আধুনিক শহরের আকাশরেখা কল্পনা করলে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে কংক্রিট, ইস্পাত ও কাচে মোড়া অসংখ্য বহুতল ভবন। কিন্তু নির্মাণশিল্প যখন জলবায়ু পরিবর্তন ও কার্বন নিঃসরণের চাপের মুখে নতুন পথ খুঁজছে, তখন লন্ডনে তৈরি একটি আবাসিক ভবন সেই প্রচলিত ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করেছে। পেট্রা হাইটস নামের এই প্রকল্পে কংক্রিটের ভারী কাঠামো কিংবা প্রচলিত স্টিল ফ্রেমের পরিবর্তে ভবনের প্রধান ভার বহনকারী কাঠামো হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে প্রাকৃতিক পাথর।
উত্তর লন্ডনের ৩১৭ ফিঞ্চলি রোডে অবস্থিত পেট্রা হাইটসের নকশা করেছে স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ’গ্রুপওয়ার্ক’ এবং কাঠামোগত প্রকৌশল সংস্থা ’ওয়েব ইয়েটস’। তিনটি ব্লকে বিভক্ত এই আবাসিক প্রকল্পের উচ্চতা ছয় থেকে দশ তলা পর্যন্ত। সবচেয়ে উঁচু ব্লকটি ১০ তলা বা প্রায় ৩০ মিটার উঁচু। প্রকল্পটির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো—ভবনের বাইরের পাথরের কাঠামোটিই মূল কাঠামোগত ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে। নির্মাতাদের ভাষায়, এটি বিশ্বের প্রথম উচ্চতলা ভবনগুলোর একটি, যেখানে এমনভাবে অশক্তিশালী পাথরের পৃষ্ঠ ব্যবহার করা হয়েছে।

পাথরই যখন ভবনের কঙ্কাল
পেট্রা হাইটসে বাইরের কাঠামো তৈরি হয়েছে প্রায় ১,০০০ টন আগ্নেয় পাথর দিয়ে। ভবনের ৫৭২টি পাথরের স্তম্ভ ও বীম একটি হেলানো কাঠামো তৈরি করেছে। এই কাঠামো শুধু ভবনের নিজস্ব ওজনই বহন করে না, বাতাসের পার্শ্বীয় চাপও সামলায়।
প্রচলিত উচ্চতলা ভবনে বাতাসের চাপ মোকাবিলার জন্য সাধারণত রিইনফোর্সড-কংক্রিট কোর বা শক্তিশালী স্টিল ফ্রেম ব্যবহার করা হয়। পেট্রা হাইটস সেই প্রচলিত পদ্ধতি থেকে সরে এসেছে। এখানে কোনো কংক্রিটের স্থিতিশীলতা কোর নেই, নেই রিইনফোর্সড কংক্রিট কলাম কিংবা ইস্পাতের রিইনফোর্সমেন্ট বার । একই সঙ্গে পাথরের কাঠামোই ভবনের দৃশ্যমান বাইরের বহির্ভাগ হিসেবে কাজ করছে। অর্থাৎ কাঠামো এবং আবরণ—দুটি আলাদা ব্যবস্থা না হয়ে একই উপাদানে মিলেছে।
এই ধারণার পেছনে গ্রুপওয়ার্ক ও ওয়েব ইয়েটসের প্রায় ১৫ বছরের গবেষণা রয়েছে। এর আগে তারা লন্ডনের ১৫ ক্লার্কেনওয়েল ক্লোজ প্রকল্পে ভারবহনকারী পাথরের কাঠামো নিয়ে পরীক্ষা করেছিল। তবে সেই ভবনে বাতাসের চাপ সামলানোর জন্য কংক্রিট কোর প্রয়োজন হয়েছিল। পেট্রা হাইটস সেই পরীক্ষাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে।

কংক্রিটের বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিক পাথর
আজকের নির্মাণশিল্পের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো অন্তর্নিহিত কার্বন । ভবন তৈরির আগে উপকরণ উৎপাদন, পরিবহন ও নির্মাণপ্রক্রিয়ায় যে কার্বন নিঃসরণ হয়, সেটিই অন্তর্নিহিত কার্বন হিসেবে পরিচিত। ইস্পাত ও কংক্রিটের ব্যাপক ব্যবহার এই সমস্যাকে আরও তীব্র করেছে।
গ্রুপওয়ার্ক এবং ওয়েব ইয়েটসের গবেষণা অনুযায়ী, একই ধরনের রিইনফোর্সড কংক্রিট কাঠামোর তুলনায় পেট্রা হাইটস-এর উপকরণ ও নির্মাণজনিত কার্বন নি:সরণ প্রায় ৩২ শতাংশ কম। তবে আরও বড় সম্ভাবনা দেখা যেত যদি ভবনের মেঝে তৈরির পদ্ধতিতেও পাথর ও কাঠের পরিকল্পিত সমন্বয় ব্যবহার করা যেত। সে ক্ষেত্রে কার্বন সাশ্রয় আরও অনেক বেশি হতে পারতো।
স্থপতি আমিন তাহা -এর যুক্তি হলো, ভবন নির্মাণে প্রথমে যতটা সম্ভব কাঠ ব্যবহার করা উচিত। যেখানে কাঠ ব্যবহার করা যায় না, সেখানে পাথর একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প। বিশেষ করে ১৮ মিটারের বেশি উচ্চতার ভবনে ম্যাস টিম্বার ব্যবহারে যুক্তরাজ্যের অগ্নিনিরাপত্তা বিধিনিষেধ থাকায় পাথর ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইতালি থেকে নরওয়ে পাথরের দীর্ঘ যাত্রা
তবে প্রকল্পটির সামনে চ্যালেঞ্জও ছিল অনেক। শুরুতে স্থপতিদের পরিকল্পনা ছিল স্থানীয় ব্রিটিশ পাথর ব্যবহার করার। কিন্তু প্রয়োজনীয় আকার ও শক্তির বড় পাথর স্থানীয় পাথর-খনি থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। ফলে নিচের অংশে ব্যবহার করা হয় সিসিলীয় ব্যাসল্ট।
পাথরগুলো ইতালির আতেলিয়ে রোমিও -তে কম্পিউটার-নিয়ন্ত্রিত ডায়মন্ড-ওয়্যার করাত দিয়ে নির্দিষ্ট মাপে কাটা হয়। কিন্তু করোনা মহামারির সময় সরবরাহব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিলে প্রকল্পে আরও একটি পরিবর্তন আসে। তখন উপরের অংশের জন্য নরওয়ের লারভিকাইট ব্যবহার করা হয়। প্রায় এক শতাব্দী পর লুন্ডস কোয়ারি আবার কাঠামোগত পাথর সরবরাহ করে—এর আগে ১৯৩৩ সালে অসলো পাবলিক লাইব্রেরির জন্য তারা কাঠামোগত পাথর সরবরাহ করেছিলো।

এই বিষয়টি পেট্রা হাইটসের পরিবেশগত দর্শনের একটি সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরে। স্থানীয় পাথর ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি বলে দূরদেশ থেকে পাথর আমদানি করা হয়। এর ফলে পরিবহনজনিত কার্বন ফুটপ্রিন্ট বেড়ে যায়। তাই ভবিষ্যতের প্রকল্পে বড় পাথরের পরিবর্তে ছোট ছোট স্থানীয় পাথর জোড়া দিয়ে কাঠামো তৈরির চিন্তা করছেন প্রকৌশলীরা।
পুরনো উপাদান, নতুন প্রযুক্তি
পেট্রা হাইটসের নান্দনিকতাও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ভবনের পাথরে একটি মরিচা-লাল রং দেখা যায়, যা আশপাশের ঐতিহাসিক লাল ইটের ভবনগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি করে। ব্যাসল্ট ও লারভিকাইট এই দুই ধরণের পাথরকে একই দৃশ্যভাষায় আনতে রাসায়নিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবহার করা হয়েছে।
ভবনটিকে তিনটি আলাদা ব্লকে ভাগ করার ফলে জটিল আকৃতির জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব হয়েছে। এখানে মোট ২২টি আবাসিক ইউনিট রয়েছে। নিচতলায় রয়েছে কাচঘেরা বাণিজ্যিক স্থান এবং একটি স্তম্ভশ্রেণি । দুটি অপেক্ষাকৃত ছোট ব্লকের ছাদে ছাদবাগান রাখা হয়েছে। ভবনের উপরের অংশে যাওয়ার জন্য হালকা ওজনের সিঁড়ি এবং প্রিফ্যাব্রিকেটেড পাথরের লিফট শ্যাফট ব্যবহার করা হয়েছে। এই পাথরের লিফট শ্যাফট মাত্র দেড় দিনে স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে।
৩০ তলা ভবনের সম্ভাবনা
পেট্রা হাইটস হয়তো নিজে ১০ তলার বেশি নয়, কিন্তু এর প্রকৃত গুরুত্ব ভবনটির উচ্চতায় নয়—এর সম্ভাবনায়। গ্রুপওয়ার্ক ও ওয়েব ইয়েটসের গবেষণা বলছে, একই ধরণের পাথরের বাইরের কাঠামো প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ৩০ তলা পর্যন্ত ভবনেও ব্যবহার করা যেতে পারে। এমন কাঠামো ইস্পাতের কাঠামোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন নি:সরন কমাতে পারে।
এই কারণেই পেট্রা হাইটসকে শুধু একটি আবাসিক প্রকল্প হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি যেন নির্মাণশিল্পের জন্য একটি পরীক্ষাগার, যেখানে হাজার বছরের পুরনো উপাদান পাথরকে আধুনিক প্রকৌশলের সঙ্গে মিলিয়ে ভবিষ্যতের নগরায়ণের নতুন সম্ভাবনা খোঁজা হয়েছে।

ভবিষ্যতের স্থাপত্য কি আবার পাথরের দিকে ফিরবে?
মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই পাথর দিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করে আসছে। কিন্তু শিল্পবিপ্লবের পর ইস্পাত, কংক্রিট ও কাচ উচ্চতলা নির্মাণের প্রধান উপাদান হয়ে ওঠে। পেট্রা হাইটস সেই ইতিহাসকে যেন উল্টো পথে হাঁটার একটি সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।
অবশ্য পাথর দিয়ে আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণ এখনই প্রচলিত নির্মাণব্যবস্থার বিকল্প হয়ে যাচ্ছে—এমন দাবি করার সময় আসেনি। বড় আকারের পাথর সংগ্রহ, পরিবহন, নির্দিষ্ট মাপে কাটা এবং কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখনও জটিল ও ব্যয়সাপেক্ষ। কিন্তু পেট্রা হাইটস প্রমাণ করেছে, প্রাকৃতিক পাথর শুধু ভবনের সামনের অংশেররই সৌন্দর্য বাড়ানোর উপাদান নয়। আধুনিক প্রকৌশলের সাহায্যে এটি একটি উচ্চতলা ভবনের প্রধান কাঠামোগত ব্যবস্থাও হতে পারে।
সুতরাং লন্ডনের এই ভবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এর পাথরের দেয়াল নয়, বরং এর চিন্তাধারা। ভবিষ্যতের শহরকে টেকসই করতে হলে সবসময় নতুন উপাদান আবিষ্কার করতে হবে এমনটি নয়। কখনও কখনও সমাধান লুকিয়ে থাকতে পারে মানুষের সবচেয়ে পুরোনো নির্মাণ উপাদানগুলোর মধ্যেই। পেট্রা হাইটস সেই পুরোনো পাথরকেই আধুনিক নগর স্থাপত্যের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা হিসেবে সামনে এনেছে।
















