশিপ এই সিনেমার লবিটিকে নতুন রূপ দিয়েছে। তারা মেঝে থেকে বেরিয়ে আসা বাঁকানো লাল ইটের কাঠামো যুক্ত করেছে। এখানে ভাস্কর্যময় টেবিল, চেয়ার এবং একটি রিসেপশন কাউন্টার তৈরি করা হয়েছে। ছাদ থেকে প্রসারিত হয়ে আলো ও বায়ুচলাচলের পথ ঢেকে রাখা হয়েছে।
চীনের উপকূলীয় শহর হাইকোতে অবস্থিত এই বাঁকানো কাঠামোটির নকশা ওয়ান প্লাস পার্টনারশিপ ডিজাইন ও নির্মাণ করেছে। এই স্থাপনাটি ঢেউ খেলানো সমুদ্রের কথা মাথায় রেখে।

দ্য স্কুপ
দ্য স্কুপ হলো লন্ডনের একটি সম্প্রসারিত অফিস ভবন। এর নামকরণ করা হয়েছে স্থাপনাটির সম্মুখভাগে খোদাই করা একটি বড় খাঁজের জন্য। স্থাপত্য সংস্থা করস্টোরফিন অ্যান্ড রাইট এটি নকশা করেছে। এর নকশা পার্শ্ববর্তী গ্রেড II-তালিকাভুক্ত গির্জার গোলাকার জানালাটিকে ঘিরে রেখেছে।
সাদা ইট দিয়ে তৈরি এই সম্প্রসারণটির কোণগুলো মসৃণভাবে গোলাকার, এবং এর ভেতরের খাঁজটিতে ধাপে ধাপে ইটের গাঁথুনির মাধ্যমে একটি পিক্সেলের মতো ডিজাইন তৈরি করা হয়েছে।

শাহ মুহাম্মদ মহসিন খান সমাধিসৌধ
বাংলাদেশের শাহ মুহাম্মদ মহসিন খান সমাধিসৌধের শীর্ষে সারিবদ্ধ নলাকার স্কাইলাইট রয়েছে। স্থানীয় এক ধর্মীয় নেতার পরিবারের কবরকে স্মরণীয় করতে রাখতে এটি নির্মাণ করা হয়।
নকশায় বর্গাকার এই ভবনের বাইরের অংশকে ঘিরে রয়েছে একাধিক নলাকার ইটের বুরুজ, যার উপরের দিকে বায়ু চলাচলের জন্য ছিদ্র রয়েছে। স্থানীয় স্থপতিরাই এই সমাধিসৌধের নকশা ও ডিজাইন করেছেন।

জিজেজি হাউস
বেলজিয়ামের ঘেন্ট-এর জিজেজি হাউসের সাবলীল দেয়ালগুলো পুনর্ব্যবহৃত ইট দিয়ে তৈরি। এই স্থাপনাটি বিদ্যমান গাছ কাটা এড়ানোর জন্য স্থানটিকে ঘিরে বাঁকানো হয়েছে।
বেলজিয়ান স্টুডিও ব্লাফ আর্কিটেক্টে এই ডিজাইন করে। ডিজাইন করা এই বাড়িটির গোলাকার আকৃতি এর উন্মুক্ত অভ্যন্তরে একটি আরামদায়ক বসার ঘর তৈরি করেছে।
স্থাপত্যকলায় এমন আরও অনেক চম দিন দিন আসবেই। প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হলে ভবিষ্যতের স্থাপত্যে ব্যতিক্রম নকশা, নির্মাণ উপকরণ এবং নির্মাণ কৌশল আমাদের বসতিকে আরও ছান্দসিক ও আরামদায়ক করে তুলতে পারে।



















