solar

হাওরে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

সারোয়ার আলম

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্যই বিশেষভাবে বিখ্যাত। তবে এটি দেশের অর্থনীতি, কৃষি ও মৎস্যসম্পদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বর্তমানে যখন বাংলাদেশ জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন হাওর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এক অলীক স্বপ্ন।

যথাযথ পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে হাওরকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

হাওর কী?

হাওর হলো প্রাকৃতিক অববাহিকাভিত্তিক জলাভূমি, যা বর্ষাকালে বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয় এবং শুষ্ক মৌসুমে অধিকাংশ এলাকায় কৃষিকাজ পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সিলেট জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা হাওরাঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।

হাওর দেশের ধান উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি মাছ, জলজ উদ্ভিদ, পাখি ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাসস্থান। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণের সময় পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

হাওর থেকে কীভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন

হাওর অঞ্চলে একাধিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। বছরের বেশিরভাগ সময় হাওরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল অলস পড়ে থাকে। তাই নানা উপায়েই হাওর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ

হাওরের বিশাল জলরাশি ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এতে কৃষিজমি ব্যবহার করতে হয় না। পানির কারণে সৌর প্যানেলের তাপমাত্রা কম থাকে, ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ে। জলাশয়ের পানিরও বাষ্পীভবন কমে। দীর্ঘমেয়াদে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় তুলনামূলক অনেক কম।

বিশ্বের চীন, ভারত, জাপান ও সিঙ্গাপুরে ইতোমধ্যে সফলভাবে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও কাপ্তাই লেকসহ বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের প্রকল্প নিয়ে কাজ চলছে, যা হাওর অঞ্চলের জন্যও সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

বায়োগ্যাস থেকে বিদ্যুৎ

হাওরাঞ্চলে প্রচুর গবাদিপশু পালন করা হয়। এছাড়া কৃষিজ অবশিষ্টাংশ, খড়, জলজ উদ্ভিদ এবং জৈব বর্জ্য ব্যবহার করে বায়োগ্যাস উৎপাদন সম্ভব। এই বায়োগ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, রান্নার জ্বালানি এবং জৈব সার উৎপাদন করা যায়। এটি পরিবেশবান্ধব এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে।

বায়োমাস বিদ্যুৎ

হাওরের কৃষিকাজ থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ধানের খড়, তুষ ও অন্যান্য জৈব উপকরণ উৎপন্ন হয়। এসব ব্যবহার করে বায়োমাস বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করলে কৃষি বর্জ্যের অপচয় কমবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস পাবে। স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎ

বর্ষাকালে হাওর অঞ্চলে নদী ও খালে প্রবল স্রোত সৃষ্টি হয়। যদিও বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্ভব নয়, তবে ছোট আকারের টারবাইন ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

বায়ু শক্তি

খোলা জলরাশির কারণে বর্ষা মৌসুমে কিছু এলাকায় বাতাসের গতি তুলনামূলক বেশি থাকে। যদি দীর্ঘমেয়াদি বায়ু প্রবাহের তথ্য বিশ্লেষণে সম্ভাবনা পাওয়া যায়, তাহলে ছোট আকারের উইন্ড টারবাইন স্থাপন করা যেতে পারে।

কেন ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ সবচেয়ে সম্ভাবনাময়?

হাওরের ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। এর প্রধান কারণগুলো হলো—

  • বিশাল জলাশয় সহজলভ্য।
  • ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন নেই।
  • বিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ নেই।
  • সৌর প্যানেলের দক্ষতা তুলনামূলক বেশি থাকে।
  • স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুফল

হাওরভিত্তিক নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে স্থানীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যাবে বিদ্যুতের ঘাটতি।

ডিজেলচালিত জেনারেটরের ব্যবহার হ্রাস পাবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বৃদ্ধি পাবে উল্লেখযোগ্য হারে। বিদ্যুৎ ঘাটতি না থাকলে স্থানীয় শিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রসার ঘটবে ব্যাপক। এছাড়া কৃষি ও মৎস্যখাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ হলে উৎপাদনও বাড়বে।

পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ

হাওর একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রতিবেশ ব্যবস্থা। তাই যেকোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে পরিবেশগত কিছু বিষয় ভাবা দরকার। হাওর পরিযায়ী পাখিদের বিরাট আবাসস্থল। প্রকল্প পরিকল্পনার আগে তা সংরক্ষণের কথা ভাবতে হবে।

এছাড়াও মাছের প্রজননক্ষেত্র রক্ষা, নৌ চলাচলে বাধা সৃষ্টি না করা, জলপ্রবাহের স্বাভাবিক গতি বজায় রাখা ও জলজ উদ্ভিদের কোন ক্ষতি করা যাবে না। পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) ছাড়া কোনো বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত নয়।

ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে?

যদিও সম্ভাবনা অনেক, তবুও কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে পানির উচ্চতার ব্যাপক পরিবর্তন হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ঝড়, বজ্রপাত ও বন্যার কারণে অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

হাওরের অনেক এলাকা এখনও জাতীয় গ্রিড থেকে দূরে। তাই উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করাও ব্যয়বহুল। প্রাথমিক ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন। প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিবেশগত ভারসাম্য নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প 

বিগত সরকার আমলে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। দেশে এ পর্যন্ত মোট ১০টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তার মধ্যে ৮টি প্রকল্প চালু আছে। বন্ধ হয়ে গেছে দুটি। আরও নতুন ৭টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

২০১২ সালে সুনামগঞ্জের দুর্গম শাল্লা উপজেলায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় যা ২০১৭ সালে বাস্তবায়ন করা হয়। তবে দীর্ঘদিন বিকল হয়ে থাকায় ব্যাটারি নষ্ট হয়ে প্রকল্পটি এখন বন্ধ  হয়ে আছে। ২৯ কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত এ প্রকল্প ৪০০ পরিবার বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারতো।

সম্প্রতি একই জেলার শাল্লা ও ধর্মপাশা উপজেলায় প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। তবে গ্রিড লাইন দূরে থাকায় নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা রয়েছে। বর্ধিত গ্রিডলাইন প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়ক হতে পারে।

ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে করণীয়

হাওরকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে কিছু কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

  • হাওরভিত্তিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা।
  • ভাসমান সৌরবিদ্যুতের পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন।
  • স্থানীয় জনগণকে প্রকল্পে অংশীদার করা।
  • পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার।
  • সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) বৃদ্ধি।
  • গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্পৃক্ত করা।
  • আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল ও সবুজ বিনিয়োগ আকর্ষণ।

হাওর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। তবে এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস, বায়োমাস এবং ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎ প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার হাওরাঞ্চলকে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির অন্যতম উৎসে পরিণত করতে পারে। 

সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে হাওর শুধু খাদ্য ও মৎস্যভাণ্ডার নয়, বরং বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য বিদ্যুতেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে হাওর।

Related Posts

কেমন হবে ভবিষ্যতের আবাসন

শুরুর কথা একটি বাড়ি কেবল মাথাগোঁজার স্থানের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষের জীবনধারা, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি এবং পরিবেশবোধের চূড়ান্ত…

ব্রাজিলের বেলেম শহরে খাল ঘিরে গড়ে উঠল এক নতুন সবুজ করিডোর

ব্রাজিলের পারা রাজ্যের শহর বেলেম দো পারায় সম্প্রতি একটি ভূদৃশ্য-কেন্দ্রিক নগর পুনরুজ্জীবন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। যার নাম “দোকা…

শেনইয়ংয়ের “ভূত সিটি” স্থাপত্যে ব্যর্থতার এক করুণ উপাখ্যান

চীনের দ্রুত নগরায়ন ও রিয়েল এস্টেট খাতের বিস্ফোরক প্রবৃদ্ধির সময় অসংখ্য বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প গড়ে ওঠে। কিন্তু এসব…

গ্রিসের ক্রিটে পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা এক তীরাকৃতি বাড়ি

গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের হেরাক্লিয়নের জলপাই-ঢাকা পাহাড়ি ভূমিতে নির্মিত হতে যাচ্ছে এক অনন্য আবাসিক স্থাপত্য, যার নাম “এন্‌’অ্যারো” (N’Arrow)।…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

মঞ্চ
12
ব্রাজিলের বেলেম শহরে খাল ঘিরে গড়ে উঠল এক নতুন সবুজ করিডোর
Ghost City
গ্রিসের ক্রিটে পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা এক তীরাকৃতি বাড়ি
চীনের যে স্থাপত্য নকশা বৈশ্বিক পরিচয়কে একসূত্রে বেধেঁছে
ওডিসি’র ম্যাট ডেমনের ৩৪ মিলিয়ন ডলারের আবাসন সাম্রাজ্য
নদীই যখন পথ: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পানিপথ-নির্ভর নগর স্থাপত্য
আলোড়ন তুলেছে আবুধাবির প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘরের নতুন ছবিগুলো